*
শচীন্দ্রনাথ সেনের কবিতা
মজার দেশ

.        (১)
সাগরের মাঝে এক দ্বীপ আছে
বড়ই একটি মজার দেশ,
কত যে নূতন, তাহার ধরণ
বলিলে কভু তা হয় না শেষ |


.        (২)
মানুষেরা যত মাছেদের মত
বাস করে সব জলের মাঝে,
মাছেরা ডাঙ্গায় ঘুরিয়া বেড়ায়
ব্যস্ত হয়ে সবে নানান কাজে |


.        (৩)
সেথা রেলগাড়ী দেখ সারি সারি
ছুটিছে নদী ও সাগর জলে,
স্টীম বোট গুলো উড়াইয়া ধূলো
রাজ পথে সব ছুটিয়া চলে |


.        (৪)
গাছ হতে ঝরে টুপ্ টাপ্ পড়ে
লেডিকেনি আর পানতোগুলি,
পথের কাঁকড়, বোঁদে মিহিদানা
সন্দেশ, চিনি, কাঁদা ও ধূলি |


.        (৫)
ঘরের দেয়াল গজা দিয়ে গাঁথা
শিড়ি গাঁথা সোন-পাপড়ি-ইটে,
ছানার গদিতে পরটা বিছান
বালিশটা পাটিশাপটা পিঠে |


.        (৬)
ট্রাম বাসগুলো উড়িয়া বেড়ায়
বিমানেরা বাঁধে গাছেতে বাসা,
ডিম পেড়ে সেথা তাও দিয়ে তারা
ছানা ফুটাইবে মনেতে আশা |


.        (৭)
রুই মাছগুলো ডেপুটি হাকিম,
বৌএরা তাদের কাৎলা রাণী,
শাড়ী পরে তারা ঘোমটা না দিয়ে
ঘুরাইয়া টেনে আঁচলখানি |


.        (৮)
কেরাণী বাবুরা খলসে ও কই
শিংগীরা পাহারা সঙ্গিন হাতে
মাগুর মাছেরা দারোগা থানার
ডাইরি লিখিছে বইয়ের পাতে |


.        (৯)
বিড়ালেরা সেথা তপস্বী হইয়া
মালা টিপে করে হরির নাম
ইঁদুরেরা সেথা ফেরি করে হাঁকে
ডালা নিয়ে মাথে ল্যাংড়া আম |


.        (১০)
আরো আছে কত মজার সে দেশে
ভাবিলে অবাক হইবে তুমি |
রবির আলোয় ঝলমল রাতি
দিনেতে সেখানে আঁধার ভূমি |


.        (১১)
এ মজার দেশে যেতে যদি চাও
হাওয়া চেপে যেও হাওয়াই দ্বীপে,
দিনে কভু নয়, রাতে যেও সেথা
নতুবা সবাই যাইবে খেপে |


.       ****************                                      
সুচির পাতায়    
মিলনসাগর
*
নূতন খবর

১ তারা প্রসন্ন সেন মূলঘরে এসে ফিরে
বাপের ভিটায় সুখে ঘুমিয়েছে চিরতরে |

২ কালীবাড়ী ছেড়ে ঘট পশ্চিম বঙ্গে
ছেলে মেয়ে বৌদের নিয়ে গেছে সঙ্গে |
নূতন খবর আর বিশেষ কিছু নাই
আশাকরি দেখা হবে ওদিকে যখন যাই |
ব্যাসদেব আজ তবে লইলেন বিশ্রাম
মাঝে মাঝে পাই যেন তব চিঠি প্রাণারাম |

.       ****************                                          
সুচির পাতায়   


মিলনসাগর
*
ঘুম পাড়ানীর গান

লীগ এল রে লীগ এল রে
.                পড়লো গ্রামে সারা
লালী ঘুমালো গ্রাম জুড়ালো
.                ঠাণ্ডা হলো পাড়া |
পাড়ায় পাড়ায় পড়ে গেছে
.                লীগ ঠেকাবার ধুম,
ভয়েতে তাই পালিয়ে গেছে
.                লালীর চোখের ঘুম |
আর ভয় নাই ঘুমোও লালী
.                পালিয়ে গেছে তারা
লালী ঘুমালো গ্রাম জুড়ালো
.                ঠাণ্ডা হলো পাড়া |

.       ****************                                        
সূচির পাতায়   


মিলনসাগর
*
মেয়ের বাড়ী

মূলঘর হতে মেয়ের বাড়ী
বালীঘাটের বাসা
গঙ্গাপারে আসবো ভারী
অনেক দিনের আশা |
কিছুতে আর হয় না সুযোগ
কাজ বেড়ে যায় মেলা
বাড়ীর বেড়া হয় না কো শেষ
হয় না কুটোর পালা |
পাই না কৃষাণ কাটে না গাছ
কাঠে কি যে হবে
একখানা কাঠ নেই কো ঘরে
উনোনে যা দেবে |
এরূপ কত কাজের হিসাব
নিত্তি এসে জমে
বালীঘাটে আসার আশা
ক্রমেই এলো কমে |
দুমাস আগে ঘুরে গেছেন
গিন্নী বালী হতে
বাসার কথা শুনে লোভটা
হচ্ছিল খুব যেতে |
যা হোক শেষে সুযগ একটা
হঠাৎ গেল মিলে
মিদনাপুরে কেষ্টা যাবে
নরেন বাবুর ছেলে |
তারি সাথে বালীঘাটে
আসবো হলো ঠিক
দুদিন বাসায় থেকে যাবো
মিদনাপুরের দিক |
অন্ধ আমি সঙ্গ আমার
নয়কো তেমন ভালো
কষ্ট করে কেষ্ট কিন্তু
নিয়েই আমায় এলো |
হেথায় এসে আনন্দেতে
দিনগুলি বেশ কাটে
মাঝে মাঝে অতীষ্ঠ হই
গল্প বলার চোটে |
বুড়ো রঞ্জন কচি ডলি
চারদিক হতে জুটে
ঘিরে ধরে এমনি ভাবে
নেবেই যেন লুটে |
গঙ্গাপারের মুক্ত হাওয়ায়
রোজই জুড়ায় প্রাণ
ছাদোর পরে গল্পে করি
সন্ধ্যা অবসান |
গঙ্গাস্নানে সকালবেলা
করি পাপের ক্ষয়
দক্ষিণেশ্বর কালীর কোলে
গঙ্গা সুখে বয় |
কালী মন্দির বাসা হতে
রোজই ভোরে দেখি
বেলুর মঠও খুবই কাছে
দেখার আশাও রাখি |
এসব ছাড়া আরও আছে
দেখার জিনাষ কত
গঙ্গার উপর রোজই নামে
Sea plane রা যত |
ওয়েলিংডন ব্রিজটি গেছে
বাড়ীর পাশটি ঘেঁষে
দিবারাত্র ট্রেনের শব্দ
আসছে কানে ভেসে |
ব্রিজের উপর গাড়ীগুলি
যখন চলে ছুটে
শব্দে কানে তালি লাগে
বুকট্ ওঠে কেঁপে |
গঙ্গা হতে Sea plane রা
যখন উঠে যায়
শব্দে তাহার বাড়ীখানি
কাঁপিয়ে দিয়ে যায় |
বাসা হতে খুব দূরে নয়
গঙ্গার বাঁধা ঘাট
শিব মন্দির আছে দুটো
স'শিব বিরাট |
গ্র্যাণ্ড ট্রাঙ্ক রোড বাসা হতে
বেশী দূরে নয়
বাসগুলি সব ওই পথেতেই
হাওড়া পানে যায় |
বাসার কাছেই বালীঘাট
স্টেশনখানি আছে
শিয়ালদহ এসে গেছে
তাতেই বাসার কাছে |
ওদিক্ আবার পশ্চিমেতে
একটু দূরেই বালী
আধঘন্টা পরে পরে
ছুটছে গাড়ীগুলি |
কতক হাওড়া যায়
কতক ব্যাণ্ডেল
যাত্রীরা ঝুলিয়া যায়
ধরিয়া হ্যাণ্ডেল |
সব দিকে সুখ আছে
দুঃখ নাই ভাই
দুঃখ শুধু যবে দেখি
ঘরে আলো নাই |
কেরোসিন মেলে নাকো
প্রয়োজন মত
কাপড় বাজার হতে
উড়ে গেছে যত |
টাকা দিয়ে মেলে নাকো
কাপড় কেরোসিন
বল দেখি গৃহস্থের
কিসে কাটে দিন |

.       ****************                                        
সূচির পাতায়   


মিলনসাগর
*
২৫শে বৈশাখ

.                (১)
আবার আসিল সেই পঁচিশে বৈশাখ,
যেদিন জন্মিলা রবি, আমাদের বিশ্বকবি,
বাজিয়া উঠিল বিশ্বে মাঙ্গলিক শাঁখ |
আবার আসিল সেই পঁচিশে বৈশাখ |

.                (২)
আবার আসিল সেই পঁচিশে বৈশাখ
কত ভক্ত, কত শিষ্যে, আপন করিলে বিশ্বে
তোমার কবিতা দিল জগতেরে ডাক
আবার আসিল সেই পঁচিশে বৈশাখ |

.                (৩)
ফিরে কি আসিল পুনঃ পঁচিশে বৈশাখ ?
করে আজ ভক্তগণ, তব পূজা আয়োজন,
সেথা তুমি না এলেও শুনি তব ডাক
আবার আসিল সেই পঁচিশে বৈশাখ |

.                (৪)
আজি পুনঃ এল ফিরে পঁচিশে বৈশাখ
তোমার অক্ষয় স্মৃতি, তব ভালবাসা প্রীতি
অক্ষয় হইয়া মনে চির দিন থাক |
এল ফিরে আজ পুনঃ পঁচিশে বৈশাখ |

.                (৫)
এসো ফিরে এসো আজ পঁচিশে বৈশাখ
কবির কবিতাগুলি গাহিয়া সেসব ভুলি
অন্য কথা মন হতে আজ মুছে যাক
কবির ও জন্মদিন পঁচিশে বৈশাখ |

.                (৬)
বরণীয় দিন এই পঁচিশে বৈশাখ
এই দিনে এল কবি ভারত গৌরব রবি,
এদিন ভুলো না কেহ মনে জেগে থাক |
তবেই সার্থক হবে পঁচিশে বৈশাখ |

.       ****************                                        
সূচির পাতায়   


মিলনসাগর
*
২২শে শ্রাবণ

আজি পুনঃ এল ফিরে ২২শে শ্রাবণ
এই দিন বিশ্বকবি, জগৎ বরেণ্য রবি
গিয়াছেন অস্তাচলে তাই কাঁদে মন |
সত্য কি গেছেন তিনি আমাদের ছেড়ে ?
যান নাই কোনখানে আছেন সবার মনে
রয়েছেন শিশুদের কচি প্রাণ জুড়ে |
তবে কেন তাঁর তরে কাঁদে প্রাণ মন,
তিনি তো জাননি চ'লে, মোরাও যাই নি ভুলে
তবু কেন মনে পড়ে ২২শে শ্রাবণ
সেদিনের কথা যে গো পারিনা ভুলিতে
স্মরি তাঁরে ব্যথা পাই, মনে হয় তিনি নাই
ছবি তাঁর তাই আঁকি লেখনি তুলিতে |
তাঁর এই মৃত্যু দিনে এস ভাই বোন
মিলি সবে ভক্তি ভরে, দানি অর্ঘ্য আজি তারে
পড়ি এস কাব্য তাঁর ২২শে শ্রাবণ |
তব আশির্ব্বাদে ভরি ব্যথাতুর মন
গাহিয়া তোমার গান পুষ্পমাল্য করি দান
সার্থক করিয়া তুলি ২২শে শ্রাবণ |

.       ****************                                        
সূচির পাতায়   


মিলনসাগর
*
কবি দাদুর জন্মদিনে

কবি দাদু রবীন্দ্রের আজি জন্মদিনে
মিলিত হয়েছি মোরা সব ভাই বোনে |
কেহ আনিয়াছি ফুল কেহ পুষ্প মালা
সাজায়ে এনেছি কহ বরণের ডালা |
কেহ বা এসেছি লয়ে মাঙ্গলিক শাঁখ
কবির এ জন্মদিন পঁচিশে বৈশাখ |
এই দিনে বিশ্বকবি জগৎ উজলি
বাংলা মায়ের কোলে এসেছিল চলি |
জনম লভিয়া তুমি এই শুভ দিনে
বঙ্গ জননীরে ঠিক নিয়েছিলে চিনে |
তোমার লেখনি হতে ঝরে কাব্য সুধা
জগৎ বাসীর আজ মিটিয়াছে ক্ষুধা |
তব গান এনেছিল বিশ্ব করি জয়
নোবেলের পুরস্কার তারি পরিচয় |
পঁচিশে বৈশাখ মোরা করিতে স্মরণ
করিয়াছি আজি হেথা ক্ষুদ্র আয়োজন |
তোমারে যে দিব আজ কি আছে মোদের
ভক্তি অর্ঘ্য নিয়ে তাই আসিয়াছি ফের |
আজ তুমি নাই বটে আমাদের মাঝে
তবু যেন দেখি তোমা অভিনব সাজে |
এস ভাই এস বোন আজি শুভ দিনে
ভরে রাখি মন, তাঁর কবিতা ও গানে |
যেমন গঙ্গার পূজা করি গঙ্গাজলে
তাঁরি দেওয়া অর্ঘ্য দেই তাঁরি পদতলে |
তব এই জন্মদিন পঁচিশে বৈশাখ
তোমার আশিষ প্রতি মনে জেগে থাক |


.       ****************                                        
সূচির পাতায়   


মিলনসাগর
*
(খুড়োর জন্য) শোকের গীতি


খুড়োর বাডীর চারদিক হতে
.                অশ্রুবারি ঝরে
খুড়ো শূণ্য বাড়ী খুড়ীর
.                প্রাণ যে কেমন করে |
যদিও খুড়োর বয়স হলো
.                ছিয়াত্তরের ঘরে
কোথায় গোলে কোথায় গেলে
.                বাড়ী ঘর আজ সকল ফেলে
খুড়ী যে আজ তোমার তরে
.                কেঁদে কেঁদে মরে |
যদিন তুমি বেঁচে ছিলে
.                খুড়ী যেন ফেলতো গিলে
ঝগড়াঝাটি চলতো বাড়ী
.                দিন রাত্রি ধরে |
খুড়োর বাড়ীর চারধার হতে
.                অশ্রুবারি ঝরে |
পুকুর তোমার কেঁদে কেঁদে
.                গাইছে গাঁথা গো
মাছগুলো যে কাঁদে খুড়ো
.                রইলে কোথায় গো |
কোথায় খুড়ো কোথায় খুড়ো
.                কাঁদছে দেশের ছেলে বুড়ো |
তোমার বসার খাটখানি যে
.                একলা থাকে পড়ে
খুড়োর বাড়ীর চারদিক হ'তে
.                অশ্রুবারি ঝরে |
তোমার সে সব রুগীগুলো
.                হাতে নিয়ে কলা মুলো
তোমায় দেখতে না পেয়ে সব
.                খুন্ন মনে ফেরে |
তোমার সাধের ডিসপেনসারি
.                রতন যে আজ মালিক তারি
রাম বাণ আর ভাজা বটি
.                বানায় রোগীর তরে
খুড়ো শুণ্য ঘরে রতন
.                কবিরাজী করে |
খুড়োর বাড়ীর চারদিক হতে
.                অশ্রুবারি ঝরে |
খুড়োর হুকো কলকেগুলো
.                দখল সুত্রে রতন পেল
তামার ভরে সদাই সে তাই
.                ভুড়ুক ভুড়ুক করে
এটাও তার প্রাপ্য ছিল
.                কবিরাজীর তরে |
বাড়ীর শোভা সকল গেছে
.                খুড়ীও আজ নেইকো বেঁচে
খুড়োর আত্মা দেখে সবাই
.                হা হা করে মরে
খুড়োর বাড়ীর চারদিক হতে
.                অশ্রুবারি ঝরে |

(মৃত্যু ৩০শে কার্ত্তিক বেলা ১২টা, ১৩৫০)


.       ****************                                        
সূচির পাতায়   


মিলনসাগর
*
জয়ের আনন্দ

হিটলার কে হারিয়ে দিয়ে
মোদের রাজা ফিরছে দেশে
খবর পেয়ে মোরাও হাসি
আনন্দে যায় বাংলা ভেসে |

.                ইটালী আর ফ্রান্সকে জিতে
.                লাখে লাখে সৈন্য নিয়ে
.                বৃটেন এবার নৌবহরে
.                আসছে ভারত সাগর দিয়ে |

হিটলার তার দলটি নিয়ে
যাচ্ছে নাকি স্পেনের দিকে
এই সুযোগে রাশিয়ারাও
জার্মানীতে গেছে ঢুকে |

.                জাপান নাকি আসাম ছেড়ে
.                বাংলার দোরে নাড়ছে কড়া
.                সাহস তাহার অসীম বড়
.                এবার খাবে ভীষণ তাড়া |

বাংলা জুড়ে যুদ্ধ ক্ষেত্র
তাদের তরেই হচ্ছে পাতা
খবর পেয়ে গর্বে মোদের
উঠছে ফুলে বুকের ছাতা |

.                আকাশ ছেয়ে উড়বে বিমান
.                বুম বুম বুম ফাটবে বোমা
.                গুড়ুম গুড়ুম গর্জি কামান
.                আঁধার করে উড়বে ধূলো |

খেয়ে তাড়া বার্মা ছেড়ে
দেশে জাপান ফিরে যেতে
সৈন্য বোঝাই জাহাজ ডুবে
মরবে আমেরিকার হাতে |

.                ভাবতে ভালো লাগছে খুবই
.                দেখলে লাগে আরো ভালো
.                কিন্তু ইহার দুঃখ যাহা
.                ভেবে হচ্ছি ভয়েই কালো |

প্রথম চোটেই ছাড়তে হবে
নিজের দেশ ও নিজের বাড়ী
"সৈন্য থাকবে দেশ ছেড়ে দাও"
সমর আইন হবে জারি |

.                তারপরে যা ঘটবে তাতো
.                খুব সহজেই বুঝতে পারো
.                ছেলে মেয়ের হাতটি ধরে
.                গাছের তলায় উপোস কর |

যদি বা কেউ রেহাই পাও
এই সামরিক আইন হতে
মিলিটারির খোরাক দিয়ে
নিজেরা সব মরবে ভাতে |

.                ভাবতে পারো অবস্থাটা
.                দেখবে যাহা চোখের আগে
.                কাটবে সবার অনাহারে
.                মুক্ত হাওয়ায় রাত্রি জেগে |

এখন তবু আছি ভালো
কেরোসিন নুন চিনি বিনে
পাইনে রেশন ছ'গুণ দামে
বাজারে তা খাচ্ছি কিনে |

.                আছি তবু নিজের ভিটে
.                বিছানাতে ঘরে শুয়ে
.                এর তুলনায় ভাবো সেদিন
.                যেদিন শুতে হবে ভূয়ে |

সবই যাবে সহ্য হয়ে
কারণ মোরা স্বাধীন নয়
গায়ের চামড়া শক্ত মোদের
কিছুতেই আর নেইকো ভয় |

.                যুদ্ধ জয়ের ক্ষতি পূরণ
.                হবে কতক বাংলা হতে
.                তাতে যদি খেতে না পাই
.                নাইবা পেলাম ক'দিন খেতে |

তবু মোরা রইব বেঁচে
জাপানীদের বোমা হতে
সাহস নাহি পাবে গো আর
ভারতটাকে কেড়ে নিতে |

.                মার্কিন আর বৃটেন মিলে
.                উড়িয়ে দিবে সাগর পারে
.                ধান চাল সব সস্তা হবে
.                বর্ষা আবার আসবে ফিরে |

আপাততঃ এই আনন্দে
বুকটা মোদের উঠছে ভরে |
গাও সবে আজ বৃটেনের জয়
দুহাত তুলে ঘুরে ঘুরে |


.       ****************                                        
সূচির পাতায়   


মিলনসাগর
*
আদর্শ চেষ্টা

মিয়ার বাড়ী বিরাট ভোজের হচ্ছে আয়োজন
কাজী মোল্লা এলেন বহুত পেয়ে নিমন্ত্রণ |
মুক্ত মাঠে খাবার জায়গা তৈরী হলো বেশ
নৌকা ভরে ডাল ও গোস্ত রান্না হলো শেষ |
সবাই যখন সারি বন্দী বসল মাঠে খেতে
কাজী মোল্লা নবাব ফকির উল্টো পাতা পেতে |
ঠিক তখনই বিপদ একটা ঘটল অকস্মাৎ
শকুন একটা ডালের নৌকায় করল বিষ্ঠাপাত |
ভোজের সভায় খবর গেল খাওয়া হলো বন্ধ
মৌলবী কন "দেখ দেখি ডালে কি কয় গন্ধ ?"
গন্ধ শোঁকে সবাই তখন নৌকার কাছে কাছে,
মৌলবী কন নিকটে কি হিন্দুর বাড়ী আছে ?
বড় মেয়া বলেন "কাছেই শিরোমণির বাড়ী"
মৌলবী কন "যাও তো কেহ সেথায় তাডাতাড়ি |
জেনে এসো এরূপ হলে তারা করেন কি
ফেলে কি দেয় ডালের সাথে মশলা আরও ঘি |"
ছুটল তখন করিম মেয়া শিরোমণির বাড়ী
খান না তারা শুনে সভায় ফিরল তাড়াতাড়ী |
আন বৈঠে ভাই দে ঘুটে সব মৌলবী কন হেঁকে
হিন্দুরা যা খান না তা খেতেই হবে রেখে |
বিষ্ঠা ঘোটা ডাল দিয়ে সব খাওয়া হলো শেষ |
ব্যাপার শুনে শিরোমণিও আমোদ পেলেন বেশ |


.       ****************                                        
সূচির পাতায়   


মিলনসাগর
*
আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে
১লা আষাঢ় ১৩৫৪

আজি আষাঢ়ের প্রথম দিবসে
.                কবি কালীদাসে পড়িল মনে,
অলকায় তিনি "মেঘদূত" রূপে
.                পাঠায়েছিলেন এমনি দিনে |
বিরহী যক্ষ বিনাইয়া কত
.                অলকার পথ চিনালো তারে,
তারি অনুরোধে নব জলধর
.                কত গিরি বন বেড়ালো ঘুরে |
নির্বাসিত হ'য়ে রাম গিরি ব'সে
.                যক্ষ তাহার প্রিয়ার ছবি
আঁকিল যে রূপে মেঘদূত পাশে
.                ভাষা দিল তারে অমর করি |
অতীত যুগের সেই দিন হতে
.                আজো সেই মেঘ মরিছে ঘুরে
খুঁজিয়া ফিরিছে অলকার পথে
.                যক্ষের প্রিয়া কোন সে দূরে |
ম'রে গেছে কবি কত যুগ হ'লো
.                মেঘদূত তার মরে নি সেযে
বাঁচিয়া রহিবে যুগ যুগ ধরি
.                বাঁচাতে কবিকে জগৎ মাঝে |
র'চে মেঘদূত কবি কালীদাস
.                উজ্জয়ীনির কোন সে কোণে
শত শত যুগ পরেও আজিকে
.                জগৎ তাহাকে তেমনি চেনে |
দেখি না বটে কবিকে আমরা
.                কোনো ক্ষোভ তাতে করি না আর
সকলি পেয়েছি হারাইনি কিছু
.                কাব্য নাটক কবিতা তার |
আজকে আবার ১লা আষাঢ়
.                আসিল নবীন মেঘেরে লয়ে
যক্ষ প্রিয়ারে মেঘদূত পুনঃ
.                খুঁজিছে আজও কি উতলা হ'য়ে ?
রাম গিরি শিরে বিরহী যক্ষ
.                এখনও কি আছে তেমনি বসে ?
মেঘদূত তার প্রিয়ার খবর
.                ল'য়ে কি আবার আসিছে ভেসে |
কে আজ দানিবে উত্তর ইহার
.                কার কাছে পাবো সঠিক কথা
উদাস হয়েছে অন্তর আমার
.                ভাবিয়া যক্ষের বিরহ ব্যথা |


.       ****************                                        
সূচির পাতায়   


মিলনসাগর
*
স্বাধীনতা
১৪ই আগস্ট, রাত্রি ৮টা

বহু আকাঙ্খিত স্বাধীনতা আজ এসেছে দুয়ারেতে তব
বরণ করিয়া লও তুমি তারে উত্সবে নব নব |
কত শহিদের ফাঁসির মঞ্চ কত শহিদের রক্ত দাগে
গড়িয়া উঠিছে স্বাধীনতা বেদী ডেকে আনো তারে বরণে গানে |
ক্ষুদিরাম, @@@, প্রফুল্ল চাকীকে ভুলিও না কভু এমন দিনে
এই স্বাধীনতা এনে দেছে তাঁরা অমূল্য তাঁদের জীবন দানে |
কত দেশ নেতা কারা অন্তরালে বহুদিন ধরি সাধনা করে
তিল তিল করি এই স্বাধীনতা এনে দিল তাঁরা ঘরের দ্বারে |
দেশবন্ধু আর যতীন্দ্রমোহন সবার উপর নেতাজী এসে
যে মুক্তি সন্ধান দিল বাঙ্গালীরে শ্মরণে তাঁদের নয়ন ভাসে |
জিন্নার দাবী মিটাতে যদিও বাঙ্গালী আজিকে বিভাগ হ'ল,
তবু সান্ত্বনা বাঙ্গালী আজিকে বিদেশী শোষণে মুক্তি পেল |
ভারতের আজ অনুরূপ দশা খণ্ডিত তাহা পাকিস্তানে
তবু স্বাধীনতা পেয়েছে সবাই সেই আনন্দ আজ মনে ও প্রাণে |
মহাত্মাজীর "ভারত ছাড়ো" প্রস্তাব মেনেছে বৃটেন আজ
মুগ্ধ হলো ভারতবাসীরা দেখে ভারতের নূতন সাজ |
গত জীবনের সব কালী গ্লানি মুছে ফেলে আজ মিলহ সবে
জাতীয় পতাকা উড়াও গগনে "বন্দেমাতরম" "জয়হিন্দ" রবে |


.                           ****************                                        
সূচির পাতায়   


মিলনসাগর
*
মহাত্মাজী

স্তব্ধ হয়েছে লেখনি আমার কি লিখিব আজ তাতো না জানি
অবাক বিস্ময়ে ভাবিতেছি শুধু মূক হয়ে গেছে মুখের বাণী |
খসিয়া পড়িল হিমালয় চূড়া বিনা মেঘে হ'লো বজ্রপাত
দিনমণি বুঝি গেল অস্তাচলে ঘনাল ভারতে গভীর রাত |
মারাঠি দস্যু কেরে তুই আজ হরণ করিলি ভারত মণি
ভারতের বুকে দিলি কি আঘাত নিজেও বোঝনি এ কথা জানি |
কোথা বোম্বাই কোথা দিল্লী ছুটিয়া আসিল রতন চোর
ভারতের সেরা মানিক হরিয়া জানিনা কি লাভ হইল তোর |
যে মহাজীবন করিলি হরণ ক্ষমা তুই তার পাবি না জানি
তবু ভগবান কর তারে ক্ষমা এ প্রার্থনা করি জুড়িয়া পাণি |
কাঁদো বঙ্গবাসী কাঁদো হে ভারত কাঁদিয়া সকলে ভাসাও ধরা
জাতির স্রষ্টা গিয়াছেন চলে ভারত যে তাই বেদনা ভরা |
দেশের সঙ্কট জাতির সঙ্কট সব ফেলে দেব গেলে যে চলে
এ সঙ্কটে ত্রাণ পাবে কিসে সবে তার কথা গেলে কারে কি ব'লে |
এনেছিলে তুমি অমর জীবন এ ভারতভূমে করিয়া সাথে
মরণে সে প্রাণ দিয়েছ বিলায় বিশ্বলোকের সবার হাতে |
যাও তবে দেব বাঞ্ছিত সে পুরে যথায় তোমারে দিয়েছে ডাক
আমরা যেমন পেয়েছিনু তোমা তারাও তেমনি তোমাকে পাক |
তাঁর মহাবাণী করিব প্রচার এস ভাই বোনে মিলিয়া সবে
তবেই সার্থক হবে তাঁর কাজ আত্মাও তাঁর শান্তি পাবে |
নাথুরাম বিনায়ক গোডসের নাম গান্ধিজী পরসে অমর হবে
কুকীর্তি তাহার ঘোষিবে জগৎ যতদিন চাঁদ সূর্য্য রবে |
১৬ই মাঘের ৫টা বেলায় অস্ত গিয়াছে ভারত রবি
শুক্রবারের এই দিনটারে ভুলিবে না কভু @@@ করি |


.                           ****************                                        
সূচির পাতায়   


মিলনসাগর
*
গান্ধিজীর গান

খসিয়া পড়িল হিমালয় চূড়া কন্যাকুমারীকা ডুবিল জলে
কোহিনূর মণি হরে নিল চোরে খসে পো'ল তারা ধরণীতলে |
জাতির জনক আর বেঁচে নাই
বিশ্ববাসী সবে কাঁদিতেছে তাই |
কোথায় গান্ধিজী কোথায় তুমি দেব কাঁদায়ে ভারতে কোথায় গেলে
তোমারে হারায়ে ভারতবাসীরা ভাসিতেছে আজ নয়নজলে |


.                           ****************                                        
সূচির পাতায়   


মিলনসাগর
*
স্বাধীনতা দিবস
১৫ই আগস্ট ১৯৪৮

বছরের পর আসিল আবার                স্বাধীনতা দিন ফিরে
বাধা বিঘ্ন শত কালগর্ভে কত               ডুবে গেল ধীরে ধীরে |
কত মহাপ্রাণ ক'রে গেল দান                স্বাধীনতা বেদিমূলে
কত জননেতা কারাগারে হেথা              দিলে প্রাণ তিলে তিলে |
আছে @@@ ক্ষুদি ও কানাই                ফাঁসীতে দিয়েছে প্রাণ
আজো ভুলে নাই তাহাদের তাই            ভারতের জনগণ |
পেয়ে স্বাধীনতা ইহাদের কথা               রচি গাহে সবে গান
বাংলার বীর সেই নেতাজীর                মহান আত্ম দান |
এনে স্বাধীনতা দিয়ে ভারতে তা             গান্ধিজী দিলেন প্রাণ
ইহাদের স্মরি শির নত করি                জাতীয় পতাকা উড়াই আজ
এ'স পণ করি এই দিন স্মরি                 সবাই সাধিব দেশের কাজ |
.                                 "জয়হিন্দ"


.                               ****************                                
সূচির পাতায়   


মিলনসাগর
*
আবাহন
দমদম এরোড্রোম, ২৩ সেপ্টেম্বর, রাত্রি ৮-৩০


স্বাধীন বঙ্গে পূজো খেতে                 আসছে এবার দশভূজা
কিন্তু মাগো পূরেব বঙ্গে                  কি দিয়ে তোর হবে পূজা |
রেতের বেলায় জ্বালতে আলো           কোসিন নেই পাকিস্তানে
আটা চিনি বায়না পাওয়া                একটাকা সের চাল সেখানে |
কি দিয়ে ভোগ হবে মা তোর            ভেবে যে ঘুম হয় না রাতে
বাপের বাড়ী আসছো তোমা             সব কটিকে নিয়ে সাথে |
সিংহ ময়ূর অসুর মুশিক                আসছো নাতো কাউকে রেখে
মুখে দেব কি যে এদের                   কান্না যে পায় ভাবতে দুখে |
পশ্চিমবঙ্গ শাড়ী ধূতি কিছু               পাকিস্তানে ত দেবে না নিতে
কালোবাজারের শাড়ী কিনে মাগো       কজনে পূজায় পারিবে দিতে |
তরিতরকারি মাছ দুধ দিয়ে              ভোগ দিব তারো সাধ্য নাই
অগ্নিমূল্যে কিছু পেলেও বাজারে          বল মা কেমনে কিনিয়া খাই |
কাজেই এবার পূজো খেতে মাগো         পাকিস্তানেতে না আসা ভালো
আসিলে দেখিবে হাসির বদলে             সকলেরই মুখ বিষাদে কালো |
তবু যদি মাগো যাও পাকিস্তানে           দশহাতে নিও অস্ত্র তুলি
ধংস করিয়া আসিও সমূলে                সেদেশের সব অসুরগুলি |
পূর্ববঙ্গের অনেকেই মোরা                 পূজোয় এবার যাবো না বাড়ী
যাইতে পারিবে বসিয়া আরামে            কারণ থাকিবে ফাঁকাই গাড়ী |


.                               ****************                                
সূচির পাতায়   


মিলনসাগর