কবি নবীনচন্দ্র সেনের কবিতা
*
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
কবি নবীনচন্দ্র সেন
( অবকাশরঞ্জিনী থেকে )


হা অদৃষ্ট! ----কবিবর! এই কি তোমার
ছিল হে কপালে ?
মধুসূদনের হায়! (শুনে বুক ফেটে যায়।)
এই পরিণাম বিধি লিখেছিল ভালে ?


দিয়াছিল যেই রত্ন ভারতী তোমায়---
অপার্থিব ধন ;
রাজ্য বিনিময়ে, আহা! কেঙ নাহি পায় তাহা
দাতব্য চিকিত্সালয়ে তোমার মরণ ?


কিম্বা কন্টকিত হায়! যে বিধি করিল
গোলাপ, কমল ;
সে বিধি পাষাণ মনে, দহিতে সুকবিগণে,
কবিত্ব-অমৃতে দিল দারিদ্র্য-অনল।


বহু যুদ্ধে না পারিয়া করিতে নির্ব্বাণ
এই হুতাশন ;
প্রাণপত্নী-করে ধরি’, নরলীলা পরিহরি’,
পশিলে মধুসূদন অমর-জীবন।


কৃতঘ্ন, মা বঙ্গভূমি! এত দিন তব
কবিতা-কানন,
যেই পিকবর-কল উছলিল, বনদল
উছলিত, ব্রজে শ্যাম বাঁশরী যেমন |


সে মধু-সখারে আজি পাষাণ পরাণে,
( কি বলিব, হায়! )
অযত্নে মা অনাদরে, বঙ্গকবিকুলেশ্বরে
ভিক্ষুকের বেশে, মাতা, দিয়াছ বিদায়!


মধুর কোকিল কণ্ঠে --- অমৃত লহরী ---
কে আর এখন,
দেশদেশান্তরে থাকি, কে 'শ্যামা জন্মদে' ডাকি'
নূতন নূতন তানে মোহিবে শ্রবণ?


তোমার মানস-খনি করিয়া বিদার,
কাল দুরাচার,
হরিল যে রত্ন, হায়! কত দিনে পুনরায়,
ফলিবে এমন রত্ন? ফলিবে কি আর?


শুণ্য হ'ল আজি বঙ্গ-কবি-সিংহাসন,
মুদিল নয়ন
বঙ্গের অনন্য কবি, কল্পনা-সরোজ-রবি,
বঙ্গের কবিতা-মধু হরিল শমন।

১০
বঙ্গের কবিতে! আজি অনাথা হইলে
মধুর বিহনে ;
আজন্ম শৃঙ্খল ভরে, দীনাক্ষীণা কলেবরে,
বেড়াইতে বঙ্গালয়ে বিরস বদনে।

১১
কল্পনার বলে সেই চরণ-শৃঙ্খল
কাটিয়া যে জনে,
মধুর অমিত্রাক্ষরে, তুলিয়া স্বরগোপরে,
দেখাইল তিলোত্তমা ‘মুকুতা যৌবনে’।

১২
রত্নসৌধকিরীটিনী স্বর্ণ লঙ্কাপুরে,
লইয়া তোমারে ;
মৈথিলী অশোকবনে, প্রমীলা সজ্জিত রণে,
প্রবেশিতে লঙ্কাপুরে বীর-অহঙ্কারে,

১৩
দেখাইল ;---বেড়াইল কল্পনার পক্ষে
লইয়া তোমারে,
স্বর্গমর্ত্ত্যধরাতলে, প্রচণ্ড জলধিতলে ;
শুনাইল “মেঘনাদ” গভীর ঝঙ্কারে।

১৪
“ব্রজাঙ্গণা”, “বীরাঙ্গণা”, নয়নের জলে,
---প্রেম-বিগলিত,---
সাজা’য়ে সুন্দর ডালা, গাঁথিয়া নূতন মালা,
আদরে তোমার অঙ্গ করিল ভূষিত।

১৫
পুণ্যখণ্ড ইউরোপে বসিয়া বিবলে
সেই দিন, হায়!
গাঁথিয়া কল্পন’-করে, পরাইল শ্রদ্ধাভরে,
রত্নময় ‘চতুর্দশ’ লহরী গলায়।

১৬
“কৃষ্ণকুমারীর” দুঃখে কাঁদাইয়া, হায়,---
বঙ্গবাসিগণ ;
বঙ্গনাট্য-রঙ্গাঙ্গণে, মোহিত দর্শকগণে,
“পদ্মাবতী” “শর্মিষ্ঠারে” করিয়া সৃজন।

১৭
বঙ্গভাষা-সুললিত-কুসুম-কাননে
কত লীলা করি’,
কাঁদাইয়া গৌড়জন, সে কবি মধুসূদন
চলিল,---বঙ্গের মধু বঙ্গ পরিহরি’।

১৮
যাও তবে, কবিবর! কীর্ত্তিরথে চড়ি’
বঙ্গ আঁধারিয়া,
যথায় বাল্মীকি, ব্যাস, ভবভূতি, কালিদাস
র’য়েছেন সিংহাসনে তোমার লাগিয়া।

১৯
যে অনন্ত মধুচক্র রেখেছ রচিয়া,
কবিতা-ভাণ্ডারে ;
অনন্ত কালের তরে, গৌড়-মন-মধুকরে
পান করি’, করিবেক যশস্বী তোমারে।

.          ****************                 
.                                                                                    
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
হতাশ
কবি নবীনচন্দ্র সেন

অকস্মাত্ কেন আজি জলধর-প্রায়,
বিষাদে ঢাকিল মম হৃদয়-গগন?
দুর্বল মানসতরী,                   ছিল আশা ভর করি,
চিন্তার সাগরে কেন হইল মগন?
দুঃখের অনলে বুঝি আবার জ্বালায়!

কেন কাঁদে মন আহা! কে দিবে বলিয়া?
কে জানে এ অভাগার মনের বেদন?
অন্তরে আছেন যিনি,             কেবল জানেন তিনি,
যে অনলে এ হৃদয় করিছে দাহন ;
কেমনে বাঁচিবে প্রাণ এ তাপ সহিয়া?

কেন কাঁদে মন আহা! ভাবি মনে মনে,
অমনি মুদিয়া আঁখি নিরখি হৃদয়,
চিন্তার অনল তায়,           জ্বলিতেছে চিতাপ্রায়,
দীনতা পবনবেগে প্রবাহিত হয়,
দ্বিগুণ আগুন জ্বলে বাঁচিবে কেমনে?

অমানিশাকালে যেথা শোভে নীলাম্বর
খচিত-মুকুতাহারে,                  তারার মালায়
তেমতি এ অভাগার,           হৃদয়েতে অনিবার,
শোভিত শতেক আশা, নক্ষত্রের প্রায়,
আজি দেখি সকলেই হয়েছে অন্তর |

বিষাদ-জলদ-রাশি আসি আচম্বিতে,
ঢাকিয়াছে আশা যত দেখা নাহি যায়,
দরিদ্রতা ভয়ঙ্কর,             পিতৃশোক তদুপর,
কেবল জ্বলিছে ভীম দাবানল প্রায়,
তারা সাজাইবে চিতা জীয়ন্তে দহিতে?


.                  ****************                 
.                                                                                            
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
অশোকবনে সীতা
কবি নবীনচন্দ্র সেন
(অবকাশ রঞ্জিনী থেকে)

চিত্র-নভঃ-কিরীটিনী সচন্দ্র রজনী,
চিত্রি' বিকসিত নৈশ কুসুম-মালায়
উদ্যান, সরসী-নীর ; অযুত রতনে
চিত্রি' সচঞ্চল চির নীল নীরনিধি,
ভাসিছে নিদাঘাকাশে | বিশ্ব চরাচর
নীরবে শান্তির সুধা করিতেছে পান |
চন্দ্রের একটি রশ্মি শিবিরের দ্বারে
রহিয়াছে শতরঞ্চি উপরে পরিয়া,
যেন স্থির উল্কাখণ্ড, স্থিরতর জ্যোতিঃ |
নিরখিয়া সেই রশ্মি বিমল উজ্জ্বল,
উদাস হইল প্রাণ, পর্যঙ্ক ত্যজিয়া
শিবির-বাহিরে নব-শ্যাম দূর্বাদলে
বসিলাম মন-সুখে ; সন্মুখে আমার
অনন্ত অসীম সিন্ধু! চন্দ্রের কিরণে
খেলিছে অনিলসহ সলিল-লহরী,
চুম্বি' মৃদু কলকলে মম পদতলে
রজত-বালুকাকীর্ণ ধবল সৈকত |
দক্ষিণে আমার --- মৃদু সুমধুর কলে
ছুটিয়াছে কল্লোলিনী@ নাচিয়া নাচিয়া,
আলিঙ্গিয়া প্রতিকুল তীরে গিরিচয় ;
ধবল উত্তরী যেন মাধবের গলে!
অপূর্ব প্রকৃতি শোভা! অদূর ভূধর
শোভিছে মেঘবত্ আকাশের গায়ে ;
কেবল কোথায় কোন উচ্চ তরুবর
অরণ্য হইতে তুলি' উচ্চতর শির,
করিতেছে আকাশের সীমা নিরুপণ |
চিত্রিত আকাশ-চন্দ্র- ভূধর-সাগর,
চিত্তবিমোহিনী শোভা! মরি কি সুন্দর!

'এমন সময়ে' আমি ভাবিলাম মনে
নিশাহন্তা 'মেকবেত' সাধিল মানস
সুপ্ত 'ডনকেনের' রক্তে ; এমন সময়ে
নিভাইল অশ্বত্থামা, ভজিয়া ধূর্জটী,
পাণ্ডব বংশের পঞ্চ প্রদীপ উজ্জ্বল ;
এমন সময়ে লঙ্ঘি উদ্যান প্রাচীর,
ভেটিল 'রোমিও' প্রাণ-প্রিয় 'জুলিয়েটে',
নিরখিল চন্দ্র-সূর্য একত্র উদয় ;
এমন সময়, হায়! প্রণয় যন্ত্রণা
নিবাইতে সাগরিকা উদ্যান-বল্লরী
লয়োছ্ল করে, দিতে কোমল গ্রীবায়,
উদ্বন্ধনে বিনাশিতে দুঃখের জীবন ;
এমন সময়ে সুপ্ত কনক-লঙ্কায়,
একাকিনী শোকাকুলা পতির বিরহে
কাঁদিলা অশোক বনে সীতা অভাগিনী ;

'এমন সময়ে' সেই সমুদ্রের কূলে
ভাবিতে ভাবিতে দেহ হইল অবশ ;
ক্রমে অজানিত সেউ সমুদ্র-বেলায়
শুইলাম, সুকোমল দূর্বাদলময়ী
শ্যামল শয্যায়! স্নিগ্ধ সমুদ্র-নীরজ
অনিল বহিতেছিল অতি ধীরে ধীরে ;                          
সূচিতে . . .    
পশিলাম ক্রমে নিদ্রা-স্বপন-মন্দিরে |
  
রত্ন-সৌধ-কিরীটিনী স্বর্ণলঙ্কা জিনি,
দেখিনু শোভিছে রাজ্য জলধি-হৃদয়ে
শত লঙ্কা পরিসরে ; বাঁধা ছিল বলে
এক চন্দ্র, এক সূর্য রাবণ-দুয়ারে,
এইখানে সুকুমার প্রণয়-শৃঙ্খলে
কত চন্দ্র, কত সূর্য প্রতি ঘরে ঘরে
রহিয়াছে শৃঙ্খলিত | বহিতেছে বেগে
যেই রম্য রখশ্রেণী বাষ্পে, হুতাশনে,
অতি তুচ্ছ তার কাছে পুষ্পকের গতি |
চপলা সন্দেশবহা ; যাহার পরশে
মরে জীব, সে বিদ্যুত্ দেশদেশান্তরে,
কভু ছায়া-পথে, কভু জলধির তলে,
বহিতেছে রাজ-আজ্ঞা | অপূর্ব কৌশল
বিরাজিয়া স্থানে স্থানে গণে অনায়াসে
সময়ের গতি, কিংবা আকাশের তারা |
লঙ্কার অমৃত ফল বানরের করে
হইল নিঃশেষ, কিন্তু এ অপূর্ব পুরে
জাতীয়-গৌরব রূপে যে অমৃত ফল
ফলিতেছে অনিবার, বিনাশিতে তা'রে
পারিবে না নরে কিংবা সমরে অমরে |
এমন অমৃত পানে পুরবাসিগণ,
আনন্দে শান্তির কোলে করিয়া শয়ন,
নিদ্রা যায় মন-সুখে, হায় রে! কেবল
অন্ধকার কারাগারে বসি, একাকিনী
একটি রমণীমূর্তি করিছে রোদন |
কতকাল রমণীর নয়নের জল
ঝরিয়াছে, কে বলিবে? সেই অশ্রজলে
হইয়াছে দুঃখিনীর অঙ্কিত কপোল ;
কবরী অবেণীবদ্ধ, জটায় এখন
হইয়াছে পরিনত ; হায়! করাঘাতে ক্ষত
বিক্ষত ললাট, স্থানে স্থানে কলঙ্কিত |
বহুমূল্য পরিধেয় নীল-বস্ত্রখানি
হইয়াছে জীর্ণ শীর্ণ --- নিতান্ত মলিন,
ততোধিক রমণীর মলিন বরণ |
বহুমূল্য রত্নরাজি আছিল যথায়,
চরণে, প্রকোষ্ঠে, অংসে, উরসে, গ্রীবায়,
উদ্বন্ধন-লতিকার চিহ্নের মতন,
শ্বেতরেখামাত্র এবে সর্ব কলেবরে
রহিয়াছে বিদ্যমান, বাম করোপরে
রক্ষিত বদন-চন্দ্র ; --- ফাটিল হৃদয়
এই মূর্তিমতী শোক করি দরশন ;
জিজ্ঞাসিনু--- 'বল মাতা! কে তুমি দুঃখিনি?
এমন বিষাদ-মূর্তি কিসের কারণ?'
বলিলা রমণী অশ্রু মুছিয়া অঞ্চলে,---
'দুঃখিনী ভারত-লক্ষ্মী আমি, বাছাধন!
আমিই অশোক-বনে সীতা বিষাদিনী |'

.             ****************                 
.                                                                                            
সূচিতে . . .   

@ কর্ণফুলী নদী       


মিলনসাগর
*
বিষণ্ম কমল
কবি নবীনচন্দ্র সেন
( অবকাশরঞ্জিনী থেকে )

.                ১
কল্পনে!
লও তুলি লও করকমলে,
চিত্রকর যাহে কুসুমদলে,
কিম্বা পূর্ণশশী আকাশমণ্ডলে,
কিম্বা কমলিনী সরসীর জলে।

.                ২
লও সেই তুলি চিত্রকর আজি,
[ নহে বিকসিত সর-রুহরাজি,
যাহাতে বিহ্বল ভ্রমর বিরাজি,
রাখিয়াছে নীল সরোবর সাজি ]

.                ৩
চিত্র সেই ফুল, স্মিত বিকসিত,
সৌরভেতে যা’র দিক আমোদিত,
কিন্তু নাহি তাহে অলি বিরাজিত,
নাহি মুখে হাঁসি---চিত্ত বিষাদিত।

.                ৪
চিত্র কর ওই করকমলিনী,
‘হারমোণিয়মে’ নাচি’ছে যেমনি,
নাচে যেইমতে ফুল্ল সরোজিনী,
সমিরণ ভরে সর-সোহাগিণী।

.                ৫
চিত্র কর ভূজ-মৃণাল তাহার,---
বিমল কোমল সুবর্ণের হার ;
নিটোল, নিরেট, অথচ আবার
পরশনে হয় শোণিত সঞ্চার।

.                ৬
চিত্র কর সেই বন্দন-চন্দ্রমা,
ত্রিভূবনে যা’র নাহিক সুষমা,
অধরে নয়নে বর্ণে অনুপমা
চিত্র কর সেই বিশ্ব মনোরমা।

.                ৭
চিত্র কর যদি পার, সহচরি,
অনুপম সেই লাবণ্য মাধুরী,
চিত্র কর সেই দৃষ্টি মুগ্ধকরী,
বিষণ্ণ, গম্ভীর, চিত্ত-দ্রবকরী।

.                ৮
কপোল কমলে দিবস যামিনী
নিরাশার কীটে দংশি’ছে, স্বজনি!
বিষণ্ণ বদনে হাসিলে কামিনী,
শোভে মেঘমুক্ত হাসি সৌদামিনী।

.                ৯
এখনো সে হাসি নয়নে আমার
রয়েছে লাগিয়া ; কি বলিব আর
হৃদয় সরসে প্রতিবিম্ব তা’র,
ভাসি’ছে উজলি’ চিত্ত অভাগার।

.                ১০
পোড়া দেশাচার এমন রতনে,
.        অযতনে এত কিসের লাগিয়া ;
কিসের লাগিয়া সোণার যৌবনে
.        বিকচ নলিনী মরে শুকাইয়া ?

.                ১১
রাজা রাজারার প্রেমের উদ্যানে
.        এমন কুসুম দেখা নাহি যায়
পূর্ণিমা নিশীথে শারদ বিমানে,
.        এমন চন্দ্রমা শোভা নাহি পায়।

.                ১২
নিরখিলে ওই মলিন বদন,
.        পাষাণ হৃদয় বিদরিয়া যায়,
নিরখিলে তা’র দীন দু’নয়ন,
.        পাষাণেও, আহা, করুণা জন্মায়!

.                ১৩
পাষাণ হইতে নিরেট অধম,
.        অসভ্য দেশের পাপাত্মা সকল ;
নাহিক হৃদয়, নাহিক মরম,
.        কাটিতে বমণী করাল কবল।

.                ১৪
এমন দেশেতে, এমন রতন,
.        না বুঝি কেমন বিধি বিধিতার,
কা’রে বল দোষি, শোভে কি কখন,
.        কাকের গলায় কণকের হার ?

.             ****************                 
.                                                                                            
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর
*
আশা
পলাশির যুদ্ধ কাব্যগ্রন্থের দ্বিতীয় সর্গের ১১ থেকে ১৫ নং স্তবক ||
কবি নবীনচন্দ্র সেন

.                ১১

ধন্য আশা কুহকিনী !  তোমার মায়ায়
মুগ্ধ মানবের মন, মুগ্ধ ত্রিভুবন !
দুর্বল মানব-মনোমন্দিরে তোমায়
যদি না সৃজিত বিধি ; হায়  !  অনুক্ষণ
নাহি বিরাজিতে তুমি যদি সে মন্দিরে---
শোক, দুঃখ, ভয়, ত্রাস, নিরাশ, প্রণয়,
চিন্তার অচিন্ত্য অস্ত্র নাশিত অচিরে
সে মনোমন্দির শোভা | পলাত
নিশ্চয়
অধিষ্ঠাত্রী জ্ঞানদেবী ছাড়িয়া আবাস ;
উন্মত্ততা ব্যাঘ্ররূপে করিত নিবাস !

.                ১২
ধন্য আশা কুহকিনী ! তোমার মায়ায়
অসার সংসারচক্র ঘোরে নিরবধি !
দাঁড়াইত স্থিরভাবে, চলিত না হায় !
মন্ত্রবলে তুমি চক্র না ঘুরাতে যদি !
ভবিষ্যৎ-অন্ধ মূঢ় মানব-সকল
ঘুরিতেছে কর্মক্ষেত্রে বর্তুল আকার
তব ইন্দ্রজালে মুগ্ধ ; পেয়ে তব বল
যুঝিছে জীবন-যুদ্ধ হায় ! অনিবার |
নাচাও পুতুল যথা দক্ষ বাজিকরে,
নাচাও তেমনি তুমি অর্বাচীন নরে |

.                ১৩
ওই যে কাঙাল বসি রাজপথ-ধারে,----
দীনতার প্রতিমূর্তি !--- কঙ্কাল শরীর,
জীর্ণ পরিধেয় বস্ত্র, দুর্গন্ধ আধার ;
দুনয়নে অভাগার বহিতেছে নার |
ভিক্ষা করি দ্বারে-দ্বারে এ তিনপ্রহর
পাইয়াছে যাহা, তাহে জঠর-অনল
নাহি হবে নির্বাপিত ; রুগ্ন কলেবর ;
চলে না চরণ, চক্ষে ঘোরে ধরাতল |
কি মন্ত্র কহিলে তুমি অভাগার কানে,
চলিল অভাগা পুনঃ ভিক্ষার সন্ধানে |

.                ১৪
ধর্মাধিকরণে বসি নিম্ন কর্মচারী,
উদরে জঠর জ্বালা, গুরু কার্যভারে
অবনত মুখ,--- ওই হংসপুচ্ছধারী
বীরবর,---- যুঝিতেছে অনন্ত প্রহারে
মসীপাত্র-সহ, প্রভু-পদাঘাত-ভয়ে |
যথা শালবৃক্ষ করে গিরি-শিরোপরে
যুঝিল ত্রেতায় বীর অঞ্জনাতনয়
নীল সিন্ধু-সহ, ডরি সুগ্রীব বানরে |
ঘর্ম-সহ অশ্রুবিন্দু বহে দর-দর,
ভাবিতেছে এই পদ ত্যজিব সত্বর  |

.                ১৫
না জানি কি ভবিষ্যৎ, আশা মায়াবিনী !
চিত্রিলে নয়নে তার ; মুছি ঘর্মজল,
মুছি অশ্রুজল পুনঃ লইয়া লেখনী,
আরম্ভিল মসীযুদ্ধ হইয়া সবল |
নবীন প্রেমিক ওই বসিয়া বিরলে,
না পেয়ে প্রিয়ার পত্রে তব দরশন,
নিরাশ প্রণয়ে ভাসে নয়নের জলে,
ভঙ্গ-প্রায় অভাগার প্রণয়-স্বপন  |
শুনিয়া তোমার মৃদু সুমধুর ভাষা
বলিল নিশ্বাস ছাড়ি --- “ না ছাড়িব আশা |”

.             ****************                 
.                                                                                            
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর