কবি কৃষ্ণকুসুম পাল-এর কবিতা
*
মহাকাব্য
কবি কৃষ্ণকুসুম পাল
‘রাতের কাব্য’  কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া

মহাকাব্য লেখা হয় না আর,
মিনি, মাইক্রো, ন্যানো  প্রেমের বাজার,
মহাপ্রেম নেই |

মহাকাব্য লিখতে হলে—
সীতা হরণ, দ্রৌপদীর বস্ত্র হরণ,-------  প্রয়োজন,
এখন সে সব হরদম্ , হামেশা হচ্ছে,
অসংখ্য মহাকাব্য লেখার আয়োজন অসম্ভব |
ভাব তাই মেঘের বিজলী চমক্
ভাব তাই ভাবনাহীন  ঠুংরী.  ঠমক্
ভাব তাই অর্থহীন ব্যর্থ ভাবনা,
ভাব তাই ধাঁধার ম্যাজিক্ রচনা,
না বলা কথা – কবিতা, শ্রোতারা সুকান্ত,
না দেখা দৃশ্য – ছবি, দর্শক দুর্দান্ত ,
না শোনা প্রলাপ ---- ভাব, ভাষ্যক বিভ্রান্ত,
না বোঝা ভাষা—কাব্য পাঠক ক্লান্ত |
কিভাবে মহাকাব্য,  মহাপ্রেম হবে ?
অথচ প্রতিক্ষণে প্রয়োজন লঙ্কা অভিযান,
আমরণ যুদ্ধ প্রত্যাশী  কুরুক্ষেত্র ময়দান |
আমরা ভালো আছি মন্দের ভালো,
সহস্র সীতার সিঁথির সিঁদুর মুছে যাক্,
দশকোটি দ্রৌপদী রাজপথে গণধর্ষিতা হোক,
আন্দোলন, ভাব আর ভাষা বিলীন এখন,
বাস্তব অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র, বাঁচায় মধুসূদন |

.     ****************    
.                                                                                                 
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর
*
দিব্যাঙ্গনা দ্রৌপদী
কবি কৃষ্ণকুসুম পাল
‘দিব্যাঙ্গনা দ্রৌপদী’  কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া

দ্রৌপদী, তুমি অতি সুন্দরী, তাই পেলেনা বর,
আমি দুর্যোধন, দুঃশাসন, কর্ণ, কীচক, জয়দ্রথ নই,
আমি তোমার যোগ্য পাণি প্রার্থী |
তোমার পঞ্চস্বামী কেহ তোমার যোগ্য নয়,
তোমার সম্মান রক্ষায় ব্যর্থ সকলে
সামান্য লক্ষ্যভেদে নয়, বংশ পরিচয়ে নয়,
তোমার বস্ত্রহরণস্থলে স্বামী পরিচয়ে হতাম অদ্বিতীয় |
দ্রৌপদী তোমার কাছে তৃপ্ত সকলে জীবনে, যৌবনে,
অথচ অতৃপ্ত বাসনায় আজো তুমি স্বর্গচ্যুতা |
যখন দেখি তোমার অর্ধউলঙ্গ রাজ সভাস্থলে-
ক্লীব পঞ্চপতি দেখল না তোমার দুর্গতি
আমার হৃৎপিন্ডে, শিরায়, ধমনীতে পঞ্চবায়ু জ্বলে,
তখনই হলো না কেন সবার মরণ |
এতো কৌশলে কুরুক্ষেত্র রণ-কি প্রয়োজন ?
দ্রৌপদী, তুমি কি দিব্যাঙ্গনা ?
মানবীর অঙ্গ সহেনা এতো গ্লানি, অপমান, অত্যাচার,
সীতাও প্রবেশ করে পাতালে,
অগ্নি পরীক্ষাপ্রার্থী আমি,  তোমার ষষ্ঠপতি,                 
আমার কাছে তুমিই অমূল্য, তুচ্ছ মেদিনী |

.             ****************    
.                                                                                    
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর
*
গলগ্রহ
কবি কৃষ্ণকুসুম পাল
‘দিব্যাঙ্গনা দ্রৌপদী’  কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া

আমাদের কথা শেষ শোন-মা, বাবা,
তোমাদের স্বপ্ন, সংগ্রাম শোনার সময় নেই কারো,
তোমাদের চাওয়া, পাওয়া
তোমাদের হাট বাজার,
আমাদের শোনাবে কেন ?
সন্তানের জন্মদান তোমাদের ইচ্ছার ফসল,
মানুষ করার দায়িত্ব, কর্তব্যও তোমাদের,
যাযাবর যৌবন নিজস্ব প্রয়োজনে গড়ে জীবন, সংসার |
তোমরা গলগ্রহ,
গলাধাক্কা দেবার আগে
বেওয়ারিশ লাশ হবার আগে,
ভালো কথায় বের হয়ে যাও,
এখানে হবে না তোমাদের সংস্থান |
কত ধর্মশালা আছে অথবা বৃদ্ধাশ্রম
স্থান পেয়ে যাবে কোন এক সান্ধ্যনীড়ে |
এমন তো নয় সহসা মরে যাবে
মৃত্যুর এখনো অনেকদিন বাকী,
কেউ কি আর ইচ্ছে করে মরে ?
তোমাদের সম্পদের কি প্রয়োজন ?
ভিক্ষার দানে চলে যাবে বাকীটা জীবন,
তোমাদের দেখবেন, তোমাদের ভগবান,
এখানে পাবে সবার অকথ্য অত্যাচার, অপমান,
সব সম্পদ কেড়ে নিয়ে কপর্দক শূন্য করেছি
এসব কথা কাউকে বলো না,
কোথাও নালিশ করলে নাকাল হবে,
আকাশে থুতু ছুঁড়লে নিজের গায়ে পড়ে !
কে কার আগুন নেভাবে
.                  আগুন লেগেছে বিশ্বঘরে |

.             ****************    
.                                                                                    
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর
*
না ছোঁয়া লগ্ন
কবি কৃষ্ণকুসুম পাল
‘দিব্যাঙ্গনা দ্রৌপদী’  কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া

মেয়েটার নাম পৃথ্বি, মাতৃ পিতৃহীন,
মামার বাড়ীতে মানুষ, সবার নয়নমণি,
আজ বিয়ে, লগ্ন আটটায়,
বরবরণ নারী জীবনের অগম্য অধ্যায়,
আজন্ম আপন ছেড়ে বিরহ সাগরে----
.                                   নতুনের স্বপ্ন ভয়,
চেনা অতীত থেকে অজানা ভবিষ্যতের কাছে আত্মসমর্পণ |
সকলে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ চায় |
নিশ্চিত মরণ অবধি যৌবন আত্মসমর্পণে সাফল্য খোঁজে |
সানাই বাজতেই দাদুর বুকের ব্যাথা বেড়ে গেল,
গিন্নী বিদায় নিয়েছে বহুদিন হল,
দাদুর কোলে পৃথ্বি অতি আদরে বড় হল,
প্রাণপ্রিয় পৃথ্বির বিরহ তাঁর সহ্য হলো না,
তিনি নিথর হলেন,
চির শান্তির দেশ পেলেন |
মেয়েটির বিয়ে আর হলো না,
পৃথ্বি কাঁদলো---
বর, দাদু,মা,বাবা, না---- নিজের জন্য !
কেউ জানলো না পৃথ্বি কেন কাঁদলো |
লগ্ন আটটায়, মেয়েটার কান্নায়
জীবন, যৌবন ভেসে গেল বন্যার জলে,
পূর্ণ যুবতী পৃথ্বি তাই আজো সূর্য্যমুখী |

.             ****************    
.                                                                                    
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর
*
প্রাণ পাখী
কবি কৃষ্ণকুসুম পাল
‘দিব্যাঙ্গনা দ্রৌপদী’  কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া

কর্মক্লান্ত পাখী নিদ্রামগ্ন ছিল নীড়ে
হঠাৎ বোমার শব্দ, গুলির শব্দ, শ্লোগান জোরে,
বাসা ছেড়ে পাখী মেলল ডানা
শুনল মসজিদের আজান, মন্দিরের শঙ্খধ্বনি,
.                                 ---- গীর্জার প্রার্থনা,
সামনে তার মুক্ত আকাশ, মুক্ত বাতাস, দীর্ঘ অজানা |
কাঁটাতার নেই তার, নেই ধর্মধ্বজা, তাজা রক্তবুকে,
অভিন্ন, একাত্ম বিশ্বে উড়ছে সে মানুষের দুঃখে,
নীচে তার পৃথিবী, একমাত্র প্রাণের ঠিকানা,
সেখানে রয়েছে তার আপন অবুঝ ছানা,
বোঝে না সে, মানুষ কেন বোমা বানায়, গুলি ছোঁড়ে,
ভাই কেন ভাই এর বুক ফোঁড়ে ?
তার চোখে পৃথিবী প্রাণের সবুজ বাগান,
মানুষ অজানা, অচেনা, অবুঝ, নিষ্প্রাণ |
ওরা কি পৃথিবীতে বাঁচতে দেবে ?

.             ****************    
.                                                                                    
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর
*
বাংলা ভাষা-ভূত ভাষা!
কবি কৃষ্ণকুসুম পাল
‘দিব্যাঙ্গনা দ্রৌপদী’  কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া

বাবা বাংলার বড় কবি, ভূতগ্রস্থ ?
মা বলে ফ্র্যান্স, ছেলে, মেয়ে ইংরেজী,
বন্ধু, বান্ধবীরা বলে উর্দু, চীনা, জার্মান |
ওরা বাংলায় থাকে বছরে ছয়মাস,
বাকী ছয় মাস ভ্রমণে দুনে বা মুনে,
বাংলার কবি বাংলায় বাঁচে বাংলার টানে,
দশটি কাব্যগ্রন্থ তাঁর, হাজার কবিতা,
কে পড়বে ভেবে পায় না কবি,
বাংলার ঘরে, ঘরে চলছে কবির ঘরানা,
নদী শুকিয়ে হচ্ছে ছড়া,
ছড়া শুকিয়ে হচ্ছে শুকনো খাল,
বাংলাদেশ আছে,  নেই বাংলাভাষা,
রবিঠাকুরের মূর্ত্তি আছে মিউজিয়ামে
.                         -- নোবেলটি নেই |
বিশ্লেষক বলছে—রবি নামে কবি ছিল,
.                  বাংলা নামে ভাষা ছিল,
.                  বাঙালীরা কবির জাত ছিল |
এখন, বাংলা কাব্যগ্রন্থ দুর্বোধ্য সবার কাছে,
মুদিখানায় হয়তো এখনো দু’একটি আছে |

বাবা, বাংলার বড়কবি, ভূতগ্রস্থ ?
মা বলে ফ্র্যান্স, ছেলেমেয়ে ইংরেজী |
বাংলা, ভূতের গরব, ভূতের আশা ?
.                      – আমরি ভূত ভাষা ?

.             ****************    
.                                                                                    
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর
*
পারভিন
কবি কৃষ্ণকুসুম পাল
‘সিঁথিতে উজ্জ্বল ছায়াপথ’  কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া

পারভিন,  তোকে তালাক দিতে পারিনি,
----এতো বে-আক্কেল হতে পারলাম না |
বড় ভালোবেসে, কলমা পড়ে তোকে নিকাহ করলাম |
মুরুব্বি মৌলনা মাসুদের জবান মতো –
এক হাজার এক টাকা নজরানা দিলাম |
তোকে ছেড়ে আমি এখন বহুদূরে –
তোর সাথে আর আমার দেখা হবে না |
কি করবো বল—
জাহিরা আমার মাথা খেলো যে-
জাহিরাতো মেয়ে নয়, যেন জহর,
.                               প্রাণান্তকর বিষ |
যে ছোঁয়, তার বাঁচা মরা সমান |
জাহিরাকে নিয়ে পালিয়ে এলাম,
তা-না হলে তোর বাপ, আমাকে জবাই করতো |
ইমরান তালাক দিয়েছিলো জাহিরাকে,
ইমরানটা বদমাশ্, -- এ যাবত পাঁচ জনকে তালাক দিল |
জাহিরা খুব ভালো মেয়ে,
আমি নিকাহ না করলে, মেয়েটা বরবাদ হয়ে যেতো |
জাহিরা কবুল করল, তাতে দোষ কি ?
দুঃখ করিস না, তোর কপাল খারাপ
তোর মাকে তালাক দিয়েছিল আব্দুল,
তারপর শোয়েবের ঔরসে তোর জন্ম হল,
শোয়েবের গায়ে শুয়োরের মতো রাগ-
তাকে আমার ভীষণ ভয় করে,
.         তাই দেশান্তরী হলাম |
আমার মাকে তালাক দিয়েছিল রহমান
তারপর মাকে নিকাহ করল আফতাব
.                                  জন্ম হল আমার |
তালাক না থাকলে , তোর, আমার জন্ম হতো না |
সমাজটা যেন তালাকেই বাড়ে,
.          তালাকই মরদের তাকত |
তালাক মাতাল জীবনটাকে তালগোল পাকায়,
.         ভালোবাসার কথা আর বিবেকে আসে না
তুই একা নস্,  নাসিরা,  সাকিলা,  আজমা,  আনোয়ারা,----
তালাক,  তালাক,  তালাক,---- তিন তালাকের ঘরছাড়া |
তাদের সাথে গল্প করিস্ |
ইউসুফ তো তোকে কত চায় |
তুইতো আমাকে ছাড়া মজলি না |
মন চাইলে ইউসুফকে কথা দিস,
তাকে নিয়ে ঢাকায় চলে যাস |
তুই কথা দিলে,
সে তার বিবিজানকে তালাক দিয়ে দেবে |
আল্লা তোকে মেহেরবাণী করুক
পারভিন, তোকে আমি ভুলতে পারলাম না,
তোর ইরফান তোর বিরহ জ্বালায় মরে,
বুঝ্ লাম, লোক মরে, ভালোবাসা মরে না  |

.             ****************    
.                                                                                    
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর
*
মাতৃভাষা
কবি কৃষ্ণকুসুম পাল
‘দিব্যাঙ্গনা দ্রৌপদী’  কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া

কোন পাখী ইংরেজী শেখেনি,
কোন পশু বাংলা বা উর্দু শেখেনি
ওরা কেবল জানে মাতৃভাষা |

সব পাখী নানা ভাষায় গান গায়,
সব পশু নানা ভাষায় কথা বলে,
ওরা স্বাধীন, ভাষার জন্য রক্তগঙ্গা বয়না |

‘কিচির মিচির’ সে-ও ভাষা,
‘ হুয়াক্কা-হু’ সে-ও ভাষা,
.        পুরায় মনের আশা |

ওদের ‘কুহু কুহু’ ডাকে বসন্ত আসে,
‘কুক্ কুরু কুক্’ ডাকে ভোর হয়,
ওরা তো মানুষ নয় |

মানুষ-ভাষার জন্য মানুষের বুকের রক্ত ঝরায়
ভাষা শহীদ ভাইয়েরা আমার, তোমরা কেন পাখী হলে না,
আমরা তোমাদের জন্য বেহেস্তেও মাতৃভাষা চাই,
নতুবা বুকের রক্তে ভাসাবো দেবালয় |

.             ****************    
.                                                                                    
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর
*
ভুলভোলা
কবি কৃষ্ণকুসুম পাল
‘দিব্যাঙ্গনা দ্রৌপদী’  কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া

ভুল করে ভোলা ভুল করে না, জেনে শুনে ভুল করে,
ভুলে তার ভাগ্য ফেরে, রাজ্যপাট ভুলের জোরে |
সংগ্রামী ভুলগুলো তার আগামীর আতঙ্ক,
ঐতিহাসিক ভুলগুলো তার বৈপ্লবিক অঙ্ক,
যুগে যুগে ভুলে ভুলে জ্বলে আগুন, পোড়ায় সমাজ,
বলছে সবাই, ঢের হয়েছে এবার থামুন, তবু চলে ভুলের শিল্পকাজ |
ভোলা রাজা, ভুলের রাজা, ভুল করতে হয় না ভুল,
ভুল হয়েছে মানছেও সে দিচ্ছে সবাই ভুলের মাশুল |
তার অভ্রান্ত বীজমন্ত্র ভুল হয়েও, শিষ্যতন্ত্র ঠিক,
মানীর মুখে চূণকালি, হাভাতের হাততালি, বন্য দশদিক |
ভুল ভোলা, ভুলছে না, ভুলবে না, ভুল বুঝিয়ে গড়ছে জনমত,
ভুল জিন্দাবাদ, ভুল জিন্দাবাদ, তত্ত্ব নয়, তথ্য নয়, চলবে ভুলের পথ |

.         
             ****************    
.                                                                                    
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর