কবি প্রেমেন্দ্র মিত্রের কবিতা ও গান
*
হঠাৎ যদি
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত “সেরা আবৃত্তির কবিতা সংগ্রহ” কবিতা সংকলন
(২০১৫) থেকে নেওয়া |


আমায় যদি হঠাৎ কোনো ছলে
কেউ ক’রে দেয় আজকে রাতের রাজা,
করি গোটাকয়েক আইন জারি
দু’এক জনায় খুব ক’ষে দিই সাজা |

মেঘগুলোকে করি হুকুম সব
ছুটি তোদের, আজকে মহোত্সব |
বৃষ্টি-ফোঁটার ফেলি চিকন চিক্
ঝুলিয়ে ঝালর ঢাকি চতুর্দিক,
দিল্ দরিয়া মেজাজ ক’রে কই,
বাজগুলো সব স্ফূর্তি ক’রে বাজা
আমায় যদি হঠাৎ কোনো ছলে
কেউ ক’রে দেয় আজকে রাতের রাজা |

হাওয়ায় বলি, হল্লা ক’রে চল
তারার বাতি নিভিয়ে দলে-দল,
অন্ধকারে সত্যি কথার শেষে
রাজকন্যা পদ্মাবতীর দেশে |
ঘুমের পুরীর সেপাইগুলো পেলে,
তাদের ধ’রে খুব ক’রে ক’ষে দিই সাজা |
আমায় যদি হঠাৎ কোনো ছলে
কেউ ক’রে দেয় আজকে রাতের রাজা |

ওলট-পালট করি বিশ্বখানা
ভাঙি যেথায় যত নিষেধ মানা ;
মনের মতো কানুন করি ক’টা
রাজা হওয়ার খুব ক’রে নিই ঘটা |
সত্য তা সে যতই বড় হোক
কঠোর হলে দিই তাদের সাজা |
আমায় যদি হঠাৎ কোনো ছলে
কেউ ক’রে দেয় আজকে রাতের রাজা |

.                ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বইটই
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত “সেরা আবৃত্তির কবিতা সংগ্রহ” কবিতা সংকলন
(২০০৯) থেকে নেওয়া |


বই’ত পড়ো, টই পড়ো কি ?
তাই’ত কাটি ছড়া |
বই পড়া সব মিছেই যদি
না হলো টই পড়া |
টই পাওয়া যায় পড়তে কোথায় ?
বলছি তবে শোনো
বই-এর মাঝে-ই লুকিয়ে থাকে
টই সে কোনো কোনো |
আর পাবে টই, সকালবেলা
বই থেকে মুখ তুলে
হঠাৎ যদি বাইরে চেয়ে
মনটা ওঠে দুলে |
টই থাকে সব রোদ-ছোপানো
গাছের ডালে পাতায় ;
টই থাকে আর আকাশ-ছোঁয়া
খোলা মাঠের খাতায় |
টই চমকায় বিজলি হয়ে
আঁধার করা মেঘে ;
খই হয়ে টই ফোটে দিঘির
জলে বৃষ্টি লেগে |
টই কাঁপে সব ছোট্ট পাখির
রং বেরং-এর পাখায় ;
খোকা খুকুর মুখে আবার
মিষ্টি হাসি মাখায় |
বই পড়ো খুব, যত পারো,
সঙ্গে পড়ো টই ;
টই নইলে থাকত কোথায়
এতরকম বই |

.           ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
কাক ডাকে
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত “আধুনিক বাংলা কবিতা ” কবিতা সংকলন (১৯৪০) থেকে নেওয়া |


খাঁখাঁ রোদ, নিস্তব্ধ দুপুর ;
আকাশ উপুর ক’রে ঢেলে-দেওয়া
.                     অসীম শূন্যতা,
পৃথিবীর মাঠে আর মনে—
তারই মাঝে শুনি ডাকে
.                     শুষ্ককন্ঠ কাক !
গান নয়, সুর নয়,
প্রেম, হিংসা, ক্ষুধা---কিছু নয়,
---সীমাহীন শূন্যতার শব্দমূর্তি শুধু |

মানুষের কথা বুঝি শুনেছি সকলই ;
মনের অরণ্যে যত হাওয়া তোলে
কথার মর্মর,
---বেদনা ও ভালোবাসা
উদ্দীপনা, আশা ও আক্রোশ,
জেনেছি সমস্ত দোলা |
সব ঝড় পার হয়ে, আছে এক
শব্দের নীলিমা,
অন্তহীন, নিষ্কম্প্র, নির্মল |

কোথায় কাদের ছাদে সমস্ত দুপুর
কাক ডাকে, শুনি |
বোঝা আর বোঝাবার
প্রাণান্ত ক্লান্তির শেষে
অকস্মাৎ খুলে যায় আশ্চর্য কবাট |
কাক ডাকে, আর,
সে-শব্দের ধুধু-করা অপার বিস্তার
হৃদয়ে ছড়ায় সব শব্দের অতীত
ধ্যান-গাঢ় প্রশান্তির মতো |

আবার বিকেল হবে,
রোদ যাবে প’ড়ে
মানুষ মুখর হবে
মাঠে আর ঘরে |
বোঝাপড়া লেনদেন
প্রত্যহের প্রসঙ্গ প্রচুর
মন জুড়ে রবে |
ক্ষণে-ক্ষণে তবু সব সুর
কেটে দিতে পারে এক কাক-ডাকা গহন দুপুর |
সমস্ত অর্থের গ্রন্থি ধীরে ধীরে খুলে,
প্রত্যহের ভাষা তার সব ভার ভুলে,
উত্তরিতে পারে এক নিষ্কম্প্র নিথর
নভোনীল অপার বিস্ময়ে |

.           ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মামলা
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত “আধুনিক বাংলা কবিতা ” কবিতা সংকলন (১৯৪০) থেকে নেওয়া |


পোকাটা দেওয়ালে
.        নোংরা প্রাণের ফোঁটা,
কামনার চেয়ে কড়া তেষ্টায়
.        মোহিনী আলোর পলকের শুধু
.               হবে জ্বলন্ত জার
সরীসৃপটা ঘৃণ্য ঠাণ্ডা হিংসে ,--
.               বিদ্রূপ-কণা-রসনা গুটিয়ে
.               ওৎ-পাতা সংহার !

কি হবে হৃদয়, কি হবে ?
রুদ্ধশ্বাস মুহূর্তে গোনা
.                শেষ হবে কি পরাভবে ?

পোকা টিকটিকি দুই-এর মামলা দুনিয়ায় |
কার হয়ে বলো লড়বে ?
কে আসামী কে যে বাদী না বুঝেই
কত ওকালতি করবে !
কালোয় সাদায় আলোয় ছায়ায়
নক্সা সাজাতে স্বখাত মায়ার
.                কাটাকাটি ঢের করলে |
গহন গভীরে ডুব দিলে কত
তুহিন শিখরে চড়লে |
মানে তবু কিছু পেলে না |
হ্যাঁ-এর  না-এর মনগড়া আঁক
.            গোঁজামিল ছাড়া মেলে না !

কে জানে, বুঝি বা পোকা টিকটিকি
.                        দুই নয় |
পর্দাটা ঠেলে উঁকি দেবে কত,
.            মজেই দেখানো অভিনয় !

.           ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
দশানন
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত “আধুনিক বাংলা কবিতা ” কবিতা সংকলন (১৯৪০) থেকে নেওয়া |


যেখানেই থাকো তুমি করো স্বর্ণময়
তপস্যা অর্জিত বীর্যে, দুর্ধর্ষ দুর্জয় |
তবু কোন ভুল
তোমার কীর্তির মূল কাটে চিরদিন ?
তুমি অদ্বিতীয়, তবু চিরপ্রীতিহীন !

সে কি শুধু লোভ, শুধু ভোগীর লালসা |
স্ফীতদন্ত অক্ষমের ?
এ-সবের কিছু বুঝি নয় |
দানবীর দুর্বলতা, দেবতার দুর্বোধ বিস্ময় !

সীতারে পারো না ছুঁতে !
ছলবল সমস্ত কৌশল
নিজেই বিফল করে |
শেষ তার সম্মতি-ভিক্ষায় !
হৃদয়ের এ সম্মানে
রামায়ণ অন্য দীপ্তি পায় |

ছোট ভীরু হাত দিয়ে
জীবনের মাপ নিয়ে যারা
নীড় বেঁধে নিরাপদ সঞ্চয়ের কড়ি কটা গোনে |
ঈর্ষায় হিংসায়
তোমার বিশাল মূর্তি তারা চিরদিন
পঙ্কলিপ্ত করে তো করুক |
এ-সবের বহু ঊর্দ্ধে তুমি অন্য আকাশে উন্মুখ |
শুধু এক দিক চিনে
জীবনেরে ক’রো না খণ্ডিত,
দশদিক হ’তে আলো অসংকোচে করো অন্বেযণ
.          তুমি তাই সত্য দশানন |

সোপান হয়নি গড়,
স্বর্গ আজো দূর |
তোমার চিতার শিখা কিংবদন্তী কল্পনার
তাই বুঝি নিভেও নেভে না,
হে অদৃপ্ত  পৃথ্বী-প্রাণ
শূন্যবৈরী শাশ্বত বিদ্রোহ !

.           ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
পথ
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
প্রমথনাথ বিশী  সম্পাদিত “কাব্য বিতান ” কবিতা সংকলন (১৯৬৬) থেকে নেওয়া |


সেই সব হারানো পথ আমাকে টানে ;----
কেরমানের নোনা মরুর উপর দিয়ে,
.                         খোরাশান থেকে বাদক্ শান,
পামিরের তুষার-পৃষ্ঠ ডিঙিয়ে ইয়ারকন্দ থেকে খোটান |
শ্রান্ত উটের পায়ে-পায়ে যেখানে উড়ছে মরুর বালি,
.                         চমরীর খুরে লেগেছে বরফ-গলা কাদা !

বাদক্ শানের চুনি আর খোটানের নীলার নিষ্ঠুর ঝিলিক-দেওয়া,
.     ভেঙে-পড়া ক্যারাভানের কঙ্কালে আকীর্ণ,
.     লুব্ধ বণিক আর দুরন্ত দুঃসাহসীর পথ—
.     লাদকের কস্তুরীর গন্ধ যেখানে আজো আছে লেগে পুরানো স্মৃতির মতো |

সেই সব মধুর পথের কথা ভাবি ;--
আকাশের প্রচণ্ড সূর্যকে আড়াল-করা
.        দু-ধারের দীর্ঘ দেওয়ালের
.        শ্যাওলাগন্ধ ছায়ায়-ছায়ায় সংকীর্ণ সর্পিল পথ,
.                সাপের মতো ঠাণ্ডা পাথরে বাঁধানো |
ভাঙা ধাপ দিয়ে উঠে-যাওয়া
ঝিলমিল-দেওয়া বাতায়নের নিচে থমকে-থামা,
.        ধূপের গন্ধে সুরভি, দেবায়তনের দ্বারে ভূমিষ্ঠ-হওয়া পথ |

ভয়ে ভয়ে স্মরণ করি সে পথ ;---
ঘন ঘাসের বনে, শিকার ও শ্বাপদের নিঃসব্দ সঞ্চরণের ‘ঠৌরি’ ;--
যুগযুগান্ত ধ’রে দুর্বল ও ভীত, হিংস্র ও নির্মম পায়ে মাড়ানো |
.        যে-পথে তৃষ্ণার টানে চলে ভয়চকিত মৃগ ;
.        অন্ধকারে শাণিত চোখ চমকায় |

যে-পথ কুরুবর্ষ থেকে বেরিয়ে এল রক্তাক্ত,
দুর্বার তাতার বাহিনীর অশ্বখুর-বিক্ষত ;
.        করোটি-কঠিন যে-পথে
.        তৈমুরের খোঁড়া পায়ের দাগ |

স্বপ্ন দেখি সে-পথের,
অস্তাচল উত্তীর্ণ হয়ে আগামী কালের পানে—
স্বপ্ন যেখানে নির্ভীক,
বৃদ্ধের চোখে শিশুর বিস্ময়,
.        পৃথিবীতে উদ্দাম দুরন্ত শান্তি ||

.           ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ছাদে যেওনাক
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
প্রমথনাথ বিশী  সম্পাদিত “কাব্য বিতান ” কবিতা সংকলন (১৯৬৬) থেকে নেওয়া |


ছাদে যেওনাক, সেখানে আকাশ অনেক বড়,
.                                সীমানা-হীন !
তারাদের চোখে এত জিজ্ঞাসা,--- স্বপন সব
.                                হবে বিলীন |

তার চেয়ে এস বসি দুজনাতে, জানালা পাশে,
.                ওধারের ছোট গলিটিরে দেখি, --গ্যাসের আলো,
পড়েছে কেমন ফুটপাথটির ধারের ঘাসে,
.                শুনি নগরের মৃদু গুঞ্জন, লাগিবে ভালো |

তার পরে চাই তোমার নয়নে, তুমিও চেও ;
.                ---ঘরের বাতিটি জ্বালা হয় নাই, আধো আঁধার |
যা দেখিব তার রাশ যেন সেথা কি রয়েছেও,
.                মনে হবে যেন চোখের সাগর, সেও অপার |

যদি খুশি হয়, কাছে সরে এসো, বাড়ায়ে হাত
.           হাতটি ধরিও, আর মাথাটিরে হেলায়ে দিও ;
সুবাসিত চুল, সেই হবে মোর গহন রাত,
.           কপালের টিপে পাব প্রিয়তম তারকাটিও |

নিকট পৃথিবী ঘিরে থাক, আর যা কিছু চেনা,
.           তাই দিয়ে রাখি শূন্য আকাশ আড়াল করি ;
মুহূর্তগুলি মন্থন করি উঠে যে ফেনা
.           তাহারি নেশায় সব সংশয় রব পাশরি’ |

সীমাহীন ধাধা ধূ-ধূ করে সখী উপরে নীচে,
.           রচ নীরন্ধ্র গাঢ় চেতনার ক্ষণিক নীড় ;
স্বপ্নহরণ মহাকাশ হোথা নিঃশ্বসিছে,
.            এই ক্ষণ-সুখ-প্রত্যয় তাই হোক নিবিড় |

ছাদে যেওনাক, সেখানে আকাশ অনেক বড়,
.                              সীমানা-হীন |
তারাদের চোখে এত জিজ্ঞাসা,---স্বপন সব
.                              হবে বিলীন ||

.           ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ভাড়াটে কুঠি
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
ডঃ নীরদবরণ হাজরা সম্পাদিত “ছোটদের আবৃত্তিকোষ ” (২০০৭) থেকে নেওয়া |


.                ভাড়াটে কুঠি !
.    নদীর স্রোতের জঞ্জাল সম আসিয়া জুটি |

ওধারে তাহারা এধারে কাহারা ওপরে ও নীচে নানা ;
পাশাপাশি রোজ ঘর করি ভাই---কেহ নয় কারো জানা !
শুধু দু’বেলায় চোখাচোখি হয় একই সিঁড়ি দিয়ে উঠি |
.                ভাড়াটে কুঠি ||

ওধারের ঘরে তাহাদের ছেলে বুঝি বা ধুঁকিছে জ্বরে ;
এধারে প্রবাসী স্বামীটির লাগি বধূটি শুকায়ে মরে |
নীচে মজলিসে সারাদিন গোল চলিছে দাবার ঘুঁটি |
.                ভাড়াটে কুঠি ||

একটি ইটের ব্যবধান রেখে পাশাপাশি থাকি শুয়ে ;
এ ছাতের জল ও ছাতে গড়ায় ভিৎ গাড়া  একই ভূঁয়ে |
ওইখানে শেষ ; তার পরে আঁটা জানালা কবাট দুটি |
.                ভাড়াটে কুঠি ||

একদিন ফের ঘূর্ণিতে টানে, কোনখানে যাই ভেসে—
কিছু নাহি জানি, তবুও বিদায় নিয়ে চলি ম্লান হেসে |
যা ছিল আড়াল রহে চিরকাল বাধা নাহি যায় টুটি |
.                ভাড়াটে কুঠি ||

শুধু কোনো দিন সঙ্গবিহীন বিদ্রোহ করে প্রাণ ;
কঠিন দেয়ালে করাঘাত করে ঘুচাইতে ব্যবধান |
ঘোচে না আড়াল, ব্যাকুল হৃদয় মিছে মরে মাথা কুটি !
.                ভাড়াটে কুঠি ||

.                 ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বিরাট সেতু সে
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
কবির প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “প্রথমা” (১৯৩২) থেকে নেওয়া |


বিরাট সেতু সে এধারের সাথে ওধার জুড়িতে চায়,
.                                     সে সেতু হয়েছ পার ?
এ-ধারে তাহার আলো জ্বলে না ক’ ওধারে অন্ধকার ;
.                                     --- সেতু সে বৃহদাকার !

এধারে যাহার মাটির দম্ভ, ওধারে মাটির মায়া,
.                          পদতলে যার অশ্রুর মত জল,
সে সেতু নহে ক’ বিবাহ দেয়নি এপারে ওপারে ভাই,
.                                 রাখিবন্ধন নহে, শুধু শৃঙ্খল ;
এধারে ওধারে জুড়ে দিতে চায় কঠিন বাঁধনে ভাই—
.                                        সেতু সে বিপুল-বল !

.        ফুল হ’তে ফলে যে গোপন সেতু ---
.                        জানি রহস্য তার ;
.        তারা হ’তে তারা’ যে সেতু উতরে
.                        লঙ্ঘি অন্ধকার,
.        তারা সন্ধান মেলে কিছু কিছু ---
.                          নিশীথ রাত্র ভরি ;
.        শুধু এ সেতুর হেতু জানি না কো
.                          উতরিতে ভয়ে মরি |

সব কিছু সে যে পার হয়ে চলে তবু কোথা নাহি পার,
.                   তীর নাহি মিলে সেতু সে নিরুদ্দেশ !
কঠিন বাঁধনে সব কিছু বাঁধে তবু লাগে না ক’ জোড়া,
.                    যোজনার মাঝে বেদনার রহে রেশ !
সূর্য্যের পানে উদ্ধত তার যাত্রার শুরু ভাই,
.                     অতল আঁধারে উৎরাই তার শেষ !

বিরাট সেতু সে লঙ্ঘিতে চায় শিশির-কণিকাটিরে
.                         সে সেতু হয়েছ পার ?
এধারে তাহার বন্ধ্যা ধরণী, অন্ধ আকাশ শিরে,
.                        ----সেতু সে ব্যর্থতার ?

.                 ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মাটির ঢেলা, মাটির ঢেলা
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র
কবির প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “প্রথমা” (১৯৩২) থেকে নেওয়া |


মাটির ঢেলা, মাটির ঢেলা,
.        রঙ দিলে কে তোর গায়ে ?
গড়্ লে তোরে কোন্ আদলের ছাঁচে ?
ভুখ্ দিলে যে বুক দিলে যে
.        দুখ দিতে সে ভুলল না,
মৃত্যু দিলে লেলিয়ে পাছে পাছে |

কোন্ মেলাতে সাজিয়ে দিলে
.        বিকিয়ে দিলে কার হাতে ?
কোন্ খেয়ালির খেলনা তুই হায়রে !
.        কোলের পরে দুলিস্ কভু
.        মাটির পরে যাস্ পড়ে—
মলিন ধুলা লাগে সকল গায় রে !

আঘাত পেলে বুক ফাটে তোর
.        চোখের জলে যায় গলে,
চোট্ খেয়ে তুই লুটিয়ে পড়িস্ ভুঁয়ে |
.        কান্না হাসির দোলা লাগে,
.        রঙ যা কিছু যায় চটে,
বর্ষাধারায় যায় রে সে যায় ধুয়ে |

মাটির ঢেলা, মাটির ঢেলা,
.        ডাক্ ছে তোরে তোর মাটি,
.        টান্ ছে আপন স্নেহ-শীতল কোলে |
ঢেউ-এর পরে জীবন-ভেলা
.        এমন সেথা দুল্ বে না,
.        ভিড়্ বে না কো ভিড়ের হট্টগোলে |

ব্যাঘাত নাহি আঘাত নাহি
.        খাম্ খেয়ালির নেই খেলা,
.        নেইক মরণ-ভয়ের ভীষণ ভুরকুটি |
বৃষ্টি-পরশ সরস-দেহে
.        জাগবে তৃণ হয়ত রে,
একটি ছোট উঠবে কুসুম ফুটি |

মাটির ঢেলা মাটির ঢেলা
.        ভুল্ লে তোর চল্ বে না,
.        তুই যে মাটি চিরকালের মাটি |
হঠাৎ কারিকরের হাতে
.        যদি বা রঙ যায় লেগে,
.        মাটি রে তুই মাটিই তবু খাঁটি |

.                 ***************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর