সত্যজিৎ রায়ের কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
এডওয়ার্ড লিয়রের ছড়ার রূপান্তর

১।    
কঞ্জুস বুড়ো বসে আছে গাছে                 
২।   
এক যে সাহেব তার যে ছিল নাক               
৩।   খুদে বাবু ফুল গাছে ব'সে যেন পক্ষী          
৪।    যেখানে যে বই আছে পাখি সম্বন্ধে              
৫।    দ্যাখো ভিসুভিয়াসের পরে চড়ি                


ল্যুইস ক্যারলের ছড়ার রূপান্তর    

৬।    
জবরখাকি              
৭।    আদ্যি বুড়োর পদ্যি              
কঞ্জুস বুড়ো বসে আছে গাছে
পাখিদের বলে, "আয় কাছে---
     তোরা যদি ঠুকরিয়ে
     দাড়িগুলো নিস নিয়ে,
নাপিতের খরচটা বাঁচে |"

.         ************                                           
উপরে
এক যে সাহেব তার যে ছিল নাক
দেখলে পরে লাগতো লোকের তাক |
      হাঁচতে গিয়ে হ্যাঁচ্চো হ্যাঁচ
      নাকের মধ্যে লাগল প্যাঁচ |
সাহেব বলে, "এইভাবেতেই থাক |"

.         ************                                           
উপরে
খুদে বাবু ফুল গাছে ব'সে যেন পক্ষী
মৌমাছি এসে বলে "এ তো মহা ঝক্কি !
       মধু খাব, সরে যাও !"
       বাবু বলে "চোপ রাও !
তুমি আছ বলে গাছে বসবে না লোক কি ?"

.          ************                                           
উপরে
যেখানে যে বই আছে পাখি সম্বন্ধে
মন দিয়ে পড়ি সব সকাল-সন্ধ্যে ?"
আজ শেষ হবে পড়া, আর বই বাকি নেই
আপশোষ শুধু --- এই তল্লাটে পাখি নেই |
.          ************                                           
উপরে
দ্যাখো ভিসুভিয়াসের পরে চড়ি
খুড়ো বলে, যাই, নেমে পড়ি |
      যেই কথা সেই কাজ
      তাই দেখ খুড়ো আজ
খুড়ো নয়, খুড়ো-চচ্চড়ি
.          ************                                           
উপরে
[ একটি অনুরোধ - এই সাইট থেকে আপনার ব্ লগ্ বা সাইটে, আমাদের কোন লেখা, তথ্য, কবিতা বা
তার অংশবিশেষ নিলে, আমাদের মূল পাতা
http://www.milansagar.com/index.html এ দয়া করে একটি
ফিরতি লিঙ্ক দেবেন আপনার ব্ লগ্  বা সাইট থেকে, ধন্যবাদ ! ]
জবরখাকি

বিল্লিগি আর শিঁথলে যত টোবে
গালুমগিরি করছে ভেউ-এর ধারে
আর যত সব মিমসে বোরোগোবে
মোমতারাদের গেবগেবিয়ে মারে |

"যাসনি বাছা জবরখাকির কাছে
রামখিঁচুনি রাবণ-কামড় তার,
যাসনি যেথা জুবজু ব'সে গাছে
বাঁদরছ্যাঁচা মুখটি ক'রে ভার |"

তাও সে নিয়ে ভুরপি তলোয়ার
খুঁজে গেল মাংসুমি দুশমনে,
অনেক ঘুরে সন্ধ্যে যখন পার
থামল গিয়ে টামটা গাছের বনে |

এমন সময় দেখতে পেল চেয়ে
ঘুলচি বনে চুল্লি-চোখের ভাঁটা
জবরখাকি আসছে বুঝি ধেয়ে
হিলফিলিয়ে মস্ত ক'রে হাঁ-টা |

সন্ সন্ সন্ চলল তরবারি |
সানিক্ সানিক্ | জবরখাকি শেষ |
স্কন্ধে নিয়ে মুণ্ডখানা তারই
গালুম্ফিয়ে যায় সে আপন দেশ |

"তোর হাতেতেই জবরখাকি গেল ?"
শুধোয় বাপে চামুক হাসি হেসে |
"আয় বাছাধন, আয় রে আমার কেলো,
বিম্বি আমার, বোস-না কোলে এসে !"

বিল্লিগি আর শিঁথলে যত টোবে
গালুমগিরি করছে ভেউ-এর ধারে
আর যত সব মিমসে বোরোগোবে
মোমতারাদের গেবগেবিয়ে মারে |


.     ************ (
Jabberwocky অবলম্বনে)                     উপরে
আদ্যি বুড়োর পদ্যি

বলবার আছে যা' তা' বলি আজ তোরে
(বলবার বেশী কিছু নেই)
দেখেছিনু বুড়ো এক ফটকের পরে,
সব্বার থুত্থুরে যেই |
আমি তারে শুধোলাম, "বুড়ো তউই কে রে?
দিন তোর কাটে কোন কাজে ?"
জবাবেতে বুড়ো কথা বলে তেড়েমেড়ে
মোর কানে কিছু ঢোকে না যে !

বুড়ো বলে, "ধরি আমি ফরিং-এর ছানা
যেই ছানা ঘুম দেয় মাঠে,
তাই দিয়ে রেঁধে নিয়ে মোগলাই খানা
ফেরি করি গঞ্জের হাটে ;
সেই খানা খেয়ে নিয়ে খালাসির বেটা
পাড়ি দেয় সাগরের জলে---
এই করে কোনমতে খেয়ে আধপেটা
কায়ক্লেশে দিন মোর চলে |"

বুড়ো বকে ; আমি পড়ি চন্তার ফেরে---
দাড়ি যদি কারো হয় সবুজই,
থুৎনির সামনেতে হাতপাখা নেড়ে
সেই দাড়ি ঢাকা যায় না বুঝি ?

বুড়ো দেখি চেয়ে আছে কাঁচু মাচু মুখে,
আমি ভাবি কী যে বলি তারে,
তারপরে মেরে এক কীল তার বুকে
বলি, "বল্, আয় কিসে বাড়ে |"

বুড়ো বলে, "শোন, আমি পাহাড়ের বুকে
খুঁজে ফিরি ঝরণার জল,
সেই জল পেলে পরে চকমকি ঠুকে
চট করে জ্বালি দাবানল |
তার ফলে সেই জল টগবগ ফুটে
হয়ে যায় মকরধ্বজ,
কোবরেজে এসে তায় নেয় লুটেপুটে,
আমি পাই কী বা সেটা বোঝ !"

এদিকেতে আমি ভাবি, আর সব ছেড়ে
খাই যদি শুধু পাটিসাপটা,
ওজনটা দিন দিন যাবে না কি বেড়ে ?
বাড়বে না উদরের মাপটা ?

এইবার বুড়োটার কাঁধ দুটো ধরে
বেশ করে দিয়ে তিন ঝাঁকি
বলি, "তোকে বার বার শুধোনোর পরে
প্রশ্নটা বুঝছিস না কি ?"

বুড়ো বলে, "কেয়া বনে---কাঞ্চির তারে
খুঁজে আমি শুশুকের চোখ,
সেই চোখে গাঁথি হার মাঝ রাত্তিরে,
সেই হার কেনে বাবু লোক |
এই ভাবে বল কেবা হয় লাখপতি,
সোনাদানা হয় আর কজনের ?
এই হার বেচে কার হয় উন্নতি,
দেড় পাই দাম যার ডজনের ?"

"খন্দেতে খুঁজি আমি খাস্তা কচুরি,
ফাঁদে ধরি কাঁকড়ার ছানা,
জঙ্গলে জঙ্গলে করি ঘোরাঘুরি,
পাই যদি হংসের ডানা |
বোঝো তবে," বলে বুড়ো এক চোখে হেসে,
"কত খেটে হয় মোরে খেতে |
বাবা তুমি বেঁচে থাক | এদ্দুরে এসে
মোর কথা শোন কান পেতে |"

আমি ভাবি বক বক করে বুড়ো কী যে,
একবার মন দিয়ে ভাবে কি---
মর্চেই ধরে যদি হাবড়ার ব্রীজে,
সরবৎ ঢাললেই যাবে কি ?
যাক্, তবু বলবই বুড়ো লোক খাশা,
খাশা তার রোজগার ফন্দী,
বেঁচে থাকে সেও যেন--- এই মোর আশা |...
এইবার নিজ কাজে মন দিই |

সেই থেকে কভু যদি বুড়ো আঙ্গুলে
লেগে যায় শিরীষের আঠা,
অথবা যদি বা দেখি হিসেবের ভুলে
ডান বুটে ঢোকে বাম পা-টা,
কিম্বা হঠাৎ যদি বাটখারা ভারী
পায়ে পড়ে থেঁত্লায় নখটা

তক্ষুনি মনে পড়ে মুখখানা তারই
সেই থুত্থুড়ে বুড়ো (তারে ভুলতে কি পারি ?)
যার চুল সব সাদা, যার সাদা গোঁফদাড়ি,
যার হাবভাবে মনে হয় যেন গোবেচারী,
যার বুক ভরা দুঃখেতে ধুক্ ধুক্ নাড়ী,
যার চোখ দুটো জ্বলজ্বলে মুখখানা হাঁড়ি,
যাকে দূর থেকে মনে হয়ে দাঁড়কাক ধাড়ি,
যার ফোঁস ফোঁস নিশ্বাস পড়ে তাড়াতাড়ি---

সেই ফটকেতে বসা বুড়ো লোকটা |


.                              ************ (
The White Knight's Song অবলম্বনে)                      উপরে