কবি কষ্ণ ধর-এর কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
*
তুমিই গ্রাহ্য খাঁটি
কৃষ্ণ ধর
(বিদ্যাসাগরকে উত্সর্গ করা কবিতা)

কাছে গিয়ে দেখি মিলেছো মেলার ভিড়ে
বীরসিঙ্গার পুতুলে মাটিতে মিশে
শ্রাবণে ভিজেছো সবাকার সাথে সাথে
দামোদরে ঝাঁপ, সেতো আছে ইতিহাসে  |


.                 বর্ণমালার দুঃখ ঘোচাতে একা
.          তুমি রাত জেগে পরিচয়লিপি আঁকো
.          আকারে ইকারে ঐক্যবাক্যে  মিশে
.          কী যে ঘটে গেল সে তো জানে জোড়াসাঁকো  |


.                    ধুতি ও চাদরে তুমিই গ্রাহ্য খাঁটি
.                    শাস্ত্র শিলাকে ভেঙ্গে করো খান খান
.                    দুর্বিনীতে দেখাতে পারো যে চটি
.                    তুমিই দেখাও রেনেসাঁসে সমাধান  |


.                   *************************  
  
.                                                                                          
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
তুমি যদি কথা বল
কৃষ্ণ ধর

তুমি যদি কথা বল, অরণ্য উত্কর্ণ হয়ে থাকে
তারার তিমির-জ্বলা ডাক দেয় শাখা-প্রশাখাকে।

তুমি যদি কথা বল, সমুদ্রসৈকতে বালিয়াড়ি
আগ্রহে চঞ্চল হয়, যদি সুর ভেসে আসে তার-ই।

তুমি যদি গান গাও, সে-গানে বিহঙ্গ পাখা নাড়ে,
তোমার কাকলি শুনে শীতার্থ বৃক্ষেরা পাতা ছাড়ে।

তুমি যদি চোখ মেল, দৃষ্টিপাতে আকাশ জঙ্গম
নয়ন ভোলানো তুমি, ক্রন্দসীর হৃদয়ে বিভ্রম।

তুমি যদি বৃষ্টি দাও, অঝোরে শস্যেরা স্নান করে
জলদবাহন তুমি, তোমার স্নেহেতে দিন ফেরে।

তুমি যদি কথা বল, তোমার কথায় আশাবরী
সাহানা, ভৈরোঁর সুরে দোল খায় দিবস-শর্বরী।

বিষণ্ণ মলিন দিনে, তোমার উজ্জ্বল উপস্থিতি।
সংকল্পে সুদৃঢ় করে প্রতিজ্ঞার অব্যর্থ প্রস্তুতি।

.              *************************  

.                                                                                          
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
কানাগলির প্রার্থনা
কৃষ্ণ ধর

কলকাতার গলিতে বাস। একতলার অন্ধকার গৃহ।
সারাদিন আলো জ্বেলে আকাশেরে করেছি প্রার্থনা :
রৌদ্র তুমি দুপায়ে মাড়াও
স্যাঁতসেঁতে এ-চাতাল, নোনাধরা গলির দেয়াল,
চুনবালি খসা আস্তাবল---
প্রাণের স্পন্দন দাও। আমরাও দীর্ঘজীবী হই।
স্বর্গ তো করিনি আশা। অপ্সরার নূপুর-নিক্কণ
মধ্যরাতে শোনা যাবে অকস্মাৎ বসন্তবাহারে ;
বেহাগের তান শুনে নিদ্রাহীন শ্লেষ্যার আশ্লেষে
খুঁজেছি বাসবদত্তা, তোমাকে কখনও---
এ-কামনা নিতান্ত অলীক।

শুধুই প্রাণের দায়ে। নবজাত শিশুর রোদন।
চঞ্চল মুষ্ঠি যে তার ব্যর্থ হয় আচ্ছন্ন সন্ধ্যায়।
স্তিমিত মোমের আলো।
তাও তো কৃপণ। এই গৃহ-অন্তঃপুরে
মৃত্যুহীন মৃত্যু-বীজ করেছে রচনা
আপন সাম্রাজ্য তার। মানুষের কাছে অধিকার
কেবলই নির্বাক মৃত্যু। এ কলকাতার
গলিতে দুঃসহ এই নাগরিক দায়।
সূর্য, তুমি কেন হলে বিগতযৌবন এই বসন্তসন্ধ্যায় ?

.              *************************  

.                                                                                          
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
মুগ্ধতার জন্য
কৃষ্ণ ধর

এখন আর কিসের জন্য বসে থাকা!
নদীতে যারা গেল, মাঝদরিয়ার দামাল হাওয়ার
খোঁজ পেয়েছে ওরা : ফিরবে সেই সন্ধ্যায়
আকাশে তারা ফোটার অপেক্ষায় ;
দিনমানে কেন তবে বসে থাকা।
নদী ওদের ডাক দিয়ে নিয়ে গেছে,
জলের অপরূপ যাদুতে ওরা বিস্মিত যুবক,
মন্ত্রের জগতে ওদের আনাগোনা,
ডাকলেও ওরা আর ফিরবে না এখন।
এখন আর কিসের জন্য তবে বসে থাকা।
আমার দুঃখকে তুমি নিয়ো,
অন্ধকারে তার ছায়াগুলি দেখি,
টুপটুর বৃষ্টির মতো নিঃশব্দে পাতা ঝরছে।
আমার সন্দিগ্ধ ভাবনাগুলে ঘাসের ডগার ওপর
জড়ো হতে হতে শিশির হয়ে গেল।
আমাকে যদি দরিয়ায় নিতে,
নদীর জলের পরিচিত শব্দে
ওদের সঙ্গ পেতাম।
আমার বধির দৃষ্টিহীন দিনগুলোকে কো পার করবে,
কোন পারানিয়া!

.              *************************  

.                                                                                          
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
গাছ পাখি জলাভূমি
কৃষ্ণ ধর

ও গাছ শোনো, বন্ধু তুমি আমার
গাছ তাকে বলে, আমি তোমার সখা
নয়তো সোনা, নয়তো রূপো তামার
বাকল আমার রূক্ষ রোদে সেঁকা।

পাখির সঙ্গে চলে এমনি আলাপ
গাছের বন্ধু পাখি সেটা জানে
শাখায় পাতায় ছায়াতে ছয়লাপ
বন্ধু দুজন বুঝে নেয় তার মানে।

মানুষ যদি এই কথাটা বোঝে
গাছ তো তারও জীবনপথের সাথী
তারই জন্য সব দিয়ে সে নিজে
মাটির তলায় শেকড় আছে পাতি।

শহর গাঁয়ের গাছ দিচ্ছে কেটে
জলাভূমির করছে সর্বনাশ
পাখির ঠোঁটে খবর গেছে রটে
আর দেরি নয়, আসছে মরুর ত্রাস।

বাঁচতে চাইলে মানুষ তোমরা শোনো
গাছ ও পাখি জলাভূমির বিকল্প নেই কোনো।

.              *************************  

.                                                                                          
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
অনুতাপের প্রশ্নে
কৃষ্ণ ধর

অনুতাপ যদি আসে কোনোদিন, কোনোদিন যদি
মনে হয়, এ আমার প্রতারণা, প্রেম নয়, তুমি
সব মনটুকু অনীবৃত করে যাকে চেয়েছিলে
যে শুধু মুখোশ পরে, উজ্জ্বল বাক্যের বিবিধার্থে
মিথ্যা এক প্রেমিকের অভিনয় করে গেল, তবে
বলো তুমি কোনোদিন অনুতাপে দগ্ধ হয়ে শেষে
নিজেকেই নিহত করার ইচ্ছে হবে না তোমার ?

কখনো হবে না, ঠিক জেনো, আমি কত যে কৃতজ্ঞ
এই বিস্মিত সময়টুকু ধরে কত স্বপ্ন, এই
রৌদ্রে ঘ্রাণ নিই, তুমি কতক্ষণ এসে বসে আছো!
আমাকে বিস্মিত করে যদি ফের কোনোদিন
নাই ডাকো, এই পরমাশ্চর্য দিন তবু তো আমার
হয়ে বলবে খোঁপা বাঁধা সুকেশী সন্ধ্যাকে, উজ্জ্বল
যুবক এক এসেছিল, উজ্জ্বলতর ভালবেসে।

.              *************************  

.                                                                                          
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
আশ্রয়ের খোঁজে
কৃষ্ণ ধর

একদিন দিশাহীন দিগন্ত
আমাকে এখানে নিয়ে এসেছিল
নাঙ্গাপায়ে বিস্তর হেঁটে
.                এখানে আসা
বড়ো কষ্ট নিয়ে এসেছিলাম
অপমানের জীবন থেকে
যদি রেহাই মেলে, জীবনযাপনেরও
.                আকাঙ্খা ছিল
হলো না। এই গাছপালা বোবা আকাশ
.                তার সাক্ষী
রেখে যাচ্ছি কিছু মায়
নিয়ে যাচ্ছি কিছু স্মৃতি
ওরা দেখেছে কীভাবে কেটেছে
.                আমার জীবন
আমার ভেতরটা কেউ দেখেনি
আমি জানি দিশাহীন দিগন্তের দিকেই
আবার ফিরে যেতে হবে আমাকে
চলে যাচ্ছি কাঁটা-মারা তাঁবুর জীবন গুটিয়ে,
নাঙ্গাপায়ে যেমন এসেছিলাম
.                একদিন তোমাদের কাছে
.                আশ্রয়ের খোঁজে॥

.              *************************  

.                                                                                          
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
ভোরবেলার গল্প
কৃষ্ণ ধর

ভোরবেলাগুলি কখন যেন হাত গলিয়ে চলে গেছে
ওরা অন্য পোশাকে দাঁড়িয়ে আছে বিকেলের বারান্দায়
যখন সময় দৌড়ুত যেন টগবগে দুরন্ত ঘোড়া
তাকাবার কথা মনে হয় নি ওদের দিকে
নিমগ্রীষ্মের দুপুরে চলতে চলতে দেখা যেত
রোদে চমকানো প্যারাসোল

হাতের মুঠোয় ধরা প্রিয় শব্দাবলী
এখন ঘুমে কাতর
তাকে জাগাতে হলে ভোরবেলাগুলিকে ফিরে চাই
ভোরের মানুষগুলিকে দেখতে চাই আবার
ভোরের স্বপ্নের গায়ে ডানা লাগিয়ে ওরা এখন
অজস্র প্রদাপতি হয়ে বিকেলের মরা রোদে উড়ছে
ওদের আমি দেখেই চিনতে পেরেছি

বিকেলবেলার জন্য কোনও স্বপ্ন আর বাকি নেই
পাতাঝরারও একটা মাধুর্য আছে নিসর্গে
নিস্তব্ধ নিশ্বাসে টুপ করে খসে পড়ে
এক একটা প্রবীণ পাতা হলুদ বিবর্ণতা শরীরে নিয়ে
এতকাল না-ঘুমের স্বপ্ন দেখে
বিকেলের এই আয়োজনে মজাই লাগে
আমি তো জেগে থাকতে চাই
বিকেলের বারান্দার রেলিং-এর ফাঁকে ফাঁকে
ভোরবেলার স্বপ্নের টুকরোগুলো গুঁজে দিয়ে
ফের আড্ডা জমানো যাবে।

.              *************************  

.                                                                                          
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
স্ববিরোধী নয়
কৃষ্ণ ধর

কখনো মানুষ চায় নিঃসঙ্গতা, কখনো
সে মিশে যেতে চায় জনারণ্যে
এই তার বিরুদ্ধ স্বভাব তবু সে স্ববিরোধী নয়
গভীর দুঃখের দিনে সে বুঝি একাকী
আনন্দের ভাগ দিতে সে যায় প্রতিবেশী ঘরে

মনুষ কখনো শিল্পী, করিগর, কখনো ভাবুক
সে স্বপ্ন দেখে, সময়ের স্রোত তাকে টানে
কখনো উজানে যায়, গা ভাসায় মোহানার দিকে
তার হাতের মুঠোতে ধরা সত্যাসত্য, অভিজ্ঞতা
পায়ে পায়ে চড়াই উৎরাই

নিজের আয়নায় দেখে মুখ
গভীর দুঃখের দিনে সে বুঝি একাকী
আনন্দের ভাগ সে দিতে যায় প্রতিবেশী ঘরে
প্রেমহীনতা থেকে যেতে চায় গভীর হৃদয়ে
অন্য কোনো হৃদয়ের সমাচারে

কখনো মানুষ চায় নিঃসঙ্গতা, কখনো
সে মিশে যেতে চায় জনারণ্যে

এই তার বিরুদ্ধ স্বভাব তবু সে স্ববিরোধী নয়

.              *************************  

.                                                                                          
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর