কবি পৌলোমী সেনগুপ্তর কবিতা
*
জবানবন্দী
কবি পৌলোমী সেনগুপ্ত

কেষ্টঠাকুরকে আমি ভুল করে
ঠেলে দিয়েছি
কালো যমুনায়, জজসাহেব

মধুমাস. হলুদ পার্বণ
জোছনাফুলের গাছে
ফুটি ফুটি হয়ে ছিল
আলো ফুল

আমার স্বভাব কাব্যিক
নতুবা নানান কথা
হাট্টিমাটিম
ভাবতে ভাবতে আমি
কেষ্টঠাকুরকে এক ধাক্কায় . . .

ঝপাস করে ভীষণ শব্দ হল
ছিটে এল জলপ্রপাত
নীল রঙের শাড়ি নিঙাড়ি নিঙাড়ি
একটু শুকনো হয়ে নিলাম আমি

কোতোয়াল, লাঠিসোঁটা, হাঁকডাক
কেষ্টঠাকুরকে কিন্তু কোথ্থাও পাওয়া গেল না

আমি বুঝতে পারিনি, জজসাহেব,
জোছনা ফুলের ছায়ায়
কেমন করে সে ডুবে গেল গহীন যমুনায়

.         *************************  

.                                                                                       
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
আরশিতে ছায়া পড়ে
কবি পৌলোমী সেনগুপ্ত

আরশিতে ছায়া পড়ে, নৌকো ভাসে, হাওয়া লাগে পালে
তুমিও লুকিয়ে থাকো, স্বাভাবিক, কোথাও আড়ালে---

দিব্যচক্ষু মাছগুলো লেজের ঝনাত ঝাপটাতে
কাচের গোলক ভাঙে, চুরমার করে সব ঢেউ
তুমি কি লুকোবে বলে জলমহলের জানালাতে ?
আমার আরশি ছায়া জানবে না জেনো তার কেউ

কত গাছ জলচর, সিক্ত এ-ডুবুরিজীবন
উজান-ভাটির দেশে সাক্ষী শুধু মায়াদর্পণ

ডুমুরফুলের মতো মখমলি অদৃশ্যতায়
আগুন জলের যুদ্ধ দেখে আমি এমন অবাক
তুমিও স্বভাবকবি, আঁশগন্ধ মিশিয়ে হাওয়ায়
উঁকি দাও এ মুলুকে। এই দ্যাখো আরশির ফাঁক---

আগুনেই এসো তবে, স্বস্তি নেই হিমেল পাতালে
আরশিতে উঠে এসো, বৌকো ভাসে, হাওয়া লাগে পালে

.       
          *************************  

.                                                                                       
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
মডেলের কথা
কবি পৌলোমী সেনগুপ্ত

আমি ভাবতে গিয়ে ঠিক ভেবেছি, কাঁদতে গিয়ে ভুল
আমি সাবধানে টিপ পড়তে গিয়ে ডুবিয়েছি বিলকুল

আমি ড্রেসিং টেবিল সামনে রেখে আয়না জোড়া চোখ
আমি চোখের পাতায় মাসকারা দিই আশকারা পায় শোক

আমি কাজল দিয়ে দুঃখ লুকোই, ব্লাশার দিয়ে ঘা
আমি চুলের ব্রাশে ঢেউ তুলেছি, ডান সিঁথি না বাঁ

আমি শ্যাম রাখি না শ্যাম্পু রাখি, কুল রাখি না দুল
আমি ঠোঁটের রেখা আঁকতে গিয়ে ডুবিয়েছি বিলকুল

আমি সুরার রঙে নেল এনামেল, মেলবন্ধন কম
শোনো, ঝড়ের মাঝে পড়লে বোঝায় ক্যাটওয়াকের দম

আমি দম দেওয়া ডল পুতুল বলে হাঁটছি, পাশে খাদ
আমি তাও তো শুধু ফিরেই আসি। দ্রৌপদী সংবাদ

আমি শোনাতে চাই সভার ভিড়ে, কেবল টানে পা
আমি লিপস্টিকে বিষদন্ত লুকোই, ব্লাশ অন দিয়ে ঘা

আমি খাঁচার দিকে আবার ফিরি, বাঁচার মোহ বেশ
আমি বুকের খাঁজে ওদের নজর আটকে রাখা কেস

আমি কেস থেকে আজ ফেস পাউডার মাখতে গিয়ে চুপ
আমি হাসতে শেখা যন্ত্রময়ী, মাজতে জানি রূপ

আমি রূপের সঙ্গে রূপো মেশাই, কাঁটার সঙ্গে ফুল
আমি বেশ করেছি, সবার চোখে ফুটিয়েছি বিষ হুল!

.                 *************************  

.                                                                                       
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
মায়া ক’রে
কবি পৌলোমী সেনগুপ্ত

তোমার ঘুমন্ত মুখ দেখে
ভোরের আলো চুপচাপ ফিরে যায়
যেন নূপুরের শব্দ
ঘুম ভেঙে উঠে বসি আমি
তোমার ঘুমন্ত মুখ দেখে
পাহাড়ি শহর মনে পড়ে
ঘোরানো রাস্তা আর হঠাৎ হাওয়ার শিহরণ
ভোরের স্বপ্নে এসো
একসঙ্গে দু’জনেই দেখি
শিকড়গুলোকে সব ছুঁয়ে দিচ্ছে নিঃঝুম ভোর
তারপর উঁকি মেরে
আমাদের ঘরে . . .
তোমার ঘুমন্ত মুখে
মেঘ, ঝরণা, পাহাড়, শৈত্য
পেয়েছে সে আমারই মতন

.        *************************  

.                                                                                       
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
কবিতাবান্ধব, তোমাকে . . .
কবি পৌলোমী সেনগুপ্ত

ক্ষমাঘেন্না করে দাও। অসময়ে এসে দাঁড়িয়েছি
কথা যে ছিল না জানি। সারা গায়ে রোদের প্রলেপ
দূরের দুপুরে এসে দাঁড়িয়েছি, বন্ধ দরজায়
এসব দরজায় নেই সূতিতীক্ষ্ণ বীর কলিংবেল।
ব্যারেথ কড়া নাড়া আছে। আছে প্রকীক্ষার সাদা পাতা।

তবু তো তুমিও আছ। দরজার ওপারে অভিমানে
উত্কর্ণ, গালে ভরা বিরহবিধুর নীল দাড়ি
কালো পক্ষ্ম, কটা চোখ, আর্দ্র তবু পুরুষসুলভ
ভাবছ, তোমার কথা এর আগে পড়েনি কি মনে ?

পড়েছে, পড়েছে ঠিকই। দুপুর যখন হারিয়েছে
অনন্ত নির্জন এক রাস্তা ধরে, বালিকার মতো
দামাল ছেলের মতো ফুটবল-বিকেল ঝাঁপিয়েছে
সবুজ ঘাসের স্বপ্নে। কিংবা সেই যুথিকালতায়
যেখানে তোমার চোখ প্রথম স্পষ্ট দেখি আমি

আমার যান্ত্রিক স্কীনে বিদেশী দুর্গের রম্য ছবি
আমার টেবিল জুড়ে অন্যের স্বপ্নের পাহাড়
তবু তুমি বার বার ফিরেছ সুড়ঙ্গপথ ধরে . . .
সেই পথে আজও নামো। খোলো এই নীরব দরজা।
একবার হাত রাখি চেনা সে পুরুষ ওষ্ঠাধরে
তর্জনি ঠেকুক আজ, আদম না--- হব্বার দু’হাতে।

.      
         *************************  

.                                                                                       
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
শিলাইদহের মেঘ
কবি পৌলোমী সেনগুপ্ত

শিলাইদহের মেঘ কখনও কখনও আসে
.                বেড়াতে এখানে
ব্রিগেড মাঠের পাশে, ছাতিম গাছের ডালে
.                একা জবুথবু
বেলাই ট্র্যাফিকের বেড়াজালে চাপা পড়া
.                শহরের বুকে
বাদুড়ের মতো মেঘ ঝুলে থাকে। তার মনে
.                পড়ে যায় নদী---

চোখে চোখ পড়ে গেলে তাকে বলি, যাও মেঘ,
.                তাঁকে গিয়ে বলো
আকাশ দুধের সর, বাতাস চোখের বালি
.                পাতাল রেলের
কোনও কোনও স্টেশনের দেয়ালে দেয়ালে তিনি
.                ঝুলে রয়েছেন
লালমাটি, ঘোলাজল, আগুনে আগুন আরও
.                হয়েছে খোয়াই

আকাশ দুধের সর, বাতাস চোখের বালি
.                বিকেলের রোদে
মেঘ তুমি নিয়ে এসো অজাচিত কালো ঝড়
.                শহর ডোবাও
তাঁকে বলো, তাঁর ঘরে অতিথি হয়েছি আজ
.                ভিটে ডুবে গেছে
আমারে ফিরায়ে লহ, আমি তোমাদেরই লোক
.                বুঝেছ তো মেঘ ?
াকাশ দুধের সর, বাতাস চোখের বালি
.                প্রেম পরকীয়া . .

.          
    *************************  

.                                                                                       
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
ক্রিকেট কোচিং সেন্টার
কবি পৌলোমী সেনগুপ্ত

মাথার ওপর ওড়ে অলিখিত কাভার-ড্রাইভ
চোখের পাতায় ভাসে বাউন্ডারি-ছোঁয়া স্বাধীনতা
দুটি ছেলে ছুঁয়ে দেখে কচি ঘাস কতটা শচিন
মায়েরা উত্সুক মুখে ক্রমাগত সাদা হয়ে আসা
ছেলেদেল নিয়ে রঙচঙে স্বপ্ন দ্যাখে মনে মনে---

ওর ছেলে বাঁ-হাতি, সে ততটা সৌরভ হয়েছে কি ?
জাদু-ভরা কাঠ দিয়ে ছবি আঁকে বাতাসে কতটা ?
আমার ছেলেটি আর কতদূর জাদেজার থেকে ?
পুল মারা শিখে গেলে বিকেলে চাউমিন কিনে দেব
অনীকের মতো হবি, কাল ম্যাচে পঞ্চাশ করেছে

বিদ্যুৎ ছোঁয়ার চেষ্টা মাঠে মাঠে মৃদু ছেলেগুলো
স্কুলে পড়ার ফাঁকে সহসাই টি.ভি. হয়ে ওঠে
তাদের দু’চোখ। তাতে ভেসে থাকে খোলা স্কোরবোর্ড
অথবা নদীর ধার---ওড়াওড়ি মাছরাঙাদের
বলের পেছনে যেন রকেটের মতো জন্টি রোডস্ . . .

আবার সকাল আসে, আবার দেশপ্রিয় পার্ক
মাছরাঙাদের নিয়ে একাকী ভোরের ট্রাম চলে

.              *************************  

.                                                                                       
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
আবেগচারণা
কবি পৌলোমী সেনগুপ্ত

আজ ওড়না ভেজাবার দিন

নেভি ব্লু আকাশ থেকে
ঝুপঝাপ নেমে আসছে কিছু হারানো বিকেল।

এমন সন্ধ্যায় খুশি হয় বিষণ্ণ পরীরা
ক্লাসরুমে টাইমবোমা ফাটে---

দিগন্ত থেকে ভেসে আসছে অতসীর বীজ
আমি ফাঁকে থেকে ফাঁকা আরও ফাঁকা---

খরস্রোতা ওড়না
কলকল বয়ে যায় মাঠভাঙা সবুজ পেরিয়ে
চিনে নেয় চাঁদের ওপিঠ

আমাকে তুমি রূপকাঁথা দিয়ে ঢেকে রাখো
আমি সাদা থেকে নীল থেকে সাদা

দীর্ঘ কবিতার মতো এঁকে বেঁকে বেড়ে চলে এইসব
এইসব আবেগযাপন।

.              *************************  

.                                                                                       
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
অবসর যাপন
কবি পৌলোমী সেনগুপ্ত

টি.ভি. তে তাই দেখেছিলাম আলোর মতো ছড়িয়ে যায় রং
গল্প শুনে কাটছে বেলা, নয়া চ্যানের হিন্দী সিরিয়াল
নায়িকা দাঁতে ঠোঁট চাপছে, নয়ক পরে থ্রী-পিস স্যুট, টাই
সাজানো ঘর, এ.সি., অফিস, বিক্রি আছে মহিলা স্বাধীনতা
অন্য ঘরে রান্না শিখে স্বামীকে দিন বউমাকে হারান
শুনে রাখুন গ্রাম কে গ্রাম জ্বলে যাচ্ছে এলাকার দখল
জল জমছে নিকাশি নেই --- দেখে রাখুন সিংহের শিকার
টি.ভি. তোমরা চোখের মণি. টিভিতে ওড়ে দুনিয়াময় ছাই
প্রেম করলে ওদের বলো--- জানিয়ে দেবে তোমার মনে আছে
কেমন কথা, কোন গানের ভাষায় বলা সবার চেয়ে ভাল

টিভির দেশে ঘাসের বনে রোদ পড়লে শহর বৃষ্টিতে
ভাসতে থাকে---সবাই একা হারিয়ে যাই জানালা দিয়ে ছাতে
লাল ঘুড়ি বা গলির ক্রিকেট সব ছাড়িয়ে অস্থিতে মজ্জায়
শহুরে রোদ কিংবা জলে আলোর মতো ছিটকে যায় টি.ভি.

.        
           *************************  

.                                                                                       
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর