কবি রাজশেখর বসুর কবিতা
কবে কোন যুগে খেয়েছিনু মোরা দুই চার ফোঁটা সুধা,
হজম হইয়া গেছে কোন্ কালে পেয়েছে বিষম ক্ষুধা |
হাজার বছর সবুর করিয়া লভিয়াছি এই জ্ঞান ---
নিজ হতে তুমি নাহি দিবে কভু ছাপ্পর ফোঁড়া দান |
ওহে --  হৃষীকেশ, তাই সকলে তোমার কাছে
জবরদস্তি করিব আদায় যা কিছু অভাব আছে |
চল্লিশ কোটি নাছোড়বান্দা মোরা ছাড়িব না কভু,
তুমি যে একলা পড়িয়াছ ধরা, কোথায় পালাবে প্রভু ?
ওঠো নারায়ণ জাগ জাগ ওহে অচেতন শালগ্রাম,
এ নয় তোমার ক্ষিরোদসিন্ধু, এ যে গরিবের ধাম |
ওহে দামোদর চল্লিশ কোটি টানিছে তোমার রশি,
ওঠ নারায়ণ আজি যে তোমার উথ্বান-একাদশী  |
মনে তুষ্ট দুষ্টু আমরা,  বেশী কিছু নাহি চাই,
অর্ধ রাজ্য রাজার কন্যে ---এসবেতে রুচি নাই |
ইন্দের পদ, কুবেরের ধন, স্বর্গের ভোগ যত
মুক্তি মোক্ষ নির্বাণ আদি তোলা থাক আপাতত  |
দেশে দেশে যাহা দিয়েছ দেদার তাই দাও আমাদের ---
একটি কেবল ছোটখাটো বর, তাতেই হইবে ঢের  ||
খোল হে শীঘ্র খোল হে তোমার শক্তির ভান্ডার,
দাও হে মাথায় হৃদয়ে শক্তি বাহুতে  শক্তি সার |
কর হে কোমল কুসুমের মত, তাতে আপত্তি নাই,
দরকার হলে বজ্রের মত কঠোরতা যেন পাই |
তৃণের চেয়েও কর হে সুনীচ, তরুর চেয়েও ধীর,
শত্রুর কাছে উঁচু যেন রয় হিমাচল সম শির |
যত খুশি দাও ক্ষমা অহিংসা অন্তরে মোর ভারি ,
একটি কেবল মনের বাসনা ব’লে রাখি হে শ্রীহরি ---
দুর্জন অরি এক চড় যদি লাগায় আমারে কভু,
তিন চড় তারে কশাইয়া দিব, মাপ কর মোরে প্রভু |
একটি কানের বদলে তাহার নিব দুই কান কাটি,
একটি দাঁতের বদলে তাহার উপাড়িব দুই পাটি  |
ইষ্টানিষ্ট না ভাবিব কভু, শত্রু করিব টিট---
ক্ষম অপরাধ ওহে দয়াময়, আমি নরকের কীট ||

এইটুকু বর লইয়া তোমায় আপাতত দিব ছুটি,
নিজ নিজ ঘর লব গুছাইয়া যত পারি মোটামুটি |
তারপরে যদি আসে হে সুদিন, আর যদি বেঁচে থাকি,
ভাল ভাল বর করিব আদায় যা কিছু রহিল বাকী----
মান সম্ভ্রম, মোটা রোজগার, চারতলা পাকা বাড়ি,
লোক-লশকর, রূপসী কবিতা, আট সিলিন্ডার গাড়ি ||

.                     ভারতবর্ষ, আশ্বিন, ১৩৩৩ ( ১৯২৬ )

.                  ****************               
.                                                                                    
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
.             নাপারুক করিতে ঊদ্ধার,
.             তথাপি সে করুণানিধান |
.             নাহি হ’ল সর্বকলদাতা
.             তবু তারে কহিব দেবতা ||

.                  ****************               
.                                                                                    
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
গৌতম যদি তালগাছ হয় আর গৌরচাঁদ
যদি নারকেল গাছ হয় তবে তুমি খেজুর মাত্র |
কিন্তু তোমাদের বাড় এখনও শেষ হয়নি
পঁচিশ বছর পর্যন্ত চলবে,
এই কথা পন্ডিতরা বলেন |
এর পরেও যা বাড়ে
তা হচ্ছে গোঁফ আর দাড়ি
আর গায়ের চর্বি বা fat  ||
.      তোমার বুদ্ধির দৌড় কত দূর ?
.      শুনেছি ষোল বছরের পরে
.      বুদ্ধি আর বাড়ে না |
.      যা বাড়ে তা হচ্ছে রসিকতা, expeerienc ,
.      দেখে শেখা, টেকে শেখা, আর শুনে শেখা |
.      এর মধ্যে শেষেরটাই risky  |
.      কালিদাস বলেছেন ---
.      মূঢ়ঃ পরপ্রত্যয়নেয় বুদ্ধিঃ ;
.      অর্থাৎ বোকারা পরের বুদ্ধিতে চলে |
.      কিন্তু নিজের বুদ্ধিতে যখন কুলোয় না
.      তখন পরের বুদ্ধি নিতেই হয় |
.      যদি তুমি চালাক হও
.      তবে মূর্খ
humbug এর মত নেবে না,
.      জ্ঞানী লোকের পরামর্শ নেবে,
.      তা হলেই সিদ্ধিলাভ |
আজ এই পর্যন্ত | যদি টিকে থাকি
তবে সামনের বছর আবার লিখব |
.                                      রাজশেখর বসু
.                                       ১৬/৬/৫৭

.            *********************

*দীপঙ্কর বসু পরশুরাম গল্পসমগ্রর সম্পাদক

.                  ****************               
.                                                                                    
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
দেবনির্মাণ
কবি রাজশেখর বসু

.          চাই বাঞ্ছাকল্পতরু      ভক্তজনত্রাতা
দূর কর --স্থলভয়,     শত্রু মোর কর হে সংহার |
.           কৃষ্ণ ধূমে দৃষ্টি হয় নাশ,
.           সোমপানে আসিল জড়তা,
.           মেদগন্ধে না পড়ে নিঃশ্বাস
.           দেখা দাও যজ্ঞের দেবতা |
.           কোথা ওহে বিশ্বদেবগণ ?
.                হা বধির হা রে           ||

.                হে অদৃশ্য দেব, এই মুক্তোকাশতলে
.           ধরা নাহি দিবে তুমি মোর মন্ত্রবলে  |
পড়িয়াছি বিপুল আয়াসে   অভ্রভেদী তব নিকেতন
পত্র পুষ্প ফল জল দিয়া ভরিয়াছি অর্ঘ্য নিবেদন
রচিয়াছি বিশ্বরচয়িতা দৃশ্যমান তব কলেবর
ধাতু শিলা কর্দমপ্রলেপ সুগঠিত মুরতি সুন্দর,
মণিময় নানা আভরণে মানায়েছি বিগ্রহ তোমার,---
ওহে স্রষ্টা, হের সৃস্টি মম, লও পূজা দাও পুরস্কার |
আর যদি ওহে নিরাকার, নাহি চাও মুরতি সুঠাম,
পাছে ঐ অবয়বহীন সুবর্তুল শিলা শালগ্রাম  |
.                   যেথা ইচ্ছা কর অধিষ্ঠান,
.             ধর ধর অর্ঘ্য উপহার,
.             কথা কও ওহে মূর্তিমান,
.             মনোবাঞ্ছা পুরাও আমার |
.             হা রে মূক জড় ভগবান,
.             হা বিমুখ অচল পাষাণ ||


.           বুঝিয়াছি যে দ্যুলোকবাসী ভগবান,
.              মুরতি পূজায় শুধু তব অপমান |
নররূপী তব দূত মুখে পাইয়াছি বার্তা অভিনব,
মানবেরে করিয়াছি দেবতা, দেবতারে করেছি মানব |
সব কথা নারিনু বুঝিতে,  এইটুকু বুঝিয়াছি প্রভু ---
নিজস্ব মোদের তুমি শুধু,  অপরের নহ তুমি কভু  |
ত্রাণ কর সন্তানে তোমার, স্বর্গলোকবাসী হে জনক,
প্রতিবেশী বিধর্মীর তরে দাও প্রভু অনন্ত নরক |
.               বীর যত তোমার সন্ততি
.               শত্রু নাশি করিছে উল্লাস,
.               জয় জয় প্রভু গোষ্ঠিপতি ----
.               ভ্রাতা বধ করিছে ভ্রাতায়,
.               তব রাজ্য রসাতলে যায় ||
.           শুনিব না কোনো কথা অপরে যা কয়
.           বিশ্বাসে তোমারে আমি লভিব নিশ্চয়
তুমি সর্ব্ব গুণের আধার   হে ঈশ্বর সর্ব্বশক্তিমান ,
তুমি সর্ব্বভয়পরিত্রাতা ,      হে অপারকরুণানিধান |
পাইয়াছি তোমারি দয়ায় ধরাতলে ভাল কিছু যাহা,
অমঙ্গল যা কিছু দিয়েছ আমারি উন্নতি তরে তাহা ---
সে কেবল তব লীলাখেলা. অথবা সে জোর কর্মফল |
হে ঈশ্বর, নাহি কি হে তব আর কোনো উপায় সরল ?
সোজাসুজি কর না উদ্ধার যদি তুমি এত শক্তিমান |
ওহে শুস্ক বাঞ্ছাকল্পতরু, গৃহস্থের পোষা ভগবান
ভক্তি চায় ধরিতে তোমারে, যুক্তি কাটে তোমার বব্ধন,
হরি প্রভু টিকিলে না তুমি, আবাহনে হ’ল নিরঞ্জন
হে অক্ষম ভয়পরিত্রাতা , হে অথর্ব নিয়মের দাস,
হে দুর্বল মহাকারুণিক, হে নিষ্ঠুর শক্তির বিকাশ,
.             
.             হে কৃত্রিম    মানববিগ্রহ ,
.             হে নরের বাহ্যিক বিধান,
.             এক চক্ষু মুদি অহরহ
.             কেমনে করিব তব ধ্যান ?

.              হে বিধাতা, পার নাই গড়িতে ঈশ্বর
.          ফেলিয়াছ এই ভার আমার উপর |
অতি দীন আয়োজন মোর, তবু নাহি মানি পরাভব,