কবি রাজলক্ষ্মী দেবীর কবিতা
যে কোন গানের উপর ক্লিক করলেই সেই গানটি আপনার সামনে চলে আসবে।
*
স্বপ্নজাল
রাজলক্ষ্মী দেবী

অনেকবার এরূপভাবে আমি
সবুজ বনে পাখীর পাখা দেখে,
স্বপ্ন, না কি সত্য, তার ফেরে,---
গোঁসাই, --- ভারি ভেজালে পড়েছিলাম।

দেড়-আঙুলে কাঠুরেটির হাতে
রক্তপূত বিজলী-হেন কুঠার।
হাতেম তাই, সিন্ধবাদ দেখে
মুকুরে মুখ। গাওনা জমে ভূতের।

ছায়াচ্ছন্ন স্বপ্ন-অন্ধকারে
খচাং চিমটি লাগাই হাতে পায়ে |
বেঁচে আছি, না ম’রে আছি, তা জানার
সেটাই নাকি অকৃত্রিম উপায় |

কিন্তু আমি স্বপ্ন ভেঙে জাগি
অন্যতর স্বপ্নেরই শয্যায় ;
ছাড়াই স্বপ্ন খোসার পর খোসা,
পৌঁছুই না বাস্তব মজ্জায় |

স্বপ্ন আছে স্বপ্নেরই কৌটায়,
স্বপ্ন-প্রর্দা ঢাকছে স্বপ্ন-পট |
রজনীদিন এমনিভাবে যাবে
জানলে --- আমি করব না ছট্ ফট্ ||

.         ******************          
.                                                                          
উপরে    




মিলনসাগর   
১।
২।
৩।
৪।
৫।
৬।
*
দ্রব্যগুণী
রাজলক্ষ্মী দেবী

দ্রব্যগুণী, অস্তিত্বের শুকনো ঘাস দু-হাতে চাপড়িয়ে
যে সুগন্ধ ব্যপ্ত করলে, আত্মাকে করলে অভিভূত,
তার জন্য কী কী দ্রব্য লাগে --- বলো, কোন্ মাপ দিয়ে
একত্রিত করলে, এই দিব্যগন্ধ! সে কোন বিদ্যুৎ
তোমার মন্ত্রের ডাকে সৃষ্টি করে --- আহা, দ্রব্যগুণী,
তাকে কেন চিরস্থায়ী করবে না ? কেমন অন্যায়,---
তোমার সুগন্ধ যদি উবে যায় | মানবাত্মা, শুনি
মারমুখো প্রকৃতির মাঝখানে প্রধান সহায় |
দ্রব্যগুণী, গুপ্ত ইচ্ছা শোনো | যদি হেন দ্রব্য লাগে :
গ্রহনক্ষত্রের ধুলো, চন্দ্রের শিকড় --- অনায়াসে
এনে দেব | চিরস্থায়ী দিব্যগন্ধ তবু যদি জাগে
বিশিষ্ট মাপের গুণে প্রাকৃতিক এ সমস্ত ঘাসে ||

.         ******************          
.                                                                          
উপরে    




মিলনসাগর   
*
কাঁকুলিয়া রোডের বেহালাদারকে
রাজলক্ষ্মী দেবী

ও বেহালাদার, তুমি এ-সব কঠিন তান
ছড়ে-ছড়ে টেনো না এখনই |
হিমাদ্রি-পর্বত যার ত্রিকোণ গাঁথুনি,--- সেই নিরাকৃতি ধ্বনি
ব্যক্ত করবে আজই ? কিছু ঊহ্য রাখো,---
কিছু রাখো অসম্পূর্ণ, দূর |
ও বেহালাদার,--- হালকা জীবনের উত্সবেই
ঢালবে তুমি এই সব সুর!

ও বেহালাদার, আমি দেখেছি সমস্ত গেলে
ঘাসের সবুজ রং থাকে,---
শ্লেট-মোলায়েম হাওয়া, ছপছপে অন্ধকার
ছোঁয় এসে নিভৃত আত্মাকে |
মীনাক্ষী-মন্দির যার চৌকোণ গাঁথুনি,---
সেই নিরাকৃতি ধ্বনি
চিরকাল থাকে | তুমি ছড়ে-ছড়ে সব তান
টেনো না এখনই ||

ও বেহালাদার, আছে মৃত্যু আছে, দুঃখ আছে আছে অন্ধকার |
কার হাত ধরে আমি সমস্ত বাধা এড়িয়ে
সে-প্রশস্ত তীর্থ হবো পার ?
কার হাত ধরে আমি সহস্রেক সিঁড়ি ভেঙে
সহসা দেখবো সূর্যপীঠ
ঝিলিঝিলি মিনারের জানালায় ?---
ঊহ্য রাখো, তুলে রাখো তোমার সংগীত |

তাদের বাজাতে দাও,--- তিনটে শব্দের মিলে
তারাফুল ঝরায় না যারা.---
শব্দের পায়ের নিচে কান পেতে
কোনোদিন শোনেনি নিঃস্তব্ধতার ধারা |
কৃত্রিম ফুলঝুরি দিয়ে তাদের সাজাতে দাও
জীবনের অলীক রাত্রিকে |
ও বেহালাদার,--- তুমি ছড়ো টান দিয়ো,
যদি ফুল দেবে মৃত্যুর যাত্রীকে ||

.         ******************          
.                                                                          
উপরে    




মিলনসাগর   
*
সন্তানেরা
রাজলক্ষ্মী দেবী

সন্তানেরা শাল-সেগুনের চারা, এখনো বাড়ে নি।
এখনো রোদ্দুরে ক্লিষ্ট, বৃষ্টিতে নড়বড়ে হয়ে, মুখে
চেয়ে থাকে। পোকা-কাটা উচ্ছন্নের সূচিকা অসুখে
করুণ অপেক্ষা রাখে। শাকাহারী শৃংগীদের শ্রেণী
দূরে রেখে বলয়িত দিগন্তে বেঁধেছি তাই বেড়া
শাল-সেগুনের চারা বাঁচাতে। সূর্যের আলো গায়ে,
পায়ে পলিমাটি, আর আশ্চর্যের বাতাস লাগায়ে
দিনে দিনে বাড়ে, যেন গোকুলে রাখাল-বালকেরা।

পরিকল্পনা-রা জানে শতাব্দীর অত্যল্প মেয়াদ।
শাল-সেগুনের চারা হয়তে বয়স্ক হবে কাল।
এবং আজকে যারা বর্ষায় গুনছে পরমাদ,
ঝড়ের সমুদ্রে তারা হেলায় উড়িয়ে দেবে পাল।
সাধের পালঙ্ক হবে, পালিকী হবে, কড়ি-বর্গা-ছাদ।
প্রাণের সবুজ রং আহ্লাদে, আশ্বাসে হবে লাল।

.                 ******************          
.                                                                          
উপরে    




মিলনসাগর   
*
যদি স্পর্শ করি
রাজলক্ষ্মী দেবী

যদি স্পর্শ করি,---তবে সহস্র বর্ষের ব্যবধান,---
অগ্নিবলয়ের মতো,---একে একে পার হবো আগে |
যেন স্পর্শে হৃদয়ের মূল ধ্রুবপদখানি থাকে,
---বিশ্বাস করি না আমি বিবিধ ঝংকার, ঐকতান |
.        ঋজুচোখে দেখতে যদি পাই হৃদয়ের মেরুদেশ,
.        অকম্পিত পদে হাঁটি হৃদয়ের বিষুবরেখায়,
.        যদি না লুণ্ঠিত হই শত বত্সরের পরিখায়,
.        ---যদি ছেড়ে দিতে পারি বিবিধ ভণিতা, ছদ্মবেশ |
ততোদিন মুক্ত তুমি, ততোদিন ফেরো ইচ্ছাসুখে,
ততোদিন প্রৌঢ়া হও বাসনার রসদ কুড়িয়ে |
স্পর্শগুলি আস্বাদন করতে হয় সস্নেহে জুড়িয়ে,
এমন উত্তাপ আছে প্রত্যেক রোমকূপের মুখে |
.        যদি স্পর্শ করি, তবে সহস্র বর্ষের যোগফল
.        শূন্য হবে | পার হবো স্বর্গ-নরকের মধ্যপথ |
.        সূর্য-চন্দ্রে ব্যবধান, সে তো শুধু অংগুলিবিঘত |
.        যদি স্পর্শ সত্য হয়,---সোনা হবে লোহার শিকল ||

.                   ******************          
.                                                                          
উপরে    




মিলনসাগর   
*
ভালোবাসা বিদেশী বাউল   
রাজলক্ষ্মী দেবী

যতক্ষণ দু’গোলাপ থাকে,
.        ততক্ষণ ভালোবাসা তোমার দুয়ারে
.                        শানাই বাজাবে।
.        কিন্তু যেই ঝরে যাবে ফুল,
.                চলে যাবে ভালোবাসা বিদেশী বাউল।


“দাঁড়া ভালোবাসা। থেমে থাক্ ভালোবাসা।
.        ঘর বেঁধে দেব তোকে, দেব দু’ বেলায় ভাত।”


.        যদি থেমে থাকে, তবে যাবে তার যাত।
তবে সে পাঙক্তেয় হবে সারিভোজনের দলে,
দেখা যাবে তার গলায় চেনা পৈতা ঝোলে।


.        যতক্ষণ আকাশে সুরভি থাকে,
.                ততক্ষণ ভালোবাসা স্বলক্ষণ, শুদ্ধ সুরে
.                শানাই বাজাবে।
.        তারপরে কেন বাঁধা যাবে ?
.                ঝরে গেলে বকুল পারুল,
.        চলে যাবে ভালোবাসা বিদেশী বাউল ||


.                   ******************          
.                                                                          
উপরে    




মিলনসাগর