*
শচীন্দ্রনাথ সেনের কবিতা
বামনের আসাম যাত্রা

বিশ বছরেরে কর্মভূমি জন্মভূমি ছেড়ে
বামন নাকি আসাম যাচ্ছে চাকরি করার তরে |
পারবে কিগো থাকতে সেথা দেশের মায়া কেটে
বুকখানি কি ব্যথায় তোমার যাবে নাকো ফেটে,
ছুননদা আর নরেন তোমার দুইটি বেলার সাথী
ছেড়ে তাদের কিসে তোমার কাটবে দিবা রাতি |
মনটি তোমার কর্ম মাঝে হয়তো রবে ঢাকা
তবু মোদের পড়লে মনে লাগবে নাকি ফাঁকা |
যাকগে --- তুমি যাচ্ছো আসাম অর্থ উপায় তরে
যাবার দিনে দেব না আর মনটি ব্যথায় ভরে |
আমরা হেথায় ভালই রব তাই ভেবে সুখ পেও
হাসি মুখে দিচ্ছি বিদায় হাসি মুখেই যেও |
মনের গোপন খবরগুলো নাইবা হলো বাহির
অভাব তোমার করবো না বোধ সেইটে করব জাহির |
কর্ম দিয়ে বিপুল অর্থ নিয়ে এসো দেশে
তাই দিয়ে ফের নূতন দেশ গড়ব মোরা শেষে |
এ গ্রাম তোমায় দিল নাকো তোমার যোগ্য আসন
তাই বলে কি দেশটা শুদ্ধ করতে যাব শাসন ?
বিধির কাছে আশিস যাচি সুস্থ শরীর নিয়ে
আবার ফিরে এসো দেশে অর্থশালী হয়ে |

২০ আশ্রিন


.       ****************                                      
সুচির পাতায়    



মিলনসাগর
*
বামন রায়ের কাল

.                (১)
এখন যদি থাকতো ব্যাঙ্কে বামন রায়ের কাল,
লাগতো নাকো স্টোরে এত কর্মচারীর পাল |
.        কন্ট্রোল গুডস্ আসতো আবার,
.        মিলতো চিনি চায়ে খাবার,
একাই বামন আনতে পারতো তেল, আটা, গুড়, ডাল,
থাকতো যদি এখনও সেই বামন রায়ের কাল ||


.                (২)
এখন যদি থাকতো স্টোরে বামন রায়ের কাল,
ব্যাঙ্কের এখন হতো নাকো এমন ধারা হাল,
.        কাপড়গুলো গুদাম ভরে,
.        থাকতো না তো এমন পড়ে,
বিকিয়ে যেত সবই আবার আসতো নতুন মাল,
কিন্তু এখন চলে গেছে বামন রায়ের কাল ||


.                (৩)
এখন যদি থাকতো স্টোরে বামন রায়ের কাল,
ফুরুতো কি এমন ভাবে স্টোরের সকল মাল ?
.        নাইকো আটা নাইকো চিনি,
.        নেই কেরোসিন কিই বা কিনি,
আছে শুধু গুদাম ভরা অখাদ্য চাল ডাল,
বাজার ছাড়া দামে আবার ছাড়ছে সে সব মাল ||


.                (৪)
কন্ট্রোল গুডস্ থাকতো যে সব বামন রায়ের কালে
হিসেব করে দিত সে সব সমান ভাগে ফেলে
.        ধরতো না তো মনে কারো
.        চাইতো তারা বেশী আরো
মুখ খিচিয়ে বামন তাদের রাখতো দূরে ঠেলে
ভালো কারো লাগতো না তা বামন রায়ের কালে ||


.                (৫)
তেল, চিনি, ডাল, বেশী কিছু পায়নি তখন যারা,
বামন রায়ের উপর খুবই ক্ষেপল সবাই তারা |
.        স্টোরের কর্তা বামন ছিলো,
.        লাগতো না সে তাদের ভালো,
তাইতো তারা তাড়ালো তায় জুটিয়ে নিয়ে দল ||


.                (৬)
এখন যদি থাকতো স্টোরে বামন রায়ের কাল,
তবে কি সে কৃষাণ নিয়ে ছাইত নিজের চাল ?
.        কজন তাহার চলত ছুটে,
.        মাল যা পেত আনতো লুটে,
ভাণ্ডারে তার উঠতো ভরে প্রচুর সে সব মাল |
হায় রে | আজ আর নেইতো স্টোরে বামন রায়ের কাল ||


.                (৭)
কি ক্ষতি আজ হলো স্টোরের ছাড়িয়ে দিয় তাকে,
পঞ্চায়েতের দলে তাহার খবর কি কেউ রাখে ?
.        স্টোরে আজ তাই নেই কোনো মাল,
.        পোড়া গুড় আর অসিদ্ধ ডাল,
তাই নিয়ে আজ চালছে তারা মাতব্বরির চাল,
বামন রায় আজ গেছে চলি নেই তো তাহার কাল ||


.                (৮)
হায় রে কবে কেটে গেছে বামন রায়ের কাল
আমরা বসে গণি তাহার তারিখ ও সাল
.        বামনের সেই কাগজ ও নুন,
.        দাম বাড়িয়ে চার পাঁচ গুণ
বেচে রাখছে সুনাম বজয় কর্মচারীর দল
গেছেই যখন যাকগে চলে বামন রায়ের কাল ||


.                (৯)
মরবে নাকো নরেন, বামন, চারু রায়ের শোকে,
তাদের চেয়েও ভাল লোক আজ ব্যাঙ্কে গেছেন ঢুকে
.        চলছে ব্যাঙ্ক ভালই এবার,
.        অভাব কিছুই নেইকো রে আর,
গেছে যদি আপদ গেছে চারু রায়ের দল |
তাড়াতে আর লাগবে নাকো নতুন কোন ছল ||


.                (১০)
তবু ভুলতে পারি না হায় গত দিনের কথা
তুলনায় যা এখন মনে দিচ্ছে বড়ই ব্যথা |
.        বর্তমানে আছেন যিনি,
.        ব্যাঙ্কের এখন কর্তা তিনি,
বামন রায়ের কল্পনাতেও ছিল না তার ছবি |
তাহার হাতে ব্যাঙ্কে যারা কলের পুতুল সবই ||


.                (১১)
রেশন যখন গ্রামে এল বামন তো নাই স্টোরে,
কোথায় গিয়ে উঠল তাহা কেই বা তা খোঁজ করে
.        ও পাড়ার ব্যাঙ্ক সুযোগ বুঝে
.        সব রেশনই রাখল নিজে
থাকলে বামন অনায়াসে পেতাম যা আজ হেথা
থলি হাতে আজ তা পেতে যেতেই হবে সেথা ||


.                (১২)
বামন নেইকো স্টোরে আজ আর জ্যোতিষও নাই বেঁচে
নরেন ছুনন বাইরে আছে বিপদ গেছে ঘুচে
.        কর্ত্তানন্দ আছেন যারা
.        ব্যাঙ্কেই এখন বসেন তারা
মরে গিয়ে জ্যোতিষ আজকে বড্ড গেছে বেঁচে |
বামন ও আজ নিজের গাঁয়েই গর্ব্বে বেড়ায় নেচে ||

মুলঘর
১লা জুলাই ১৯৪৪


.                   ****************                                             
সুচির পাতায়    



মিলনসাগর
*
শ্রীযুত জ্ঞানেন্দ্র কুমার সেন, হেড মাস্টার মহাশয়ের বিদায়
উপলক্ষে স্মৃতিগাথা


বিদায় বিদায় বন্ধু বিদায় বিদায়
.                ছাড়িয়া মোদের সবে কোথা তুমি চলে যাবে
ছাড়িতে তোমারে বন্ধু মন নাহি চায়
.                ব্যথাভরা প্রাণে তবু দিতেছি বিদায় ||


বিদায় বিদায় বন্ধু বিদায় বিদায়
.                খড়রিয়া হাইস্কুলে প্রধাণ শিক্ষক ছিলে
বড় হয়ে ছিলে সেথা নিজ মহিমায়
.                চতুর্দ্দশ বর্ষ পরে দিলাম বিদায় ||


বিদায় বিদায় বন্ধু বিদায় বিদায়
.                কত যে মহান ছিলে দুদিনে তা যাবো ভুলে
ভুলিবনা স্মৃতিটুকু কোনোদিন হায়
.                সজল চোখেতে তাই দিতেছি বিদায় ||


বিদায় বিদায় বন্ধু বিদায় বিদায়
.                ছেলেরা তোমারে পেয়েছিলো গো বটের ছায়ে
সুশীতল ছায়া দান করেছ সবায়
.                তাই কাঁদে প্রাণ তোমা দিতে যে বিদায় ||


বিদায় বিদায় বন্ধু বিদায় বিদায়
.                স্কুলের উন্নতিতরে খাটিয়াছ অকাতরে
কখনও কাতর তাহে দেখিনি তোমায়
.                অকৃপন দান তব রয়েছে সেথায় ||


বিদায় বিদায় বন্ধু বিদায় বিদায়
.                বিনিময় হেথা হতে পেরেছ কিছু নিতে
নেই যে মোদের কিছু কি দিব তোমায়
.                তাই আজ শূণ্য হাতে দিলাম বিদায় ||


বিদায় বিদায় বন্ধু বিদায় বিদায়
.                নিজগুণে গ্রামটিরে লয়েছ আপন করে
বিদেশীর মত কিছু ভাবিনি তোমায়
.                তুমিও নিজের দেশ ভেবেছ ইহায় ||


বিদায় বিদায় বন্ধু বিদায় বিদায়
.                গ্রাম্য প্রতিষ্ঠানগুলি নিয়েছিলে করে তুলি
পুষ্ট হয় তারা তোমার সেবায়
.                আশাকরি ভুলিবে না এ গ্রাম তোমায় ||


বিদায় বিদায় বন্ধু বিদায় বিদায়
.                রামচন্দ্র সম এসে, চৌদ্দ বছর বনবাসে,
কাটাইয়া আজ তুমি নিতেছ বিদায় |
.                সুগ্রীবের দল মোরা রহিনু হেথায় ||


বিদায় বিদায় বন্ধু বিদায় বিদায়
.                তুমি রাজধানি মাঝে ডুবে রবে নানা কাজে
এ কটি বন্ধুরে মনে পড়িবে কি হায়
.                পড়ে যদি এসো তবে ছুটির সময় ||


বিদায় বিদায় বন্ধু বিদায় বিদায়
.                আজি মোরা কয়জনে, তোমারে ব্যথার্থ মনে
হেথা হতে শুধু হাতে দিলাম বিদায়
.                রহিও না ভুলে বন্ধু এই কজনায় ||


এস বন্ধু এস তবে বিদায় বিদায়
.                তোমারে যা দিনু দুঃখ মনে তাহা রেখো নাকো
ভুলে যেও হেথা পাওয়া ক্লেশ সমুদয়
.                আজি বন্ধু এসো তবে বিদায় বিদায় ||


ওগো বন্ধু আজ তুমি আমাদের ছেড়ে
.                কেন চলে যাবে বল গ্রাম খালি করে |
মোরা কি পারিনি দিতে যা চেয়েছ তুমি
.                সেই অভিমানে গেলে ছেড়ে কর্ম ভূমি ||


যাও তবে যাও বন্ধু রুধিবনা পথ
.                তবে তরে অপেক্ষিছে কাল্পনিক রথ
সেথা গিয়ে আমাদের যাবে কিগো ভুলে
.                স্মৃতিও কি রাখিবে না তাও নিবে তুলে ||


ভুলে কি যাইবে তুমি স্কুলটি তোমার
.                বকুলতলার ঘাট হিতৈষী ভাণ্ডার |
ভুলে কি রহিবে সেই বালিকা ইস্কুল
.                বীণাপাণি গ্রন্থাগার তাও হবে ভূল ?


কতদিন তব সনে কত কথা ছলে
.                কাটায়েছি কত সন্ধ্যা ভৈরবের কুলে
পল্লীস্বাস্থ সমিতিরে রবে কিগো মনে
.                ভুলো না পানায় ভরা দিঘিটি সে সনে ||


স্কুলের বালক আর তাহাদের পাড়া
.                ফুটবল গ্রাউণ্ড তব নিজ হাতে গড়া
এ সব ভুলিতে তুমি পারিবে কি কভু ?
.                পারিলেও অনুরোধ ভুলিওনা তবু ||


এ পল্লীর পথঘাট তব পরিচিত
.                সবই কি ভুলিয়া যাবে জনমের মত,
না না বন্ধু একথাও পারিনা ভাবিতে
.                এতটা নিষ্ঠুর তুমি পারিবে না হতে ||


চতুর্দ্দশ বর্ষ পরে তব গৃহখানি
.                ডাকিবে তোমারে পিছে দিয়ে হাতছানি |
তখন মোদের কথা হয়তো বা মনে
.                পড়িতেও পারে কভু তব স্মৃতি কোণে ||


তোমারে বিদায় দিতে প্রাণ নাহি চায়
.                নির্মম হইয়া তব দিতেছি বিদায়
এস বন্ধু এস তবে ছুটি পেলে পরে
.                মনে যদি পড়ে এসো আমাদের ঘরে ||


.                   ****************                                                
সুচির পাতায়    




মিলনসাগর
*
শ্রীযুক্ত জ্ঞানেন্দ্র কুমারের বিদায়ে বিদায় গীত


মোদের পাষাণ অন্তরেও কান্না ঝরে পড়ে
তোমায় বিদায় দিতে মোদের প্রাণ যে কেমন করে
কোথায় যাবে স্কুলটি ছেড়ে এমন ভাবে
তাই তো তোমায় বিদায় দিতে কান্না ঝরে পড়ে |
মোদের পাষাণ অন্তরেতেও কান্না ঝরে পড়ে
বিদায় বেলায় কি দিব গো আজকে তোমার করে
তোমার প্রিয় ছাত্রগুলি কেমন করে রইবে ভুলি
মোদের খুবই কান্না পাবে থাকতে তোমায় ছেড়ে |
চোখের জলে পথটি তোমার দিব পিছল করে |
মোদের পাষাণ অন্তরেতেও কান্না ঝরে পড়ে
বিদায় তোমায় দিতে যে দেব অশ্রু মোদের ঝরে
তোমার প্রিয় ফুটবল মাঠ, স্কুলবাড়ী আর সে নদী ঘাট
যাবার বেলা হাতছানি দে ডাকবে বারে বারে |
করুণ চোখে বিদায় দিলাম এস আবার ফিরে
মোদের পাষাণ অন্তরেতেও কান্না ঝরে পড়ে ||


.                   ****************                                                
সুচির পাতায়    




মিলনসাগর
*
চিঠি (বন্ধু জ্ঞানেন্দ্র কুমার সেন কে লেখা)

"বন্ধু"!
চৌদ্দ বছর বাস করে এই বনের কুটির ছেড়ে
কেমন আছ ভুলে মোদের রাজধানীতে ফিরে ?
মাসাধিক কাল গেছ তুমি এখান থেকে চলে
লিখো চিঠি এই কটা দিন কেমন সেথায় ছিলে |
সুগ্রিবের দলটা তোমার পড়ে নিকি মনে ?
কেমন তোমার কেটেছিল দীর্ঘ দিন এই বনে ?
আমরা তোমায় ভুলতে কিন্তু পারছি নিকো মোটে
তাই এ চিঠি লিখছি মোরা এ কজনায় জুটে |
শান্তিদেবীর কৃপায় এ নাম চারু রায় দেন এসে
শুনে দলের এই পরিচয় ফেলবে তুমি হেসে
তবু তোমায় লিখছি বন্ধু নামের পরিচয়
কেমন তোমার লাগল শুনে জানতে সবাই চায় |

"পরিচয় পত্র"
যে দল ছাড়িয়া রাম নিল গো বিদায়
সে দলের আজ কিছু দেই পরিচয়
সুগ্রীব হইলেন নিজে চারু রায়
মৃত বলি বালীরাজ জ্যোতিষে মানায়
অঙ্গভারি বেদব্যাস অঙ্গদ সুধীর
তানতুন্ তোমার ভক্ত তাই হনুবীর
সুবুদ্ধি নরেন তাই মন্ত্রী জাম্ভুবান
সেতু বাঁধি নল নাম লইল বামন
ভৈরব সুষেণ বৈদ্য বসেছেন সেজে
নল সহকারী তাই কবি নিল নিজে |
রামচন্দ্র হেথা হতে গিয়েছে যে চলে
সপ্তরথী আছে বসি সুগ্রীবের দলে |
গয় ও গবাক্ষ দোহে ছিল এই দলে
দলভ্রষ্ট হয়ে তারা দূরে গেছে চলে |
এই পরিচয় পত্রে পড়ে যাবে মনে
তুমি বন্ধু চৌদ্দ বছর ছিলে এই বনে |
যাহার কৃপায় নাম হইল সবার
নিজ নাম প্রকাশের দিনু তারে ভার
কবে পুনঃ দেখা বন্ধু পাইব তোমার
সবার কুশল সহ লিখো সমাচার |


.                   ****************                                                
সুচির পাতায়    




মিলনসাগর
*
মাস্টার মহাশয়

গ্রামের মোড়ল তিনি সুবুদ্ধি নরেন,
খড়ারিয়া হাইস্কুলে মাস্টারী করেন |
মাস্টার হলেও তার ক্ষমতা অশেষ,
দরিদ্রের বন্ধু বলে নাম আছে বেশ |
হিতৈষীর সম্পাদকী বহুদিন করে,
বামনের লাঞ্চনায় আসিলেন ছেড়ে |
চারু রায় তার দলে দিয়েছিল যোগ,
তাতেই ব্যাঙ্কের আজ হেন কর্মভোগ |
পাড়ার ঝগড়াঝাটি মিটান নরেন,
গ্রামের সকল কাজে শালিসি করেন |
এহেন নরেন যবে সেক্রেটারী রূপে,
ফুড্ কমিটির কাজে দিলো প্রাণ সঁপে |
প্রথম প্রথম তারে লাগিল না মন্দ,
পরে কিন্তু তাহাতেই লেগে গেল দ্বন্দ্ব |
রেশন টিকি হাতে মানশেরা যবে,
দেখা দিত গৃহে তার ভোরবেলা সবে |
তখন মেজাজ তার থাকিত না বশে
বিদায় করিত শেষে ঘন্টা দুই বসে |
এইভাবে চলে রোজই কমিটির কাজ,
নরম গরম শেষে এলো রণসাজ |
দিন নাই, রাত নাই, বাড়ীটি তাহার,
মেছোহাটা হলো শেষে রোধে সাধ্য কার |
কেহ বা কাপড়, কারো কেরোসিন চিনি,
রেশন টিকিট নেই মাল কিসে কিনি |
এইভাবে রোজ রোজ নানা উত্পাতে,
নরেন বসিল শেষে হাত দিয়া মাথে |
ছেলে পেলে রুগ্ন, আরও রুগ্ন পরিবার,
এ ঝঞ্ঝাট পোহাতে সে পারে নাকো আর |
ধীর শান্ত বলে তার ছিল খুব খ্যাতি,
কমিটির চাপে খেপে গেল রাতারাতি |
ঠাণ্ডাভাবে তার সাথে কথা বলা ভার,
কথা শুনিবার নেই সময় তাহার |
ছেড়েছে ব্যাঙ্কের কাজ টিউশানি আর,
করিবে বাড়ীর কাজ নেই অবসর |
এইভাবে অবশেষে মনস্থীর করি,
মিটিং এ কাটায়ে নাম চলে এলো বাড়ী |
এখন মিলেছে তার এখণ্ড সময়,
স্কুল হতে ফেরে বাড়ী পুনঃ স্কুলে যায় |
গোবেচারী নরেন যে মাস্টার মশায়
তাহার কি সাজে বল এত সব দায় ?
ফুড কমিটি তাই গেল ও পাড়ায়,
পারমিট পেতে এবে সবে সেথা যায় |
আমাদের সুবিধাটা কিছু যায় যাক,
মোদের মাস্টার তবু শান্তিতে থাক |


.            ****************                                                    
সুচির পাতায়    



মিলনসাগর
*
বিশ বর্ষ পরে
ব্যাসদেবের (তারাপ্রসন্ন তর্কতীর্থ) প্রয়াণে


আজি হতে বিশ বর্ষ পরে
ঘুমায়ে রয়েছি রাতে আপনার ঘরে
ঝাঁঝাঁ করিতেছে রাত্রি নীরব নিঝুম
হঠাৎ কাহার ডাকে ভেঙ্গে গেল ঘুম
চোখ মেলে সবিস্ময়ে দেখিনু শিয়রে
ব্যাসদেব নিজে এসে ডাকিছেন মোরে
আজি হতে বিশ বর্ষ পরে |

শুনিলাম স্পষ্ট ভাবে ব্যাসের বচন
"দেহ ছাড়ি এই মাত্র আসিনু ছুনন,
নশ্বর সে দেহ ঘিরে কাঁদিছে সবাই
দানিবে সান্ত্বনা সবে ডাকিতেছি তাই
ঊষার আলোয় আমি দাঁড়াতে না পারি
তরায় চলিয়া যাও আমাদের বাড়ী |"
বলি ইহা ব্যাদেব মিলাল আঁধারে
আজি হতে বিশ বর্ষ পরে |

চক্ষু মুদিলাম দেহ রোমাঞ্চিত হল
পোষের শীতেও অঙ্গে ঘাম দেখা দিল |
তবু ঘরে বসে থাকা পোষাল না আর
ছুটিলাম সেই রাতে ব্যাসের আগার |
গিয়ে দেখি ব্যাসমুখে শুনেছিনু যাহা
সেই স্থানে অবিকল ঘটিয়াছে তাহা
কেবল নরেন আছে বসি একধারে
আজি হতে বিশ বর্ষ পরে |

নরেন আমাকে দেখি হইল অবাক
বলে আসিলেন এত রাতে পেয়ে কার ডাক ?
পরে শুনাইব তাহা বলিলাম তারে
খবর জানাতে সবে পাঠায়েছ কারে |
বলিল ফড়িং, মিনু এখনই যাইবে
রাত না পোহাতে শব ঘাটে নিতে হবে |
দাহনান্তে ফিরিলাম ব্যাসের আগারে
আজি হতে বিশ বর্ষ পরে |

মহাদেব দেখি পুন আমাদের সনে
কাঁদিলেন মাতা সহ বধু কন্যাগণে
মামুলি ভাষায় কিছু দানিয়া সান্ত্বনা
ফিরিয়া আসিনু বাড়ী হয়ে আনমনা |
প্রভাত হয়েছে সবে ফিরিনু আলয়ে
চেয়ারেতে ক্লান্ত দেহ দিলাম এলায়ে |
রাতের ঘটনা মনে আসে বারে বারে
আজি হতে বিশ বর্ষ পরে |

সবাই হয়েছি বৃদ্ধ শুভ্রকেশ শিরে
লোল চর্ম, দন্তহীন হইতেছি ধীরে |
শিশুরা যুবক হলো যুবকেরা বুড়ো
প্রৌঢ় যারা ছিল সব হলো থুরথুড়ো,
ব্যাসদেব ৭৮এ গিয়েছেন চলে |
দেখিব না আর কভু এ হেন ব্যাসেরে
আজি হতে বিশ বর্ষ পরে |

অবসর কালে বন্ধু ছিলেন আমার
শ্রান্তি দূর হয়ে গেলে কার কাছে আর
নিন্দাছলে স্তুতি মোর কে আর করিবে
কবিতায় ছোট লিখে কে মোরে বাড়াবে |
কত মুখ স্মৃতি আর কত কি যে কথা
মনে পড়ে আজ বড় পাইতেছি ব্যথা |
ভুলিতে পারিনা ব্যাস ভাবি বারে বারে
আজি হতে বিশ বর্ষ পরে |

দিন দশ পরে শ্রাদ্ধ পেয়ে নিমত্রণ
উপনিত হইলাম ব্যাসের ভবন
শ্রাদ্ধ বাসরে তার দেখিনু সন্মুখে
রহিয়াছে তৈলচিত্র জল এল চোখে |
পিণ্ড অন্তে পিণ্ড শেষ হয়ে গেল আজ
আমার ও বন্ধুদের ফুরাইলো কাজ
শেষ শ্রদ্ধা করিলাম নিবেদন তারে
আজি হতে বিশ বর্ষ পরে |

মনে পড়ে আজ হতে বিশ বর্ষ আগে
মোদের অন্তর মাঝে কবি এক জাগে |


.            ****************                                                    
সুচির পাতায়    



মিলনসাগর
*
বিমলানন্দ সেন মহাশয়ের মৃত্যুতে স্মৃতি তর্পণ

আজি হেমন্তের প্রথম দিবসে
কি শুনিনু ওগো কানে,
আমাদের ছেড়ে চলে গেছ দেব
তুমি নাকি কোনখানে |

ওগো দানবীর দরিদ্র পল্লীর
তুমি যে গো ছিলে প্রাণ,
দুস্থ পরিবারে প্রতিদিন ধরে
বাঁচায়েছ তব দান |

তুমি নাই আজ ফুরায়েছে কাজ
কে বাঁচাবে গরীবেরে
হয়ে তোমা হারা কত গরীবেরা
অনাথ হইল যেরে |

ধ্যান গম্ভীর তুমি কর্মবীর
মহা যোগী বাজ ঋষি
তোমার তুলনা জগতে মেলেনা
সব কাজে ছিলে মিশি |

হিতৈষী ভাণ্ডার পলিলী স্বাস্থ্য আর
মুক্তকেশী কালী বাড়ী
রাণী বিদ্যালয় গার্ল ইস্কুল
কারেও ছিলে না ছাড়ি |

যে দিকেতে চাই দেখি তুমি নাই
তোমার অভাবে শূণ্য সবটাই
কে করিবে আজ এ পল্লীর কাজ
আজ যে গো তুমি নাই |

যাও তবে দেব সে অমর ধামে
যেথা নাই রোগ শোক
যেখায় গিয়াছ ভাবি সুখে আছ
ইহাই স্বান্তনা হোক |

শোক তপ্ত তার পরিবারগণে
স্বান্তনা দিবার ভাষা তো নাই
দানিও স্বান্তনা বিভু তাহাদের
তোমার চরণে শুধু এ চাই |

মৃত্যু ১লা কার্ত্তিক ১৩৫০, সোমবার


.            ****************                                                    
সুচির পাতায়    



মিলনসাগর
*
স্বর্গীয় নেপালচন্দ্র রায় মহাশয়ের স্মৃতি সঙ্গীত

মূলঘরের এই অন্তরে আজ কান্না ঝরে পড়ে
নেপালচন্দ্র শূণ্য দেশ আজ প্রাণ যে কেমন করে
.        কোথায় গেল কোথায় গেল
.        দেশ যে আজি আঁধার হলো
নেপালশূণ্য দেশে মোরা থাকব কেমন করে
মূলঘরের এই অন্তরে আজ কান্না ঝরে পড়ে

ভৈরব আজি করুণ সুরে গাইছে গাথা গো
মোদের ছেড়ে আজকে তুমি যাচ্ছ কোথায় গো
.        কোথায় তুমি কোথায় তুমি
.        শূণ্য তোমার জন্ম ভূমি
কান্না ভরা বাঁশী যো মোর বাজছে করুণ স্বরে
মূলঘরের এই অন্তরে আজ কান্না ঝরে পড়ে |

বাং মৃত্যু ৮ মাঘ শনিবার
ইং ২২ জানুয়ারী ভোর ৫ট||


.            ****************                                                    
সুচির পাতায়    



মিলনসাগর
*
স্বর্গীয় নেপালচন্দ্র রায় মহাশয়ের মৃত্যুতে

তুমি দেব নাই শুনি এ কি কথা
বাজিল বুকেতে কি ভীষণ ব্যথা
মূলঘরবাসী হারাল কি পিতা
গেলে কি দেশ করি অন্ধকার

সবারই মুখেতে শুনি আজ তুমি নাই
নেপাল চন্দ্র আর বেঁচে নাই
তাই শূণ্য হেরি যে দিকে তাকাই
অন্তরে কি তাই উঠে হাহাকার

বিমলা বাবুর মকণের কথা
ভুলে নাই দেশ যায়নি সে ব্যথা
পুনঃ এ আঘাত এ শোক বারতা
দেশবাসী হায় সবে কত আর

এ দেশের কাজ হল সমাপন
চলে গেলে আজ তাই কি দু'জন
কে পুরাবে আর তোমাদের স্থান
যে দিকে তাকাই হেরি যে আঁধার

কর্ম্মবীর তুমি স্বদেশ প্রেমিক
দেশের সেবায় ছিলে যে নির্ভিক
জ্ঞান গরিমায় পুরে ছিল দিক
তব যশ ঘোষে উচ্চ বিদ্যালয়

তোমার তুলনা তোমাকেই নিয়া
গঙ্গা পূজা যেন গঙ্গা জল দিয়া
মহাপ্রাণ তুমি কি বারাট হিয়া
অন্তর ছিল যে শক্তির আলয়

বৃদ্ধকালে তুমি মূলঘরে থেকে
গিয়াছ চলিয়া কীর্তি তব রেখে
বালিকারা তাই লেখাপড়া শেখে
তোমার স্থাপিত বালিকা ইস্কুলে

যে দিকে তাকাই দেখি তুমি নাই
তোমার অভাবে শূণ্য সব ঠাঁই
বিভূর চরণে এই মোরা চাই
তোমারে যেন গো না রহি ভুলে

তব আরাধনা তোমার সাধনা
যোগাবে মোদোর কর্মের প্রেরণা
জানি যেন সব কিছু @@@
তোমার চরণ কৃপার বলে

বিশ্বভারতীতে শান্তিনিকেতনে
তোমার মহিমা সকলেই জানে
অকস্মাৎ তব এই তিরোধানে
ভাসিছে তাহারা নয়ন জলে

যাও তবে দেব সেই পূণ্যলোকে
ভুগিবেনা আর যেতা রোগ শোকে
সেথা গিয়ে যেন থেকে চির সুখে
করি এ কামনা বিভূ পদতলে |

বাং ৮ই মাঘ শনিবার
ইং ২২শে জানুয়ারী ভোর ৫||


.            ****************                                                    
সুচির পাতায়    



মিলনসাগর
*
নগেন্দ্র স্মৃতি তর্পণ

কাঁদো আজ খুলনাবাসী কাঁদো আরবার,
দেউটি যে নিভে গেল আজ খুলনার,
আচার্য্য প্রফুল্ল আর নেপালের শোক
এখনও তো ভোলে নাই খুলনার লোক |
নগেন গিয়াছে কাল এ শোক বারতা
বাজিবে খুলনার বুকে পুনঃ ঘোর ব্যথা,
দেব হেথা তব জন্মভূমি, কর্মভূমি সব
তোমার অভাবে হলো সকলি নীরব,
কর্মে, জ্ঞানে, দানে তব না মেলে তুলনা
ভুলিতে পারে না তাই তোমারে খুলনা
পরীক্ষাত্রী, দীন, দুঃখি আর পথচারী
সকলের অন্নসত্র ছিল তব বাড়ী |
অসহযোগের দিনে শোভাযাত্রা সাথে
কন্যা জামাতারে নিয়ে নেমেছিলে পথে,
পুলিশের নির্যাতন ব্যাটন প্রহার
সকলি সহিয়াছিল তব পরিবার |
মস্তকে আঘাত নিয়ে গৃহিণী তোমার
কন্যা জামাতার সাথে গেল কারাগার |
তুমিও পুত্রের সনে ঢুকেছিলে জেলে
খুলনাবাসী আজও তাই যায় নাই ভুলে |
সাতক্ষীরা বাসীদের দুর্ভিক্ষের ক্লেশ
তোমার সেবা ও দানে হয়েছিলো শেষ |
বিপদ আপদে কেহ তব কাছে গেলে
রক্ষা করিয়াছ তুমি তারে অবহেলে |
সুদক্ষ আইনজীবি তেজস্বী নির্ভিক
তোমার সুযশে পূর্ণ হয়েছিল দিক |
তব দানে, তব কর্মে ছেয়ে আছে দেশ
তোমারে প্রণাম করি হে যোগী মহেশ |
হে মহা তাপস যাও সে অমর ধাম
তোমারে স্মরিয়া কাঁদে মূলঘর গ্রাম |
এই গ্রামে ছিল তব মাতুল আগার
ধন্য তাই আমাদের লহ নমস্কার |

মৃত্যু
৬ই পৌষ ১৩৫৩, রাত্রি ১১টা


.            ****************                                                    
সুচির পাতায়    



মিলনসাগর
*
স্বর্গীয় জ্যোতিষচন্দ্র রায়ের অকাল মৃত্যুতে স্মৃতি তর্পণ

শুভদিনে শুভক্ষণে পঞ্জিকা দেখিয়া,
চলিলে জ্যোতিষ আজ সকলে ছাড়িয়া |
কৈশোরে "পুয়োর ফাণ্ড" নামে ভিক্ষা ঝুলি,
গরীবের তরে স্কন্ধে নিয়াছিলে তুলি |
যৌবনে ব্যাঙ্কের বোঝা করিলে মাথায়
তবু ভিক্ষা ঝুলি তুমি ছাড় নাই হায় |
আজ সেই ভিক্ষ ঝুলি কার স্কন্ধে দিয়ে
যাইতেছ চিরতরে তুমি ছুটি নিয়ে |
হিতৈষী ব্যাঙ্কের তুমি জন্মদাতা বলে
ধন প্রাণ সব কিছু তার তরে দিলে |
মনে তব কি জানি কি ক্ষুদ্র অভিমান
শেষের কয়টি দিন করেছিল ম্লান |
তাই কি প্রফুল্ল মনে বইতে বিদায়
শেষ দিনে হিতৈষীর দ্বার গেলে হায় |
গ্রামের আছিলে বন্ধু গরীবের প্রাণ
দেশ সেবা ছিল তব কর্তব্য মহান |
আশৈশব তব সঙ্গ পাইয়াছি আমি
তবু চিনি নাই আজও রত্ন কিযে তুমি |
চিনিতে সুযোগ আজ দিয়ে গেলে হায়
জানিনাক কতদিনে চিনিব তোমায় |
গিয়ে সুখে থাক তুমি সেই পূণ্য স্থানে
এই আশির্বাদ যাচি ডাকি ভগবানে |

ইতি গুণমুগ্ধ শচিন সেন,
মৃত্যু ৯ই আষাঢ় ১৩৪৯ সাল


.            ****************                                                    
সুচির পাতায়    



মিলনসাগর
*
স্বর্গীয় জ্যোতিষচন্দ্র রায়ের স্মৃতি তর্পণ

না মানিয়া দিনক্ষণ, না দেখিয়া পাঁজি
.        কোথায় জ্যোতিষচন্দ্র চলি গেলে আজি |
কাঁদাইয়া বৃদ্ধামাতা, ভ্রাতা, ভগ্নী, দারা
.        কাঁদাইয়া পুত্রকন্যা কাঁদাইয়া পাড়া |
ভাসাইয়া শোকে আজ মূলঘর গ্রামে
.        অকালে যেতেছ চলি কোন পূণ্যধামে |
হিতৈষী ব্যাঙ্কের তুমি জন্মদাতা বলে
.        ধন প্রাণ সব কিছু তার তরে দিলে |
মনে তব কি জানি কি ক্ষুদ্র অভিমান
.        শেষের কয়টি দিন করেছিল ম্লান |
তাই কি প্রফুল্ল মনে বইতে বিদায়
.        শেষ দিনে হিতৈষীর দ্বার গেলে হায় |
গ্রামের আছিলে বন্ধু গরীবের প্রাণ
.        দেশ সেবা ছিল তব কর্তব্য মহান |
আশৈশব তব সঙ্গ পাইয়াছি আমি
.        তবু চিনি নাই তোমা কি রত্ন যে তুমি |
৯ই আষাঢ় বেলা চার ঘটিকায়
.        সবে হায় গেলে ছাড়ি চিনিনু তোমায় |
কোথায় যেতেছ চলি পল্লীবন্ধু তুমি
.        ছাড়িয়া হিতৈষী ব্যাঙ্ক ছাড়ি জন্মভূমি |
বামন, নরেন, পুন আর চারু রায়
.        তোমার বিহনে আজ করে হায় হায় |
যেথায় যেতেছ তুমি স্বর্গ সেই স্থান
.        হয় যেন তাই তুমি করো ভগবান |
যাও তবে পল্লীবন্ধু সেই স্বর্গপুরে
.        রোগ শোক জরা সেথা রবে সরে দূরে |


ইতি গুণমুগ্ধ শচিন সেন,
মৃত্যু ৯ই আষাঢ় বুধবার বেলা ৪ ঘটিকায় |
মূলঘর, বড়বাড়ী |


.            ****************                                                    
সুচির পাতায়    



মিলনসাগর
*
বাণী বালিকা বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক
শ্রীযুক্ত সুরেশচন্দ্র রায়ের বিদায় উপলক্ষে

ওহে দেব আজ তুমি আমাদের ছেড়ে
চলিয়া যেতেছ নাকি কোন সে সুদূরে
যাইবার কালে কিগো পড়িবেনা মনে
বাণী বিদ্যালয়টিকে গ্রামখানি সনে
তোমার যতনে গড়া এই বিদ্যালয়
এইভাবে তাহারে কি ছেড়ে যেতে হয়
এ গৃহের যত কিছু যত স্মৃতিকণা
সবাই তোমারে যেতে করিতেছে মানা
তোমারে বিদায় দিতে সব ছাত্রিগণে
ব্যথাকি পাবে না ভাব একটুও মনে
তবুও নির্মম হয়ে দিতেছি বিদায়
উন্নতির পথে কেন হব অন্তরায়
এই বিদ্যালয় যেগো ছিল তব প্রাণ
তোমার অক্লান্ত সেবা পেয়েছে সে দান
তোমার যে দান মোরা পেয়েছিনু সবে
ভূলিবনা কোন দিন রাখিব নীরবে
অশ্রুজলে পথ তব দেব না ভিজায়ে
কর্মস্থানে যাবে যে গো সেই পথ দিয়ে
যাও তবে আমাদের ভুলিয়া থেক না
তোমারে রাখিবে মনে প্রতি ধুলিকণা
উন্নতি হউক তব করি এ কামনা
বিধির চরণে এই জানাই প্রার্থনা

তোমারই বাণী বিদ্যালয়ের ছাত্রীবৃন্দ

৫ই মাঘ ১৩৫৩



.            ****************                                                    
সুচির পাতায়    



মিলনসাগর
*
সোনাদাদুর স্মৃতি তর্পণ

বুদ্ধু তোমার সোনাদাদু
.        মোদের মায়া ছেড়ে
চলে গেছেন বিধির ডাকে
.        কোন এক অচিনপুরে |
সেদিন ছিল ২৬শে মাঘ
.        শনির সন্ধ্যে বেলা
৫২তে ছেড়ে গেলেন
.        পাটনা গঙ্গাভিলা |
আর তো কভু দেখতে তাঁরে
.        পাবে নাকো তুমি
মূলঘরের এই সেনের বাড়ী
.        তাঁহার জন্মভূমি |
দেশে তিনি আসেননিকো
.        হয়তো অনেক দিন
তবু এ গ্রাম শুধতে তাহার
.        পারবে নাকো ঋণ |
কত দুস্থ নিরাশ্রয় যে
.        বাঁচতো তাঁহার দানে
হিসাব তাহার নাইকো জানা
.        কোথায় কে তা জানে |
এদেশ ছেড়ে গেলেন তিনি
.        সুদূর বার্মা দেশে
একজিকিউটিভ্ ইঞ্জিনিয়ার
.        হলেন তথায় শেষে |
রায়বাহাদুর খেতাব সহ
.        লক্ষ পতি হয়ে
ফিরে এলেন কলকাতাতে
.        শেষ অবসর নিয়ে |
পুরো সাহেব ছিলেন তিনি
.        বার্মা থাকা কালে
হেথায় এসে ভক্ত সাধু
.        হলেন সকল ফেলে |
অকাতরে গরীব নিঃস্বে
.        করে গেছেন দান
নিজের তরে পেয়েছিলেন
.        শুধুই ভগবান |
ছেলে মেয়ের উৎপীড়ণে
.        বোমা পড়ার তরে
পাটনা গেলেন শেষ কালেতে
.        ভবানীপুর ছেড়ে |
সেইখানে তাঁর শেষ নিঃস্বাস
.        গেছেন তিনি রেখে
তাঁর তরে আজ অশ্রুবারি
.        ফেল গভীর দুঃখে |
আমরা তবু দেখেছি তাঁর
.        সৌম্য মূর্তিখানি
দেখলে নাকো তোমরা তাঁকে
.        এই যা দুঃখখানি |
চলে গেছেন মহাপুরুষ
.        কাজ করে তাঁর শেষ
অভাবে তাঁর কেঁদে ভাসায়
.        আজকে সারা দেশ |



.            ****************                                           
সুচির পাতায়  



মিলনসাগর
*
বুদ্ধু ও বাচ্চুর চিঠি

ওমা তুমি মোদের ছাড়ি
.        গেছ চলে দিদির বাড়ী,
কষ্ট কিছু হচ্ছে না তো
.        সেথায় গিয়ে মোদের ছাড়ি |
চুলবুল কি মোদের কথা
.        কোন সময় কিছু বলে,
আমি কিন্তু রোজই ভাবি
.        তাহার কথা সন্ধ্যে কালে |
তোমার কথাও মনে পড়ে
.        শোবার সময় বিছানাতে
রাতে দেখি শূণ্য তাহা
.        যেথায় শুতাম তোমার সাথে |
স্কুল থেকে ছুটে যবে
.        শুতে আসি তোমার কোলে,
আরো মনে পড়ে মাগো
.        খাবার সময় দুপুর হলে |
সত্যি তুমি বল দেখি
.        বাচ্ছুদি আর আমার কথা
কখনও কি মনে পড়ে
.        তোমার মনে দেয়না ব্যথা |
যাকগে এসব লিখি কি ছাই
.        ভেবো নাকো সত্যি ইহা
আমরা হেথায় ভালই আছি
.        মনে তুমি ভাববে তাহা |
কবে তুমি আসবে হেথায়
.        দিনটি শুধু লিখো মোরে
হিসেব আমি রাখব তাহার
.        চিঠি পেলে রোজই ভোরে |
ওখানে সব কেমন আছে
.        দিদিরা ও জামাইবাবু
শুনলাম হোথায় রোগে ভুগে
.        তিনি নাকি ছিলেন কাবু |
পাশের বাসায় মঞ্জুদিরা
.        ছোট কাকা আর ছোটমা
ডলিরা সব কেমন আছেন
.        লিখলে চিঠি জানিও তা |
এখন তবে আমরা আসি
.        চিঠি দিলে লিখবো আবার
খাবার সময় হ'য়ে এলো
.        ওদিক আমার দিচ্ছে খাবার |



.            ****************                                           
সুচির পাতায়  



মিলনসাগর