কবি প্রবীর জানার কবিতা ও ছড়া
*
ভবিষ্য
কবি প্রবীর জানা

এত মৃতের মিছিল
ভাবতে পারিনি।
মরার আগে মানুষগুলোকে
মেরে ফেললো!
খুনীরা উল্লাস করতে করতে
আনন্দে বুকে ফোলাতে ফোলাতে
হাতের পিস্তল ছুরি স্টেনগান
উর্দ্ধে তুলে
বিজয়ধ্বনি দিতে দিতে
আস্তানায় ফিরে গেল।
মদের পেয়ালায় চুমুক দিতে গিয়ে
চমকে উঠল
পেয়ালায় ভাসছে
তাদের মৃত মুখের ছবি
উপছে পড়ছে রক্ত
ওদের খুন করার আগে কি
নিজেদের খুন করেছে ?
স্পষ্ট দেখছে দূর থেকে
শববাহকেরা এগিয়ে আসছে
ওদের নিয়ে যাবে।

.           *************************  

.                                                                                          
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
ভালোবাসি তোমাকে
কবি প্রবীর জানা

আমি ভালোবাসি তোমাকে
বর্ষাভেজা রামধনু রং
এলোচুল বটের ঝুরি
বা ভেজা মাটির গন্ধে পাই
তোমার ছোঁয়া।
ঢেই খেলানো শিশির ছায়ায়
আমি খুঁজে পাই
তোমার বুকের স্পন্দন।
এখানেই দাঁড়িয়ে এক
নিশ্চুপ দুপুরে বলেছিলে,
আমি ভালোবাসি তোমাকে।
মনে প্রিজমে ভেসে ওঠে
কৈশোর পেরিয়ে যৌবনের
প্রথম দৃষ্টির অপলক চোখ।
দিঘির জলে কাঁপে
পদ্মের ঊষ্ম ঠোঁট
বাতাসে শিশির সিক্ত
শিউলি সুবাস।
জানি অধরা তুমি,
যেদিন পাবে না খুঁজে আমার ঠিকানা
কান পাতলে মাটির কাছাকাছি
পাবে শুনতে আমার কথা।

.        *************************  

.                                                                                          
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
ওরা কারা
কবি প্রবীর জানা

ওরা আসে শীতের রাতে ---
আমার সারা শরীর চাদরে মোড়া,
ডান হাত ধরে বলে সাথে যেতে।
কিছুটা হাঁটতেই আর একজন
বাম হাত ধরে টান দেয় ---
চল না আমার সাথে।
আর একজন আমাকে কাঁধে তুলে
বলে --- তোমাকে রাখব গোপন আস্তানায়
কেউ তোমার ছায়াও খুঁজে পাবে না।
আমি বলি --- ভাবতে দাও,
আমারও তো মন আছে!

ওরা আসে বর্ষার দিনে
চার দিকে জল থৈ থৈ নদী,
মেঘ গম্ভীর আকাশে অজস্র জিজ্ঞাসা।
কেন যাব, কথা কি রেখেছ ?
ওদের হাতের পতাকা --- মিছিল
আমার স্বপ্নে রঙিন,
আমার বুকের পোশাক সরাতেই দেখে
ভারতের মানচিত্র আঁকা!
আমি বলি --- যারা একে ভালোবাসে
আমি যাব তার সাথে!

ওরা আসে ওরা আসবে,
আমি জানি ওরা কারা!!

.        *************************  

.                                                                                          
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
পরিবর্তন
কবি প্রবীর জানা

আজকের সকাল যেন
অন্য সকালের চেয়ে আলাদা,
পাখিরা মনের সুখে গান গাইছে
গন্ধরাজ ফুলের হাসির সৌরভে
ছড়িয়ে পড়েছে মাদকতার সুবাস
ভোরের তরুণ রোদে।
রাতের পর সকাল
এটাই তো নিয়ম।
কাঁধের জোয়ালে এলিয়ে থাকা
লাঙলটা দুলছে
বলদদুটোর হাঁটার তালে
লাঙলের মুঠে শক্ত করে
ধরে রেখেছে এক তরুণ কৃষক
সবই তো আগের মতো
তবে ?
আজকের ভোরের আকাশ
রক্তিম নয়
আগের মতো নাই রক্তের দাগ,
দীর্ঘ ঝঞ্ঝা বাদলের পরে
এ এক নতুন সকাল।
দানবমুখো মেঘগুলো
বৃষ্টি হয়ে ঝরতে ঝরতে
এখন নিশ্চিহ্ন,
যুদ্ধবিরতির রেখা টেনে দু-একটা
শুভ্র মেঘের ধ্বজা নীল আকাশে,
একেই বলে পরিবর্তন।

.        *************************  

.                                                                                          
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
প্রতিসারী
কবি প্রবীর জানা

স্বপনবাবু দাগ কাটছেন
বালির উপর একটা কাঠি দিয়ে
দীঘার সমুদ্র তীরে বসে।
দাগ কাটতে কাটতে রেখাগুলো
স্বপনবাবুর ছবি হয়ে গেল
কি বিভত্স তার রূপ
একটি কঙ্কাল
বুকের উপর ঘটে যাওয়া
জীবনের কিছু ছাপ।
সূর্য পশ্চিম আকাশে
রক্তিম হাতছানি,
স্বপনবাবু মিল খুঁজছেন
বার্ধক্য শরীরের সাথে কঙ্কালের
জোয়ারে যাবে মুছে রেখাগুলো।
স্বপনবাবু ভাবছেন আর ভাবছেন!!

.        *************************  

.                                                                                          
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
চোখ ফিরিয়ে নিল
কবি প্রবীর জানা

মণীষা আমার দিকে চেয়ে হাসছিল
হাসবেই না বা কেন,
আজ যে তার বিয়ে।
বর আসবে
নতুন করে ঘর বাঁধবে।
আমার বুকটা এখন
বৈশাখের মাঠ,
কদিন আগে ছিল
শ্রাবণের ঝরা আকাশ।
সে বলেছিল ---
আবার দেখা হবে ভালো থেকো।
ভালো কি আর থাকা যায় ?
সেই খালপাড় ইটের পাঁজা
পাশে কৃষ্ণচূড়া গাছটায়
এখন ভরা কোটাল,
আগুন রং-এর শাড়ির আঁচল
তার বুকের উপর।
মণিষার এলোচুলের
সোঁদা গন্ধ গাছের ছায়ায়
অতৃপ্ত নির্জনতায়!
মণীষা ভালো ছবি আঁকতে পারে
গাছপালা নদী নৌকো
পাল্কী পক্ষীরাজ ঘোড়া
আরো কত কি।
আঙুল দিয়ে হাওয়ায়
রেখা টানতে টানতে
চোখদুটো তার ঝাপসা হয়ে এল,
আজ মণিষার বিয়ে
সে আর হাসল না
চোখ ফিরিয়ে নিল।

.        *************************  

.                                                                                          
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
অন্য এক মুখ
কবি প্রবীর জানা

আমি স্বপ্ন দেখি মাছের মতো
দু’চোখ খোলা রেখে।
কখনও তা রূপালী ঝর্না হয়ে
নেমে আসে তোমার বক্ষ থেকে
দু’ধারে শুভ্র পাহাড় চূড়ো
চড়াই উতরাই সমতল
সোনালী ধানের শীষে উঁকি মারে
সাঁঝবেলার আধখানা চাঁদ।
স্বপ্ন তোমার সমুদ্রের গভীরতা
আকাশের অসীমতা বা
চাঁদের পাহাড়ে মানিক খোঁজা,
তুমি ঝাঁপ দাও দিঘি বা
নদীর জলে
প্রতিবিম্বকে চাঁদ ভেবে।
সময়ের স্রোতে চাপা পড়া
তোমার স্বপ্ন-ফসিলে
জেগে ওঠে আমার
রোপন করা সবুজ বনানী
আকাশের আড়ালে পাই
খুঁজে অন্য এক মুখ।

.        *************************  

.                                                                                          
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
তোমরা ভগবান
কবি প্রবীর জানা

আকাশ ভরা মেঘ
বজ্র আর বৃষ্টি!
এক কৃষককে বলেছিলাম
তুমি আমার ঈশ্বর
অপূর্ব তোমার সৃষ্টি

গা ছম্ ছম্ অন্ধকার
রুদ্ধশ্বাস অভিযান
খনি শ্রমিককে বলেছিলাম
তুমি আমার ভগবান
দধীচির চেয়েও মহান

ওরা আকাশের দিকে চেয়ে
বলেছিল --- আমরা মানুষ
ওখানে আছেন ঈশ্বর
খোদা --- মেহেরবান
আমি বলেছিলাম
তোমরা আমার ভগবান

.        *************************  

.                                                                                          
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর