বন্দিনী মেয়েটার জন্য দু’টুকরো    
সব্যসাচী গোস্বামী

১.
মাঝ বয়সের প্রেম
বন্দিনী মেয়েটার চোখের লবনাক্ত জলে
আশিরনখ ভিজে ওঠো তুমি

মাঝ বয়সের প্রেম
তাঁর চোখে চোখ রেখে দেখো
শৃঙ্খলিত দিন, বিপন্ন জন্মভূমি ...

২.
কাল সারা রাত ধরে কবিতাটির সাথে
সংগ্রাম চালিয়ে...
কাল সারা রাত ধরে শব্দ নিয়ে
কাটাকুটি খেলার পর দেখি,
ডাইরিতে তোমার জন্য পড়ে আছে
একটিই মাত্র শব্দ
‘ভালোবাসি ...’

.     ******************     
.                                                                               
সুচিতে...   


মিলনসাগর
কবি সব্যসাচী গোস্বামীর কবিতা
*
জংলী গাছের ফুলকে
সব্যসাচী গোস্বামী

জংলী গাছের ফুল, তুমি তাকিয়ে থাকো আমার দিকে একা
জংলী গাছের ফুল, তুমি দেয়াল ফুঁড়ে সূর্যকে হাতছানি
জংলী গাছের ফুল, তোমার মুক্ত আকাশ, বুকের দীর্ঘশ্বাসে
জংলী গাছের ফুল, তোমার পাতার বাহার নাকেতে নাকছবি
জংলী গাছের ফুল, তোমার শরীর ছুঁয়ে বৃষ্টি ঝরে পড়ে
জংলী গাছের ফুল, তোমার বুকের ভিতর ছিন্নপাতার ব্যথা
জংলী গাছের ফুল, তুমি দাঁড়িয়ে থাকো সকাল-সন্ধ্যাবেলা
জংলী গাছের ফুল, তোমার গভীর দু’চোখ করছে টলমল
জংলী গাছের ফুল, তোমার মুখের রেখায় বিষাদ ঘন মেঘ
জংলী গাছের ফুল, তোমার স্বপ্নে বাজে ধামসা-মাদল বোল
জংলী গাছের ফুল, তোমার হৃদয় জুড়ে পাকা ধানের ক্ষেত
জংলী গাছের ফুল, তুমি ভিড়ের মধ্যে আমার একলা থাকা ...

.                   ******************     
.                                                                               
সুচিতে...   


মিলনসাগর
*
চল্‌ মেয়ে চল্‌
সব্যসাচী গোস্বামী

গ্রাম্য বালিকা         নস্টালজিক          উঠোনেতে মাখা জোছনায়
বুকের ভিতর        কষ্ট আটকে          দু’চোখের জল মোছ না!

খাতা লেনদেন        মন দেয়ানেয়া        খুনসুঁটি আর পদ্য।
চুলের ফিতেয়        বিকেলের রোদ      ঝরে ঝরে পড়ে সদ্য।

নিষেধাজ্ঞার          পাঁচিল ডিঙিয়ে        স্বপ্ন দেখার স্পর্ধায়
দু’জনাতে মিলে     টান দিয়ে ছিঁড়ি        অন্ধকারের পর্দা।

চল্‌ মেয়ে চল্‌        হেঁটে হেঁটে যাই        ঝড়ের সঙ্গে যুদ্ধে,
যৌথ সফরে          দু’হাতে সরাই         যত আছে অবরুদ্ধ।

.                      ******************     
.                                                                               
সুচিতে...   


মিলনসাগর
*
কিছু কবিতা
সব্যসাচী গোস্বামী

কিছু কবিতা শুধুই তোমার,
কিছু কবিতা সবার জন্য।
কিছু কবিতা কষ্টমাখা
মায়ের চোখের জল মেশানো।

কিছু কবিতা ছোট্ট মেয়ের
দুষ্টুমি আর খুশির হাসির।
কিছু কবিতা প্রতিবেশী
একসাথে বসে পাশাপাশি।

কিছু কবিতা স্মৃতি মন্থন,
কিছু কবিতা সদ্য লেখা।
কিছু কবিতা বার্তা শোনায়
লড়াই করে লড়াই শেখার।

কিছু কবিতা তাঁদের নিয়ে
আত্মত্যাগী শহীদ যাঁরা।
কিছু কবিতা তাঁদের জন্য
দুনিয়াটাকে গড়ছে যাঁরা।

কিছু কবিতা রাজদ্রোহী,
কিছু কবিতা ‘হেই মারো টান’--
দু’হাত দিয়ে ভাঙছে শেকল
আঁকড়ে বুকে রক্ত নিশান...

.       ******************     
.                                                                               
সুচিতে...   


মিলনসাগর
*
আমরা দু’জন, আরো অনেক, অনেক মানুষ
সব্যসাচী গোস্বামী

আমরা করি ঝড়ের বুকে আগুন খেলা
মেঘলা রাতেও আমরা পোড়াই আতসবাজি
আমরা আনি দারুণ শীতেও বসন্তকাল
আপোস নিয়ে বাঁচার চেয়ে, মরতে রাজি।

দারুণ ত্রাসেও আমরা বাঁচি কবিতা খাতায়,
মৃত্যুশীতল হাতছানিতেও স্বপ্ন দেখি
হাঁটতে পারি ক্লান্তি নিয়েও অনেকটা পথ
কোনটা আসল, কোনটা মেকী চিনতে শিখি।

আমরা দু’জন, আরো অনেক, অনেক মানুষ
স্বপ্ন ছুঁয়ে হাঁটতে থাকি মাটির টানে
হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম মাটির গভীর
হাত মেলেছি, এবার আকাশ ছোঁয়ার পালা...

.              ******************     
.                                                                               
সুচিতে...   


মিলনসাগর
*
সুযোগ পেলেই
সব্যসাচী গোস্বামী

সুযোগ পেলেই
ভাত খেয়ে নাও পেট পুরে

সুযোগ পেলেই
বুক ভরে নাও অক্সিজেন

সুযোগ পেলেই
ঘুমিয়ে নিও ক্লান্ত চোখ

সামনে পাহাড়
এখনো বাকি অনেক পথ

বাধার পাহাড়
ডিঙোতে হবে লক্ষ্য স্থির...

.    ******************     
.                                                                               
সুচিতে...   


মিলনসাগর
*
মা’কে লেখা চিঠি
সব্যসাচী গোস্বামী

কত কবিতা তোমার জন্য লিখি।
ছিঁড়ে ফেলি আরো কতশত।
তোমায় নিয়ে ভাবতে বসে, মাগো
চোখে ভাসে বিষণ্ণ মুখ যত।

যা আসে লিখি, লিখে ফেললেই হ’ল।
মনে কী আসে, বুঝি না দু’চ্ছাই!
ভালো লাগলে যত্ন করে রাখি,
না লাগলে তা ছিঁড়েই ফাতরাফাই!

লেখায় খুঁজি বসতি, জনপদ।
গাঁয়ের পুকুর, খাপলা জালের মাছ।
ক্ষেতের আলে লাগে নাগরিক ছোঁয়া,
দু’দিকে দুই তাল-খেজুরের গাছ।

একটু দূরে সোনালী চতুর্ভুজ,
হৃদয় খুঁড়ে উঠছে উড়ালপুল।
জলে পড়েছে শপিং-মলের ছায়া।
রূপনগরীর হাওয়ায় ওড়ে চুল।

বাজারে আগুন, ফুটপাত শুন্‌শান্।
বানিয়া আসে বিদেশ থেকে উড়ে।
বিজ্ঞাপনী সংস্কৃতির তালে,
লাস্যময়ী নাচে দেয়াল জুড়ে।

দেয়ালের গায়ে রক্তের দাগ লাগে,
সবুজ শিকারী বসে আছে ওৎ পেতে।
তাদের ঠোঁটে ঝরে লোভের লালা,
বিষ লেগেছে হলুদ ধানের ক্ষেতে।

লোভের বিষ প্রোমোটারের চোখেও,
মাথায় ধরা ‘উন্নয়নে’র ছাতা।
মহাকরণের ঠাণ্ডা ঘরে বসে
অংক কষে নাগরিক কোলকাতা।

গাঁয়ে বসেছে মোবাইলের টাওয়ার,
মুঠোর মধ্যে দুনিয়াকে ভরে রেখে
সম্পর্কের সূক্ষ্ম তন্তুজালে
নীল হয়েছে ভোগবাদী বিষ মেখে।

মহাজনের লোভের চোখে ক্ষেত।
গোলার ফসল ঋণের হাতে বাঁধা।
মাটি শুকোয়, কলজে শুকোয় মাঠে,
বেঁচে থাকাই মস্ত গোলকধাঁধা।

দাম ফেলেছে পাটের আড়তদার।
পাটচাষিদের ক্ষিদের জ্বালা পেটে।
বাজল বাঁশী ছুটির জানান দিয়ে,
মিটিং আছে জুটমিলের গেটে।

মিটিংয়ে লোক উপচে পড়ে ভিড়ে,
গেটে ঝুলেছে লক-আউটের তালা।
বক্তিমেতে নেতার ভরে পেট,
মাইক বাজে, কান যে ঝালাপালা।

মিলের গেটের হকার ইয়াস্‌মিন,
নিত্যগোপাল চায়ের দোকানদার,
কাজ বন্ধ, বিক্রি অনিশ্চিত,
তাঁদের চোখেও ঘনায় অন্ধকার।

শাসক নাচেন আই.পি.এলে’র তালে,
কালো টাকা সুইস ব্যাঙ্কে জমে।
দেদার বিকোয় শচীন- শাহরুখ খান।
আমরা মাতি ক্রিকেট দেশপ্রেমে।

লোভের ছায়া দীর্ঘতর হয়,
দু’দিক দিয়ে বাড়িয়ে দেয় হাত।
আঁকড়ে থাকি জমি, বসত, গ্রাম।
নিকষ কালো অন্ধকার রাত।

রাত গিয়েছে ভোরের পথে বেঁকে।
সূর্য ওঠে পূর্ব দিঘির পার।
স্বপ্ন দিল সূর্যকে হাতছানি,
হাতে হাতে ফেরে গোপন ইস্তাহার।

রক্তচক্ষু নিষেধ করে, তবু
মনের কথা গোপন রাখা দায়।
এমুখ থেকে ওমুখ, হাজার মুখে
বিদ্রোহের বার্তা পৌঁছে যায়।

কত কবিতা নতুন করে লিখি,
কত কবিতা ছিঁড়েই ফাতরাফাই।
কলম-খাতা বুকে আগলে চলো
মা-ছেলেতে বিদ্রোহেতে যাই।

দু’জন মিলে বিদ্রোহেতে যাই!

.    ******************     
.                                                                               
সুচিতে...   


মিলনসাগর
*
রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস
সব্যসাচী গোস্বামী

যেখানে পথ গিয়েছে বেঁকে
যেখানে গোধূলির হাতছানি
যেখানে আকাশে রামধনু
যেখানে সাদা মেঘের ভেলা

যেখানে সূর্য অস্ত যায়
যেখানে সন্ধ্যাতারা ওঠে
যেখানে সকাল শিশির মাখা
যেখানে ক্লান্ত বিকেলবেলা

যেখানে হঠাৎ বৃষ্টি নামে
যেখানে মাটির গন্ধ সোঁদা
যেখানে শান্ত গাছের ছায়া
যেখানে শৈশব-ছেলেবেলা

সেখানে হঠাৎ নামে রাত
নিঃঝুম পুলিশভ্যানের রাত
সেখানে বসে আমার মা
মুখে বিষাদ জোছ্‌না...

.    ******************     
.                                                                               
সুচিতে...   


মিলনসাগর
*
নভেম্বর বিপ্লব : বন্দিনী মেয়েটির চোখে
সব্যসাচী গোস্বামী

বহতা সময় বর্ষার মতো অস্থির
কবিতা খাতায় জমে ওঠে নৈঃশব্দ
হৃদয় মুক্ত, দূরের পৃথিবী আবছা
নিষেধাজ্ঞার প্রাচীরেতে অবরুদ্ধ।

জীবন এখালে সরল অপাপবিদ্ধ
আলো থেকে দূরে বিবর্ণ আর প্রান্তিক
ঘড়ির কাঁটার গতিও এগোয় মন্থর
গুমোট বাতাস শৃঙ্খলে বাঁধা শান্তি।

এপারে পৃথিবী কর্মবিমুখ, ক্লান্ত
ওপারে পৃথিবী কোলাহলময়, উত্তাল
বন্দি মেয়ের শেকল ভাঙার স্বপ্নে
সমাজতন্ত্র : নভেম্বরের সকাল...

.        ******************     
.                                                                               
সুচিতে...   


মিলনসাগর
*
আজ নয় কাল, অথবা পরশুদিন
সব্যসাচী গোস্বামী

যতই দেখাও শাসনের তর্জনী
গোপনে গোপনে যতই দেখাও ভয়
আজ নয় কাল, অথবা পরশুদিন
তোমার জন্য লেখা আছে জেনো, নিশ্চিত পরাজয়।

যতই দেখাও হাড়হিম করা ত্রাস
লাঠি, বন্দুক, কালা কানুন কি জেল
আজ নয় কাল, অথবা পরশুদিন
সাঙ্গ হবেই তোমার সকল শোষণ, জুলুম, খেল্‌।

জনতাকে দাও যতই ঘোড়ার ডিম
নিষ্ঠুর মুখ যতই লুকাও স্নো-পাউডার ক্রিমে
আজ নয় কাল, অথবা পরশুদিন
তোমার সময়, তোমার শাসন যাবেই যে অন্তিমে।

যতই দেখাও মিছরি মাখানো ছুরি
মুখোশের নিচে যতই লুকাও ভণ্ডামো, কপটতা
আজ নয় কাল, অথবা পরশুদিন
ইতিহাস হবে - তোমার ধ্বংস, জনতার বীরগাথা।

.               ******************     
.                                                                               
সুচিতে...   


মিলনসাগর
*