কবি প্রেমেন্দ্র মিত্রের কবিতা ও গান
*
ঝড় যেমন ক’রে জানে অরণ্যকে
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
ব্রততী বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত “শুধু আবৃত্তির জন্য” কবিতা সংকলন (২০০৬ ) থেকে
নেওয়া |


ঝড় যেমন ক’রে জানে অরণ্যকে
.                তেমনি ক’রে তোমায় আমি জানি |
দুরন্ত নদীর ধারা যেমন ক’রে দেখে
.                আকাশের তারা
----সেই আমার দেখা |
স্থির আমি হই না,
আমার জন্যে নয় প্রশান্তির পরিচয় |

কেমন ক’রে আমি বোঝাই আমার ব্যাকুলতা !
.    বাতি দিয়ে কি হয় বিদ্যুতের ব্যাখ্যা ?
.              সাগরের অর্থ মেলে সরোবরে ?
একটা মানে আছে পালিত পশুর চোখে,
আর একটা মানে বন্য শ্বাপদের বুকে,
.     বৃথাই এ দুই-এর মিল খোঁজা |
আমি থাকি আমার উদ্দামতায় ;
.        চেয়ো না আমায় বশ করতে,
.                                সহজ করতে |

কে জানে হয়তো আমার জানাই
.               সত্যকারের জানা |
দুলে না উঠলে আকাশের বুঝি
.                মানে হয় না,
পৃথিবীকে নাড়া দিয়ে সত্য করতে হয় |

তুমি আমার আকাশ---
আমার দুরন্ত স্রোতে কম্পমান
.                তোমার পরিচয় |
.                তুমি আমার অরণ্য---
.                আমার ঝঞ্ঝাবেগের
.                        প্রশ্রয় ও প্রতিবিম্ব |

.                ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
নীলকন্ঠ
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
ব্রততী বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত “শুধু আবৃত্তির জন্য” কবিতা সংকলন (২০০৬) থেকে
নেওয়া |


হাওয়াই দ্বীপে যাইনি, দক্ষিণ সমুদ্রের কোনো দ্বীপপুঞ্জে |
তবু চিনি ঘাসের ঘাগরা-পরা ছায়াবরণ তার সুন্দরীদের ;
.         ----বিদেশী টহলদারের ক্যামেরা-কলুষিত চোখে নয় |
দেখেছি তাদের ঘাসের ঘাগরায় নাচের ঢেউ-এর হিল্লোল,
নোনা হাওয়ার দমকে দমকে যেমন নারকেল বনের দোলা |
.        মোহিনী পলিনেসিয়া !
.        মহাসাগরে ছড়ানো
ভেঙে-যাওয়া ভুলে-যাওয়া কোনো সুদূর সভ্যতার নাকি ভগ্নাংশ !
.        আমি জানি,
.        সমুদ্রের ঔরসে
.        প্রবাল-দ্বীপের গর্ভে তার জন্ম |
সূর্যের ঔরসে
মহারণ্যের গর্ভে যার জন্ম,
আঁধারবরণ সেই আফ্রিকাকেও জানি,
---শৌখিন শিকারী আর পণ্ডিত-পর্যটকের চোখে নয় |
অরণ্য-চোয়ানো ঝাপসা আলোয়,
কি, দিগন্ত-ছোঁয়া ফেল্ট-এর চোখ ঝলসানো উজ্জ্বলতায়
উদ্দাম আঁধারবরণ আফ্রিকা !
কন্ঠে তার দুরন্ত আরণ্য উল্লাস
.               ---- হে-ইডি, হাইডি, হা-ই !

.                হে-ইডি, হাইডি, হা-ই !
কালো চামড়ার ছোঁয়াচ বাঁচাতে
কালো মনের ছোঁয়াচে রোগে জর্জর
.             বিলাসী ক্লীবের প্রলাপ-প্রতিধ্বনি নয় |
.             রাত্রি-নিবিড়, অরণ্য-গহন আফ্রিকার
.                   রোমাঞ্চিত উত্তাল উচ্চারণ
.                   ------ হে-ইডি, হাইডি, হা-ই !

.                হে-ইডি,  হাইডি,  হাই !
অরণ্য ডাকে ওই---যাই!
সিংহের দাঁতে ধার, সিংহের নখে ধার,
.                  চোখে তার মৃত্যুর রোশনাই !
.                  ---- হে-ইডি, হাইডি, হাই |
বন-পথে বিভীষিকা, বিঘ্ন,
আমাদেরও বল্লম তীক্ষ্ম!
কাপুরুষ সিংহ তো মারতেই জানে শুধু
.                  আমরা যে মরতেও চাই !
..                  হে-ইডি, হাইডি, হা-ই !

মেয়েদের চোখ আজ চকচকে ধারালো ;
নেচে-নেচে ঢেউ তোলা, নাচের নেশায় দোলা
.            মিশ্ কালো অঙ্গে কী চেক্ নাই !
মৃত্যুর মৌতাতে বুঁদ হয়ে গেছি সব,
.             রমণী ও মরণেতে ভেদ নাই !
.             হে-ইডি, হাইডি, হা-ই !---
.             হে-ইডি, হাইডি, হা-ই !
আমাদের গলায় কই সেই উদ্দাম উল্লাস,
.               ঘাসের ঘাগরায় দুরন্ত সমুদ্র-দোলা ?
.               কেমন ক’রে থাকবে ?
.               আমাদের জীবনে নেই জলন্ত মৃত্যু,
.                     সমুদ্র-নীল মৃত্যু পলিনেসিয়ার !
.                     আফ্রিকার সিংহ-হিংস্র মৃত্যু !
আছে শুধু স্তিমিত হয়ে নিভে যাওয়া
.             ---- ফ্যাকাশে রুগ্ন তাই সভ্যতা |

সভ্যতাকে সুস্থ করো, করো সার্থক |
.                আনো তীব্র, তপ্ত, ঝাঁঝালো মৃত্যুর স্বাদ,
.                সূর্য আর সমুদ্রের ঔরসে
.                        যাদের জন্ম,
.                মৃত্যু-মাতাল তাদের রক্তের বিনিময় |

ভরাট-করা সমুদ্র আর উচ্ছেদ-করা অরণ্যের জগতে
.            কী লাভ গ’ড়ে কৃমি-কীটের সভ্যতা,
.             লালন ক’রে স্তিমিত দীর্ঘ পরমায়ু
.                   কচ্ছপের মতো ?
.             অ্যামিবারও তো মৃত্যু নেই |
মৃত্যু জীবনের শেষ সার আবিষ্কার
.               আর
.               শিব নীলকন্ঠ !

.                ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
নৌকো
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
ব্রততী বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত “শুধু আবৃত্তির জন্য” কবিতা সংকলন (২০০৬) থেকে
নেওয়া |


মনে পড়ে
নুলিয়াদের সেই নৌকো,
ঢেউএর নাগাল ছাড়িয়ে
শুকনো বালির ওপর কাঠের ঠেকো দিয়ে আটকে রাখা
মনে পড়ে
তারই ওপর গিয়ে বসেছিলাম
সেদিন প্রথম রাতে !
কৃষ্ণ পক্ষের দ্বিতীয়া কি তৃতীয়া,
চাঁদ উঠতে আর দেরি নেই |
সমুদ্রে যেন তারই অস্থির উত্তেজনা,
হু হু-করে-বওয়া হাওয়ায়
তারই উদ্দাম উদ্বেগ |
শুধু বসেছিলাম পাশাপাশি,
হাত তো ধরিনি, বলিনিও কিছু |
কিই বা বলবো সমুদ্রের চেয়ে ভালো করে !
উদ্দাম হাওয়াতেই ছিলো আমার আলিঙ্গন |
ছুঁইনি তাই |
মনে কি পড়ে,
হঠাৎ নৌকোটা উঠেছিলো দুলে,
বুঝি হাওয়ায় বালি সরে গিয়ে
কাঠের ঠেকো একটু নড়ে উঠে,
কিংবা বুঝি সমুদ্রেরই ডাকে |
একটু শিউরে উঠেছিলে
হেসে উঠেছিলে তারপর
‘যদি-- ?’
একই প্রশ্ন বুঝি উঠেছিলো
দু’জনের চোখে ঝিলিক দিয়ে |
যদি নৌকো যায় ভেসে
চাঁদ ওঠার ওই থমথমে প্রহরে
তরল রাত্রির মতো নীলাগলানো এই সমুদ্রে !
যদি নৌকো ভেসে যায় হঠাৎ
সম্ভবের এই কঠিন শাসন
কাঠের ঠেকোর মতো ঠেলে ফেলে !
তা কি কখনো যায় !
জানি, জানি  এ যে নুলিয়াদের জেলেডিঙি
শুধু মাছ ধরতেই জানে |
সে নৌকো থেকে নেমে এসেছি,
ফিরে এসেছি সেদিনকার সেই সমুদ্রতীরে থেকে
বাঁধানো রাস্তার এই শহরে,
দেওয়াল-দেওয়া এই ঘরে |
তবু জেনো সে নৌকো কেমন করে এসেছে সঙ্গে,
জেনো, সে নৌকো চিরদিন থাকবে তৈরি
সম্ভবের তীরপ্রান্তে
আশায় উদ্বেগে কম্পমান |

.                ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
চীনা তর্জমা
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
সাগরময় ঘোষ সম্পাদিত “দেশ” সুবর্ণজয়ন্তী কবিতা সংকলন ( ১৯৮৫ ) থেকে নেওয়া |


হে পৃথিবী, কোথায় যাব? ক্লান্ত
আকাশে চাই, সেখানে উদ্ ভ্রান্ত |
আমার মন গহন বন ফুরায় না |

অতল থেকে নাম-না-জানা তৃষ্ণা,
মিটাতে যা পান করেছি বিষ না |
তবুও শাপ বুকের তাপ জুড়ায় না |

হয়ত হিয়া নিজের বাণে বিদ্ধ
বৃথাই খোঁজে শিকারী সন্দিগ্ধ |
মানে না ভুল ওষধি মূল কুড়ায় না |

মেঘের রাত মরুর দিন তপ্ত
আঁধার আলো জেনেছি ভাবি সব ত |
ঝিমানো প্রাণ কারো নিশান উড়ায় না |

.                ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
তোমাকে চিঠি
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
সাগরময় ঘোষ সম্পাদিত “দেশ” সুবর্ণজয়ন্তী কবিতা সংকলন ( ১৯৮৫ ) থেকে নেওয়া


শুনেছি, পেয়েছ নাকি নিভৃতির দুর্গ সুদুর্গম
শান্ত এক নির্জনতা
---ফিসফিস বন-ঝাউ কাঁপা
পড়-পড় পাহাড়ের কোল-আঁকড়ানো
আঁকাবাঁকা চড়াই-এর পথে
হঠাৎ শূন্যতা মেলে-ধরা |

দিন সেথা দিগন্ত-উদাসী
রাত সব নক্ষত্র-বিলাস |

ডাকো যদি,
যেতে পারি পার হয়ে দুর্লঙ্ঘ্য পরিখা,
শেষ-চূড়া-সোপানে আসীন
নিতে পারি একবার
তোমার তৃপ্তির স্বাদ |
ভয় হয় শুধু
তোমার আমার প্রিয়-তারা
যদি ভিন্ন হয়,
দুজনায় অন্য নামে ডাকে !

তুমি আমি দুজনেই
চোরাবালি-মগ্ন স্বপ্ন জেনেছি অনেক
বানচাল সঙ্কল্পের
একই ঘাটে হল ভরাডুবি |
তবু ছুটি নিতে পারি কই ?
ফিরে ফিরে খেয়া বাই হাটে |

এত ভিড় কিলবিল ক্ষুধা ভয় অন্ধতা তাড়িত
এত গোল, দিশাহারা ধূলিধূম্র আকাশ বধির
জর্জর হৃদয় তবু কী বিশ্বাসে সব কিছু সয় ?
হিজিবিজি এ-প্রলাপ---- এরও হবে প্রাঞ্জল অন্বয় |

.                ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
এক আকাশ অন্ধকার
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
সাগরময় ঘোষ সম্পাদিত “দেশ” সুবর্ণজয়ন্তী কবিতা সংকলন ( ১৯৮৫ ) থেকে নেওয়া


একটি মানুষের মধ্যে আমি
এক আকাশ অন্ধকার দেখেছিলাম |

কতজনের সঙ্গেই ত মিশি,
ভালবাসি, ঘৃণা করি, থাকি উদাসীন |
তারা সব টুকরো টুকরো আলো
উজ্জ্বল কি স্তিমিত |

তাদের চেনা যায়, পড়া যায়
মানেও পাওয়া যায় ছাড়াছাড়া |
তাদের সঙ্গে পরিচয় দিয়েই
জীবনের প্রাঞ্জল পুঁথি প্রতিদিন লেখা |
কিন্তু মন নিজের অগোচরে
খোঁজে সেই অনাদি আশ্চর্য অন্ধকার
সব অভিধান যেখানে অচল, সব নামতা নিরর্থক |

সেই এক আকাশ অন্ধকার
আমি পেয়েছিলাম একবার
পথে যেতে কোন এক স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে
দুপুর রোদে গাড়ির জন্যে দাঁড়িয়ে
দুটি অতল চোখের মধ্যে |

সে পুরুষ কি নারী
কেউ যেন জানতে না চায়,
জানতে না চায় কী তার বয়স |
সে সময়ের অতীত, যৌনতার ঊর্দ্ধে |
তার অন্ধকার ত না-এর শূন্যতা নয়,
নীহারিকা-গর্ভ এক রহস্য-নিবিড়তা |

সত্তার গহনে এই অন্ধকার যদি লুপ্ত হয়,
আমাদের সাজানো শহর
আর সফল জীবন ত শুধু
পরিসংখ্যানের অঙ্ক |

এত খণ্ড খণ্ড আলোর জটলায়,
এত মাপজোকের দুনিয়ায়
সেই অন্ধকার বয়ে বেড়াবার মানুষ
কি সব ফুরিয়ে গেল !

.                ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ঘরটা একটু অগোছাল
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
“দেশ” পত্রিকার ৭৫ বছর উপলক্ষে প্রকাশিত কবিতা সংকলন ( ২০১০ ) থেকে নেওয়া |


ঘরটা একটু অগোছাল থাক,
.              উঠানে একটু ধুলো |
খাড়া দেওয়ালের কঠোর জ্যামিতি ভাঙতে
.              বন্য লতাটা তুলো |

অন্তরে কিছু সংশয় থাক
.               ভাষায় একটু দ্বিধা,
কিছু ভুলচুক কাটাকুটি নিয়ে
.               জীবনের মুসাবিদা |

নিরেট সত্য, নিখুঁত মাধুরী,
.               ছাপানো-ই মেলে কিনতে |
শুধু নির্যাস চায় না হৃদয়
.               পুষ্পতরুর বৃন্তে |

কিছু মলা কিছু খাদ নিয়ে জেনো
.                সব মধুরের খেলা |
মর্ত্যের মাটি ময়লা বলেই
.               এখানে প্রাণের মেলা !

.                ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
কবি-নাস্তিক
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
কল্লোল পত্রিকা ১৩৩১ মাঘ, ১০ম সংখ্যার কবিতা।
অরুণ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “কল্লোল কবিতা সমগ্র” (২০১৬) থেকে নেওয়া |


এই ভুবনের মধুর দিনের পথিক যত,
আস্ ল যারা
হাস্ ল যারা
ক্ষণেক ভালবাসল যারা,
   আজকে তারা সন্ধ্যা তোমার
পাকা সোনার
গলার হারে,
গগন পারে
যে-কথাটি গেল থুয়ে,
কপোল ছুঁয়ে
                  গেল চলে
যাহা বলে,
হায়রে হায়,
হারিয়ে যায়
.                        সকল কথা আসন্ন ঐ অন্ধকারে |
.                                              আর যারা সব
.              বইল বোঝা, সইল ব্যথা,
.                  মনের কথা কইল না ;
ফুলের তরী বাইল শুধু, ফলের কড়ি চাইল না ;
.          নীড়েতে পাখ্ পুড়্ ল যাদের আকাশে হায় উড়্ ল না—
.                                                    ঘুর্ ল না ;
.                                   তাদেরও আজ দিবা শেষে
.                                    ভালবেসে,
.                                   জড়িয়ে বুকে মুছিয়ে আঁখি
.                                   অশ্রু-জলে অধর রাখি,
.                                   ডাক্ বে না কেউ হায়রে হায় !
জানি, জানি, সন্ধ্যারাণি, দিনের বাণী সব বৃথায় !
.                                   ধূলা সে যে ধূলাই শুধু
.                                   পরশ-পাথর নাই রে নাই |
.                                    মিথ্যা বোঝা, মিথ্যা খোঁজা
.                                    বৃথা ওরে সব যোঝা-ই
.                                     মরমে যে মার খেয়েছে
মিথ্যা যে তার সব ওঝাই
.                                     বুকের ভিতর যা থাকে থাক্
.                                               ঢেকেই তা রাখ্
.        ওষ্ঠে প্রিয়ার ভণ্ডামি নাই, নাই পেয়ালায় বুজরুকি,
.        পরকালের পুঁথি ফেলে, আয় রে হতাশ আয় দুখী,
আয় রে আয়
দিন যে যায় !
.                                             উপবাসী প্রাণ যে চায়
.                                             বিপুল নিদারুণ ক্ষুধায় |
.           যখের কড়ি আগ্ লে আছিস মোক্ষ আশায় মূর্খ কে ?
.                                                      অর্ঘ্য দে |
.
.                                    এই দেহ তোর দেবতা শুধু,
.        দিন দুয়েকের স্বর্গ রে !
.                        অর্ঘ্য দে |
মর-দেহের চেয়ে মূর্খ, মোক্ষ নয় মহার্ঘ রে |
.                           অর্ঘ্য দে |
মৃত্যু শাসায়, শুনতে কি পাস্ ?
.                    দেখ্ তে কি পাস্, শ্মশান পাতা সকল ঠাঁই,
.                                বিশ্ব জুড়ে চিরটা কাল কালের হাতের নেই কামাই ?
.             ওরে অন্ধ, ওরে হতাশ !
লুট্ ক’রে নে যেথায় যা পাস্   
.                                   আকাশ বাতাস,
.                                   প্রেমের প্রকাশ,
নারীর দেহে রূপের বিকাশ,
.                                      যেথায় যা পাস্ |
.
.                                     ভিখারী তুই আছিস্ ভুখা,
.                শিকারী সুখ নেয় লুটে,
এ কিরে তোর মনের বিকার----
.                   রইবি খুশী চির্ কুটে ?
.           হাঁক উঠে
.           মুখ ফুটে
মোক্ষ-মোহের ডোর টুটে,
.        “এই জীবন মোর সাধন
.        স্বর্গ মোর এই ভুবন !”
.                                      দুখ যে চায়, দুখ যে পায়,
.                                      আর যে সুখের পিছনে ধায়,
.                                দিনের শেষে সব সমান, সব সমান |
.                      পুঁথির পাতায় ধাপ্পাবাজি পরকালের সব প্রমাণ |
.                                  ডাক্ ছে কবি--- আয়রে আয়
.                                 তিলে, তিলে, প্রাণ-পেয়ালায়
.                                               চুমুক দেবার সময় যে যায় !
.                   সময় যে যায়----সময় যে যায়, বাজছে কালের ডঙ্কা রে,
.        সকল সুখের পাছে আছে সমাপ্তিরই শঙ্কারে !
.                                 শিবের সাথে শ্বস্ ছে রে সব,
.                          সৃষ্টি সাথে ধ্বংসোত্সব
.                                     কালভৈরব হুঙ্কারে |
.         যৌবনেরও মউ-বনে সব মউ-মাছিদের মর্মরে
.      শুন্ ছি বাজায় বিসর্জনি কঙ্কালেরা পঞ্জরে ;
.                                  বাজায় ফুলে বাজায় পাতায়
.                                  পাখীর পাখায় লাজুক লতায়,
.                                 সুখে, আশায়, ভালবাসায়
.                                   সব ভরসায়
.                                                  বাজায়, বাজায়, কেবল বাজায় !
.                                        ----বসন্তোরি রঙিন খাতায়
.                        রঙের সাথে কালো কালি-ই লিখ্ ছে শমন পাতায় পাতায় |
ওরে তাই—
.         চোখের জলের সময় যে নাই !
.                                      রূপের মেয়াদ দু’দিন মোটে
.                          দু’দিন মেয়াদ যৌবনের |
প্রিয়ার ঠোঁটের গুল্ বাগে ভাই
.                        ইজারা যে দুই দিনের !
.                    ঠিকানা নেই ঠিকানা নেই
.                         আশার ফানুশ কখন ফাঁসে ;
.                        জীবন স্বপন ভাঙেরে তোর
.                             মহাকালের অট্টহাসে !
ভাব্ বি কি আর, কর্ বি বিচার
.                       বৃথা কি আর খাট্ বি বেগার ?
.                                     কালকে প্রিয়ার মুখে পাবি
.                                    হয়ত চিহ্ন বলি-রেখার !
আজ দরজায়
.                    তাই ত কবি ডাক্ দিয়ে যায়---
.    ফাগুন ফুরায়----
.     আগুন জুড়োয় !
.        মধু-মাসের মহোত্সবে দস্যু হ’য়ে লুট্ বি কে আয় |
.                      ছিনিয়ে নেবার সাহস যে চাই—
.                      বিনিয়ে কাঁদিস্ কার ভরসায় ?

.                    ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
‘সেথা তুমি পূর্ণ ছিলে’
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
কল্লোল পত্রিকা ১৩৩১ ফাল্গুন, ১১শ সংখ্যার কবিতা।
অরুণ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “কল্লোল কবিতা সমগ্র” (২০১৬) থেকে নেওয়া |


সেথা তুমি পূর্ণ ছিলে
আপনাতে আপনি মগন,
আনন্দের স্পন্দহীন নিশ্চল গগনে ;
তাই বুঝি সৃজিলে আমারে
কাঁদিবার লাগি |
কাঁদিবার সাধ,
তাই তুমি মোর সাথে ছোট হবে, লুটাবে ধূলায়,
আঘাত করিবে আপনারে,-- মূঢ় অবিশ্বাসে
আবার ভাসিবে আঁখিনীরে !

সেথা তুমি পূর্ণ ছিলে,--
শুধু সেথা ছিল না ক’ আঁখিজল,
বিরহ বেদনা আর উষ্ণ দীর্ঘশ্বাস |
আমার মাঝারে তাই
এমন করিয়া কাঁদ ;
কাঁদ এত রূপে !
অকারণে কাঁদ একবার
জীবনের তীরে নামি
চিহ্নহীন বালুচরে ;
পুনঃ কাঁদ প্রেয়সীর, প্রেয়সীর লাগি—
বার বার দুরন্ত যৌবনে ;
তার পর সমস্ত জীবন ধরি’
সংশয়ে, দ্বিধায়, দ্বন্দ্বে
বঞ্চনায়, আঘাতে ও হতাশা,
কাঁদ এত রূপে |
নিখিল ভুবন ভরি’ খেলিতেছ কাঁদিবার খেলা
অনাদি অতীত কাল ধরি’ |
বিস্ময়ে চাহিয়া দেখি
সে খেলায় মাতি
কোথায় নেমেছ তুমি মোর সাথে,
জঘন্য পাপের মাঝে, বীভত্স ক্ষুধায়,
অসহ্য গ্লানির পঙ্কে, পুতি-গন্ধভরা,
অচিন্ত্য কলুষে হীনতায় |

মোর সাতে পাপী হলে
বুকে তুলে নিলে মোর তাপ
মোর সাথে দুর্বহ ব্যথার
বোঝা স্কন্ধে নিলে তুলে,
পিশাচ সেজেছে মোর সাথে
কুটিল, নির্মম, ক্রূর, নৃশংস, নির্দয় ;
বিস্ময়ে চাহিয়া দেখি, আর বসে রই
স্তব্ধ হয়ে ভয়ে ও বিস্ময়ে---
তোমার কান্নার খেলা অপরূপ, অদ্ভুত, ভীষণ বুদ্ধির অতীত !
যত কান্না ধরণীতে ; তার মাঝে তুমি কাঁদ
এই শুধু জানি---
আর ধন্য আপনারে মানি |

.                    ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
“সৃষ্টির প্রথম প্রাতে বিধাতার মনে যে কথাটি ছিল সঙ্গোপনে“
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
কল্লোল পত্রিকা ১৩৩১ ফাল্গুন, ১১শ সংখ্যার কবিতা।
অরুণ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “কল্লোল কবিতা সমগ্র” (২০১৬) থেকে নেওয়া |


.        এস নারী,
.        আজ তব কানে কানে,
.        কই কথা প্রাণে প্রাণে ;---
.        সৃজন-রহস্য-কথা
.        ----নিখিলের আদিম বারতা |
.                            যৌবনের মায়ালোকে,
অনাদি ক্ষুধার সেই অনির্বাণ জ্বালা নিয়ে চোখে,
এস নারী, আরো কাছে এস,
বুকে বুক রেখে শুধু ক্ষণিকের তরে মোহভরে, ভালবেসো |
.                        চুপে চুপে যে কথাটি
.                        শিখাইছে মাটী
.                        প্রতি নবাঙ্কুরে,
.        ইঙ্গিতে যে কথাটিরে গ্রহতারা বলে ঘুরে ঘুরে
.                আলোকের অর্ধস্ফুট সুরে,
.                সৃষ্টির প্রথম প্রাতে বিধাতার মনে
.                যে কথাটি ছিল সঙ্গোপনে,
.                সে গোপন বারতাটি কবির প্রকাশ
এস নারী, এল আজ জীবনের দখিনা-বাতাস |
.        মুখে নয়, শুধু বুকে বুক দিয়ে নয়,
ব্যঞ্জনা-ব্যাকুল সর্ব অঙ্গ মোর, মন প্রাণ দিয়ে
.        শিখাইব সে রহস্য প্রিয়ে !
.        জানিবার দূরন্ত আগ্রহে
তোমার ও-দেহের মাঝে শোণিতের বন্যাবেগ বহে !
যৌবন-সুষমা তব, এ যে সেই বাসনার ভাষা !
এরি মাঝে জেগে আছে নিখিলের অনির্বাণ আশা !
.                এই তব হেঁয়ালি ভাষায়
.        সৃষ্টির কামনাখানি নবরূপে ফুটে পুনরায় |
.                ভয়ঙ্কর ভুখে ,
এস নারী, এই তব তনুলতা নিষ্পেষিয়া বুকে
.                        কই মোর রহস্য-বারতা ;
জন্মে জন্মে এ দেহের প্রতি অণু-পরমাণু মাঝে বহিয়া এনেছি যেই কথা,
সে বাণী সুগন্ধ করি অগণন ফাল্গুনের সুরভি নিশ্বাসে,
রঞ্জিয়া বিচিত্রবর্ণে, সিক্ত করি’ সঙ্গীতের আনন্দনির্য্যাসে
.                রূপে, রসে, অপরূপ করি’
.        কই ধীরে,---দেহমন, এ জীবন, ----উঠুক শিহরি !
.                হে প্রিয়া আমার,---
.        তবু যদি আরো কিছু রয়ে যায় বাকি,
.                অসমাপ্ত যায় কিছু থাকি,
.        হাস্যে তব, লাস্যে তব, ছলনায়, কৌশলে, কলায়,
সৌন্দর্যের ইন্দ্রজালে মুগ্ধ করি’ দুলাইয়া আবেগ-দোলায়
.        ধাঁধিয়া কটাক্ষপাতে, বাঁধিয়া অচ্ছেদ্য মায়াফাঁসে,
সমস্ত চেতনা হরি’ মগ্ন করি’ আলিঙ্গনে, কুহক-বিলাসে
.        উদ্ ভ্রান্ত করিয়া মোরে করিয়া বিহ্বল,
.                লুটে নিও সকল সম্বল !

.                    ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর