কবি প্রবুদ্ধ সুন্দর করের কবিতা
*
হুমায়ুননামা
কবি প্রবুদ্ধ সুন্দর কর

মৃতের নামের আগে যে চন্দ্রবিন্দুটি বসানোর রীতি
সেই চন্দ্রবিন্দু ঈশ্বরপ্রতীক

আমাদের ইতিহাসে হুমায়ুনের প্রার্থনা নেই
তাই তার গোটা আয়ুষ্কালই অভিশপ্ত একটি মৃত্যুশিয়র
যে-শিয়রে অপত্যতাড়িত এক দিকভ্রান্ত পিতা
রাত জেগে বসে থাকে, আর, ভিক্ষুকের মতো পূর্বে ও পশ্চিমে
দুই করতল পেতে পুত্রের আরোগ্য চায়  |

আমাদের ইতিহাসে নেই হুমায়ুনের প্রর্থনা
তাই, পিতার যকৃৎ চেপে বসে কর্কটের দাঁড়া
অসহায় হুমায়ুনও জন্মজানুকাটা বলে প্রর্থনা-অযোগ্য  |

তহশিল কাছাড়িতে আমার পিতার নথিভুক্ত নাম চন্দ্রবিন্দু হরিপদ কর
কুলাঙ্গার পুত্র আমি, আর, পিতা আমার ঈশ্বর জহিরউদ্দিন মহম্মদ বাবর |

.      
               ****************  
.                                                                             
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর
*
হেমন্তসম্ভব
কবি প্রবুদ্ধ সুন্দর কর

আর আমাকে বিষণ্ণ কোরো না হেমন্তকাল
না-লেখার অভ্যাস আমাকে গিলে ফেলছে ক্রমশ
একেকটা দিন ধ্বনি হয়ে পাহাড়ের দিকে গিয়ে
মরা আলো ও কুয়াশা মেখে প্রতিধ্বনি
গোধূলির ফাঁদ হয়ে ফিরে আসে রোজ
পা দিলেই ঝাঁকে ঝাঁকে ছুটে আসে
মনখারাপের বিষ মাখানো অব্যর্থ অজস্র তিরের ফলা |

না-লেখার অভ্যাস, আমাকে অস্থির কোরো না আর
প্রেম আর নুন-চাপা একেকটি অস্থিরতা থেকে
মুখভর্তি রক্ত উঠে আসে |


তোমাকে লিখতে বা মুছে ফেলতে গিয়ে হেমন্তসম্ভব
নিজেরই অজান্তে একটি জোঁকের মৃত্যুদৃশ্য উপমেয় হল |

.                     ****************  
.                                                                             
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর
*
আলো
কবি প্রবুদ্ধ সুন্দর কর

সন্ধ্যা নেমে এলে সমূহ মনোবেদনা নিয়ে জ্বলে ওঠে একটি নক্ষত্র
বিষাদস্পৃষ্ট তোমার মুখ
কোনও একদিন যদি স্পষ্ট হয়ে ওঠে
বোঝা যাবে, সেই নক্ষত্রের আলো
পৃথিবীতে এসে পৌঁছেছে, সামান্য আগে |

.         
   ****************  
.                                                                             
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর
*
ছায়া
কবি প্রবুদ্ধ সুন্দর কর

দু-চোখ মোমের শিখা, তাই
কালি পড়ে রাত-জাগা দু-চোখের কোলে
আমাকে এ আলো ভেদ করে না বলেই
এই ছায়া, অনচ্ছ অবগ্রহের মৃত্যুপূর্ব অসুস্থকালিমা |

.            ****************  
.                                                                             
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর
*
হারমোনিয়ম
কবি প্রবুদ্ধ সুন্দর কর

The sly reeds whisper to the nights---
--James Joyce


এক
আমাদের বংশের প্রাণস্বরূপ এই হারমোনিয়ম
ভেতরে চিরহরিৎ অরণ্যঅঞ্চল | দিনে
বেলোর পাঁচটি ছিদ্র দিয়ে অনর্গল
অক্সিজেন বেরোতেই থাকে | তাই পৃথিবীর যাবতীয় গাছ
আমাদের কাছে ডামি |
আমিও আত্মহত্যাপ্রবণ | কোনও কোনও পূর্ণিমায়
হারমোনিয়মটিকে শিয়রে রাখি |
বেলোর ছিদ্রগুলির দিকে মুখ রেখে নিদ্রা যাই |

দুই
হারমোনিয়মের বেলোতে সব মিলিয়ে পাঁচটি ছিদ্র
উপরে তিনটি, নিচে দুটো  |
উপরের ছিদ্র ক্ষিতি, অপ, তেজ
নিচে মরুৎ ও ব্যোম |

বাবার ধারণা, পূর্বপুরুষদের আত্মা
এই হারমোনিয়মের ভেতর লীন হয়ে আছে |

তিন
বেলোর গায়ে যে ছিদ্রটি বাবার ভাষায় ক্ষিতি
আমি সেই ছিদ্রটিকে কাম বলি  |
এভাবে অপকে ক্রোধ ও তেজকে লোভ
মরুৎকে মদ ও ব্যোমকে মোহ
যদিও রিপুপ্রবণ আমার মাৎসর্য নেই
তাই, বেলোর শরীরে গোপনে আরেকটি
ছিদ্র রেখে যেতে চাই |

চার
পূর্বপুরুষদের চক্ষুদানপত্র মেনে
তাদের মৃত্যুর পর, এক একটি চোখ দিয়ে তৈরি
হারমোনিয়মের প্রতিটি রিড
শুদ্ধ ও কোমল |
ছোটোবোন রিডে আঙুল ছোঁয়ালে ত্রিসন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে
আমি তো জন্মান্ধ |   গান গাই


যে গান অন্ধের যষ্টি ----

.         ****************  
.                                                                             
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর
*
পরজন্ম
কবি প্রবুদ্ধ সুন্দর কর

অমৃতের মাদকতা রক্তে মিশে আছে
টলমল করে ওঠে সমস্ত শরীর
পথেও বিপথে ঘুরে খানাখন্দে পড়ি
যেন তীব্র ক্ষুধায় আকন্দপাতা খেয়ে
স্বেচ্ছা-অন্ধ হয়েছি দেবতাদের দেশে |

পরজন্ম বলে যদি সত্যি কিছু হয়
সমুদ্রমন্থন শেষে রাহুর কবন্ধ আমি
অমরত্ব নয়, চাই, চাঁদের প্রণয় |

.         ****************  
.                                                                             
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর
*
শাশ্বতী
কবি প্রবুদ্ধ সুন্দর কর

অগ্রহায়ণের আলো সূর্যাস্তজটিল
রাত্রি ও কুয়াশা তাই অতিবৈবাহিক
যে-কুহক আমাকেও করেছে শরিক
রোমশ জড়ুল নয়, সূচ্যগ্র সে তিল

যদি বিনাযুদ্ধে চাই সন্ধিপত্র মেনে
অস্থির পুরুষকার, মূঢ়, তবে বলো
জটিল সূর্যাস্তশেষে অস্ত্রের ধারালো
নীরবতা কীভাবে মিশেছে রক্তে, নুনে

পৌত্তলিক তার দুঃসাহসের ভেতর
অপরিমেয় সমুদ্র হয়ে শুয়ে থেকে
প্রশস্ত বালিতে, ঢেউয়ের ব্রেলে লিখে
রাখি গলনকাহিনি, তেমন কাতর

ছিলেন সুধীন্দ্রনাথ, সেই সূত্রে আমি
নিজেকে জেনেছি দ্বিধাথরথর মমি |

.         ****************  
.                                                                             
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর
*
গতিপথ
কবি প্রবুদ্ধ সুন্দর কর

লামডিং-এ নদী নেই ? আছে | যেন অপ্রস্তুত চোখে অতর্কিত
এ প্রশ্নের দিকে সামান্য তাকিয়েছিলে |
নাম জান ?
সাদা বালি, নুড়ি ও পাথরে বুক ঘষে ঘষে ক্রমশ যে নদী
পাখিদের আত্মহত্যা, অম্বালিকা ফাংলোর প্রণয়, ব্ল্যাক উইডো, নিষিদ্ধ লাউপানি
আর টানেল পেছনে রেখে মাহুর পেরিয়ে তোমার রিডের দিকে বয়ে গেছে
তার শীর্ণতা, বিস্মৃতপ্রায় নজরুলগীতির মতো |
তীব্র হাহাকার বুকে চেপে শুশ্রূষাবহ তোমার
গায়কির কাছে সে এসেছে | তার পায়ে পায়ে আমি
নিরাময়শেষে, খরস্রোত নিয়ে হয়তো সে বাঁক নেবে নাগাপাহাড়ের দিকে
আমার আরোগ্য নেই | আমৃত্যু শুশ্রূষালোভী হয়ে
তোমার ত্রিসন্ধ্যা আর হারমোনিয়মের আশ্রয়ে তবে থেকে যাই ?

.     
               ****************  
.                                                                             
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর
*
জ্যোতিষবচন
কবি প্রবুদ্ধ সুন্দর কর

আপনার শত্রু আর কেউ নয়, আপনি নিজেই
যুক্তি, তর্ক ও মন্তব্য এড়িয়ে চলুন |
ঈর্ষাপরায়ণ বামনেরা মাঝে মাঝে সিটি দেবে
উত্তেজিত হবেন না
মুখ্যমন্ত্রীকে দেখুন, নিন্দা ও প্রশংসা দুটোতেই নির্বিকার |

নির্জনতা ছাড়া কোনও কিছুই সম্ভব নয়
লেখালেখি, চুম্বন, আত্মসমীক্ষা, ধ্যান, এমনকি খুনও
মনে রাখবেন, কোলাহল হলাহল |

যে পা-গুলো এতদিন প্রণামের যোগ্য বলে মনে হয়েছিল
সেগুলো শয়তানের খুর হয়ে আরও স্পষ্ট হবে |
শিবির বিপজ্জনক, নিরাপদ দূরত্বে থাকুন
অত্যুত্সাহ কিংবা বিরোধিতা একদম নয়
বিদ্যুৎ আগুন, জল, শস্ত্র থেকে সাবধান |

বিষম রাশির জাতক আপনি, প্রতিকারহীন
প্রবাল, সিংহলি মুক্তা, পোখরাজ, বার্মিজ গোমেদ
কোনও কিছুই আপনার কাজে আসবে না
বরং ব্রাহ্মণ গ্রহাচার্যকে দারুহরিদ্রা দান করে প্রণাম করুন  |

মনে রাখবেন, প্রণাম এমন এক শক্তি
শয়তান তো বটেই, প্রণামের মুহূর্তে শত্রুও
আপনাকে আশীর্বাদ না করে পারবে না |

.              ****************  
.                                                                             
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর