কবি প্রেমেন্দ্র মিত্রের কবিতা ও গান
*
জীবন-শিয়রে বসি স্বপ্ন দেয় দোল
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয় কল্লোল পত্রিকার ১৩৩১ চৈত্র সংখ্যায়। কবির প্রথম
প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “প্রথমা”-র (১৯৩২) কবিতা।


জীবন-শিয়রে বসি স্বপ্ন দেয় দোল---
ওরে ব্যর্থ ব্যথাতুর
সে মিথ্যায় মত্ত হয়ে সত্য তোর ভোল্  |
.               ব্যথিত শ্বাসের বাষ্পে ইন্দ্রধনু রচি’ ইন্দ্রজালে,
.               যদি সে মৃত্যুর মরু-মরীচিকা সৃজিয়া সাজালে,
.               অনন্ত মৌনতা মাঝে কাতর দরদী
.               এক কণা সুর লাগি এত করি সাধিল সে যদি
.               সৃষ্টির পাণ্ডুর ওষ্ঠে শীতল তিক্ততা,
.                                অন্তরের নির্মম রিক্ততা,
.                 ক্ষণিকের অপ্রচুর শীর্ণ শুষ্ক
.                হাসির ছলনা দিয়া রাখিতে আবরি,
.                এত সকাতর ব্যর্থ চেষ্টা যার,
.                শুধু তার সকরুণ প্রেমটিরে স্মরি
.                আজি তবে সযতনে হাস্য টানি ব্যথাম্লান মুখে
.                        নিদারুণ কপট কৌতুকে
.                রঙীন বিষের পাত্র ওষ্ঠে তুলি ধরি
.                যাব পান করি |
অবিশ্বাসী প্রিয়ারেও অসঙ্কোচে দিব আলিঙ্গন,
যে অধর করিল বঞ্চনা, তাহারেও করিব চুম্বন |
যে আশার ম্লান দীপখানি
তিমির রাত্রির তীরে আতঙ্কে শিহরি
বহুক্ষণ নিভে গেছে জানি,
---তারি আলো আছে ,---করি ভান,
কন্টকিত লক্ষ্যহীন পথে, নিরুদ্দেশে করিব প্রয়াণ,
.                                      মিথ্যা অভিযান |

যে প্রেম জীবনে কভু মুঞ্জরে না তারি মৃতমূলে
সমস্ত জীবন-রস
নিঙারিয়া সঁপি দিব জ্ঞাতসারে ভুলে
.                     মর্মগ্রন্থি খুলে |
ছল করি ভালোবাসি, জরা-শোক-জর্জরিত, মূল্যহীন এ মাটীর শখ,
আগ্নেয় আয়ুর দ্বীপে ক্ষণকাল তরে,
তার লাগি আয়োজিব মিথ্যা মহোত্সব |
যদিও সকল হাস্য-ফেনপুঞ্জ-তলে
জানি ক্ষুব্ধ ব্যথা সিন্ধু দোলে,
যদিও অশ্রুর মূল্যে কোন স্বর্গ মিলিবে না জানি,
হাসি অশ্রু উচ্ছলিত তবুও রঙীন,
এ বিস্বাদ জীবনের বিষ-পাত্রখানি
ওষ্ঠে তুলি ধরি,
নিঃশেষিয়া যাব পান করি,--
শুধু তার সযতন অনুরাগ স্মরি,
জীবন-শিয়রে বসি দোলা দেয় যে স্বপ্নসুন্দরী !

.                ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
উদ্বেলিত যৌবনের সিন্ধুতীরে
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
কল্লোল পত্রিকা ১৩৩২ বৈশাখ ( মে ১৯২৫ ) সংখ্যার কবিতা।
অরুণ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “কল্লোল কবিতা সমগ্র” (২০১৬) থেকে নেওয়া |


সুন্দর প্রভাতে
একদিন, জীবনের নীল পারাবার তীরে,
অকলঙ্ক পাল তুলি
কযেছিল শৈশব আমার
চলিলাম যৌবনের দেশে |
সুপ্তিহীন সমুদ্রের গান
অহরহ তারে ঘিরে ঘিরে
ওঠে উচ্ছ্বসিয়া ;
সেথা নিত্য আনন্দের মেলা
সেথা চির নন্দনের খেলা |

তার পর একদিন পথহীন পারাবারে দিক্ ভ্রান্ত
কৈশোর আমার
কয়েছিল কাঁদি
--কবে উতরিব সেই যৌবনের দেশে
যেথা মায়া, যেথা সব বস্তহীন ছায়া
যেথা শুধু স্বপনের মেলা ;
যেথা মোর সব কান্না শুধু বিরহের,
সব হাসি মিলনের শুধু ;
যেথা প্রিয়া
ব্যাকুল নয়ন মেলি
জাগে চির প্রতীক্ষায়
অন্তহীন যুগযুগান্তর ;
বিরহের দীর্ঘশ্বাসে নিত্য উদ্বেলিয়া ওঠে অশান্ত সাগর |
যেথা দিন ক্লান্তিহীন তন্দ্রাহীন রাত,
যেথা কথা অশ্রান্ত প্রলাপ |
---আনন্দ যে ক্ষণে ক্ষণে পরিপূর্ণ আপনারে সহিতে না পারি
গলে যায় আঁখিজলে,
আঁখিজল মুক্তা হয়ে হাসে—
প্রিয়া বিনা যেথা কিছু নাই |
তাহারি প্রশান্ত প্রেম ফুটে আছে
জলে স্থলে নিখিল ভুবনে
অক্ষয় সৌরভে ভরা
একটি অপূর্ব চাওয়া—
পরিপূর্ণ পদ্ম একখানি |
আজ সূর্য অস্ত যায় পশ্চিমের ছিন্ন রক্ত-মেঘের আড়ালে
রক্তসিন্ধু স্থির অচঞ্চল
মূর্ছাহত সীমাহীন বালুচর !
মন্দবায়ে
ছিন্ন পাল তুলি ভগ্ন নায়ে
ফিরে চায় জীবন আমার
ফিরে চায় পশ্চাতের পানে |
পূর্বের সীমান্ত রেখা মুছে যায়
অন্ধকারে ধীরে
--জীবনের যাত্রা হল শেষ |
কি কহিতে চাহে আজি জীবন আমার—
হিম-ওষ্ঠে কি কথা বাধিয়া যায় কঠিন নীহারে –-
আরবার ফিরে চল হোথা
ফিরে চল যৌবনের দেশে,
প্রিয়ারে খুঁজিতে যেথা বিফলে কাটিয়া গেল দিন
তবু প্রিয়া দেখা নাহি দিল
চিনিতে হল না চেনা |
যেথা তার সাথে
বারবার নানা মত পরিচয় হল পলে পলে
অনন্ত অশেষ ;
তবু তৃপ্তি হল নাক হায় |

ফিরে চল উদ্বেলিত যৌবনের সিন্ধুতীরে
হাসি কান্না ভুল ভ্রান্তি ভরা
দীর্ঘ-নিশ্বাসের দেশে ;
স্বপ্ন সত্য যেথা সত্য প্রিয়া
যেথা প্রণয়ের জয় নিত্য ওঠে গানে গানে
মৃত্যুর কল্লোল উল্লঙ্ঘিয়া |
---দীর্ঘ জীবনের মোর সমস্ত আশ্বাস
ধন্য হল যে যৌবনে
একটি ছোঁয়ায় শুধু একটি চাওয়ায়
প্রাণের প্রিয়ার |

.                ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
আজ আমি চ’লে যাই
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
কল্লোল পত্রিকা ১৩৩২ শ্রাবণ ( অগাস্ট ১৯২৫ ) সংখ্যার কবিতা।
অরুণ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “কল্লোল কবিতা সমগ্র” (২০১৬) থেকে নেওয়া |


.        আজ আমি চ’লে যাই
.                চ’লে যাই তবে,
.        পৃথিবীর ভাই বোন্ মোর
.                গ্রহতারকার দেশে
.                সাথী মোর এই জীবনের
.                কেহ চেনা, কেহ বা অচেনা |
.        তোমাদের কাছ হতে চ’লে যাই তবে ;
.        কোথাও দু’ফোঁটা জল শুকাইবে ভূমিতলে
.        একটী করুণ শ্বাস মিশাইবে উতলা বাতাসে
.        আজ কয়ে যাব এক সন্ধান তাহার !

নীল আকাশের গ্রহে একটী প্রার্থনা মোর রেখে যাই শুধু
রেখে যাই স্পন্দহীন বক্ষপুটে মৃত্যুম্লান মর্মকোষে মোর |

.        যে কেহ আমার ভাই  যে কেহ আমার ভগিনী,
.        এই ঊর্মি-উদ্বেলিত সাগরের গ্রহে
.        অপরূপ প্রভাত সন্ধ্যার গ্রহে এই
.        লহ শেষ শুভ ইচ্ছা মোর
.        বিদায় পরশ, ভালোবাসা,
.        আর তুমি লও মোর প্রিয়া
.        অনন্ত রহস্যময়ী
.        চিরকৌতূহল-জ্বালা
.        --- অসমাপ্ত চুম্বনখানিরে
.        তৃপ্তিহীন |
.        যদি প্রেম সত্য হয়
.        যদি সত্য হয় এই কান্নার সাধনা,
.        তবে আর বার
.        অদেখা আকাশে কোন্
.        কোন্ নীহারিকাপুঞ্জে
.        নব সূর্য উদ্ভাসিত সে কোন্ সুন্দরী তারকায়
.        হবে কিরে পরিচয়
.        নাহি জানি !
.        ---নয় এই অনাহূত নিষ্ঠুর বিদায় !
.        আজ আমি চ’লে যাই—
.        যত দুঃখ সহিয়াছি
.        বহিয়াছি যত বোঝা পেয়েছি আঘাত
.        কাটায়েছি স্নেহহীন দিন
.        হয়ত বা বৃথা,
.        আজ কোন ক্ষোভ নাই তার তবে
.        কোনো অনুতাপ আজ রেখে নাহি যাই—
.        একটি আকাঙ্ক্ষা শুধু
.        জ্বেলে রেখে গেনু |

.        আজো যারা আসে পিছে
.        অনাগত, পৃথিবীর ভ্রূণ-শিশু ত,
.        তারা যেন পৃথিবীরে এমন করিয়া নাহি দেখে |
.        আজ যারা বাসিতে পেল না ভালো
.        আমাদের চারিপাশে আজ যত প্রাণ
.        অন্যায় দারিদ্র্যে আর হীন লালসায়
.        অন্ধ পঙ্গু কাঁদে উষ্ণ অভিশাপে,
.        আজিকার মানবের যত গ্লানি পাপ
.        ---আমাদের সাথে যেন মোরা সব
.        মুছে লয়ে যাই
.        --- সব শাস্তি, সকল বেদনা |
.        যারা আজো জন্ম লয় নাই
.        তাহাদের প্রেম
.        ব্যর্থ নাহি হয় যেন এমন করিয়া.        
.        লোভের ক্ষুধার ফাঁদে |
.        দেবতার দ্বার যেন তাহাদের তরে
.        আজিকার মত রোধ নাহি করে
.        স্বার্থ অসঙ্গত, কপটতা, মোহ, প্রবঞ্চনা,
.        হিংসা অন্ধকার |
.        পৃথিবী সুন্দর হয় যেন ;
.        দেবতার আশীর্বাদ লোভ যেন নাহি কেড়ে রাখে
.        স্বার্থ করে অন্যায় বন্টন |
.        প্রেম বিনা কারো জন্ম ব্যর্থ নাহি হয় যেন,
.        ছিঁড়ে যায় লালসার জাল
.        ধুয়ে যায় আজিকার সব ক্ষুদ্র মলিনতা |
.        দিকে দিকে কোটি গৃহ ভেঙ্গে পড়ে আজ                
.        প্রচণ্ড লোলুপ এই মানবের বাসনার ঝড়ে ;
.        উপবাসী কাঁদে মাতা মোহমত্ত নারীর অন্তরে
.        কাঁদে প্রিয়া উত্পীড়িতা বারাঙ্গানা বুকে
.        দেবতা কাঁদেন ভাঙ্গা ঘরে |

পৃথিবীর ভাই-বোন মোর—
.        এই বিলাপের গ্রহে মোর কান্না রেখে যাই আজ
.        একটি বাসনা আর,
পশ্চাতে আসিছে যারা
.        তারা যেন ধরণীর এ কলুষ দেখিতে না পায়—
.        মোদের চোখের জলে শেষ হোক সব তাপ গ্লানি
.        শেষ হোক্ মানব আত্মার এই কাতর কাকুতি
.        আমারে বেদনায় |
.        তারা যেন সবে ভালোবাসে |

.                ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সে কবে আমার মনে
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
কল্লোল পত্রিকা ১৩৩২ পৌষ ( জানুয়ারী ১৯২৬ ) সংখ্যার কবিতা।
অরুণ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “কল্লোল কবিতা সমগ্র” (২০১৬) থেকে নেওয়া |
.

যাযাবর হাঁস নীড় বেঁধেছিল বনহংসের প্রেমে
আকাশ-পথের কোন্ সীমান্ত থেমে
.        সে কবে আমার মনে ;
.        ডুবেছে বিস্মরণে,
আজি শুধু তার শূন্য নীড়টি ঘিরি
হতাশ আশার উদাস অলস মৌমাছি মরে ফিরি |

বেদিয়ার মেয়ে মরু ছেড়ে হল মোতি-মহলের বাঁদি
চঞ্চল চোখ্ ‘বোর্ খা’তে দিল বাঁধি
.        সে কবে আমার মনে ;
.        ডুবেছে বিস্মরণে |
আজি শুধু তার ত্যক্ত জীর্ণ ঘরে
পুরোনো স্মৃতির শ্রীহীন শুকানো পল্লব কাঁদি মরে |

শুকনো চড়ায় সারাদিন করে শুক্ নিরা কলরব,
ভাদ্রের বানে ভেসে লাগে ঘাটে শেফালি-শিশুর শব,
.        আমার পরাণে আজি
.        উত্সব বেশে সাজি
হৃদয়ের পথে কঙ্কালগুলি চলে,
বাসর-রাতের দীপ নিবে গেছে বিধবা-নয়ন-জলে |

.                ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ওরা ভয় পায়
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
কবিতাটি কল্লোল পত্রিকা ১৩৩২ মাঘ ( ফেব্রুয়ারী ১৯২৬ ) সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।
কবির প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “প্রথমা”-র (১৯৩২) কবিতা।


ওরা ভয় পায় !
ওরা চোখ বুজে থাকে,
বলে মিথ্যা, সত্য, কিছু নাই—
শুধু ফাঁকি, আর শুধু মায়া ;
.                   এই আসা যাওয়া,
আগে পাছে শুধু তার,
অর্থহীন নিরুত্তর অন্ধকার শুধু !

আমার ভুবনে কিন্তু ফুল ফোটে ফল ফলে রোজ
ঋতুগুলি আসে যায় গন্ধে গানে প্রাণে ভরপুর !
আগে পাছে আছে কি না কিছু
খুঁজিবার
নাহি অবসর |
আছে যাহা,
তাহারই পাছে,
আমার দিবসরাত্রি
ছোটে অনুক্ষণ !
আমার দিনের আলো,
হেসে কাছে আসে,
ভালোবেসে
কথা কয় ;
আমার রাত্রির সুপ্তি, কপোল পরশ করে ধীরে,
বলে,
নাহি ভয় !

.      ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সুদূরের আহ্বান
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
মেঘ বসু সংকলিত ও সম্পাদিত “আবৃত্তির কবিতা কবিতার আবৃত্তি” ( ২০০৯ ) থেকে
নেওয়া |


অগ্নি-আখরে আকাশে যাহারা লিখিছে আপন নাম,
.        চেন কি তাদের ভাই
দুই তুরঙ্গ জীবন-মৃত্যু জুড়ে তারা উদ্দাম,
.        দুয়েরি বল্গা নাই !

পৃথিবী বিশাল তারা জানিয়েছে, আকাশের সীনা নাই,
ঘরের দোওয়াল তাই ফেটে চৌচির |
প্রভঞ্জনের বিবাগী মনের দোলা লেগে নাচে ভাই,
তাদের হৃদয়-সমুদ্র অস্থির !

বলি তবে ভাই, শোন তবে আজ বলি,
অন্তরে আমি তাদেরই দলের দলী ;
রক্তে আমার অমনি গতির নেশা ;
নাশায় অগ্নি স্ফুরিছে যাহার, বিজলী ঠিকরে খুরে
.        আমি শুনিয়াছি সেই হয়রাজের হ্রেষা !

যে শেণিতধারা ঘুমায়ে কাটালো পুরুষ চতুর্দশ,
দেখি আজো ভাই লাল তার রঙ, তাজা তার জৌলস !
আজো তার মাঝে শুনি সে প্রথম সাগরের আহ্বান ;
করি অনুভব কল্পনাতীত সৃষ্টির ঊষা হ’তে,
.        তার জয় অভিযান |

তপতী কুমারী মরু আজ চাহে প্রথম পায়ের ধূলি |
অজানা নদীর উত্স ডাকিছে ঘোমটা আধেক খুলি |
.        নিঃসঙ্গ গিরিচূড়া,
তুহিন তুষার-শয়নে আমারে স্মরিছে বিরহতুরা |

উত্তর মেরু মোরে ডাকে ভাই, দক্ষিণ মেরু টানে,
ঝটিকার মেঘ মোরে কটাক্ষ হানে ;
.        গৃহ-বেষ্টনে বসি,
কখন প্রিয়ার কন্ঠ বেড়িয়া হেরি পূর্ণিমা-শশী |

সুশীতল ধারা নদীটি বহুক মন্থরে তব তীরে,
গৃহবলিভুক্ পারাবতগুলি কূজন করুক ঘিরে,
পালিত তরুর ছায়ে থাক ঢাকা তোমাদের গৃহখানি,
স্তোত্র রচিও, যদি পার তব প্রিয়ার আঁখি বাখানি |
.               ছোট এই আশা, সুখ,
ঈর্ষা করি না, ঘৃণা নহে ভাই, শুধু নহি উত্সুক |

মনের গ্রন্থি জটিল বড়ো যে খুলিতে সহে না তর ;
সোহাগের ভাষা কখন শিখি যে নাই মোটে অবসর ;
.        শুনে কাল হল ভাই,
অরণ্য-পথ গভীর গহন, সাগরের তল নাই |

অগ্নি-আখরে আকাশে যাহারা লিখেছে আপন নাম,
.        আমি যে তাদের চিনি |
দুই তুরঙ্গ তাহাদের রথে, উদ্ধত উদ্দাম,
.        ----শোনো তার শিঞ্জিনী |

মোদের লগ্ন-সপ্তম ভাই রবির অট্টহাসি,
.        জন্ম-তারকা হয়ে গেছে ধূমকেতু !
নৌকা মোদের নোঙর জানে না,
.        শুধু চলে স্রোতে ভাসি—
.        কেন যে বুঝি না, বুঝিতে চাহি না হেতু !

.               ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ট্রেনের জানলা
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
শ্যামলকান্তি দাশ ও বিমল গুহ সম্পাদিত “হাজার কবির হাজার কবিতা” ( ২০০৪ )
সংকলন থেকে নেওয়া |.        


উড়ো হরিয়ালঝাঁক বাবলাবন সবুজ বিদ্যুতে
ছুঁয়ে গেল | দু’দিনের গলদঘর্ম ট্রেনের ধকল
উসুল হয়নি তাতে | তবু যেন দুরন্ত দুপুর
একটি চোরাই সুখে নীলপদ্মে করে টলমল |

সবই জানলায় দেখা | তাই দিয়ে সব চাওয়া-পাওয়া,
জীবিকা, জনন, জপ | জানলার ধারে দিন গোনা |
আরো যদি বাতায়ন থাকে, খোঁজা বুঝি পণ্ডশ্রম |
এক জানলারই মাপে গড়া চোখ কান ও চেতনা |

তবু বেগ যদি হতে পারি কখনও বিবাগী,
অচলেরা চমকায় | বহু দূর চক্রবালে স্থির
ধ্রুব পাহারেরা নড়ে | ট্রেনের কামরায় চোকাচোখি,--
মানে নেই, নেই পরিণাম, তবু মুহূর্ত মদির |

পাথুরে প্রান্তরে, নয় ফসলের ক্ষেত আগলানো,
কিম্বা কারখানার সাক্ষী, যার যার নিজের স্টেশন |
চেনা রাস্তা, চেনা বাড়ি, ঘড়ি ঠিক, কিন্তু ভুলচুক |
কখনও ঝলকে শুধু আচমকা অন্য অন্বেষণ |

.               ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বিফল নায়ক
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় ও দীপক রায় সম্পাদিত “বাংলা আধুনিক কবিতা” ১ম খন্ড
(এপ্রিল ১৯৯২) থেকে নেওয়া |

অন্ধকারে ডুব দিয়ে নিরাময় হয় হয়তো কেউ
কেউ চায় শুধু স্বচ্ছ আলো দিয়ে হৃদয় ধোয়াতে |
আছে এক মূঢ়মতি আলো অন্ধকারে ভেদাভেদ
বোঝে না যে, সাধে নাকো জীবনের নির্যাস চোয়াতে |

একদিন সেও বুঝি হ’তে চেয়ে মামুলি নায়ক
পরিপাটি গেঁথেছিল সুখ দুঃখ উত্কন্ঠা হতাশা,
সাজিয়েছিল আখ্যায়িকা শাদা কালো নক্ শাকাটা ছকে,
পঞ্জিকা নির্ভুল জেনে লগ্ন ধ’রে মেটাতে পিপাসা |

তারপর সেজেগুজে ভূমিকায় নেমে এসে দেখে
গল্প সব ধুয়ে মুছে বয়ে যায় কৌতুকে সময়,
দিগ্বিদিক অনিশ্চিত, চিহ্ন সব অস্থির বিভ্রম,
ব্যাপ্তি বিন্দু সমার্থক, এক-ই সুরা সংশয় বিস্ময় |

.               ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
কালা ধলা ভাই আমার
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় ও দীপক রায় সম্পাদিত “বাংলা আধুনিক কবিতা” ১ম খন্ড
(এপ্রিল ১৯৯২) থেকে নেওয়া |


এ-পারেতে কালো রঙ বৃষ্টি পড়ে ঝম্ ঝম্
ও পারেতে গাছে শুধু লঙ্কা টুকটুক করে,
কালা ধলা ভাই আমার মন কেমন করে !
মাঠে নাই পাকা ধান, মই দেব কি ?
কাস্তে কোদাল থাকে আন, শান্ দিয়ে দি |

মুগুর হাতুড়ি দাও কাঁটা ঠুকে নেব
হাসিমুখে ঠোঁটরাঙা পান খেয়ে দেব |
নদীতে কাটালে বান, ডিঙি ভেঙে খান্ খান্
এ-বারেতে যাদুমনি কেমন করে যাই
আবার জোয়ার এলে হবে না কামাই |
.        ঘরে আছে খুদকুঁড়ো
.        তাতে দিও নুনের গুঁড়ো
.        লঙ্কা দুটো ছিঁড়ে তাই—
.                চাঁদমুখে খাও |
.        বাদল গেলে দেব তোমায়
.                পুলি পোলাও |

.               ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মুখ
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় ও দীপক রায় সম্পাদিত “বাংলা আধুনিক কবিতা” ১ম খন্ড
(এপ্রিল ১৯৯২) থেকে নেওয়া |


একটা মুখ কাঁদায় হয়ে শীতের রাতে পথে অনাথ শিশু,
মেলায় বাজিকরের খেলায় একটি মুখ মুখোশ প’রে হাসায় |
.        খেয়ার নায়ে ওপারে যেতে কবে যে কোন ভিড়ে
একটা মুখ এক নিমেষে অকূল স্রোতে ভাসায় !
.                কার সে মুখ, কার ?
.                জানে কি তারা-ছিটানো অন্ধকার !

সে মুখ যারা দেখে নি তারা জানে না জ্বালা নিদান যার নেই |
শীতের দিনে পোহায় রোদ উঠোনে বসে আরামে কাঁথা গায়,
.        ঝুমকো লতা দেয়ালে তোলে,  মরাই রাখে ভ’র,
.            ফল কি ফুল পাড়তে শুধু নাগাল ডাল নামায় |
.                হোক সে মুখ যার,
.                অনিদ রাতে কাঁপে না অন্ধকার |

সে মুখ যার পড়েছে চোখে ঘরে-ই থাকে যায় না সেও বনে,
বসত করে পাঁচিল ঘিরে, হিসেব করে পুঁজি যা আছে ভাঙায় |
.        তবুও কোন হতাশ হাওয়া একটা ছেঁড়া ছায়া
.        তারার ছুঁচে সেলাই ক’রে রাত্রি জুড়ে টাঙায় |
.                কার সে ছায়া, কার ?
.                প্রাণেশ্বরী পরমা যন্ত্রণার |

.                      ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর