কবিওয়ালাদের রচিত গান বা কবিগানের কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা দেওয়া কঠিন | বিভিন্ন স্থানে, বিভিন্ন সময়ে
প্রচলিত লোককবিতা (যেমন তর্জা, পাঁচালী, খেউড় ইত্যাদি) অবলম্বনে বিচিত্র বিষয়ের সংমিশ্রণে কবিগান
জন্মলাভ করে | কেবল ধর্মশাস্ত্র বা পৌরাণিক কাহিনীই নয়, মানুষের সাধারণ মনোবৃত্তির বিচার ও
বিশ্লেষণও এই কবিগানকে প্রভাবিত করতো |  অনেক ক্ষেত্রে এই কবিগানের মধ্য দিয়ে সে যুগের জাতি-
বিদ্বেষ সহ নানা সামাজিক চিত্র অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে |  

অনেকে বলেছেন যে উচ্চ শ্রেণীর সাহিত্যের সমান্তরাল এই সাহিত্য সমাজের “নিম্নশ্রেণী”-র সৃষ্টি | মনে রাখা
দরকার যে কবিগান মোটেই নিম্ন শ্রেণীর সাহিত্য বা নিম্ন রুচির নয় | উচ্চ শ্রেণীর সাহিত্যানুশাসনের
পরিপ্রেক্ষিতে কবিগানকে নিন্দা করা হয়েছে এই বলে যে তা নাকি অনুপ্রাস-সর্বস্ব, ভাবশূণ্য, চাকচিক্যময়
কাব্য | ইংরাজী সাহিত্যানুপ্রাণিত বাংলা সাহিত্যে রুচির পরিবর্তনের ফলে কবিগান ধীরে ধীরে লুপ্ত হতে
বাধ্য হয় |  

রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, “একদিন গোধূলির সময়ে যেমন পতঙ্গে আকাশ ছাইয়া যায়, মধ্যাহ্নের আলোকেও
তাহাদিগকে দেখা যায় না এবং অন্ধকার ঘনীভূত হইবার পূর্বেই তাহারা অদৃশ্য হইয়া যায় --- এই কবির
গানও সেইরূপ একসময়ে বঙ্গ সাহিত্যের স্বল্পক্ষণস্থায়ী গোধূলি আকাশে অকস্মাৎ দেখা দিয়াছিল...” |

বলাবাহুল্য এঁদের জীবন ও কাজ বাংলার ইতিহাসে নিজের দাগ রেখে গেছে | তাঁদের জীবনকে কেন্দ্র করে
প্রায় একশো বছর পরে নির্মিত হয়েছে একাধিক জনপ্রিয় ছায়াছবি, যাতে অভিনয় করেছিলেন সে সময়ের
নামী-দামী শিল্পীরা | তারই মাধ্যমে আবার মানুষ গেয়েছেন ওই কবিয়ালদের রচিত গান | বর্তমান কালের
সঙ্গে তুলনা করলে, আমাদের তো তা অশ্লীল, অভদ্র আর নিম্ন রুচির মনে হয় নি | নিছক সাহিত্যের দিক
দিয়েও তা মোটেই নিম্ন মানের মনে হয় নি |

আমরা এখানে বিশিষ্ট কয়েকজন কবিয়ালদের মধ্যে হওয়া কিছু চাপান-উতোর তুলে দিচ্ছি | এর সঙ্গে
আমরা, আমাদের ওয়েবসাইটেই প্রকাশিত,  বহু  কবিওয়ালা বা কবিয়ালের আলাদা পাতায় যাবার লিঙ্ক
দিয়ে দিয়েছি | সেখানে সেই কবিয়ালদের গান বা কবিগান, যা আমরা সংগ্রহ করতে পেরেছি, আপনারা
পড়তে পারবেন |  




উত্স:  
ডঃ শিশির কুমার দাশ, সংসদ সাহিত্য সঙ্গী ২০০৩
দুর্গাদাস লাহিড়ি সম্পাদিত "বাঙালীর গান" ১৯০৫  
ডঃ শ্রীপ্রফুল্লচন্দ্র পাল, প্রাচীন কবিওয়ালার গান, ১৯৯৮
রমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলা দেশের ইতিহাস, ১৩৭৮
S.K.De, Bengali Literature in the 19th Century, 1919   
ভবতোষ দত্ত সম্পাদিত ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত রচিত জীবনী, ১৯৫৮
দীনেশচন্দ্র সিংহ, কবিয়াল কবিগান, ১৯৭৭


আমাদের যোগাযোগের ঠিকানা :-
srimilansengupta@yahoo.co.in
১৯৬৭ সালের ছায়াছবি এন্টনী ফিরিঙ্গী থেকে একটি শট্। এন্টনী ও ভোলা ময়রার কবিগানের আসর।
অভিনয়ে উত্তমকুমার ও অসিতবরণ। সৌজন্যে দূরদর্শন কলকাতা।
কবি গান - অতি প্রাচীন কাল থেকেই ভারতবর্ষে কবির লড়াই চলে আসছে | একবার সম্রাট বিক্রমাদিত্য
কবি কালিদাস ও দণ্ডীর  কবিশক্তির পরীক্ষা করবার জন্য সামনে পড়ে থাকা একটি গাছের গুড়ি দেখিয়ে
তার বর্ণনা করতে বললে দণ্ডী বললেন “শুষ্কং কাষ্ঠং তিষ্ঠত্যগ্রে” | আর একই জিনিষ দেখে কালিদাস বললেন
“নীরসঃ তরুবরঃ পুরতো ভাতি” | কালিদাসের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ হয়েছিল সেদিন | মহারাজ লক্ষণ সেনের সভায়
জয়দেব, ধোয়ী, উমাপতি ধর, গোবর্ধনাচার্য প্রভৃতি কবিদের মধ্যেও কবিতায় বাগযুদ্ধ চলতো | মহারাজ
কৃষ্ণচন্দ্রের ছত্রছায়ায় পরিপোষিত কবি
রামপ্রসাদ সেন ও আজু গোঁসাই এর বাগযুদ্ধের কথা সর্বজনবিদিত,
যদিও তা ভণিতাচ্ছলে শাক্ত ও বৈষ্ণবের কথা-কাটাকাটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল |

সেই কবিতাশ্রয়ী বাগযুদ্ধের পরম্পরা, একটু অন্যভাবে, অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি থেকে উনবিংশ শতকে
মাঝামাঝি সময়কালের বাংলায়, কবিগানের আকারে দেখা দিয়েছিল |  ১৭৬০ থেকে ১৮৩০ পর্যন্ত একদল
কবি আবির্ভূত হন | তাঁরা কবিওয়ালা বা কবিয়াল নামে পরিচিত হলেন | এঁরা প্রাচীন কাব্যের বিষয় গ্রহণ
করেছিলেন কিন্তু প্রাচীন কাব্যের আধ্যাত্মিকতা বর্জন করেছিলেন | এঁরা অনেকেই মুখে মুখে গান রচনা
করতেন এবং নিজের নিজের কবির দল তৈরি করেছিলেন | অনেক কবির আবার নিজের দল ছিল না |  
তাঁরা  অন্যের দলে গান রচনা করে দিতেন | তাঁদের বলা হোত “দোহার” বা “বাঁধনদার” | কবিওয়ালা বা
কবিয়ালরা আসরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গান করতেন বলে এই গানকে “দাঁড়া-কবিগান”-ও বলা হোত, এই ধারণা
ভুল | "দাঁড়া কবি" মানে যাঁরা "বাঁধা গীত" গান, উত্তর-প্রতি উত্তরের মত "বাঁধা" | অপেশাদার শখের
কবিওয়াকে "দাঁড়া কবি" বলেছেন ঈশ্বর গুপ্ত | পরবর্তী সময়ে তা পেশাদার অপেশাদার সবার ক্ষেত্রেই
ব্যবহার করা হয়েছে |  তবে তিনি স্পষ্ট করেন নি "দাঁড়া" কথার অর্থ |

কবির লড়াই ছিল সে কালের এক বিশেষ মনোরঞ্জনের সাধন | বিয়ে, দোল, দুর্গোত্সব প্রভৃতি সামাজিক ও
ধর্মীয় উত্সবে ধনী ব্যক্তিদের গৃহে কবিগানের আসর বসানো হোত |  তাতে অন্তত দুটি কবির দলকে
নিমন্ত্রিত করা হোত | আসর বসতো যাত্রাগানের মতো খোলা যায়গায় কখনও বা শামিয়ানা খাটিয়ে |
মাঝখানে কবিগানের আসরের চারপাশ ঘিরে শ্রোতারা বসতেন | আসরে বসেই জমিদার বা যাঁর গৃহে আসর
বসেছে, তিনি  অথবা অন্য কেউ একটা কোন বিষয় প্রস্তাব করতেন, যার পক্ষে ও বিপক্ষে বলার সুযোগ
আছে | তখন দুই কবিওয়ালা বা কবিয়াল দুই পক্ষ অবলম্বন করতেন | প্রথমে একজন যা গাইতেন, তিনি
শেষ করবার পরই অন্য কবিয়াল উঠে দাঁড়িয়ে  তার প্রতিবাদ ও যুক্তি খণ্ডন করে নিজের পক্ষের
সমর্থনমূলক গান করতেন | এমনও হোত যে এক কবি একটি সমস্যা উপস্থিত করে অপরকে তার সমাধান
করবার জন্য গানের মাধ্যমে দ্বন্দ্ব-যুদ্ধে আহ্বান করতেন | উত্তর ও প্রত্যুত্তর সবই গানের মধ্য দিয়ে হোত |  
এই উত্তর ও প্রত্যুত্তর কে বলা হোত “চাপান” এবং “উতোর” | প্রথম কবি চাপান গাইতেন | প্রতিপক্ষের কবি
উতোর গাইতেন | এই চাপান এবং উতোরের মধ্যে দিয়েই কবির দলের জয়-পরাজয় নির্ধারিত হোত |  
কবির লড়াইয়ের জয়-পরাজয়ের সিদ্ধান্তের ভার শ্রোতাদের উপরে থাকতো | তাতে অনেক সময় গণ্ডগোল
বেঁধে যেত | অনেক ক্ষেত্রে কোনো বর্ষিয়ান কবিয়াল তার সমাধান করে দিতেন | যেমন মহারাজ নবকৃষ্ণ
কবিয়াল হরু ঠাকুরকে তাঁর সভাসদ করে সেই ভার দিয়েছিলেন |

যেহেতু উপস্থিত শ্রোতার মনোরঞ্জন এবং দলের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপন্ন করাই ছিল কবির লড়াই-এর মূল লক্ষ, ভাব
ও রুচির সূক্ষ্মতার চেয়ে মুখ্য হয়ে উঠেছিল শ্রোতাদের রুচি ও চাহিদা অনুযায়ী কবিতা রচনা | তাই মাঝে
মাঝেই আসল বিষয় থেকে সরে গিয়ে তাঁরা পরস্পরের প্রতি ব্যক্তিগত আঘাত করে গান করতেন, যা
কখনও অতি কুরুচিকর, অভদ্র ও অশ্লীলতায় ভরে থাকতো কিন্তু শ্রোতাদের কৌতুহল ও উত্তেজনা বাড়িয়ে
তুলতো | হয়তো কবি গানের জয়-পরাজয়ও, এর দ্বারা প্রভাবিত হোত |

শিবনাথ শাস্ত্রী লিখেছেন, “কবির গান সচরাচর দুই দলে হইত | কোনও একটা পৌরাণিক আখ্যায়িকা
অবলম্বন করিয়া দুই দল দুই পক্ষ লইত | যে দল সর্বপেক্ষা অধিক পরিমাণে লোকের চিত্তরঞ্জন করিতে
পারিত তাহাদেরই জয় হইত | এই সকল উত্তর প্রত্যুত্তর অধিকাংশ স্থলে পৌরাণিকী আখ্যায়িকা পরিত্যাগ
করিয়া ব্যক্তিগতভাবে দলপতিদিগের উপরে আসিয়া পড়িত এবং অতি কুৎসিত, অভদ্র, অশ্লীল ব্যঙ্গোক্তিতে
পরিপূর্ণ থাকিত |”

এমনও হোতো যে দুই কবিয়াল সঙ্গোপনে পরস্পর মিলিত হয়ে পরস্পরের চাপান ও উতোর জেনে নিতেন |
পরে, আসরে সেই মত কবিগান পর্ব পরিবেশন করতেন | এরকম কবিগানকে “বাঁধুটি” বলা হোত এবং যখন
কবিয়ালরা সরাসরি আসরে নেমে তাত্ক্ষণিক রচিত গানের মাধ্যে চাপান ও উতোর গাইতেন তখন সেটাকে
“উপস্থিতি” বলা হোত | মনে করা হয় যে কবিগানের পূর্বরূপ “বাঁধুটি”ই ছিল | ক্রমে প্রতিভাবান কবিদের
আগমনে তা উপস্থিতি তে রূপান্তরিত হয় |  

প্রাচীনতম কবিওয়ালার নাম
গোঁজলা গুঁই | তিনি ১৭৬০ এর পূর্বে বর্তমান ছিলেন | তাঁর একটি মাত্র গান
পাওয়া গেছে | তাঁর তিন প্রধান শিষ্য ---
রঘুনাথ দাস, লালু নন্দলাল এবং রামজী | রামজীর কোনো গান
আমরা এখনও হাতে পাইনি। রঘুনাথের শিষ্যদের মধ্যে
রাসু-নৃসিংহহকুঠাকুর কবিওয়ালা হিসেবে
বিশেষ খ্যাতি লাভ করেন |
হরুঠাকুরের শিষ্যদের মধ্যে নীলু, রামপ্রসাদ ঠাকুর এবং ভোলা ময়রা যথেষ্ট
খ্যাতি অর্জন করেন | রামজীর শিষ্য পরম্পরার মধ্যে
রাম বসু শ্রেষ্ঠ | অনেকের মতে কবিওয়ালাদের মধ্যে
তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিভা | পোর্তুগীজ সাহেব
হ্যান্সম্যান এন্টনি (এন্টনি ফিরিঙ্গী) কবিয়াল হিসেবে যথেষ্ট খ্যাতি
লাভ করেছিলেন | তাঁর সাথে ভোলাময়রার কবিরগানের আসরের খুব নাম ছিল | সাহেব, বাঙালীর পোষাকে
গান গাইছেন, তা দেখতেও বেশ জনসমাগম হোত | কবিগানের কবিওয়ালাদের মধ্যে মহিলারাও ছিলেন, যার
মধ্যে
যজ্ঞেশ্বরী-এর নাম উল্লেখযোগ্য।
১৯৬৭ সালের ছায়াছবি এন্টনী ফিরিঙ্গী থেকে একটি শট্। এন্টনী ও যজ্ঞেশ্বরীর কবিগানের আসর।
অভিনয়ে উত্তমকুমার ও রুমা গুহ ঠাকুরতা। সৌজন্যে দূরদর্শন কলকাতা।