কবি সলিল চৌধুরী র জন্ম দক্ষিণ ২৪ পরগণার রাজপুর-সোনারপুর অঞ্চলের গাজিপুরেমাতা
বিভাবতী দেবী
পিতা জ্ঞানেন্দ্র মোহন চৌধুরী আসামের লতাবাড়ি চা বাগানে ডাক্তারী করতেন একদিন
সাহেব ম্যানেজার তাঁকে "কাম হিয়ার ডার্টি নিগার" বলায় তিনি ঘুষি মেরে সাহেবের তিনটে দাঁত ফেলে দেন!
এর ফলস্বরূপ তাঁকে সবকিছু জলের দরে বিক্রী করে শুধুমাত্র কুকুর মার্কা কলের গানের গ্রামাফোন ও
শখানেক সিম্ফনি রেকর্ড নিয়ে আসাম ছেড়ে চলে আসেন
গান্ধীজির সত্যাগ্রহের সময় তিনি নাকি দু তিন
ট্রাঙ্ক ভর্তি
 দামি  সূট  পুড়িয়েছিলেন!  স্বাভাবিক  ভাবেই  বাবার  প্রভাব  কবি সারা জীবন ধরে  অনুভব  
করেছেন এমন সব ঘটনাবলিও তাঁর গানের ভেতর দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে

কবি আট ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয়
 দঃ ২৪ পরগণার সুভাষগ্রামে, যার পুরাতন নাম কোদালিয়া, তাঁর
মামার বাড়িতে থেকে পড়াশোনা
হরিনাভি স্কুল থেকে প্রথম বিঙাগে ম্যাট্রিকুলেশন এবং আই.এসসি. এবং
পরে কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজ থেকে বি.এ. পাশ করেন


দাদার অর্কেস্ট্রা ক্লাবে নানান বাদ্যযন্ত্র বাজানোয় হাতে খড়ি
১৪/১৫ বছর থেকেই বাঁশি বাজাতেন পরে
আই.পি.টি.এ.-র সঙ্গেও বাঁশি বাজিয়েছেন
দুর্ভিক্ষের সময় যে দলটি আসাম ও বাংলা ঘুরেছিল, তিনি সেই
দলেও বাঁশি বাজিয়েছিলেন
সুভাষগ্রামে মজে জাওয়া বিদ্যাধরী নদীর সংস্কারের দাবীতে যে আন্দোলন হয়
তাতে তিনি সক্রিয় অংশ গ্রণ করেন
পার্টির জেলা নেতা শ্রী নিত্যানন্দ চৌধুরীর মত সংস্কৃতি সম্পর্কে
উদারচেতা মানুষের উত্সাহ দানের ফলে তিনি প্রায়  প্রত্যেকটি মিটিং এর জন্য একটি করে গান রচনা
করতে শুরু করেন!

তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক ফ্রন্টের সর্বক্ষণের কর্মী ছিলেন
১৯৪৫ সালে, বঙ্গবাসী কলেজে পড়া
কালীন রংপুরের ছাত্র সম্মেলনে যোগ দেবার সময়, আজাদ হিন্দ ফৌজের বন্দীদের বিচার নিয়ে লিখেছিলেন
তাঁর প্রথম "গণ সংগীত" - 'বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা আজ জেগেছে এই জনতা'
কৃষক
আন্দোলনের জন্য তাঁর রচিত "হেই সামালো হেই সামালো" গান অর্ধ শতাব্ দি পরের  
সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম
আন্দোলনকারীদের  কণ্ঠেও আমরা শুনেছি! ১৯৪৬ সালের ২৯শে জুলাই, নৌ বিদ্রোহের সময়  রচনা
করেছিলেন "ঢেউ উঠেছে কারা টুটেছে"
দাঙ্গার সময়ে লিখেছিলেন "ও মোদের দেশবাসীরে, আয়রে পরাণ
ভাই, রহিম ভাই"


কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তর  "পাল্কির গান" এবং কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যর  "রানার", "অবাক পৃথিবী", "ঠিকানা
আমার চেয়েছ" প্রভৃতি কবিতায় সুর দিয়ে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে তা আজ বাংলার অমূল্য সম্পদ করে
দিয়ে গেছেন
তাঁর "গাঁয়ের বধু" তাঁকে বাংলার ঘরে ঘরে সবার হৃদয়ের সংগীতকার করে দেয় আই.পি.টি.
এ. তে তাঁর সহযোদ্ধা-বন্ধু এবং  প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ শ্রী অভিজিত বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণে আমরা
জানতে পাই যে একবার সলিল চৌধুরী তাঁর অনুজ সুহাসকে  বলেছিলেন যে "গাঁয়ের বধু লিখে যদি আমি
মরে যেতাম, তাহলেও আমি সলিল চৌধিরীই হতাম"
 অভিজিত বাবু আরও জানান যে একদিন ব্যক্তিগত
আলাপচারিতায় সলিল চৌধুরী বলেন "
জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র (বটুকদা) মাটি না কোপালে সলিল চৌধুরীর জন্ম
হতো না"
রবীন্দ্র সংগীতের পুরোধা শ্রীমতী সুচিত্রা মিত্র বলেছিলেন "বাংলা গানের ক্ষেত্রে রবীন্দ্র - নজরুল
উত্তর যুগের পর আমাদের দেশে সলিলের আবির্ভাব একটি নতুন যুগের সূচনা..."


তাঁর সুরারোপিত প্রথম বাংলা ছায়াছবি সত্যেন বসুর "পরিবর্তন" মুক্তি পায় ১৯৪৯ সালে
প্রথম  
সুরারোপিত হিন্দী ছায়াছবি, তাঁর নিজের গল্প "রিক্সাওয়ালা" অবলম্বনে, বিমল রায়ের "দো বিঘা জমিন", এই
ছবিটির চিত্রনাট্য লেখাতে সলিল চৌধুরীর বিশেষ অবদান ছিল
আর্থিক কারণে তাঁর বম্বে তে চলে যাওয়ার
পর বাংলা গানের জগতের প্রভূত ক্ষতি হয়ছিল এ কথা নানাজনে নানা সময়ে স্বীকার করেছেন

১৯৪৯ - ১৯৯৫ সময়কালের  মধ্যে তাঁর সুরারোপিত বাংলা,  হিন্দী  এবং  অন্যান্য ১৪টি ভাষার ছায়াছবির
সংখ্যা ১৩৫
 

তিনি প্রথাগতভাবে কোনো সংগীত গুরুর কাছে শিক্ষা লাভ করেন নি |  বলতেন যে তাঁর গুরু রেকর্ড,
রেডিও, টেলিভিশন প্রোগ্রাম ও আন্তর্জাতিক সংগীত! প্রভাবিত হয়েছিলেন মোজার্ট, বিথোভেন ও বাখ্ এর
মত সুরস্রষ্টাদের দ্বারা


এই অসাধারণ প্রতিভার সংগীত জীবন নিয়ে লিখে শেষ করা আমাদের সাধ্যের বাইরে | পাঠকের জন্য
আমরা তাঁর কয়েকটি যুগান্তকারী গান এখানে তুলে দিয়েছি


এছাড়াও সলিল চৌধুরী অসাধারণ কবিতা লিখে গেছেন
 তাঁর কাব্য গ্রন্থ "সলিল চৌধুরির কবিতা" প্রকাশিত
হয় ১৯৮৩ সালে | সেখানে তিনি লিখেছেন যে ১৯৪৮ সালে "পরিচয়"-এ তাঁর প্রথম কবিতা "শপথ" প্রকাশিত
হলেও কেউ তখন কবি স্বীকৃতি দেন নি
প্রায় তিন দশক পর তিনি দেখেছিলেন যে তাঁর কবিতা বিভিন্ন
সভায় পাঠ হচ্ছে এবং লোকে ভালও বলছেন
তিনি কবিতা লিখেছেন পরিত্যক্ত খামে, হোটেলের মেনুকার্ডে
কিম্বা প্লেনে দেওয়া কাগজের রুমালে বা পুরানো ডায়েরিতে অথবা ধবধবে সাদা খাতার হয়তো প্রথম
 
দুপৃষ্ঠায় | সবই হয়তো হারিয়ে যেতো
কিন্তু তাঁর স্ত্রী এবং বিখ্যাত গায়িকা শ্রীমতী সবিতা চৌধুরী সন্তান
সমাদরে যত্ন সহকারে তা একত্রিত করে প্রকাশিত করার ব্যবস্থা করেন


আমরা এখানে তার কয়েকটি কবিতাও তুলে দিয়েছি

    
আমরা কৃতজ্ঞ সংগীত শিল্পী এবং কবি দীপক দে-র  কাছে, যাঁর পাঠানো সুগবেষিত লেখা থেকে এই কবি-
জীবনীটি নেওয়া হয়েছে


আমাদের ই-মেল -
srimilansengupta@yahoo.co.in   


এই পাতার প্রথম প্রকাশ - ২০০৮
কবি জন্মদিন সংশোধিত করা হয়েছে - ৩০.১১.২০১৯।

...