কবি মণিভূষণ ভট্টাচার্য্য -  জন্মগ্রহণ করেন অবিভক্ত বাংলার চট্টগ্রামে | পিতা যোগেন্দ্রনাথ
ভট্টাচার্য্য ও মাতা সত্যভামা দেবী |  পৈতৃক উপাধি ছিল ‘বাচস্পতি’ | যোগেন্দ্রনাথ ছিলেন সংস্কৃত শাস্ত্রবিদ |
দেশ ভাগের পর মণিভূষণ সপরিবারে প্রথমে চলে আসেন আসানসোল, পরে দাদার পরিবর্তিত কর্মস্থল
নৈহাটিতে চলে আসেন |

কবি মণিভূষণ ১৯৫৭ সালে নৈহাটির ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র কলেজ থেকে আই .এ. পাশ করে কলকাতা-র বঙ্গবাশী
কলেজে সন্মানিক বাংলা নিয়ে পড়েন এবং ১৯৫৯ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য
বিভাগে ভর্ত্তি হন,  কিন্তু শেষ পর্যন্ত এম. এ পরীক্ষা দেন নি |

কবি ১৯৬২ সালে কাঁচড়াপাড়ায় হার্নেট উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন, অল্প কয়েক দিন
শিক্ষকতা করার পর তিনি গরিফা উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন ১৯৬৩ সালে |  
উচ্চশিক্ষিত ব্রাহ্ম পরিবারের কন্যা শ্রীমতী আলো দাসের সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয় ১৯৭৫ সালে।

কবি মণিভূষণের প্রথম কবিতার বই “কয়েকটি কন্ঠস্বর” প্রকাশ হয় ১৯৬২ সালে বন্ধুদের আগ্রহে ও
অর্থসাহায্যে | বইটি বুদ্ধদেব বসুকেও আকর্ষণ করেছিল | ১৯৭১ সালে কবির দ্বিতীয় কবিতার বই “উত্কন্ঠ
শর্বরী” প্রকাশ হয় | জরুরী অবস্থায় দেশজোড়া অস্থিরতার পর্বে প্রকাশিত হয় তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ  
“গান্ধিনগরে রাত্রি” | এই বইটি তাকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে দেয় | বইটি পড়ে অগ্রজ কবি বীরেন্দ্র
চট্টোপাধ্যায় এমন অভিভূত হয়েছিলেন যে, তিনি বইটির প্রচার করতে থাকেন | বইটি প্রকৃত অর্থে সত্তরের
গণ আন্দোলন, সামাজিক অস্থিরতা, পুলিশি সন্ত্রাস ও শাসকের দমন পীড়নের দিনলিপি হয়ে ওঠে |  এরপর
প্রকাশিত হয় ১৯৭৭ সালে “মানুষের অধিকার”, ১৯৮০ সালে “দক্ষিণ সমুদ্রের গান”, ১৯৮৩ সালে “প্রাচ্যের
সন্ন্যাসী”, ১৯৯৩ সালে “অবিচ্ছিন্ন অন্তপুর”, ১৯৯৫ সালে ”পরিব্রাজকের জললিপি” ইত্যাদি এবং সর্বশেষ
কাব্যগ্রন্থ “আত্মভোজ” প্রকাশিত হয় ২০১১ সালে | বাংলা সনেট রচনাতেও তিনি একটি ধারা তৈরি
করেছেন যার নিদর্শন ছড়িয়ে আছে তাঁর “রাজহাঁস” নামক গ্রন্থের কবিতাগুলির মধ্যে |  কবি প্রথম জীবনে
বড় কাগজে লিখেছেন, কিন্তু ১৯৬২ সালে ভারত-চীন যুদ্ধের সময় “শিল্পীর স্বাধীনতা” বিষয়ে তাঁদের অবস্থান
মেনে না নিয়ে তাঁদের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করেন |  এর পর তিনি কোন বৃহৎ বাণিজ্যিক কাগজে লেখেননি |
পরবর্তী সময়ে প্রথা, পরিচয়, অনুষ্টুপ, অনীক, কোরক, ইত্যাদি পত্র পত্রিকাকেই তিনি স্বাধীনভাবে মত
প্রকাশের হাতিয়ার করে নেন |

কবি মণিভূষণের গভীর আস্থা ছিল মানুষ ও মানবতাবাদের প্রতি | জীবনযাপনে ছিলেন অত্যন্ত
সাধাসিধে ও অনাড়ম্বর | যতটা লিখতেন তার থেকে ভাবতেন ও পড়তেন অনেক বেশি | ভিড়, হইচই
সভাসমিতির হুল্লোড় এড়িয়ে চলতেন | বেড়াতে ভালবাসতেন |  অনুভব ও পর্যবেক্ষণের
ক্ষমতা ছিল প্রখর | বামপন্থায় আজীবন বিশ্বাসী হয়েও দলীয় বা রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার কথা কখনও
ভাবেননি, বরং ক্ষমতায়নের বৃত্ত থেকে দূরে থেকেছেন | ১৩ জানুয়ারী ২০১৪ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে
৭৫ বছর বয়সে তিনি পরলোক গমন করেন |  

আমরা
মিলনসাগরে  কবি মণিভূষণের ভট্টাচার্য্যর কবিতা তুলে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে
আমাদের এই প্রচেষ্টা সার্থক মনে করবো।

মিলনসাগরের জন্য কবির এই পরিচিতিটি লিখে দিয়েছেন মানস গুপ্ত।

উত্স - তাপস ভৌমিক, “অগ্নিবলের কবি”, সংবাদ প্রতিদিন, ২৬শে জানুয়ারী, ২০১৪, রবিবার


মিলনসাগরে কবি মণিভূষণ ভট্টাচার্য্যর মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন।    


আমাদের ই-মেল -
srimilansengupta@yahoo.co.in     


এই পাতার প্রথম প্রকাশ - ১৪.২.২০১৪  

...