কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তর কবিতা
*
পাল্ কীর   গান
কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত
এই গানটি সলিল চৌধুরীর সুরে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে সংগীত প্রেমী বাঙালীর বুকে অমর হয়ে বিরাজ করছে।
তামার টাটে !
তপ্ত তামা,--
যায় না থামা,--
উঠ্ ছে  আলে
নাম্ ছে  গাড়ায়,--
পাল্ কী  দোলে
ঢেউয়ের নাড়ায় !
ঢেউয়ের দোলে
অঙ্গ দোলে !
মেঠো জাহাজ
সাম্ নে  বাড়ে,--
ছয় বেহারার
চরণ-দাঁড়ে !
কাজ্ লা  সবুজ
কাজল প'রে
পাটের জমি
ঝিমায় দূরে !
ধানের জমি
প্রায় সে নেড়া,
মাঠের বাটে
কাঁটার বেড়া
|
'সামাল' হেঁকে
চল্ ল বেঁকে
ছয় বেহারা,--
মর্দ তারা !
জোর হাঁটুনি
খাট্ নি  ভারি;
মাঠের শেষে
তালের সারি
|

তাকাই দূরে,
শূন্যে ঘুরে
চিল্  ফুকারে
মাঠের পারে
|
গরুর বাথান--
গোয়াল-থানা,--
ওই গো ! গাঁয়ের
ওই সীমানা !

বৈরাগী সে,--
কণ্ঠী বাঁধা,--
ঘরের কাঁথে
লেপছে কাদা;
মট্ কা  থেকে
চাষার ছেলে
দেখ্ ছে,--ডাগর
চক্ষু মেলে !
দিচ্ছে চালে
পোয়াল গুছি;
বৈরাগীটির
মূর্তি শুচি
|

পের্ জাপতি
হলুদ বরণ,--
শশার ফুলে
রাখছে চরণ !
কার বহুরি
বাসন মাজে ?
পুকুর ঘাটে
ব্যস্ত কাজে;--
এঁটো হাতেই
হাতের পোঁছায়
গায়ে মাথার
কাপড় গোছায় !

পাল্ কী  দেখে
আস্ ছে  ছুটে
ন্যাংটা খোকা,--
মাথায় পুঁটে !

পোড়োর আওয়াজ
যাচ্ছে শোনা,--
খোড়ো ঘরে
চাঁদের কোণা !
পাঠশালাটি
দোকান-ঘরে,
গুরু মশাই
দোকান করে !
পোড়ো ভিটের
পোতার 'পরে
শালিক নাচে,
ছগল চরে
|

গ্রামের শেষে
অশথ-তলে
বুনোর ডেরায়
চুল্লী জ্বলে;
টাট্ কা  কাঁচা
শাল-পাতাতে
উড়ছে ধোঁয়া
ফ্যান্ সা  ভাতে
|

গ্রামের সীমা
ছাড়িয়ে, ফিরে
পাল্ কী  মাঠে
নাম্ ল  ধীরে;
আবার মাঠে,--
তামার টাটে,--
কেউ ছোটে, কেউ
কষ্টে হাঁটে;
মাঠের মাটি
রৌদ্রে ফাটে,
পাল্ কী  মাতে
আপন নাটে !

শঙ্খ-চিলের
সঙ্গে, যেচে--
পাল্লা দিয়ে
মেঘ চলেছে !
তাতারসির
তপ্ত রসে
বাতাস সাঁতার
দেয় হরষে !
গঙ্গা ফড়িং
লাফিয় চলে
বাঁধের দিকে
সূর্য ঢলে
|

পাল্ কী  চলে রে !
অঙ্গ ঢলে রে !
আর দেরী কত ?
আরো কত দূর ?
"আর দূর কি গো ?
বুড়ো-শিবপুর
ওই আমাদের;
ওই হাটতলা
ওরি পেছুখানে
ঘোষেদের গোলা
|"

পাল্ কী  চলে রে,
অঙ্গ টলে রে;
সূর্য ঢলে,
পাল্ কী  চলে !

.   **************                 

.                                                                                       
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
ধূলা-ভরা দ্যায় ধরা তোর লাগি ধর্ণা !
   ঝর্ণা !
এস তৃষার দেশে এস কলহাস্যে--
গিরি-দরী-বিহীরিনী হরিনীর লাস্যে,
ধূসরের ঊষরের কর তুমি অন্ত,
শ্যামলিয়া ও পরশে কর গো শ্রীমন্ত;
ভরা ঘট এস নিয়ে ভরসায় ভর্ণা;
   ঝর্ণা !
শৈলের পৈঠৈয় এস তনুগত্রী !
পাহাড়ে বুক-চেরা এস প্রেমদাত্রী !
পান্নার অঞ্জলি দিতে দিতে আয় গো,
হরিচরণ-চ্যুতা গঙ্গার প্রায় গো,
স্বর্গের সুধা আনো মর্ত্যে সুপর্ণা !
   ঝর্ণা !
মঞ্জুল ও-হাসির বেলোয়ারি আওয়াজে
ওলো চঞ্চলা ! তোর পথ হল ছাওয়া যে !
মোতিয়া মোতির কুঁড়ি মূরছে ও-অলকে;
মেখলায়, মরি মরি, রামধনু ঝলকে
তুমি স্বপ্নের সখী বিদ্যুত্পর্ণা
   ঝর্ণা !

.      *************************                 

.                                                                                       
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
     ছায়া-জোনাক আলিঙ্গিতে
     জলে জোনাক দিশে হারায় |
দিশে হারায় যায় ভেসে যায়
স্রোতের টানে কোন্ দেশে রে ?
মরা গাঙ আর সুর-সরিত্
এক হয়ে যেথায় মেশে রে !
     কোথায় তারা ফুরিয়েছে, আর
     জোনাক কোথা হয় সুরু যে
     নেই কিছুরই ঠিক ঠিকানা
     চোখ যে আলা রতন উঁছে |
আলেয়াগুলো দপদপিয়ে
জ্বলছে নিবে, নিবছে জ্বলে',
উল্কোমুখী জিব মেলিয়ে
চাটছে বাতাশ আকাশ-কোলে !


      আলেয়া-হেন ডাক-পেয়াদা
      আলেয়া হতে ধায় জেয়াদা
      একলা ছোটে বন বাদাড়ে
      ল্যাম্পো-হাতে লক্ ড়ি ঘাড়ে;
সাপ মানে না, ভাঘ জানে না,
ভূতগুলো তার সবাই চেনা,
ছুটছে চিঠি পত্র নিয়ে
রণরণিয়ে হনহনিয়ে |
      বাঁশের ঝোপে জাগছে সাড়া,
      কোল্-কুঁজো বাঁশ হচ্ছে খাড়া,
      জাগছে হাওয়া জলের ধারে,
      চাঁদ ওঠেনি আজ আঁধারে !
শুকতারাটি আজ নিশীথে
দিচ্ছে আলো পিচকিরিতে,
রাস্তা এঁকে সেই আলোতে
ছিপ চলেছে নিঝুম স্রোতে |
      ফিরছে হাওয়া গায় ফুঁ-দেওয়া,
      মাল্লা মাঝি পড়ছে থকে;
      রাঙা আলোর লোভ দেখিয়ে
      ধরছে কারা মাছগুলোকে !
চলছে তরী চলছে তরী--
আর কত পথ ? আর ক'ঘড়ি ?
এই যে ভিড়াই, ওই যে বাড়ী,
ওই যে অন্ধকারের কাঁড়ি--
      ওই বাঁধা-বট ওর পিছন্
      দেখছ আলো ? ঐতো কুঠি
      ঐখানেতে পৌঁছে দিলেই
      রাতের মতন আজকে ছুটি |
ঝপ ঝপ তিনখান
দাঁড় জোর চলছে,
তিনজন মাল্লার
হাত সব জ্বলছে;
      গুরগুর মেঘ সব
      গায় মেঘ মল্লার,
      দূর-পাল্লার শেষ
      হাল্লাক্ মাল্লার !

.         *************************                 

.                                                                                       
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
যার        পুষ্কর-মেঘ পুষ্কর্ণীর দশ ক্রোশ ঠিক বেড়।

ওই        ফাল্গুন আর দক্ষিণ বায় --- সিংহল তার ঘর
হায়        লুব্ধের প্রায় সিংহল ধায় বঙ্গের অন্তর ;
ছিল        সিংহল এই বঙ্গের, হায়, পণ্যের বন্দর,
ওগো       বঙ্গের বীর সিংহল-রাজ-কন্যার হয় বর।

ওই         সিংহল দ্বীপ সুন্দর, শ্যাম, --- নির্ম্মল তার রূপ,
তার        কণ্ঠের হার ল’ঙ্গর ফুল, কর্পূর কেশ-ধূপ ;
আর        কাঞ্চন তার গৌরব আর মৌক্তিক তার প্রাণ,
আর        সম্বল তার বুদ্ধের নাম সম্পদ নির্ব্বাণ।

.                 *************************                 

.                                                                                       
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
‘তুমি কেন বাবা ছেড়ে দিলে তারে ?
.                তোমার কি নেই দাঁত!’

কষ্টে হাসিয়া আর্ত কহিল
.                ‘তুই রে হাসালি মোরে,
দাঁত আছে বলে কুকুরের পায়
.                দংশি কেমন করে ?

কুকুরের কাজ কুকুর করেছে
.                কামড় দিয়েছে পায়,
তা ব’লে কুকুরে কামড়ানো কী রে
.                মানুষের শোভা পায়।’

.        *************************                 

.                                                                                       
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
এইদেশে সৃষ্টি,
ধুপছায়া যার শাড়ী
তার হাসি মিষ্টি |
মুখখানি মিষ্টিরে
চোখদুটি ভোমরা
ভাব-কদমের--ভরা
রূপ দেখ তোমরা !
ময়নামতীর জুটি
ওর নামই টগরী,
ওর পায়ে ঢেউ ভেঙে
জল হোলো গোখরী !
ডাক পাখী ওর লাগি'
ডাক ডেকে হদ্দ,
ওর তরে সোঁত-জলে
ফুল ফোটে পদ্ম |
ওর তরে মন্থরে
নদ হেথা চলছে,
জলপিপি ওর মৃদু
বোল বুঝি বোলছে |
দুইতীরে গ্রামগুলি
ওর জয়ই গাইছে,
গঞ্জে যে নৌকা সে
ওর মুখই চাইছে |
আটকেছে যেই ডিঙা
চাইছে সে পর্শ,
সঙ্কটে শক্তি ও
সংসারে হর্ষ |
পান বিনে ঠোঁট রাঙা
চোখ কালো ভোমরা,
রূপশালী-ধান-ভানা
রূপ দেখ তোমরা


পান সুপারি ! পান সুপারি !
এইখানেতে শঙ্কা ভারি,
পাঁচ পীরেরই শীর্ণি মেনে
চলরে টেনে বৈঠা হেনে ;
বাঁক সমুখে, সামনে ঝুঁকে
বাঁয় বাঁচিয়ে ডাইনে রুখে
বুক দে টানো, বইটা হানো--
সাত সতেরো কোপ কোপানো |
হাড়-বেরুনো খেজুরগুলো
ডাইনী যেন ঝামর-চুলো
নাচতে ছিল সন্ধ্যাগমে
লোক দেখে কি থম্ কে  গেল |
জমজমাটে জাঁকিয়ে ক্রমে
রাত্রি এল রাত্রি এল |
ঝাপসা আলোয় চরের ভিতে
ফিরছে কারা মাছের পাছে,
পীর বদরের কুদরতিতে
নৌকা বাঁধা হিজল-গাছে |


আর জোর দেড় ক্রোশ--
জোর দের ঘন্টা,
টান ভাই টান সব--
নেই উত্কণ্ঠা |
চাপ চাপ শ্যাওলার
দ্বীপ সব সার সার,
বৈঠৈর ঘায়ে সেই
দ্বীপ সব নড়ছে,
ভিল্ ভিলে  হাঁস তায়
জল-গায় চড়্ ছে |
ওই মেঘ জমছে,
চল্ ভাই সমঝে,
গান গাও দাও শিশ,
বকশিশ ! বকশিশ !
খুব জোর ডুব-জল
বয় স্রোত ঝিরঝির,
নেই ঢেউ কল্লোল,
নয় দুর নয় তীর |
নেই নেই শঙ্কা,
চল্ সব ফুর্তি,
বকশিশ টঙ্কা,
বকশিশ ফুর্তি |
ঘোর-ঘোর সন্ধ্যায়,
ঝাউ-গাছ দুলছে,
ঢোল-কলমীর ফুল
তন্দ্রায় ঢুলছে |
লকলক শর-বন
বক তায় মগ্ন,
চুপচাপ চারদিক--
সন্ধ্যার লগ্ন |
চারদিক নিঃসাড়,
ঘোর-ঘোর রাত্রি,
ছিপ-খান তিন-দাঁড়,
চারজন যাত্রি |


জড়ায় ঝাঁঝি দাঁড়ের মুখে
ঝউয়ের বীথি হাওয়ায় ঝুঁকে
ঝিমায় বুঝি ঝিঁঝিঁর গানে--
স্বপন পানে পরাণ টানে|
   তারায় ভরা আকাশ ওকি
   ভুলোয় পেয়ে ধূলোর পরে
   লুটিয়ে পল আচম্বিতে
   কুহক-মোহ-মন্ত্র-ভরে !


কেবল তারা ! কেবল তারা !
শেষের শিরে মানিক পারা,
হিসাব নাহি সংখ্যা নাহি
কেবল তারা যেথায় চাহি |