কবি শশিভূষণ দাশগুপ্তর কবিতা
*
ছুটির দিনটা
কবি শশিভূষণ দাশগুপ্ত

ছুটির দিনটা                পাক খায় তিনটা
তাক ধিন্ ধিন্ তা          নাচি আর গাই ;
চেয়ে দেখি বাইরে          রোদটুকু নাইরে
হুল্লোড়ে ডাকে মেঘ         হাঁই মাঁই কাঁই।

ভ্যাংচায় হুলো মেঘ        ল্যাংচায় নুলো মেঘ
ছিচ কাঁদে ভুলো মেঘ      পথ ভুলে কোণে ;
কোনটার ধরে নাক         বায়ু খায় ঘুরপাক
যত রোস হাঁক ডাক        কেইবা তা শোনে!

কেলো ভূতো পেলটা        রাখ মারবেলটা,
ভাল নাহি লাগে আজ       টুং টাং খেলা ;
তার চেয়ে শুয়ে টান        গায়ে দিয়ে কাঁথাখান
চুপচাপ বনে যাই            লক্ষ্মীর চেলা।

হাঁই মাঁই করে মেঘ          সাঁই সাঁই বায়ু বেগ
পিট পিট চোখ দুটো        বোজা আছে অল্প ;
তার মাঝে আছো বেশ     গায়ে গায়ে দিয়ে ঠেস
শুনি বসে ঘরছাড়া          মেঘেদের গল্প।

.                *****************             

.                                                                                          
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
জামরুল
কবি শশিভূষণ দাশগুপ্ত

জ্যৈষ্ঠের অপরাহ্ন-বেলা  |
পীচে-বাঁধানো রাস্তা গ’লে মিশে যাচ্ছে
বিক্ষুব্ধ বাতাসের সঙ্গে |
মাঝে মাঝে জানালায় ধাক্কা দিয়ে যায়
প্রতপ্ত নগরীর দীর্ঘশ্বাস |

চা-পানের নিমন্ত্রণ |
সেটা অবশ্য সাধারণ নাম বা উপলক্ষ্য
যাকে ঘিরে লক্ষ্য হয়ে ওঠে পাঁচ রকমের আয়োজন------
ভূরি জলযোগ, সুশীতল পানীয়-------
সুরম্য দর্শনীয় এবং সুমধুর শ্রবণীয়
এবং ইত্যাদি |

বিরাট বড়লোকের বাড়ি |
কক্ষের দরজা বন্ধ----
জানালাগুলো বন্ধ এবং ভিজে খস্ খসে ঢাকা,
ভিতরে সাঁই সাঁই চলেছে পাখা
আর জ্বলছে তুহিন-রাতের চাঁদের আলোর মত
ঈষৎ নীল কাচের অস্বচ্ছ আবরণ পরানো
বিজুলীর বাতি,
মিলনসাগর    
বাইরের জগৎটাকে জোর করে ঠেকিয়ে রাখবার
নিখুঁত ব্যবস্থা |

খাবার এল অনেক------প্রাচুর্যে এবং প্রকারে,
নিম্ কি আর কচুরি আর শিঙাড়া------
ভাজি আর ডালনা আর চাটনি------
তারি পাশে একখানি চীনেমাটির থালায় সাজানো
আম আর লিচু ----- আর দুটো জামরুল  |

বাজে রেডিও ----- বিলিতি ঢঙের রেকর্ড------
ওঠে হাসি-ঠাট্টার রোল,
তাও অবশ্য পরদা-মাফিক ----
স্থান-কাল-পাত্রের বিচারে |
রুদ্ধ কক্ষ |
বায়ু ঢুকবার পথ নেই---আলো ঢুকবার রন্ধ্র নেই------
শব্দের প্রবেশও সবটা না হলেও অনেকটা নিষিদ্ধ  |
সামনে চীনেমাটির সাদা বাসন------
তারই উপরে দু’টো জামরুল  |

চেয়ে আছি ঐ দুটো জামরুলের দিকে,
সহসা দমকা হাওয়ায় খুলে গেল মনের জানালা,-----
চারিদিকে অনেক আলো, অনেক হাওয়া,
অনেক পথ-প্রান্তর-খোলা আকাশ |
সেই জানালার পথ দিয়ে
চলে গেলুম অনেক দূরের দেশে
অনেক বন-প্রান্তর পাহাড়-নদী মাঠঘাট অতিক্রম ক’রে  |
যেখানে গিয়ে পৌঁছলুম
সেখানে পড়ে রয়েছে শ্যাওলা-ভরা একটি দীঘি
কর্মহীন নিরালা গ্রাম্য স্থবির |
তার সামনে -----যতদূর চোখ যায়
ধূ ধূ করে দিগন্তজোড়া মাঠ ;
তার বুকে ঝিলমিল-করা রোদের তাপ
ঝলসে’ ওঠে চাষীর ঘামে-ভেজা কালো দেহে-----
আর সাদা বলদ দু’টোর পিছল গায়ে |

নির্জন দুপুর -----স্তব্ধ দুপুর------
শ্যাওলাভরা দীঘির চারিকূল ঘেঁষে
বেড়ে উঠেছে পানিকচু আর হিঞ্চে-----
আর পুরু হয়ে উঠেছে কলমীর দল-----
যার উপরে বকগুলো আর বেলেহাঁসগুলো
ঘুরে বেড়ায় স্বেচ্ছাবিহারীর ছন্দে |
কালো দীঘির মাঝখানে যেটুকু রয়েছে ফাঁক
সেখানে ডুবছে আর খেলছে
মিলনসাগর    
পানকৌড়ির একটি ছোট্ট দল ;
মাছরাঙা হ্রস্বগ্রীবায় লাল চঞ্চু ঊর্ধ্ব ক’রে
ধ্যান ধ’রে আছে পূব-দক্ষিণ কোণের তেঁতুল গাছটায় |

এপারে একটি বকুল গাছ,
তার নীচে বাহুতে মাথা দিয়ে
অঘোরে ঘুমিয়ে পড়েছে ভিন গাঁয়ের পথিক,
পাশে ঘুমিয়ে আছে বাঁশের লাঠির আগায় বাঁধা
ময়লা ছেঁড়া কাপড়ের কি যেন একটা পুঁটুলি |
তারি পাশে একটা জামরুল গাছ -------
তিনখানি ভাঁজ হয়ে দীঘির কূলে হেলে পড়েছে |
যে বাঁকা ডালখানি এগিয়ে গেছে দীঘির দিকে
তাঁরই উপরে নিশিন্ত নিরালায় রয়েছে ব’সে
একটি বার-তের বছরের গেঁয়ো জীব ;
কোঁচড়ভরা টস্ টস্ করে জামরুল |
মাঝে মাঝে কোঁচড় খুলে খায়,
পা দোলায় আর গুন্ গুন্ গান গায়-----
আর তাকিয়ে থাকে মাঠের দিকে,
কালো দীঘির বুকে ডুব মেরেছে যে পানকৌড়ি
তার দিকে,
আর ঝুপ ক’রে ছোট একটা মাছ তুলে নিল যে মাছরাঙা
তারি দিকে  |

চীনেমাটির বাসনে সাজানো জামরুলের দিকে তাকাই
আর আনমনে ভাবি --------
এত রূপ এই জামরুলের !

.        *****************             

.                                                                                          
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর