কবি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়  - এর আসল নাম প্রবোধকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় | জন্মের সময়
ফুটফুটে সুন্দর কালো শিশু বলে আঁতুড়ঘরেই তাঁর নামকরণ হয় কালোমাণিক | সেই থেকে তাঁর ডাক নাম
"মানিক" |

তিনি জন্ম গ্রহণ করেন বিহারের “দুমকা” শহরে |  পিতা হরিহর বন্দ্যোপাধ্যায় সেখানে এসিস্ট্যান্ট   
সেটলমেন্ট অফিসারের সরকারি চাকরি করতেন | মাতা নীরোদাসুন্দরী দেবী, কবির মাত্র ১৬ বছর বয়সেই
ডবল নিমোনিয়ায় ভুগে পরলোক গমন করেন |

শৈশবে তিনি ভীষণ দুরন্ত ছিলেন | বঁটিতে পেট কেটে হাসপ্তাতাল দৌড়াদৌড়ি! দাদা সুধাংশুকুমারের পিঠে
চেপে আলমারির উপর থেকে ইঁদুর ধরতে গিয়ে আলমারি চাপা পড়া! কালীপূজার বাজি তৈরী করতে গিয়ে
বারুদভরা শিশি ফেটে আপাদমস্তক ভাঙা কাঁচে বিদ্ধ হওয়া! রান্নাঘরে উনোন থেকে চিমটে দিয়ে কয়লা
তুলে খেলতে গিয়ে পায়ের উপর পড়ে পুড়ে যাওয়া! লুকিয়ে সদ্দ নামানো গরম রসগোল্লা মুখে পুড়ে সারা মুখ
পুড়ে যাওয়া! এমন অনেক কাহিনীই আমরা জানতে পাই | একবার দুমকায় থাকতে, তাঁর ছোট ভাই কুঁয়ায়
পড়ে গিয়েছিলেন, ঝুঁকে ব্যাঙ দেখতে গিয়ে | মাণিকের উপস্থিত বুদ্ধি ও বড়দের চেষ্টায় ছোটভাই সে যাত্রায়
রক্ষা পান | তিনি নাকি শরীরচর্চা করতেন, আখড়ায় গিয়ে কুস্তি লড়তেন! একবার কোন এক গুণ্ডা তাঁর ভাই
প্রবোধকে বলপূর্বক লুকিয়ে রেখেছিল | মাণিক সেই গুণ্ডাটিকে নির্দিষ্ট সময় মাঠে আসতে বললেন এবং
সেবারের লড়াইয়ে সেই ব্যক্তিকে মার খেয়ে হাসপাতালে যেতে হয়েছিল!

তিনি স্বভাবে একটু বেপরোয়া ছিলেন | টাঙ্গাইলে থাকার সময়ে স্কুলে না গিয়ে তিনি একা একা মাঠে ঘুরে
বেড়াতেন, বাঁশী বাজাতেন | তিনি নাকি খুব ভাল বাঁশী বাজাতে পারতেন | কখনও মাঝিদের সঙ্গে রাত
কাটাতেন নৌকায় | কখনও সময় কাটাতেন ঘোড়ার গাড়ির গাড়োয়ানের সঙ্গে | এর জন্য বাড়ীর বড়দের
কাছে সাজাও খেয়েছেন প্রচুর!

বাবার বদলির চাকরির জন্য শিক্ষাজীবনটা কেটেছে ঘুরে ঘুরে | কলকাতার মিত্র ইনস্টিটিউশনে বড়দার
তত্বাবধানে স্কুল শুরু করলেও, বড়দা চাকরিসূত্রে বদলি হয়ে গেলে তাঁকে বাবার কাছে টাঙ্গাইলে গিয়ে ভর্তি
হতে হয় | সেখান থেকে কাঁথি মডেল স্কুল | শেষমেষ বড়দির কাছে থেকে মেদিণীপুর জিলা স্কুল থেকে,
আবশ্যিক ও ঐচ্ছিক গণিতে লেটার নিয়ে, প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করেন | এরপর বাঁকুড়ার ওয়েসলিশন
কলেজ থেকে ১৯২৮সালে প্রথম বিভাগে আই.এস.সি. পাশ করে, গণিতে অনার্স নিয়ে কলকাতার প্রেসিডেন্সি
কলেজে ভর্তি হন | সাহিত্যকর্মে মন দিয়ে ফেলেছিলেন বলে আর পড়ায় সময় দিতে পারছিলেন না | তাই
বার বার কলেজের পরীক্ষায় ফেল করে সাহিত্যচর্চাকেই তাঁর নিজের পেশা করে তুললেন |

চাকরি জীবন শুরু হয় ১৯৩৪ সালে | সে বছর, কয়েক মাসের জন্য তিনি “নবারুণ” পত্রিকার সম্পাদকের
দায়িত্ব পালন করেন | এর পর ১৯৩৭ থেকে ১৯৩৯ সালের ১লা জানুয়ারি পর্যন্ত “বঙ্গশ্রী” পত্রিকার সহ-
সম্পাদক ছিলেন | সেখান থেকে বেরিয়ে এসে তিনি নিজের প্রকাশনা সংস্থা “উদয়াচল প্রিন্টিং এণ্ড  
পাবলিশিং হাউস” প্রতিষ্ঠা করেন | ১৯৩৯ সালে মানবেন্দ্রনাথ রায়ের সংস্পর্শে এসে “ন্যাশনাল ওয়র ফ্রন্ট” এ
প্রভিন্শিয়াল অর্গানাইজার ও বেঙ্গল দপ্তরে পাবলিসিটি এসিস্ট্যান্টের চাকরি পান | এই চাকরিটি তিনি  
১৯৪৩ পর্যন্ত করেন | এরপর তিনি আর কোনো চাকরি করেন নি |

১৯৩৮ সালে তাঁর বিবাহ হয় ময়মনসিংহের গভমেন্ট গুরু ট্রেনিং স্কুলের প্রধান শিক্ষক সুরেন্দ্রনাথ
চট্টোপাধ্যায়ের সেজ কন্যা কমলা দেবীর সঙ্গে | এর আগে থেকেই তাঁর শরীর ভাল যাচ্ছিল না | পুতুল নাচের
ইতিকথা লেখার সময় থেকেই তাঁর মৃগীরোগ ধরা পড়েছিল |  

১৯৪৪ সালে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ গ্রহণ করেন এবং সাংস্কৃতিক
বিভাগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে জেলা পরিষদের সদস্য মনোনীত হন |

এর আগে ১৯৩৬ সালে কংগ্রেসের লখনৌ অধিবেশনের সময় প্রধানত কমিউনিস্ট বুদ্ধিজীবী ও   
সাহিত্যিকদের উত্সাহ ও চেষ্টায় গঠিত হয়েছিল মুন্সী প্রেমচন্দের সভাপতিত্বে “নিখিল ভারত প্রগতি লেখক
সংঘ” | পরে প্রগতি লেখক সংঘের বঙ্গীয় শাখার নাম দেওয়া হয় “ফ্যাসিস্ট বিরোধী লেখক সংঘ” | মাণিক
এই সংঘের সঙ্গে হন | ১৯৪৪ সালে অনুষ্ঠিত হয়েছিল পূর্ববঙ্গ প্রগতি ও লেখক সম্মেলন”, মাণিকের
সভাপতিত্বে | “ফ্যাসিস্ট বিরোধী লেখক সংঘ" এর নাম বদলিয়ে রাখা হলো "ফ্যাসিস্ট বিরোধী লেখক ও
শিল্পী সংঘ” | ১৯৪৮ সালে বোম্বাইতে অনুষ্ঠিত হয় “প্রবাসী বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন” | এখানে গণসাহিত্য শাখার
সভাপতি করা হয় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে | ১৯৪৯ ও ১৯৫৩ সালে তাঁর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় প্রগতি
লেখক সংঘের চতুর্থ ও পঞ্চম (শেষ) অধিবেশন |

ভগ্নসাস্থ্য ও আর্থিক অনটন এই সময় তাঁর নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়ায় | ১৯৫৪ তে গিতে তাঁর অবস্থা চরমে ওঠে
এবং তাঁর দুরবস্থা নিয়ে বুদ্ধিজীবী মহলে আলোড়ন সৃষ্টি হয় | অতুলচন্দ্র গুপ্তর বাড়িতে সাহিত্যিক ও
শিল্পীদের এক সভায়,
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায় প্রভৃতির
উপস্থিতিতে ঠিক হয় যে মানিক বন্দ্যপাধ্যায়ের আর্থিক সাহায্যের আবেন জানানো হবে | মুখ্যমন্ত্রী  
বিধানচন্দ্র রায়ের ইচ্ছায় পশ্চিমবঙ্গ সরকার মাসিক ১০০টাকা পেনশান ভাতা দেওয়া শুরু করেন এবং
এককালিন ১২০০টাকাও তাঁকে দেওয়া হয় | শুরু হয় তাঁর চিকিত্সা | শেষবার তাঁকে ভর্তি করা হয়
নীলরতন সরকার হাসপাতালে | সেখানেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন |  

তাঁর রচনার মধ্যে চোখে পড়ে বাংলা সাহিত্যে ভাবপ্রবণতার বাহুল্যের ব্যতিক্রমী ও বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গী এবং
চরিত্রের বিভিন্ন আচরণের বিশ্লেষণে বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারা | “বঙ্গশ্রী” পত্রিকায় চাকরি করার সময় তিনি
মার্ক্সীয় দর্শনের প্রতি আকৃষ্ট হন | বুখানিনের ঐতিহাসিক বস্তুবাদ আর লিয়নটিয়েভের বই থেকে মার্ক্সীয়
দর্শনের অর্থনীতি সম্বন্ধে  জ্ঞান আহরণ করে নিজেকে মার্ক্সীয় নীতিতে বিশ্বাসী সাহিত্যিক রূপে প্রতিষ্ঠা  
করেন | ফলে তাঁর রচনা দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে --- প্রথম পর্বে দেখা যায় ফ্রয়েডীয় তত্ত্বের প্রতি ঝোঁক,
দ্বিতীয় পর্বে মার্ক্সীয় দর্শনের প্রভাব | তিনি এক সময়ে লিখেছিলেন ---

“আমার বিজ্ঞানপ্রীতি, জাত-বৈজ্ঞানিকের কেন-ধর্মী জীবন জিজ্ঞাসা, ছাত্রবয়সেই লেখকের দায়িত্বকে অবিশ্বাস্য গুরুত্ব দিয়ে ছিনিমিনি
লেখা থেকে বিরত থাকা প্রভৃতি কতগুলি লক্ষণে ছিল সুস্পষ্ট নির্দেশ যে সাধ করলে আমি কবি হতেও পারি ; কিন্তু ঔপন্যাসিক
হওয়াটাই আমার পক্ষে হবে উচিত ও স্বাভাবিক |”

কলেজে ছাত্রাবস্থায়, বিচিত্রা পত্রিকায় (১৯২৮) “অতসী মামী” গল্প প্রকাশের পর সাহিত্য জগতে আলোড়ন
দেখা দেয় | ২১ বছর বয়সে তাঁর প্রথম উপন্যাস “দিবারাত্রির কাব্য” লেখেন | ১৯৩৬ সালের মধ্যেই তাঁর
লেখা  বাংলা সাহিত্যের  অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস "পদ্মানদীর মাঝি" এবং "পুতুলনাচের ইতিকথা" প্রকাশিত
হয় | এরপর তিনি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন |

তাঁর অন্যান্য রচনার মধ্যে রয়েছে “প্রাগৈতিহাসিক” (১৯৩৭), “মিহি ও মোটা কাহিনী” (১৯৩৮), “সরীসৃপ”
(১৯৩৯), "সমুদ্রের খাদ" (১৯৪৩), তেভাগা আন্দোলন নিয়ে লেখা "ছোট বকুলপুরের যাত্রী" (১৯৪৯) প্রভৃতি
ছোটগল্প সংগ্রহ এবং “জননী” (১৯৩৫), “শহরতলী” (১ম খণ্ড ১৯৪০ ও ২য় খণ্ড ১৯৪১), “অহিংসা” (১৯৪১),  
“স্বাধিনতার স্বাদ” (১৯৫১) প্রভৃতি উপন্যাস | "পুতুলনাচের ইতিকথা" (১৯৩৬) এবং  "পদ্মানদীর
মাঝি" (১৯৩৬) তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনা বলে পরিগণিত এবং বাংলা সাহিত্যের ক্লাসিক হিসেবে স্বীকৃত | এ ছাড়াও
রয়েছে একটি প্রবন্ধ সংকলন, একটি নাটক এবং তাঁর কবিতা |

আমরা, কৃতজ্ঞ
কবি ও গীতকার রাজেশ দত্তর কাছে কারণ তাঁরই উত্সাহদানে, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই
কবিতাগুলি, মিলনসাগরে তুলতে সক্ষম হলাম | তিনি নিজেই আমাদের পাঠিয়েছেন এই কবিতাগুলি, যুগান্তর
চক্রবর্তী সম্পাদিত, "মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা" গ্রন্থটি থেকে |  কবিতার গুণ ও ঐতিহাসিক দিক
বিচার করে এই কবিতাগুলি তিনিই নির্বাচিত করে আমাদের পাঠিয়েছেন |

১৯৭০ সালে প্রকাশিত “মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা” গ্রন্থটি র প্রকাশক ছিলেন আনন্দরূপ চক্রবর্তী,
গ্রন্থালয় প্রাইভেট লিমিটেড, ১১এ বঙ্কিম চাটুজ্জে স্ট্রীট, কলকাতা ৭০০০৭৩  | এই বইটির প্রচ্ছদশিল্পী ছিলেন
কবি পূর্ণেন্দু পত্রী | প্রচ্ছদের উপর হাতের লেখাটি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের | তাই আমরা এই  বইটির
প্রচ্ছদের ছবিও এখানে তুলে দিলাম |

মানিকবাবু তাঁর কবি ও ঔপন্যাসিক হওয়া নিয়ে যাই বলে থাকুন না কেন, তাঁর কবিতার কিন্তু তাঁর
উপন্যাসের মতোই বয়স | তাঁর প্রথম উপন্যাস “দিবারাত্রির কাব্য”-এর তিনটি পৃথক বিভাগের ভূমিকা
দিয়েছিলেন তিনটি ছোট কবিতা দিয়ে | কবি তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশিত কবিতা ছাড়া রেখে যান দুটি
কবিতার খাতা যা থেকে তাঁর মৃত্যুর ১৪ বছর পর যুগান্তর চক্রবর্তীর সম্পাদিত গ্রন্থে ৬৯টি কবিতা ছেপে
বার করা হয় | মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা রচনার সময়কাল মূলত দুটি | প্রথম জীবনের কবিতা লেখা
হয় ১৯২৪ থেকে ১৯২৯ | শেষ জীবনের কবিতা --- রচনা কাল ১৯৪৩ থেকে ১৯৫৩ |

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা সম্বন্ধে যুগান্তর চক্রবর্তীর লেখা, তাঁর সম্পাদিত “মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের
কবিতা”-র ভূমিকাটি আমরা এই সাইটেই রেখেছি |
সেই লেখাটি পড়তে এখানে ক্লিক্ করুন |



উত্স :  তুষারকান্তি মহাপাত্র, বাঙলার মণীষা ২খণ্ড, ১৯৮৭
.          যুগান্তর চক্রবর্তী, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা, ১৯৭০    
.          
ডঃ শিশিরকুমার দাশ, সংসদ বাংলা সাহিত্য সঙ্গী, ২০০৩       


এই ওয়েব সাইটে কবি মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মূল পাতায় যেতে হলে এখানে ক্লিক্ করুন..
.      
http://www.milansagar.com/kobi/manik_bandyopadhyay/kobi-manikbandyopadhyay.html    



আমাদের যোগাযোগের ঠিকানা :-   
মিলনসাগর       
srimilansengupta@yahoo.co.in      
.