কবি পরেশ ধরের কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।  www.milansagar.com
*
.                         শান্তি তরজা    
.                                   পরেশ ধর

.                                    
ভূমিকা

বিখ্যাত ইটালিয়ান শিল্পী পিকাসো অঙ্কিত শ্বেতপারাবত আন্তর্জাতিক ভাবে গৃহিত  শান্তি সংগ্রামের
প্রতীক | এই কপোত আঁকা পতাকার নীচে জাতি ধর্ম ও রাজনীতিক মতবাদ
 নির্বিশেষে সমবেত হচ্ছে
দুনিয়ার সমস্ত সৎ ও শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ---- শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র, শিক্ষক, কেরানী, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী ও
বৈজ্ঞানিক-- এমন কি ধর্মযাজকেরা পর্যন্ত | ইংল্যান্ড আমেরিকার
মুষ্টিমেয়  মুনাফালোভী ধনকুবেররা
পৃথিবীতে তৃতীয় মহাযুদ্ধ বাধাবার যে ঘৃণ্য চক্রান্ত পাকিয়ে তুলছে
---তাকে বানচাল করতেই আজ দুনিয়া
জুড়ে অগনিত জনসাধারণের এই সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা |
এই প্রচেষ্টা যদি দেশে দেশে অধিকাংশ শ্রেণীর মধ্যে
তীব্র রূপ তবে যুদ্ধবাজদের বিন্দুমাত্র ক্ষমতা থাকবে না আবার একটা ধ্বংস যজ্ঞ ঘটিয়ে দেবার | তাই
পৃথিবজুড়ে সচেতন জনতা আজ শান্তি সংগ্রামের ডাকে সাড়া দিয়েছে | সুস্থ জীবন-তৃষ্ণার তাগিদ আজ
তারা জড়ো হচ্ছে শ্বেত কপোত আঁকা নিশানের নীচে কঠিন প্রতিজ্ঞা নিয়ে|  যুদ্ধের প্রতি তাদের তীব্র ঘৃণা
ও সুন্দর জীবনের জন্যতাদের বুক ভরা স্বপ্ন যেন মূর্ত হ’য়ে উঠেছে ঐ প্রতীক চিহ্ন শ্বেত কপোতের মধ্য|
তাই ঐ প্রতীক চিহ্ন আজ জগৎ জুড়ে শান্তি-কামী জনসাধারণের যুদ্ধবিরোধী উদ্দীপনার উৎস |

মার শান্তি তরজায় শ্বেত পারাবতের আখ্যান অনেকটা জায়গা জুড়ে আছে ; তাই সে সম্পর্কে কিছু
বলে নিলাম |

আর একটি বিষয় এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন | গণ-আন্দোলনের গান কোন ধারায়  রচিত ও গীত
হওয়া উচিত সে সম্পর্কে আমার একটি মতাদর্শ আছে |
অবশ্য তার বিস্তৃত আলোচনা স্থান এটা নয় ;  
আন্দোলনের নানা স্তরে সে আলোচনা অদূর ভবিষ্যতে বেস তীব্র ভাবে হবে বলেআমার বিশ্বাস | এখানে
শুধু তার উল্লেখ করলাম এই জন্য যে বর্তমা শান্তিতরজাটি সেই আদর্শের ভিত্তির উপর আমার প্রথম
পরীক্ষামূলক রচনা | প্রথম রচনা বলে স্বভাবতই এতে হয়তো অনেক ত্রুটি আছে | তা ছাড়া শান্তি

সংগ্রামের বিষয় বস্তুটি এমনই যে তার ওপর কোন শিল্প সৃষ্টি ক’রলে বিভিন্ন সমালোচকের বিচিত্র
তত্ত্বগত সমালোচনার আঘাতে শিল্পীকে প্রায়ই দিশেহারা
হ’তে হয় | তবে এটাও ঠিক যে দেশের কোন
সমস্যা সম্পর্কে রাজনীতিক
বাকবিতন্ডার আড়ালে শিল্পের মধ্যে অনেক সময় সেই সমস্যার যথার্থ
আবেগটি প্রতিফলিত হয় |

আমি আমার এই তরজায় শান্তি সম্পর্কে একটা ব্যাপক অনুভূতি সঞ্চারের চেষ্টা ক’রেছি | কতটা সফল
হ’য়েছি সে বিচারের ভার জনসাধারণের ওপর |


কলিকাতা  ২৪ / ১১ /  ৫১                                      
                            পরেশ ধর
   



.                              
শান্তি তরজা
.                                   পরেশ ধর


[ শুরুতে দ্রুত বোল-বিন্যাসে কাওয়ালী ঠেকার ওপর ঢুলী বাজিয়ে যাবে |
সঙ্গে থাকবে কাঁসি | মিনিট দুই
তিন বাজাবার পর একটি দীর্ঘ তেহাই দিয়ে ঢোল বাজনা শেষ হবে | সঙ্গে সঙ্গে নিজের স্বতন্ত্র “হায় হায়
হায়” গানের টান ধরে জনৈক
তরজাওলার প্রবেশ | ঢুলীর সঙ্গত তখন গানের সঙ্গে চলতে থাকবে | ]



জনৈক তরজাওলার গীত


হায় হায় হায় হায়  হায় হায় হায়রে হায়,
কোথা থেকে আপদ এসে জুট্ লো কলকাতায় |
ঘুঘু পাখির বেশ ধ’রেছে
.          মুখে শান্তি-বুলির খই ফোটায় |
শান্তি চাই শান্তি চাই ব’লে
কান-ফাটানো কোলাহলে
বিষম ঘুঘু শান্ত দেশে অশান্তি আনিল |
সোনার বাংলা সবাই জানি
বলেন যত গুণী জ্ঞানী
এমন দেশে কবে আবার অশান্তি আসিল |
হেথা যত ভদ্রজনা বিচার করুন এই সভায় |


অশান্তি যে অদৃশ্য নয়
সে এলে টের পাবেন নিশ্চয়
দেশের পানে তাকিয়ে দেখুন কোথায় সে বিরাজে
হেসে খেলে জীবন কাটে
দেখ্ ছি মোরা পথে ঘাটে
দুষ্ট লোকে ঢিল ফেলে স্থির সরোবরের মাঝে ;
মগজে থাকলে ঘিলু সোজা কথা বোঝা যায় |


ট্রামে বাসে লোক ধরে না
সকাল সাঁঝে ভিড় সরে না
দেশবাসী ব্যস্ত নানান্ কারবারে আর কাজে |
হাটবাজারে শত শত
বিক্রি হচ্ছে জিনিষ কত
তবু নাকি অভাব দেশে-----শুনলে মরি লাজে |
ছল খোঁজা স্বভাব হলে ছলের অভাব হয় না হায় |


শুনুন কিছু লোকের বায়না
কেউ নাকি ভাত কাপড় পায় না
আপনারা কি হেথা সবাই ভুখা দিগম্বর ?
কত শত গ্রাম নগরে
না খেয়ে ভাই ক’জন মরে ?
ক্ষুধার জ্বালায় আত্মহত্যার পান ক’টা খবর ?
রোগে ভুগে মরছে কত-------কেউ না আপত্তি জানায় |


ঘুঘু পাখি থাকি থাকি
কড়া গলায় বল্ ছে হাঁকি,
দুনিয়াতে কারা নাকি যুদ্ধ চায় বাধাতে |
মতলবখানা নয় সুবিধের
ও সব কায়দা জানি যে ঢের
নিজের পাতে লাগলে মেঠাই দেখাই অন্য পাতে |
আর তো সেদিন নাইরে যখন শাক দিয়ে মাছ ঢাকা যায় |


শান্ত শিষ্ট দেখ্ তে ভালো
ঘুঘু পাখি দেশ জ্বালালো
ধারালো ঐ চঞ্চু নখর লুকিয়ে রাখে খাসা !
বাইরে পাখির ভঙ্গি মধুর
অন্তরে তার বিষ ভরপুর
শান্তি শান্তি ক’রে যে তার যুদ্ধ ফাঁদার আশা
দুনিয়াকে দখল নিতে ফন্দি মনে ঘোঁট পাকায় |


আমি বাবা খাঁটি মানুষ খাঁটি কথা জানি
খাঁটি কথা বল্ তে কোন ডর নাহি মানি
.          শোন খাঁটি কথা শোন শোন |
বাংলা দেশে চল্ তি আছে একটি কথা সাদা
সেই কথাটি এবার তবে শোন বলি দাদা


.            শোন খাঁটি কথা শোন শোন |
ঘুঘু পাখি ধান খেয়ে পালায় বারে বার
বার বার তিনবার তার বেশি নয় আর
               শোন খাঁটি কথা শোন শোন |
চতুর্থ বারেতে যখন খেতে এলো ধান
ফাঁদে পড়ে বাছাধনের খতম হলো প্রাণ
.                শোন খাঁটি কথা শোন শোন |
দুনিয়াতে নয়া ঘুঘুর হল যে আমদানী
এই ঘুঘুও তিনবার ধান খেয়ে গেছে জানি
.               শোন খাঁটি কথা শোন শোন |


প্রথম বারেতে ঘুঘু গেল রাশিয়ায়
ধান খেলো বন্দী তবু হলোনা সেথায় |
.              শোন খাঁটি কথা শোন শোন |


উল্টে গেল আইন কানুন ধর্ম রীতি নীতি
সে দেশে চল্ ছে এখন দুঃশাসনের ভীতি
.             শোন খাঁটি কথা শোন শোন |


দ্বিতীয় বারে গেল ঘুঘু পূর্ব-ইউরোপে
নয়া গণতন্ত্র নাকি সেথায় এলো সঁপে
.          শোন খাঁটি কথা শোন শোন |


তৃতীয় বারের কথা আমার বলতে সরম লাগে
ঘুঘু পাখির দম্ভ দেখে অঙ্গ জ্বলে রাগে
.            শোন খাঁটি কথা শোন শোন |


তৃতীয় বারে বিট্ লে ঘুঘু গেল মহাচীনে
ধান খেয়ে ফাঁদ ডিঙিয়ে দেশটা নিল জিনে |
.                    শোন খাঁটি কথা শোন শোন |


চতুর্থ বারেতে ঘুঘু দেখি বিষম রোখ্
বিশ্বখানা দখল নিতে জেগেছে তার ঝোঁক |
.                    শোন খাঁটি কতা শোন শোন |


পিপীলিকার পাখা ওঠে মরিবার তরে
এই বারে ঐ ঘুঘুকে পাঠাবো যমের ঘরে |
.                শোন খাঁটি কথা শোন শোন |


আমি যা বলিলাম আজি সভার মাঝে
.            দেশবাসীর কাছে
যদি মিথ্যে মনে হয় কাহারো
.            দয়া ক’রে হেথায় এসে
.                        জবাব দিয়ে যান্ |
খাঁটি কথা বলেছি যে কেবা আছে
.                       বিরোধ করে আমায়
জানি চির কালের সত্য যাহা
.           তাহারই জয় হবে, হবে
                    মিথ্যের অবসান |


জনৈক সাধারণ লোকের প্রবেশ


জঃ সাঃ লো ------- বাবু মশাই গো. তোমার গান শুনে একটু তরজা গাইতে             
                     ইচ্ছে করছে |
তরজাওলা ---------- কে রে বেটা তুই ?
জঃ সাঃ লো--------- আমি  এই দেশেরই একজন সাধারণ লোক |
                     তরজাওলা -------   শুনছেন মশাই ----- এ ব্যাটা দেবে আমার কথার জবাব|  
                                                       ওরে এসব রাজনীতির ব্যাপার তুই কি বুঝিস্ ?
জঃ সাঃ লো-------   এখনো বুঝবো না ?  তোমাদের রাজনীতির ঠেলায়
                     আমাদের প্রাণ যে ওষ্ঠাগত |   এখনো না বুঝ্ লে আর
                     আর কবে বুঝবো ?  বলি যে সব কথা বল্ লে ওসব      
                     তোমার কোন বাবা শিখিয়ে দিয়েছে ?
তরজাওলা -----    কি বল্ লি হারামজাদা ! শুন্ ছেন, শুন্ ছেন মশাইরা
                                ব্যাটার  আস্পর্ধার কথা |  ব্যাটাকে জুতিয়ে------
জঃ সাঃ লো------   তোমার পায়ে কই গো বাবু মশাই ?  যাক্, তুমি যে ধাপ্পা
                       দিয়ে এতগুলো লোককে ভুলিয়ে যাবে তা চল্ বে না |
                      তোমার কথার জবাব আমি দেব |
তরজাওলা -----    বল্ ব্যাটা বল্  |  তোর পাগলামী শোনার পর এই সব         
                     ভদ্রলোকেরাই তোকে শায়েস্তা করবে, বল্  |



জনৈক সাধারণ লোকের গীত

.                     লম্ফ ঝম্প অনেক দেখেছি
.                        এ যে চোরের মুখে রাম নাম
.                         ঢিলের হোল হীরের দাম
.                        বঙ্গ ভূমি রঙ্গভরা কেন বলে বুঝেছি |
.                        এ যে সাদা রং-এর কয়লা গো
.                    নেই গায়ে তার ময়লা গো
.                         বিদ্ ঘুটে সব কান্ড দেখে বিষম ধাঁধায় পড়েছি
.                        এ যে নিরিমিষে মাছ রাঙ্গা
.                        রাজাধিরাজ ভিখ্ মাঙা
.                    তোমার কি মতলব তা নিমেষে টের পেয়েছি
.                       এ যে সচ্চরিত্র কুলটা
.                       কন্দর্প ঐ নুলোটা
.                          সাধে কি আর আজকে আমি তরজা গাইতে এসেছি |
জঃ সাঃ লো----               কি গো মশাই কানে ঢুকছে তো আমার কথা ?



পুনরায় গীত শুরু


.                          দাদা বেশ বলেছ ভালো
.                      দেশে অশান্তি যে নাই খবর জমকালো |
.                       ট্রামে বাসে সাঁঝ সকালে ভিড়ে ঠাসা
.                          দেশে তবে অশান্তি নাই--------যুক্তি খাসা !
.                       আছে কোটি কোটি জনা
.                                  লাখো লাখো ভগ্ন গ্রামে
.                    বিপুলা এই বঙ্গ ভুমির
.                                 কটা লোকে চড়ে ট্রামে ?
.                       তা ছাড়া গাড়ির ভিড়ে
.                                     উপোসী নেই কে রটালো ?


   .                          দেশ জুড়ে অকাল মরণ এল ধেয়ে
.                       তিলে তিলে মর্ ছে মানুষ ভাত না পেয়ে
.                    সত্য বটে দু’ একজনা
.                                  ক্ষুধায় আত্মহত্যা করে
.                       তার মানে কি যত লোকের
.                                   সাজানো সুখ থরে থরে ?


.                        জাতিটাই মরছে রোগে
.                                    অনাহারের রোগ জোরালো |


.                         কত শত ভগ্নী মাতা বস্ত্র বিনে
.                       নিরুপায়ে কাটায় গৃহে রাত্রি দিনে
.                         বেকারীর বিড়ম্বনা
.                                       ঘরে ঘরে দুর্বিসহ
.                        ভাত কাপড় জোটে না হায়
.                                      এ জীবনে কি  নিগ্রহ !


.                        কোথা ভাই দেশবাসী
.                                হেসে খেলে দিন কাটালো !
.                          সোনার বাংলা হায়রে এদেশ নয়রে এখন
.                          শকুনি শেয়াল যে হেথা করে বিচরণ
.                          দেশমাতা দুঃখিনী যে
.                                  শত অপমানে সারা
.                          পথে পথে ঘুরে মরে
.                                   নরনারী গৃহহারা |
.                        সারা দেস কাঙাল ক’রে
.                                      শেয়াল শকুন পেট ভরালো |


.                        দাদা বলে ঘুঘু পাখি অশান্তি চায়
.                        তাই তারে ছলে বলে ধরিবে খাঁচায়
.                                  আহা কথাখানি বেশ |
.                        এই ঘুঘু বার বার ধান খেয়ে যাবে
.       
   ঐ,           কারো সাধ্য নাই এরে ফাঁদে আটকাবে
.                                   আহা কথাখানি বেশ |


.                        দুনিয়াতে য়ত আছে জনসাধারণ
.                        এই ঘুঘু পাখি জেনো তাদেরই জীবন
.                                   আহা কথাখানি বেশ |
.                        এতদিন যারা ছিল হীন পদানত
.                        তাদেরই সাধনা পাখি সাধে অবিরত
.                                    আহা কথাখানি বেশ |
.                        মুনাফা শিকারে যারা বিষম পটু
.            ঐ            তাদেরই লালসা বিষে ধরনী কটু
.                                     আহা কথাখানি বেশ |
.                        মহা প্রলয়ের তারা করে আয়োজন
.                        মেদিনী দখলে রেখে করিতে শোষণ
.                                      আহা কথাখানি বেশ |
.                        তাই কপোতের মাঝে গরীবের দল
.                        জমা হল দানবেরে করিতে বিকল
.                                      আহা কথাখানি বেশ |
.                        কোটি কোটি প্রাণ এই কপোতের প্রাণে
.         ভাই         এক হয়ে মিশে গেছে অপরূপ টানে |
.                                        আহা কথাখানি বেশ |
.                                    দেশে  দেশে যেথা আছে যত প্রতিরোধ
.                         সবই জেনো ঐ শ্বেত কপোতের ক্রোধ
.                                      আহা কথাখানি বেশ |
.                         এই পারাবত ভাই মহা  বলে বলী
.                        এ্যাটমের দম্ভকে চলে পায়ে দলি
,                                       আহা কথাখানি বেশ |
.                        এই পাখি শান্তির প্রহরী কঠোর
.            ঐ          ভাঙে শত শোষণের বন্ধন ডোর
.                                          আহা কথাখানি বেশ |
.                        মন্দিরে মসজিদে মঠে গির্জায়
.                        ঘরে মাঠে কলে মধু শান্তি বিছায়
.                                        আহা কথাখানি বেশ |
.                        শিশুদের ঝ’রে যাওয়া হাসি-খুশি গান
.                        তাহারে ফোটাতে পাখি হল আগুয়ান |
.                                         আহা কথাখামি বেশ |
.                        মায়েদের চোখে জমা অশ্রু-সাগর
.              ঐ
       পাখি সেথা জাগালো আনন্দ-লহর
.                                         আহা কথাখানি বেশ |
.                        স্নেহ প্রীতি অনুরাগে ভরা সংসার
.                        হৃদয়ের তটে তটে সুখের জোয়ার
.                                          আহা কথাখানি বেশ !
.                        তুমি আমি আর যত নুয়ে-পড়া প্রাণ
.                        পাখি হ’য়ে জেগে উঠে করি অভিযান
.                                          আহা কথা খানি বেশ !
.                        যারা ভাবে এই পাখি করিবে নিধন
.                        নিজেরা মরিবে তারা ----- বিধির লিখন
.                                           আহা কথাখানি বেশ |
জঃ সাঃ লোক-----   কি গো মশাই, তোমার কথার আরো জবাব                             

.                     
শুনবে? তবে শোন--


(পুনরায় গান শুরু করতে যাবে এমন সময় সহসা জীর্ণা-বসনা, বেদনাক্লিষ্ট জনৈক সাধারণ
নারীর প্রবেশ)


জঃ সাঃ না---    না,. না , তুমি আর নয় | আমি ওর কথা শুনেছি | এবার আমি ওর কথার জবাব দেব |

.             জঃ সাঃ লোক -----  তুমি কে ?
.             জঃ সাঃ না ------     আমি ?
                              

গীত সুরু ------

আমি একজন বাংলাদেশী অভাগিনী নারী
.                সে কাহিনী শোন বলে যাই
আমাদের কথা শুনে কেহ চোখেরি জল ফেলো না গো
.                বুকের চিতার আগুন জ্বালা চাই |


কত স্বপন ছিল আমার মনে
সুখেরি ঘর বাঁধবো ধনে জনে
সবুজ মাঠে সোনার ফসল দেখে
পরাণ দুলে উঠতো থেকে থেকে |
পরাণ দুলে উঠতো থেকে থেকে |
দানবের নিঃশ্বাসে হায়
.                স্বপন আমার পুড়ে হল ছাই |


জমিন গেল্ গেল বাস্তুভূমি
দেশমাতা এমন নিদয় তুমি |
শিশু কোলে, স্বামীর হাত ধরে
মোরা নেমে এলাম পথের পরে
গাছের তলাতে সেদিন
.                চোখের জলে হল মোদের ঠাঁই |


এলো আকাল মেলে মরণ-পাখা
গাঁয়ে মোদের হল না আর থাকা
ধুঁকে ধুঁকে চলি  সহর পানে
পথের কোথা শেষ কেবা জানে |
নদীর স্রোতে তৃণ সম
.                নিরুদ্দেশে ভাসিয়া বেড়াই |


সহরে হায় একটু ফ্যানের আশে
দ্বারে দ্বারে ফিরেছি নিরাশে
শিশুর ক্ষুধা সহিতে না পেরে
গলা টিপে ফেলেছি যে মেরে !
নিজ হাতে সন্তানে খুন
.                ক’রে তবু অশ্রু ঝরে নাই |

ক্ষুধার জ্বালায় পাগলিনী সম
জানি না হায় স্বামী কোথায় মম !
অবশেষে পেটের বিষম দায়ে
সতীত্ব যে দিয়েছি বিকায়ে
তিলে তিলে তুষানলে
.                পরাণ আমার পুড়িছে সদাই |



তরজাওলা আস্তে আস্তে সরে পড়ে
              

কোরাস : ------
( কোরাস গানে সাধারণ লোক ও সাধারণ নারী যোগ দেবে )


.             অগ্নি-গিরি জ্বালো বুকে
অগ্নি-গিরি জ্বালো বুকে জ্বালো বুকে
.       জ্বালো বুকে জ্বালো বুকে দাঁড়াও রুখে,
রুখে দাঁড়াও ----- দাঁড়াও ----- দাঁড়াও রুখে |


বিষ-নিঃশ্বাসে ভরিয়া বাতাসে
.                    মহাকাল আসেরে আসেরে
ধ্বংস-জটার কালো মেঘে মেঘে
.                     দিগন্ত আলো নাশেরে |


.                ভাই উঠে দাঁড়াও
.                আর ঝড় ওঠাও
.                ঐ মেঘ তাড়াও |
জীবন-অরণ্যে ভোরের পাখীর গানে
.                শান্তি-যাপন রচি সুখে |



.                   **********************         
.                                                                                     
পাতার উপরে   
.                                                                      
কবি পরেশ ধরের সূচিতে...     


মিলনসাগর