December 6, 2019 ·

‘যদি ভুলে যাও মোরে জানাবো না অভিমান,
আমি এসেছিনু তোমার সভায় দু’দিন শোনাতে গান...’
‘শতেক বরষ পরে’ স্মরণে বরণে প্রবাদপ্রতিম গীতিকার প্রণব রায়

**************************************
গতকাল ৫ ডিসেম্বর ছিল বাংলা গানের স্বর্ণযুগের প্রখ্যাত কবি ও গীতিকার প্রণব রায়ের ১০৮তম
জন্মবার্ষিকী। বহুমুখী প্রতিভাসম্পন্ন প্রণব রায় (জন্ম: ৫ ডিসেম্বর, ১৯১১– মৃত্যু: ৭ অগাস্ট, ১৯৭৫) আরো
ব্যাপ্ত পরিচয়ে ছিলেন গল্পকার, চিত্রনাট্যকার, প্রযোজক, চিত্রপরিচালক, অভিনেতা এবং স্বদেশি আন্দোলনে
উদ্বুদ্ধ হয়ে কারাবাসী এক প্রতিবাদী কবি। বিশ শতকের তিনের ও চারের দশকে বাংলা বেসিক আধুনিক
গান এবং চিত্রগীতির প্রথম যুগের সবচেয়ে জনপ্রিয় গীতিকারদের মধ্যে প্রবাদপ্রতিম ‘থ্রি মাস্কেটিয়ার্স ছিলেন
– অজয় ভট্টাচার্য, শৈলেন রায় এবং প্রণব রায়। ১৯৩৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘পণ্ডিতমশাই’ ছায়াছবিতে শৈলেন
রায়ের পাশাপাশি এক নবীন গীতরচয়িতার অসামান্য প্রতিভা ও মেধাকে কাজে লাগিয়েছিলেন খ্যাতনামা
সুরকার ও সংগীত পরিচালক কমল দাশগুপ্ত। ২৫ বছর বয়সী সেই তরুণ গীতিকারের নাম প্রণব রায়।
কলকাতার বেহালার বড়িশার সুপ্রাচীন ও সুবিখ্যাত সাবর্ণ রায়চৌধুরী বংশের উত্তরসূরি দেবকুমার
রায়চৌধুরীর ছেলে প্রণব রায়ের খুব অল্প বয়স থেকেই ছিল কাব্যসাহিত্যের প্রতি প্রবল আকর্ষণ ও গভীর
অনুরাগ। গানে আগ্রহের নেপথ্যে পারিবারিক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের প্রভাব ছিল। নিজে পিয়ানো ও
অর্গান বাজাতে পারতেন। ছাত্রাবস্থা থেকেই কবিতা লিখতেন। সমাজ ও রাজনীতি সচেতন এই তরুণ-কবি
যৌবনের প্রাণোদ্দীপনায় উদ্দীপিত হয়ে সেকালের ‘বিশ্ববন্ধু’ পত্রিকায় ‘কমরেড’ নামে একটি কবিতা লেখার
অপরাধে রাজরোষে পড়ে কারাবরণ করেছিলেন। কারাবাস থেকে মুক্তি পেয়ে সাহিত্যচর্চা শুরু করেন
‘রোমাঞ্চ’ শীর্ষক পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে। ছোটোগল্প, কবিতা লিখতেন ‘বসুমতী’, ‘গল্পলহরী’, ‘পুষ্পপাত্র’,
‘শিশির’ ইত্যাদি সাহিত্য পত্রিকায়। বছর খানেক ‘বসুমতী’ পত্রিকাতে বার্তা সম্পাদকের কাজ করেছিলেন।
পরে চাকরি করেছিলেন ‘পাইয়োনিয়ার’ রেকর্ড কোম্পানিতে। ১৯২৯ সাল থেকে বিখ্যাত ‘কল্লোল’ পত্রিকায়
লিখেছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ‘কল্লোল’-এর প্রকাশ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে প্রণব রায়ের উদ্যোগেই নিয়মিত
বসত সাহিত্যের আড্ডা। এই আড্ডায় প্রেমেন্দ্র মিত্র, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত-সহ আরও কবি ও লেখকেরা
আসতেন। প্রত্যেকেই কেমন করে যেন ভুলে যেতেন ‘কল্লোল’ উঠে যাওয়ার যন্ত্রণা। ‘প্রণবের অফিসটি’-ই
যে এই ভুলিয়ে দেবার ক্ষেত্রে এক বিরাট ভূমিকা পালন করেছিল, সে কথা আত্মকথা ‘স্মৃতির ঝাঁপি’তে লিখে
গেছেন পরিমল গোস্বামী। প্রসঙ্গত এও উল্লেখযোগ্য, ‘কল্লোল’ উঠে যাবার আগে প্রেমেন্দ্র মিত্র শেষ দুটি
সংখ্যায় প্রণব রায়কে প্রেরণা দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছিলেন। ১৩৩৬ বঙ্গাব্দের ‘কল্লোল’-এর ৭ম বর্ষের ‘অঘ্রান’
সংখ্যায় বেরিয়েছিল তাঁর গল্প ‘গন্ধ’ আর পৌষ সংখ্যায় কবিতা ‘তোমাকে’। বুদ্ধদেব বসুর প্রতিষ্ঠিত ও
সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত প্রণব রায়ের ‘আলাপ’ কবিতাটি কবিগুরু
রবীন্দ্রনাথের প্রশংসা লাভ করে। তাঁর কবিতা সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথ একবার বলেছিলেন, “প্রণবের কবিতা
আমি যখনই পড়ি, আমার মন তার কবিত্বশক্তিকে স্বীকার ক’রে নেয়।” ১৯৩৪ সালে কাজী নজরুল ইসলাম
এবং কমল দাশগুপ্তের স্নেহসান্নিধ্য লাভের পর থেকে গান রচনা করতে থাকেন। তাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরি
প্রসিদ্ধ গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের জন্মদিনও ডিসেম্বরের ৫ তারিখে। গৌরীপ্রসন্ন তাঁর সম্পর্কে শ্রদ্ধার
সঙ্গে বলেছিলেন, ‘বাংলা ছবিতে সিচুয়েশন অনুযায়ী গান লেখার ক্ষেত্রে প্রণব রায় আমার ভগীরথ।’
সেই সময়ের সুপ্রসিদ্ধ গায়িকা কমলা ঝরিয়ার রেকর্ডের জন্য ‘ও বিদেশী বন্ধু’ গানটি লিখে প্রণব রায়ের
গীতিকার জীবনের সূচনা হয়েছিল। প্রথিতযশা শিল্পী যূথিকা রায়ের সুললিত কণ্ঠে তাঁর সংগীত জীবনের
টার্নিং পয়েন্ট ছিল প্রণব রায়ের লেখায় ও কমল দাশগুপ্তের সুরে বিখ্যাত দু’টি বাংলা আধুনিক গান
‘সাঁঝের তারকা আমি পথ হারায়ে’ এবং ‘আমি ভোরের যূথিকা’। এ গান দুটো যূথিকা রায়ের ‘সিগনেচার
সং’ হিসেবে বিখ্যাত। কমল দাশগুপ্তের সুরে যূথিকা রায় ও পরে ফিরোজা বেগম ও মাধুরী চট্টোপাধ্যায়ের
কণ্ঠে রেকর্ড করা ‘এমনই বরষা ছিল সেদিন’ গানটিও প্রণব রায়ের রচনা। এছাড়াও ১৯৪৮-এ সুরসম্রাট
জগন্ময় মিত্রের গাওয়া অবিস্মরণীয় সেই বাংলা ব্যালাড বা সংগীত-গাথা ‘চিঠি’ (তুমি আজ কত দূরে,
সুরকার: কমল দাশগুপ্ত ) এবং জগন্ময়ের কণ্ঠে ১৯৪২-এ প্রকাশিত সুবল দাশগুপ্তের সুরে আরো দুটি
মর্মস্পর্শী অসাধারণ কাহিনিগীতি ‘সাতটি বছর আগে’ এবং ‘সাতটি বছর পরে’ও প্রণব রায়েরই রচনা।
কমল দাশগুপ্তের সুরে জগন্ময় মিত্রের কণ্ঠে ‘তুমি কি এখন দেখিছ স্বপন’ (১৯৪৪), ‘কেন আগের মতো কাছে
এসে’ (১৯৪৫), ‘তুমি তো জানো না’ (১৯৫০) ইত্যাদি জনপ্রিয় গানের গীতিকার ছিলেন প্রণব রায়। ১৯৪৯
সালে আরেক কিংবদন্তি শিল্পী মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের জীবনের প্রথম রেকর্ডের গান – ‘ফিরিয়া ডেকো না
মহুয়া বনের পাখি’র রচয়িতাও ছিলেন তিনি। এই গানটি অবশ্য ১৯৩৬ সালে প্রথম রেকর্ড করেছিলেন
হরিমতী দেবী। সুর দেন কমল দাশগুপ্ত। বাংলা বেসিক আধুনিক গানের এমন অজস্র মাইলফলকের স্রষ্টা
ছিলেন প্রণব রায়। সুধীরলাল চক্রবর্তীর সুরে ও কণ্ঠে প্রণব রায়ের রচিত ‘মধুর আমার মায়ের হাসি চাঁদের
মুখে ঝরে’ গানটি আপামর বাঙালি শ্রোতাদের কাছে আজও জনপ্রিয়।

‘এখনই উঠিবে চাঁদ’, ‘মন যবে করে মানা’, ‘কতদিন দেখিনি তোমায়’, ‘সেই মধুরাতে আধখানি ছিল জাগিয়া’,
‘প্রণয়ের গান গাহিতে বোলো না’, ‘সখী, সেদিন শ্রাবণে’, ‘তুমি যে গিয়াছো বকুল বিছানো পথে’, ‘আমি
সাগরের বেলা’, ‘নাই বা ঘুমালে প্রিয়’, ‘যবে এসেছিলে তুমি প্রিয়’, ‘জানি বাহিরে আমার তুমি অন্তরে নও’,
‘দূর থেকে তুমি ধরা দিলে’, ‘শতেক বরষ পরে’, ‘ঘুমের ছায়া চাঁদের চোখে’, ‘তোমার আকাশে এসেছিনু হায়
আমি কলঙ্কী চাঁদ’, ‘মনের দুয়ার খুলে’, ‘মধুরাতে বলো প্রিয়’, ‘ও তোর জীবন বীণা আপনি বাজে’, ‘যেথা গান
থেমে যায় দীপ নেভে হায়’, ‘আমার প্রভাত মধুর হল’, ‘মোর জীবনের দুটি রাতি’, ‘ছিল যে আঁখির রাগে’,
‘ফিরাবে কি শূন্য হাতে’, ‘ভালোবসেছিনু ভুলো না’, মাটির এ খেলাঘরে কেউ হাসে কেউ কাঁদে’, ‘আমার
সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বলবে’, ‘তোমারে চাহিয়া এ জীবনে’, ‘তার সাথে মোর স্বপ্নে দেখা’, ‘জানি জানি একদিন’, ‘তুমি
যে এসেছো ফিরে’, ‘যেন গোলাপ হয়ে ফুটল’, ‘যদি ভুল ভেঙে যায়’, ‘আমার মনের পাখি মধুঋতুর সাড়া
পেল’, ‘হৃদয় আমার সুন্দর’, নিদহারা আজ রাতে গায় পাপিয়া’, ‘চলে যাওয়া নহে ভুলে যাওয়া’, ‘মানিনী গো
গরবিনী, আছে কি তা জানা’, ‘দিয়ে যাবো ফাগুন রাতে’, ‘শ্রাবণ রজনী বহিয়া যায়’, ‘দূরে যদি চলে যাই’,
‘জীবনে যারে তুমি দাওনি’, ‘যদি ভুলে যাও মোরে জানাবো না অভিমান’, ‘আমার সোনা চাঁদের কণা’ –
এমন অসংখ্য কালজয়ী গান রচনায় তিনি তাঁর উজ্জ্বল প্রতিভার সাক্ষর রেখে গেছেন। উল্লিখিত শিল্পী
কমলা ঝরিয়া, যূথিকা রায়, জগন্ময়, সুধীরলাল, মানবেন্দ্র প্রমুখ ছাড়াও কুন্দনলাল সায়গল, কমল দাশগুপ্ত,
কানন দেবী, রাধারাণী দেবী, রবীন মজুমদার, সত্য চৌধুরী, সন্তোষ সেনগুপ্ত, গৌরীকেদার ভট্টাচার্য, ধনঞ্জয়
ভট্টাচার্য, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, বেচু দত্ত, রামকুমার চট্টোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, মান্না দে, মহম্মদ রফি,
ফিরোজা বেগম, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, সুপ্রীতি ঘোষ, গৌরী দত্ত, কল্যাণী দাশ, উৎপলা সেন, গায়ত্রী বসু, শিপ্রা
বসু, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, আলপনা বন্দ্যোপাধ্যায়, নির্মলা মিশ্র, আরতি মুখোপাধ্যায় প্রমুখ অনেক
খ্যাতনামা কণ্ঠশিল্পীরা তাঁর রচিত গান গেয়েছেন।

বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য তাঁর প্রথম গান রচনা ১৯৩৬ সালের ‘পণ্ডিতমশাই’ ছবিতে কমল দাশগুপ্তের সুরে।
সেই গানটি ছবিতে বৈরাগীর ভূমিকায় অভিনয়ের সঙ্গে নিজেই গিয়েছিলেন স্বনামধন্য গায়ক-অভিনেতা
ভবানী দাস। এরপর কৃষ্ণচন্দ্র দে’র সংগীত পরিচালনায় ‘পরপারে’ ছায়াছবিতে এবং সুরসাগর হিমাংশু
দত্তের সুরে ‘রুক্মিণী’ ছবির জন্যে গান লেখেন। চিত্রগীতিকার হিসেবে তাঁর যথার্থ স্বীকৃতি ও সম্মান এবং
ধারাবাহিক সাফল্যের সূত্রপাত হয়েছিল ১৯৪১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘নন্দিনী’ ছবিটির গান রচনা করে। সেই
ছবিটিরও সংগীত পরিচালক ছিলেন হিমাংশু দত্ত। এরপর প্রণব রায়ের গীতরচনায় রাইচাঁদ বড়ালের
সংগীত নির্দেশনায় ‘পরিচয়’, ‘প্রতিশ্রুতি’ এবং দুর্গা সেনের সংগীত পরিচালনায় ‘ব্রাহ্মণ-কন্যা’ ও
‘রাসপূর্ণিমা’ ছবির গানগুলি শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছিল। ১৯৪২-এ কমল দাশগুপ্তের সুরে ‘গরমিল’ ছবিতে
গায়ক-নায়ক রবীন মজুমদারের কণ্ঠে ‘এই কি গো শেষ দান’ এবং ওই একই বছর ‘শেষ উত্তর’ ছবিতে
কানন দেবীর কণ্ঠে ‘আমি বনফুল গো’ প্রণব রায়কে সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দিয়েছিল। রাইচাঁদ বড়ালের
সুরে ‘নারী’ ছায়াছবিটির গীতরচনায় শৈলেন রায় ও প্রণব রায় জুটিকে দেখা যায়। আর তারপর থেকেই
অপ্রতিদ্বন্দ্বী গীতিকার হিসেবে প্রণব রায়ের শুধুই সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে ক্রমোত্তরণ। ‘আলেয়া’ ছবির ‘মাটির
এ খেলাঘরে’, ‘কাশীনাথ’ ছবিতে ‘তুমি ডেকেছো মোরে’, ‘দম্পতি’ ছায়াছবিতে ‘চাঁদের আলোর দেশে’
গানগুলি ছাড়াও ‘নীলপরী স্বপ্নে’, ‘দিকশূল’, ‘দেবর’, ‘পোষ্যপুত্র’, ‘বিচার’ ‘সহধর্মিনী’, ‘নন্দিতা’, ‘কলঙ্কিনী’,
‘বন্দিতা’, ‘এই তো জীবন’, ‘বিরাজ বৌ’, ‘মৌচাকে ঢিল’, ‘পথের দাবী’, ‘রাত্রি’, ‘শৃঙ্খলা’ ইত্যাদি একের পর
এক ছবির জন্যে গান লিখে প্রণব রায় সেকালের এক নম্বর গীতিকারের আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। দুই
দশকেরও বেশি সময় ধরে সে-যুগের খ্যাতকীর্তি সব সুরস্রষ্টা ও সংগীত পরিচালক রাইচাঁদ বড়াল, কৃষ্ণচন্দ্র
দে, পঙ্কজ কুমার মল্লিক, কমল দাশগুপ্ত, সুবল দাশগুপ্ত, দুর্গা সেন, কালীপদ সেন, গোপেন মল্লিক,
তিমিরবরণ থেকে শুরু করে শচীন দেববর্মন, শৈলেশ দত্তগুপ্ত, অনুপম ঘটক, রবীন চট্টোপাধ্যায়, নচিকেতা
ঘোষ, নিতাই ঘটক, পবিত্র চট্টোপাধ্যায়, বিনোদ চট্টোপাধ্যায়, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য প্রমুখ আরো অনেক
সুরকারদের জন্য গান রচনা করেছিলেন তিনি। কথায়-সুরে রবীন চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে প্রণব রায়ের
মণিকাঞ্চন যোগের শুভ সূচনা হয় ১৯৪৬ সালে ‘সাত নম্বর বাড়ি’ ছবিটিতে। এই ছবিটির কাহিনি ও
সংলাপও লিখে দিয়েছিলেন প্রণব রায়। ‘মন্দির’ ছায়াছবিটির কাহিনি, চিত্রনাট্য এবং গীতরচনাও তিনি
করেছিলেন। ‘সাত নম্বর বাড়ি’ ছবিতে একটি জনপ্রিয় গান ছিল ‘ফেলে আসা দিনগুলি মোর’। যে তরুণ
গায়ক সেই গানটি গেয়েছিলেন, তিনি হলেন পরবর্তীকালের বাংলা সংগীত জগতের উজ্জ্বলতম তারকা
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। ১৯৪৯ সালে ‘অনুরাধা’ ছায়াছবিতে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ও কল্যাণী দাশের দ্বৈত
কণ্ঠে ‘ও কলঙ্কী চাঁদ’ গানটির সুরকার ছিলেন কমল দাশগুপ্ত এবং গীতিকার প্রণব রায়।

অনেকের কাছেই অজানা যে, সুপ্রিয়া দেবীর অভিনয়ের সূচনা হয়েছিল যে ছবি দিয়ে, সেই ‘নাগপাশ’ ছবির
কাহিনি, সংলাপ এবং গানের রচয়িতা ছিলেন প্রণব রায়। যদিও কোনো অনিবার্য কারণে মুক্তির আলো
দেখেনি সেই ছবিটি। আবার ‘দেয়া-নেয়া’ বা ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’-খ্যাত চিত্রপরিচালক সুনীল বন্দ্যোপাধ্যায়ের
চলচ্চিত্র জীবন শুরুই হত না, যদি না গভীর সখ্যতায় প্রণব রায় পাশে থাকতেন। ১৯৪২ সাল থেকে
নির্দেশক নীরেন লাহিড়ী আর প্রণব রায়ের যৌথ যাত্রা শুরু ‘গরমিল’ ছবি দিয়ে। তারপর ‘দম্পতি’,
‘সহধর্মিনী’ থেকে শুরু করে ‘দেবীমালিনী’ ‘তানসেন’ পর্যন্ত নীরেন লাহিড়ীর বহু ছবির গীতিকার বা
কাহিনিকার থেকেছেন তিনি। ১৯৪২ সাল থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত এই সুদীর্ঘ সময়কালের কোনো একদিন
ইউনিটে কর্মরত অবস্থায়, একটি ছেলে এসে কাজ চাইলেন নীরেনবাবুর কাছে। উনি দুরের দিকে দেখিয়ে
বললেন, “ওই ঘরে গিয়ে দেখ,  পাজামা  পাঞ্জাবি পরা একটি ঢ্যাঙা-মতন লোক ব’সে লিখছেন।ওঁকে গিয়ে
বল। যদি দরকার হয়, উনিই বুঝবেন।” ছেলেটি সেই ঘরেই গেল। খানিক বাদে প্রবল উৎসাহে বেরিয়ে
এলেন প্রণব রায়। “বেণুবাবু, (ইন্ডাস্ট্রিতে এ নামেই পরিচিত ছিলেন নীরেন লাহিড়ী) এ ছেলেকে নিতেই হবে
আমাদের।ছেলেটি ইংরেজিতে সদ্য এম এ পাশ করেছে। ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে এ সব শিক্ষিত ছেলেদেরই তো
আসা একান্ত প্রয়োজন।” সেই থেকেই সুনীল বন্দ্যোপাধ্যায় হয়ে গেলেন নীরেন লাহিড়ীর সহকারী এবং
মিউজিক্যাল ছবি তৈরির ক্ষেত্রে ‘যদুভট্ট’বা ‘তানসেন’-এর নির্দেশকের সার্থক উত্তরসূরির স্বাক্ষর রেখেছিলেন
তাঁর নিজের তৈরি জনপ্রিয় ছবিগুলোতে। কুন্দনলাল সায়গলকে দিয়ে প্রথম বাংলা আধুনিক গান
গাইয়েছিলেন তিনি। বাংলা সিনেমার প্রথম পরিচালক গোষ্ঠী ‘অগ্রগামী’র শুরুতেই যে বিপুল সাফল্য ১৯৫৮
সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘শিল্পী’ ছবিতে, তার চিত্রনাট্যও লিখে দিয়েছিলেন প্রণব রায়। কিন্তু ‘অগ্রগামী’র অন্যতম
পরিচালক সরোজ দে’র অনুরোধে প্রণব রায় সরিয়ে নিয়েছিলেন নিজের নাম। ‘চিত্রনাট্যকার’ হিসেবে
টাইটেল কার্ডে যায় ‘অগ্রগামী’র নামই।  ঠিক  এই  একই  ঘটনা ঘটেছিল ১৯৬৯ সালে ‘পরিণীতা’ ছবির
ক্ষেত্রেও। পার্থপ্রতিম রায়চৌধুরী-র লেখা ছবিটির গোটা চিত্রনাট্যটাই প্রণব রায়কে দিয়ে আবার নতুন করে
লিখিয়ে নিয়েছিলেন পরিচালক অজয় কর। কিন্তু নতুন ছেলের ভবিষ্যৎ নির্মাণের কথা মাথায় রেখে টাইটেল
কার্ডে প্রণব রায় পার্থপ্রতিমের নামটিই রেখেছিলেন ‘পরিণীতা’ ছবির চিত্রনাট্যকার হিসেবে। শুধু তাঁর নাম
রয়েছিল ছবিটির ‘গীতিকার’ হিসেবে। তিনি কয়েকটি ছবিতে অভিনয়ও করেছিলেন। যেমন, ‘পরিণীতা’,
‘থানা থেকে আসছি’, ‘কাঁচ কাটা হীরে’, ‘হারানো সুর’ ইত্যাদি।

১৯৬২ সালে তাঁর লেখা কাহিনি নিয়ে নির্মিত দেব আনন্দ ও ওয়াহিদা রেহমান অভিনীত হিন্দি ছবি ‘বাত
এক রাত কি’- র মুক্তির পরে দেব আনন্দ কলকাতায় এসে প্রণব রায়ের চেতলার বাসভবনে তাঁর সঙ্গে
দেখা করেন। দীর্ঘসময় ধরে গল্পের মাঝে কথা বলেছিলেন তাঁর পরবর্তী ছবি নিয়ে। বোম্বেতে তাঁকে
যাওয়ার আন্তরিক আমন্ত্রণ জানিয়ে বলেছিলেন যে, পরের ছবিতে তাঁর সঙ্গে কাজ করতে তিনি আগ্রহী।
কিন্তু প্রণব রায় নারাজ। বম্বের শিল্পীদের দিয়ে তাঁর লেখা বাংলা গান রেকর্ড করানো হবে শুনলে যেমন
তিনি তীব্র অনীহা প্রকাশ করে স্পষ্টই বলে দিতেন, “কেন বাবা, আমাদের এখানে কি শিল্পী কেউ নেই?”,
ঠিক তেমনই নিজেরও বোম্বে গিয়ে কাজের ব্যাপারে ছিল প্রবল নিরাসক্তি। আসলে, বাংলা সংগীত ও
চলচ্চিত্রের জন্যেই তিনি নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন। নিবিড় মমতায় বাংলার শিল্প ও সাংস্কৃতিক জগতের সঙ্গেই
জড়িয়ে থাকতে চেয়েছেন আজীবন।

১৯৪৯ সালে ‘রাঙামাটি’ নামে একটি ছবি পরিচালনা করেছিলেন প্রণব রায়। এই সিনেমায় স্বনামধন্য গায়ক
সত্য চৌধুরীকে নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করিয়েছিলেন। গানের সুর দিয়েছিলেন কমল দাশগুপ্ত। কিন্তু
ছবিটি বাণিজ্যিক সাফল্য লাভ করেনি। কারণ, ততদিনে বাংলা ছায়াছবিতে গায়ক-নায়কদের যুগের
অবসান ঘটে গেছে। নবাগত প্রতিভাবান অভিনেতারা নায়কের ভূমিকায় রুপোলি পর্দার জগৎ ভালো
করছেন। আর পাঁচের দশক থেকে শুরু হয়ে গেল মহানায়ক উত্তমকুমারের যুগ। রবীন চট্টোপাধ্যায় এবং
প্রণব রায়ের অমর যুগলবন্দির দিকচিহ্ন হয়ে রয়েছে উত্তমকুমার ও সুচিত্রা সেন অভিনীত সুপারহিট
ছায়াছবি ‘সাগরিকা’র গানগুলি। সেই ছবিতে প্রণব রায়ের লেখা ‘হৃদয় আমার সুন্দর’ কিংবা ‘আমার স্বপ্নে
দেখা রাজকন্যা থাকে’ ইত্যাদি গান আজও সংগীতপ্রেমী বাঙালি শ্রোতাদের পছন্দের গানের তালিকায় প্রথম
সারিতে থাকে। উত্তম ও মালা সিনহা অভিনীত ‘পৃথিবী আমারে চায়’ ছবিতে গীতা দত্তের কণ্ঠে ‘নিশি রাত
বাঁকা চাঁদ আকাশে’, অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের নির্দেশনায় স্বরূপ দত্ত-তনুজা অভিনীত ‘পিতাপুত্র’ ছবিতে
সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে ‘তীর বেঁধা পাখি আর গাইবে না গান’ ও ‘তুমি কত সুন্দর কে আমারে বলে
যায়’, শুভেন্দু-অপর্ণা অভিনীত ‘নায়িকার ভূমিকায়’ ছবিতে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া ‘নতুন সূর্য আলো
দাও’, ‘এই ফাগুনে ডাক দিলে কে’, ‘ও নিরুপম’, অনুপ ঘোষালের কণ্ঠে ‘এক যে আছে কন্যা’, উত্তম-অনীতা
গুহ অভিনীত ‘হারজিৎ’ ছবিতে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া ‘মধুমালতী ডাকে আয়’, উত্তম-সুচিত্রার
‘কমললতা’ ছবিতে শ্যামল ও সন্ধ্যার দ্বৈত কণ্ঠে ‘ও মন কখন শুরু কখন যে শেষ কে জানে’, কিংবা সন্ধ্যা
রায় ও নির্মল কুমার অভিনীত ‘দ্বীপের নাম টিয়ারং’ ছবিতে শ্যামল মিত্রের কণ্ঠে ‘পীরিতি বসত করে যেথা,
সেথা গিয়া ভিড়াই সাম্পান’ থেকে শুরু করে ‘ফরিয়াদ’ ছায়াছবিতে আরতি মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে ‘আজ
দুজনে মন্দ হলে মন্দ কি’ ইত্যাদি অগণিত মণিমুক্তোর মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অনবদ্য গানগুলিতে
গীতিকার প্রণব রায়ের মহান কীর্তি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অম্লান হয়ে রয়েছে। এছাড়াও ‘ঢুলি’, ‘সাহেব
বিবি গোলাম’, ‘পরিণীতা’, ‘অভয়ের বিয়ে’, ‘আরোগ্য নিকেতন’, ‘ভোলা ময়রা’, ‘বৈকুণ্ঠের উইল’  
‘গড়নসিমপুর’, ‘কলঙ্কিত নায়ক’ ইত্যাদি ছবিগুলি তাঁর রচিত গানে সমৃদ্ধ। অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের
নির্দেশনায় এবং নচিকেতা ঘোষের সুরে 'ধন্যি মেয়ে' ছায়াছবিতে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, আরতি মুখোপাধ্যায়
ও মান্না দে'র কন্ঠে গানগুলিও গীতিকার প্রণব রায়ের অন্যতম অমর সৃষ্টি।

প্রায় আড়াই হাজারেরও বেশি (মতান্তরে সাড়ে তিন হাজার) সংখ্যক গানের রচয়িতা ছিলেন তিনি।
আক্ষেপের বিষয় হল, তাঁর রচিত গানের পূর্ণাঙ্গ ডিস্কোগ্রাফি এবং সব গানের লিরিক্সের সংকলন এখনও
অলব্ধ রয়েছে।

✅ শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক ওয়েব-আর্কাইভ ‘মিলনসাগর’-এ প্রণব রায়ের রচিত নির্বাচিত ৪৮টি
জনপ্রিয় গানের কথার সংকলন পড়তে নীচের লিঙ্কে ক্লিক করুন।
http://www.milansagar.com/kobi/pranab_roy/kobi-pranabroy.html    

বাংলা আধুনিক গান ও ছায়াছবির গানের জগতে এত বেশি সংখ্যক গান আর কোনো গীতিকার লিখে
যেতে পারেননি। এক সময় ‘রোমাঞ্চ’ পত্রিকার নিয়মিত লেখক প্রণব রায়ের রচিত অজস্র গানের অমূল্য
সম্ভারে কালোত্তীর্ণ গানগুলি আজও শুনলে রোমাঞ্চিত হতে হয়। এমন বিস্ময়কর প্রতিভার অদ্বিতীয়
গীতিকারের অমর স্মৃতির উদ্দেশে অন্তরের বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাই। ������������

রচনা:~ রাজেশ দত্ত, ৫ ডিসেম্বর, ২০১৯। (সাহায্যসূত্র: অতনু চক্রবর্তী রচিত গ্রন্থ ‘প্লে-ব্যাক: সিনেমার গানের
রূপকথা’ দোলন ঘোষের লেখা নিবন্ধ ‘প্রণব রায়: শতবর্ষপারেও সমকালীন এক সৃজনপ্রতিভা’ এবং
ইন্টারনেট-সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যাদি)

✅ নীচের লিংকে ক্লিক করে পড়ুন বরেণ্য কবি ও গীতিকার প্রণব রায়ের জীবন ও সংগীত সৃজন নিয়ে
প্রদীপ দে’র লেখা একটি তথ্যঋদ্ধ ও সুখপাঠ্য নিবন্ধ।
https://www.bangla-kobita.com/…/bismrito-bangla-ganer-jadu…/
মিলনসাগরে কবি প্রণব রায়ের পরিচিতির পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন . . .


মিলনসাগরে কবি প্রণব রায়ের পরিচিতির পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন . . .