কবি মোহিনী চৌধুরীর কবিতা ও গান
*
হায় রে লেখা
কবি মোহিনী চৌধুরী
হেমেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত সম্পাদিত “বঙ্গশ্রী” পত্রিকার চৈত্র ১৩৫২ ( এপ্রিল ১৯৪৬ ) সংখ্যায়
প্রকাশিত।


সন্ধ্যা নামে-নামে
.        নাম-না-জানা গ্রামে !
আমার হাতে গানের খাতা
.        গান লিখেছি দু’টি,
শেষ হ’য়েছে কল্পলোকের খানিক ছুটোছুটি ;
.        ছুটির দিনের শেষে
ফিরছি তখন গাঁয়ের পথে সহরতলীর ‘মেসে’ ।

আমার চেয়ে বয়সে-বড়ো গাঁয়ের ছেলে কোনো
.        ব’ললে ডেকে’ : ‘শোনো ---
ক্ষেত নিড়ানীর কাজে ব’সে গেলাম কেবল দেখে
কাগজ-কলম নিয়ে কী-যে ক’র্ ছো তখন থেকে ?’
.        চোখের ওপর মেলে দিলেম খাতা,
খাতার পাতা কাঁপলো হাওয়ায়,
.        কাঁপলো চোখের পাতা ।

মনে হোল ভুল ক’রেছি, আমার লেখাপড়া
.        ওদের কাছে গোষ্পদে চাঁদ ধরা !
মুখের কথা বুঝবে ভেবে ব’লে গেলাম মুখে
যে-গান দু’টি কালির টানে লেখা খাতার বুকে ।
.        তবুও যেন বুঝলো না সে কিছু,
ফিরে গেল আপন ঘরে মুখটি ক’রে নিচু ।
হায় রে লেখা, হায় রে বড়াই, হায় রে কবির আশা ।
একই দেশের মানুষ তবু ব্যর্থ আমার ভাষা ।

.                ******************                 
.                                                                            
সূচীতে . . .   




মিলনসাগর
*
সুপ্রভাত
কবি মোহিনী চৌধুরী
সচ্চিদানন্দ ভট্টাচার্য সম্পাদিত “বঙ্গশ্রী” পত্রিকার অগ্রহায়ণ ১৩৪৮ ( ডিসেম্বর ১৯৪১ )
সংখ্যায় প্রকাশিত ।

.                 ( গান )
সুন্দর, তুমি এসেছ রুদ্রবেশে,
.         আজিকে  সুপ্রভাত !
তন্দ্রাজড়িত জীবনে’ জাগালে এসে
.         হে মোর জীবননাথ ।

ওগো প্রশান্ত, সেজেছ ভয়ঙ্কর,
ছিলে শ্যাম তুমি, হ’লে আজ শঙ্কর ;
তিমির কারার রুদ্ধ দুয়ার দেশে
.          হেনেছ চরণাঘাত ।

বাঁশরী তোমার বিষাণের মতো বাজে,
.            কন্ঠে বিষের জ্বালা ;
সাপ হ’য়ে দোলে তোমার বক্ষোমাঝে
.            চারু বনফুলমালা ।

চিনেছি তোমারে ওগো হৃদিরঞ্জন,
ছলনা তোমার প্রলয় প্রভঞ্জন ;
মোর দুরাশার সুদূর পথের শেষে
.             রেখেছ শুভ্রহাত ।
.             ----আজিকে সুপ্রভাত ॥

.                ******************                 
.                                                                            
সূচীতে . . .   




মিলনসাগর
*
যন্ত্রের যন্ত্রণা
কবি মোহিনী চৌধুরী
সচ্চিদানন্দ ভট্টাচার্য সম্পাদিত “বঙ্গশ্রী” পত্রিকার ফাল্গুন ১৩৪৬ ( মার্চ ১৯৪০ ) সংখ্যায়
প্রকাশিত ।


শতাব্দীর ষড়যন্ত্রে হয়েছে নিঃশেষ
জীবনের চিরশান্তি এসেছে দুর্দ্দিন,
কলঙ্ক-পতাকা তার আকাশে উড্ডীন,
ধূলি ও ধুমায় লেখা অতীত-বিদ্বেষ ।

আত্মগরিমায় মত্ত এলো বর্ত্তমান,
অকারণ-অহঙ্কার অলঙ্কার তার,
বিজ্ঞানের গর্ব্বে খর্ব্ব বিধি বিধাতার,
চক্রের চক্রান্তে হেরি হত্যার প্রমাণ ।

মৃত্যু-আর্ত্তনাদে আজি পূর্ণ চতুর্দ্দিক্,
সর্ব্বহারাদের কন্ঠে করুণ রোদন ;
আত্মকৃত দুষ্কৃতির নাহি সংশোধন
শিক্ষার ত্রুটীরে দেই ধিক্কার অধিক ।

বল শিক্ষা ! কেন এই হতাশা-প্রান্তরে
প্রাণ হয় নিষ্পেষিত মুষ্ঠি-ভিক্ষা তরে ।

.                ******************                 
.                                                                            
সূচীতে . . .   




মিলনসাগর
*
শান্তি ও শাস্তি
কবি মোহিনী চৌধুরী
সচ্চিদানন্দ ভট্টাচার্য সম্পাদিত “বঙ্গশ্রী” পত্রিকার মাঘ ১৩৪৬( ফেব্রুয়ারী ১৯৪০ ) সংখ্যায়
প্রকাশিত ।

শান্তি ছিল সেইদিন,---যবে তপোবনে,
জীবন বহিত সদা সংযমের স্রোতে,
উদাত্ত মন্ত্রের ধ্বনি উঠিত পবনে,
পূর্ণ ছিল মনঃপ্রাণ মহা পূর্ণব্রতে ।

.                            শান্তি ছিল সেইদিন.—যবে দেশমাঝে
.                            ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা ছিল, ছিল সত্য ঋষি,
.                            স্বার্থহীন সেবা ছিল ধর্ম্মে ও সমাজে,
.                            ন্যায়ের মর্য্যাদা ছিল, মহত্ত্বের কৃষি ।

.                                        ব্রাহ্মণ  ‘ব্রাহ্মণ’ ছিল ----পূজ্য দেবসম,
.                                        বৈশ্যের প্রবৃত্তি ছিল প্রতারণাহীন,
.                                        ক্ষত্রিয়ের তেজোবীর্য্য ছিল শুদ্ধতম,---
.                                        মানুষের প্রাণে ছিল শান্তি সেইদিন ।

.                                                নিষ্ঠা ত্যজি’ সবে যবে হোলো উচ্ছৃঙ্খল,
.                                                সেদিন বাজিল প্রাণে শাস্তির শৃঙ্খল ।


.                                                                          ******************        

.                                                                             
সূচীতে . . .   




মিলনসাগর
*
নেতা, না অভিনেতা
কবি মোহিনী চৌধুরী
সচ্চিদানন্দ ভট্টাচার্য সম্পাদিত “বঙ্গশ্রী” পত্রিকার কার্তিক ১৩৪৫ ( নভেম্বর ১৯৩৮
) সংখ্যায় প্রকাশিত ।

বল এ কি তব ভণ্ডামি নয়, এর মূলে কোন সত্য প্রেরণা আছে ?
তোমার মৌনী ধ্যান-দৃষ্টিতে সত্যশিবের নির্দ্দেশ মিলিয়াছে ?
ত্যাগ ও সেবার ধর্ম্ম নিয়াছ নহে কি কেবল মিথ্যা মন্ত্র-মোহে ;
স্বার্থ-প্রতিমা কর নাই পূজা পরোপকারের সীমাহীন সমারোহে ?
তোমার কর্ম্মে মুক্তি পেয়েছে তোমার মনের সহজ চিন্তাধারা,
নিষ্ঠা তোমার শুভ আদর্শ, সত্য কি তব জীবনের ধ্রুবতারা ?
অকপটে তুমি নর-নারায়ণে দিয়াছ তোমার প্রাণের অর্ঘ্য আনি ?
বল, তুমি কোন্ মহাদেবতার লভিয়াছ চির পুণ্য আশীর্ব্বাণী ।

.                      বল, বল তুমি নিষ্পাপ কি না, বল, বল তুমি নহ বিশ্বাসঘাতী ;
.                      কল্যাণ-ব্রত লও নাই তুমি বিশ্বপ্রেমের ক্ষণিক নেশায় মাতি’ ।
.                      সুবিধা-বাদীর হীন চাতুর্য্যে সত্য কি তব আছে সুতীব্র ঘৃণা?
.                      বল তুমি তব স্বরূপখানিরে ঢাকিয়াছ কোন ছদ্ম-বসনে কি না ।
.                      তুমি তো দুষ্ট প্রতারক নও, সত্য কি তুমি নির্ম্মল সাধুচেতা ?
.                      দুর্ভাগাদের সমব্যথী তুমি, তুমি যথার্থ নেতা, নও অভিনেতা ?
.                      খ্যাতির লালসা নাই তব মনে, তুমি কি নীরবে পরহিত করি চল ?
.                      তুমি কি প্রকৃত স্বেচ্ছাসেবক, সে কথা আজিকে স্পষ্টকন্ঠে বল ।

.                                                         ******************        

.                                                                             
সূচীতে . . .   




মিলনসাগর