আমরা মিলনসাগরে  কবি শিবরাম চক্রবর্তীর কবিতা তুলে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে এই
প্রচেষ্টার সার্থকতা।




উত্স -
  • সুরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়, “শরৎ-পরিচয়” (২য় সংস্করণ ১৯৫৬)।
  • গোপালচন্দ্র রায়, “শরত্চন্দ্র” ১ম ও ২য় খণ্ড, ১৯৬১।
  • গোপালচন্দ্র রায়, “শরত্চন্দ্রের চিঠিপত্র” (প্রকাশকাল অজানা)।
  • গোপালচন্দ্র রায়, “শরৎ-পত্রাবলি”, ২০০০।
  • অমল হোম, “পুরুষোত্তম রবীন্দ্রনাথ”, ১৯৫৫।
  • সৌরেন্দ্রনাথ মিত্র প্রকাশিত “শরৎ-তর্পণ”, ১৯৫৯।
  • নরেন্দ্র দেব, শরৎ-বন্দনা, ১৯৩২।
  • ভারতী পত্রিকার ১৩৩৩ বঙ্গাব্দের পূজা সংখ্যায়, (অক্টোবর ১৯২৬), শরত্চন্দ্রের নামে “ষোড়শী”।
  • সুকুমার সেন ম্পাদিত শরত্সাহিত্যসমগ্র, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, ১৯৮৫।
  • শিশিরকুমার দাশ, “সংসদ বাংলা সাহিত্য সঙ্গী”, ২০০৩।
  • শিবরাম চক্রবর্তী, “ঈশ্বর পৃথিবী ভালবাসা”, ১৯৫৯।
  • সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু, “সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান” ১ম খণ্ড, ২০১০।
  • দেবজিত বন্দ্যোপাধ্যায়, “বঙ্গমঞ্চে কথাশিল্পী”, eisamay.indiatimes.com, ২১.০৯,২০১৫।
  • সুশান্ত কর্মকার, “ঔপন্যাসিক যখন নাট্যকার :: শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়”, সাকসেস বাংলা ওয়েবসাইট
  • শিবরাম চক্রবর্তীকে নিয়ে “চকরবর্ তি”, আনন্দবাজার পত্রিকা ওয়েবসাইট



কবি শিবরাম চক্রবর্তীর মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন



আমাদের ঠিকানা :
srimilansengupta@yahoo.co.in               


এই পাতার প্রথম প্রকাশ - ২২.৭.২০১২।
কবির ভারতী পত্রিকায় প্রকাশিত কবিতা সহ পরিবর্ধিত পাতা - ১৩.১০.২০১৯।


...
কবি শিবরাম চক্রবর্তীর জন্ম গ্রহণ
করেন পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলার চাচলের
রাজ পরিবারে, কিন্তু কলকাতায়, তাঁর
মাতুলালয়ে। তাঁর শৈশব ও কৈশোর কাটে
পাহাড়পুর ও চাচল-এ। পিতা শিবপ্রসাদ
চক্রবর্তী, মাঝে মাঝেই পথে বেরিয়ে পড়তেন
পরম প্রাপ্তির সন্ধানে। এই বেরিয়ে পড়ার
নেশা শিবরাম পেয়েছিলেন উত্তরাধিকার সূত্রে। একবার কৈশোরে তিনি বাড়ী থেকে পালিয়েও যান,  যার
অভিজ্ঞতায় তিনি পরবর্তিতে রচনা করেন তাঁর উপন্যাস "বাড়ী থেকে পালিয়ে" (১৯৩৭), যা চলচিত্রায়িত
করেন ঋত্বিক ঘটক।
*
শিবরাম চক্রবর্তীর শিক্ষাজীবন   
শিবরাম চক্রবর্তীর সাহিত্য   
ষোড়শী নাটকের নাট্যরূপ নিয়ে শরত্চন্দ্র, শিবরাম ও শিশির
ভাদুড়ী কে নিয়ে
একটি ঐতিহাসিক বিতর্ক     
শিবরাম চক্রবর্তীর শিক্ষাজীবন -                                                     পাতার উপরে . . .   
ইস্কুলে পড়তে পড়তেই তিনি স্বধীনতা আন্দোলনে যোগদান করেন এবং
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের সান্নিধ্যে
আসেন। স্বদেশী আন্দোলনের যোগদানের ফলে তাঁকে কারাবাসও করতে হয় এবং তার জন্য তিনি ম্যাট্রিক
পরীক্ষায় বসতে পারেন নি। এই সময়ে তিনি "বিজলী" ও "
Forward" পত্রিকার সাংবাদিক এবং পরবর্তিতে
"যুগান্তর" ম্যাগাজিনের প্রকাশক হিসেবে কাজ করেন। তাঁর জীবনের বেশীরভাগটাই কাটে উত্তর কলকাতার
মুক্তরাম বাবু স্ট্রীটের একটি মেসবাড়ীর দোতলায়। তিনি ছিলেন খামখেয়ালি, দরাজ মনের এবং বেহিসেবী।
ফলে মাঝে মাঝেই তাঁকে আর্থিক অনটনের মধ্য দিয়ে যেতে হোতো | শেষ বয়সে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁর
মাসোহারার ব্যবস্থা করেন।
*
শিবরাম চক্রবর্তীর সাহিত্য -                                                            পাতার উপরে . . .   
সাহিত্যের জগতে তাঁর প্রবেশ কবি হিসেবে "মানুষ" (১৯২৯) কাব্যগ্রন্থের প্রকাশ দিয়ে। এছাড়া ঐ বছরই
তিনি প্রকাশ করেন আরও একটি কাব্যগ্রন্থ "চুম্বন"। এই কাব্যগ্রন্থ দুটিতে তাঁর রোমান্টিক বিহ্বলতা এবং
দরিদ্র মানুষের জন্য বেদনাবোধ পুরো মাত্রায় প্রকাশ পেয়েছে।

এর পর তিনি "বসুমতী", "আনন্দবাজার পত্রিকা" এবং "দেশ" পত্রিকায় গল্প ও উপন্যাস লেখা শুরু করেন।
তাঁর লেখা শ্লেষ্মালংকার যুক্ত। তাঁর প্রতিভার সর্বশ্রেষ্ঠ প্রকাশ কিশোর সাহিত্যে। তাঁর সৃষ্ট চরিত্র হর্ষবর্ধন,
গোবর্ধন ও ইতু ও বিনি পাঠকচিত্ত জয় করেছে। এমন কি নিজের নামের বানান (শিব্রাম চকরবরতি) ভেদের
মধ্য দিয়েও তাঁর হাস্যরসের পরিচয় পাওয়া যায়।  তাঁর গল্পে তাঁর সৃষ্ট কাল্পনিক চরিত্রের মধ্যে তিনি
নিজেকে স্বচ্ছন্দে  বিচরণ করাতে পারতেন। শরত্চন্দ্রের "দেনাপাওনা" উপন্যাসের নাট্যরূপ "ষোড়শী" তাঁরই
করা। তাঁর আত্মজীবনী "ঈশ্বর, পৃথিবী, ভালোবাসা" (১৯৭৪) তাঁর শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্মের মধ্যে পড়ে। তাঁর
লেখা "মস্কো বনাম পণ্ডিচেরী" তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা এবং ব্যঙ্গ ও তর্ক প্রবণতার অন্যতম নিদর্শন। তাঁর
প্রায় ৬০ বছরের সাহিত্যিক জীবনে তিনি ১৫০টির বেশী গ্রন্থ রচনা করেছিলেন।
*
ষোড়শী নাটকের নাট্যরূপ নিয়ে একটি ঐতিহাসিক বিতর্ক -                       পাতার উপরে . . .  
ষোড়শী নাটকের নাট্যরূপ কার দেওয়া, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা-প্রকাশিত  গ্রন্থাবলীতে
তুমুল তর্ক-বিতর্কের সূচনা হয়। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ছাপা
কবি শিবরাম চক্রবর্তীর আলাপচারিতা এবং
১৯৫৯ সালে তাঁর “ঈশ্বর পৃথিবী ভালবাসা” গ্রন্থে এই নিয়ে লেখা, থেকেই এই বিতর্কের সূত্রপাত।

শরত্চন্দ্রের কবিতা মিলনসাগরে তুলতে গিয়ে আমাদের এই “ঘোলাজলেই” নেমে তাঁর “কবিতা” ধরে আনতে
হয়েছে!! এই বিষয়টির একটি সত্য-কেন্দ্রিক গ্রহণযোগ্য সমাধান না হলে যে
শরত্চন্দ্রের কবিতাই আমাদের
পাওয়া হতো না। পাঠক ভাববেন না যেন যে আমরা যেন-তেন করে ষোড়শীর গানগুলির রচনা শরত্চন্দ্রের
নামে চালিয়ে দেবার চেষ্টা করছি! কারণ ষোড়শীর বাইরেও
শরত্চন্দ্রের ছড়া ও কবিতা আমরা সংগ্রহ  
করতে সফল হয়েছি। তা দিয়েই মিলনসাগরে শরত্চন্দ্রের কবিতার পাতা করে দেওয়া যেতো।

কিন্তু আমরা মনে করছি যে ষোড়শীর গানগুলি কার -
শিবরাম চক্রবর্তীর না শরত্চন্দ্রের লেখা এই বিতর্কের
একটি চূড়ান্ত সমাধান হওয়া বাংলা সাহিত্যের পক্ষেও শোভনীয়। তাই খানিকটা অপ্রাসঙ্গিক হলেও আমরা
এই বিষয়ে আমাদের প্রাপ্ত তথ্যাদি বিশ্লেষণ করে জানতে পেরেছি যে ষোড়শীর গানগুলি সত্যই
শরত্চন্দ্রের
লেখা। পাশাপাশি আমরা আরও চাই যে, এই অবাঞ্ছিত ঘটনার ফলে শিবরাম চক্রবর্তীকে যে তিক্ততার মধ্য
দিয়ে বাকি জীবনটা কাটাতে হয়েছে এবং
শরত্চন্দ্র ও শিশির ভাদুড়ীর নামে যে অপবাদ  ছড়িয়েছিল,  
তারও অবসান হোক।    

এই নিয়ে আমাদের বিশ্লেষণ এই রকম . . .
যে টুকরে টুকরো খবর ছড়িয়েছিল তার কয়েকটি প্রথমেই আমরা এখানে তুলে দিচ্ছি . . .

১। সাকসেস বাংলা ওয়েবসাইটে সুশান্ত কর্মকারের “ঔপন্যাসিক যখন নাট্যকার :: শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়”
প্রবন্ধে তিনি ষোড়শী নাটকের সম্বন্ধে লিখেছেন . . .

১৯২৭ খ্রিঃ ১৩ আগষ্ট @ শরৎচন্দ্র কৃত ‘দেনাপাওনা’ উপন্যাসের নাট্যরূপ ‘ষোড়শী’র আত্মপ্রকাশ ঘটে
‘ভারতী’ পত্রিকায়। তবে জানা যায় ‘ষোড়শী’র নাট্যরূপ দানের কৃতিত্ব শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের একার নয়।
সৌরিন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায় তাঁর "শরৎচন্দ্রের জীবনরহস্য" গ্রন্থে জানিয়েছেন, ‘দেনাপাওনা’ উপন্যাসের  
নাট্যরূপ প্রথমে শ্রীশিবরাম চক্রবর্তী দিয়েছিলেন। শরৎচন্দ্র সেই লেখা আগাগোড়া পরিমার্জন করে  
শরৎচন্দ্রের নামেই ‘ষোড়শী’ নামে ‘ভারতী’তে প্রকাশিত হল এক সংখ্যাতেই সমগ্রভাবে। নাটক বাবদ
‘ভারতী’র তরফ থেকে সম্পাদিকা সরলা দেবী শরৎচন্দ্রকে তিনশো টাকার চেক দেন। এ টাকা থেকে  
শরৎচন্দ্র অবশ্য শিবরামকে একশো টাকা দিয়েছিলেন
।”
@ ভারতীতে প্রকাশনার তারিখটা ১৩৩৩, আশ্বিন
(Puja) সংখ্যায় (অক্টোবর ১৯২৬) হবে।---মিলনসাগর॥

২। আনন্দবাজার পত্রিকায়
শিবরাম চক্রবর্তীকে নিয়ে “চকরবর্ তি” পাতায় শরত্চন্দ্রের দেনা-পাওনা
উপন্যাসের নাট্যরূপ ষোড়শী কে নিয়ে মর্মান্তিক কথা বলা হয়েছে। তাঁকে নাকি
শরত্চন্দ্র কোনো পারিশ্রমিক
দেননি। নাটকের পরিচালক-অভিনেতা শিশির ভাদুড়ীই তাঁকে ১২০টাকা দিয়েছিলেন। এই লেখাটি ১৯৬০-এ
প্রকাশিত,
শিবরাম চক্রবর্তীর “ঈশ্বর পৃথিবী ভালবাসা” গ্রন্থের লেখারই পুনরাবৃত্তি। সেই লেখাটি আমরা নীচে
দিলাম।

৩। শিবরাম চক্রবর্তীর “ঈশ্বর পৃথিবী ভালবাসা” গ্রন্থের ৪০৩-পৃষ্ঠায় দেওয়া আলেখ্যে থেকে প্রয়োজনীয়
অংশই কেবল তুলে দিচ্ছি। তবুও এটা বেশ দীর্ঘ হয়ে গেল। পাঠক আমাদের এর জন্য মার্জনা করবেন।
এখানে তিনি অহিন্দ্র চৌধুরী এবং শিশির ভাদুড়ীর অভিনয়ের এবং শিশির ভাদুড়ী এবং প্রবোধচন্দ্র গুহর
উপস্থাপনার মধ্যে তুলনামূলক বিচার করতে গিয়ে দেনা-পাওনার নাট্যরূপ ষোড়শীর সম্বন্ধে লিখেছেন . . .

“ . . .
তবে রবীন্দ্রনাথকে না আনতে পারলেও শরত্চন্দ্রকে রঙ্গমঞ্চে প্রথম আহরণের মাহাত্য তাঁর (শিশির
ভাদুড়ীর)। যদিও সেটা অনেক গড়িমসির পরেই। এবং এক রকম, ঐ প্রবোধবাবুকে টেক্কা দিতে গিয়েই।
(প্রবোধচন্দ্র গুহই রবীন্দ্রনাথকে, শিশির ভাদুড়ীর আগে, রঙ্গমঞ্চে এনেছিলেন প্রথম তাঁর চিরকুমার সভা,
শোধবোধ, গৃহপ্রবেশ ইত্যাদি মঞ্চস্থ করার মধ্যে দিয়ে )

আমি যখন দেনা-পাওনার নাট্যরূপের খসড়া নিয়ে তাঁর কাছে যাই, তিনি দেখে শুনে ‘ভেরি ক্লেভারলি ডান্’
বলে আমাকে তা ফেরত দিয়েছিলেন। আমি তখন কী করি, টাকার দরকার, আমার বন্ধু জগৎ
ভট্টাচার্যকে তা ছাপতে দিই। সরলা দেবী সম্পাদিত ভারতী মাসিকপত্রের তিনি তখন সহযোগী সম্পাদক,
শরত্চন্দ্রের অনুমতি নিয়ে তাঁর নামেই সেটা তিনি ভারতীর শারদীয় আর সর্বশেষ সংখ্যায় বার করেন ---
দক্ষিণার সিংহভাগ স্বভাবতই শরৎবাবুকে দিয়ে নামমাত্র কিছু (নাট্যরূপ দাতারূপে নিজের নাম হারানো
সত্ত্বেও) পেয়েই আমি বর্তে যাই, বলাই বাহুল্য। এবং ভারতীতে প্রকাশ লাভের পরই প্রবোধবাবু সে বই
মঞ্চস্থ করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। খবরটা পাবামাত্রই শিশিরকুমার পাণিত্রাসে তাঁর কাছে গিয়ে হুমড়ি
খেয়ে পড়ে বইয়ের অভিনয় স্বত্ব আগেভাগেই হাতিয়ে নিয়ে আসেন। তাহলেও, কাজটা এমন কিছু নিন্দনীয়
হয়েছে আমার মনে হয় না। নাথিং আনফেয়ার ইন লাভ এন্ড ওয়ার... ইত্যাদি বলে না?

এবং লাভের কথাটা ধরতে গেলে, এরকম কাজ করতেই হয়। আর সেটা খতিয়ে দেখে বলা যায়, ষোড়শীই
তাঁর প্রযোজনা-কৃতিত্বের ইতিহাসে  সবচেয়ে লাভজনক অধ্যায়। তাঁর অভিনয়কীর্তিতে সবচেয়ে কীর্তিত।
. . .”

এরপর শিবরাম চক্রবর্তী ৪০৫-পৃষ্টায়, তাঁর মন থেকে কী ভাবে শরত্চন্দ্রের মর্মর মূর্ত্তির স্খলন ঘটল এবং
ষোড়শীর প্রথম শোয়ের দিনের (বেনিফিট নাইটের) অভিজ্ঞতার বিবরণ দিয়েছেন . . .

“ষোড়শী নিয়ে লড়ালড়ি চিরদিনের---সেই সুন্দ-উপসুন্দর আমল থেকেই। আর দেনাপাওনার জেরও কখনই
মেটে না। আর সেই সব মিলিয়ে সমস্ত ব্যাপারটাই কেমন যেন অসুন্দর।

জানি ; কিন্তু জানলেও মন মানতে চায় না। এমন কি, কোনো ভাবমূর্তি নিছক মনগড়া হলেো তা ভাঙলে
মনে লাগে, না লেগে পারে না। নিতান্ত পৌত্তলিকা যদিও, অন্তর্গত সেই পুতুল (বা প্রতিমাই) ভেঙে পড়লে
মনের খানিকটা নিয়েই পড়ে বুঝি।

আমার মর্মের পীঠস্থান থেকে শরত্চন্দ্রের মর্মর মূর্তির স্খলন সেদিন আমার মনে বেশি লেগেছিল---
লাভালাভের নীট হিসেবের থেকেও। তাঁর সেই ভঙ্গুর দশাই তখন আমার কাছে মর্মান্তিক।

ভাবমূর্তি উপে গিয়ে কী ভাবমূর্তিই না দেখেছিলাম সেদিন!

ষোড়শীর বেনিফিট নাইটে আমারও কিছু প্রাপ্যগণ্ডা থাকবে আশ্বাস পেয়েছিলাম শিশিরবাবুর।

অভিনয় শেষে গ্রীনরুমে গিয়ে জানলাম, (শিশিরবাবু স্বমুখেই) সেদিনকার বিক্রির সব টাকা একটা খলেয় ভরে
রাখা হয়েছিল, সেই থলিটা নিয়ে শরত্চন্দ্র চলে গেছেন খানিক আগেই।

শিশিরবাবু আমার অংশত দাবীর কথাটা তাঁকে জানিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি নাকি তা দাবিয়ে দিয়েছেন।
বলেছেন --- ‘শিবরাম টাকা নিয়ে কী করবে? বিয়ে করেনি কিচ্ছু না! তার ছেলে নেই পুলে নেই, ঘর নেই
সংসার নেই---টাকার তার কিসের দরকার!’

এই বলে থলে নিয়ে ট্যাকসি ডাকিয়ে এতক্ষণে হয়ত হাওড়া স্টেশনে।

তবুও শিশিরকুমার বলতে গেছলেন---‘ক্ষমাঘেন্না করেও কিছু অন্তত দিন একে শরত্দা!’
তার জবাবে তিনি এই বলেছেন, ‘আমার বেনিফিট নাইটের বখরা ওকে দিতে যাব কেন? এ রাত্তিরে টিকিট
বিক্রি হয়েছে আমার নামে, আমার জন্য টাকা দিয়ে দেখতে এসেছে সবাই। এর ভেতর সে আসছে কোথা
থেকে?’

আমি আর কিছু কইতে পারি না। সত্যি! আমার টাকার দরকার কী! মেসের টাকা বাকী, এর ওর
তার কাছে ধার, এটা ওটা সেটার দরকার---কিন্তু তা নিয়ে উচ্চবাচ্যর কী প্রয়োজন! আমার অভাবের চাকী
এখানে ঘুরিয়ে কী লাভ? তা শুধু আমাকে পিষ্ট করার জন্যই, অপরের পৃষ্ঠপোষকতা লাভের নিমিত্ত নয়।
আমার নিজের চরকায় আর কেউ তেল দিতে আসবে কিসের গরজে?

আমি চুপ করে থাকি। শিশিরবাবু তাঁর এক ভাইকে বলেন---‘দ্যাখ তো কিছু পড়ে আছে কিনা কোথাও।’

‘ক্যাশবাক্সে যা ছিলো সবই তো দেওয়া হয়ে গেছে শরত্দাকে। টিকিটঘরে একটা পয়সাও পড়ে নেই আর।’

‘আমার চেক বইটা আন।’

চেক বই এলে আমাকে শুধান, ‘ক্রস চেক দেব?’

‘ভাঙাব কোথায় আমার কি কোনো অ্যাকাউন্ট আছে কোথাও!’
‘একটা পে টু সেলফ্ লিখে দাওনা দাদা’, তাঁর ভাই বাতলায়।
একশ’কুড়ি টাকার একখানা সেলফ্ চেক কেটে দেন তিনি তত্ক্ষণাৎ। ‘আমার সেভিংস অ্যাকাউন্টে এই
টাকাই পড়ে আছে দেখছি।’

এর বেশি আর কিছু বললেন না। যা পাই যথা লাভ জ্ঞান করে আমিও বাক্যব্যয় বাহুল্য বোধ করি।
সেই একশকুড়িই আমার কাছে এক কাঁড়ি। তখনকার মত দুঃখ প্রশমনের পক্ষে অনেক টাকা। এই সেলফ্
হেলপেই চলে যাবে এখন দিনকতক।

কিন্তু সত্যি বলতে, শিশিরবাবুর দিক থেকে ততটা নয়, শরত্চন্দ্রের ব্যবহারে আমার আঁতে লেগেছিল
যেমনটা। উপন্যাসের দরদী শরত্চন্দ্র জীবনের বাস্তববিন্যাসে এক নিমেষে কোথায় যে হারিয়ে গেলেন
। . . .”

শিবরাম কতটা আঘাত পেয়েছিলেন, তা তাঁর ৪০৭ এর পাতায় এই মন্তব্য থেকে বোঝা যায় . . .

“ . . .
প্রতিভার এটা অভিসম্পাত কিনা জানি না, তবে সপ্রতিভদের এই উত্পাত। বিশ্বাত্মবোধে  বিশ্বকে
আত্মসাৎ করার ভগবদ্দত্ত ন্যায্য অধিকার তাঁদের।  অন্তত তাঁরা তাই মনে করেন।  এবং সেই কর্মের হেতু
কোনো দুঃখ দরদ  দূরে  থাক,  সঙ্কোচমাত্র  বোধ করেন না।  এইহেতু  প্রতিভাধরদের থেকে দূরে থাকাই
নিরাপদ।

প্রতিভার অবদানই শ্রেয়, তাই আমাদের গ্রহণীয় হওয়া উচিত। কিন্তু সেই সঙ্গে প্রতিভার প্রতিভুকেও নিতে
গেলে তাঁর খাই মেটাতে নিজের লেশমাত্রও অবশেষ থাকে না, অবশেষে নিজেও যেতে হয়। প্রতিভা সাধারণ
নিয়মের ব্যতিক্রম। পতঞ্জলির অষ্টাঙ্গযোগে নিয়মের পরে যমের স্থান---প্রতিভা সেই যম। আশপাশের সব
কিছু, সবাইকেই তিনি হজম করেন। তাই করেই বেঁচেবর্তে থাকেন, বাড়বাড়ন্ত হয় তাঁর।

গোরুর চেয়ে গোরুর দুধ ভালো, তাই খেয়েই খুশি থাকতে হয়, তার ওপরেও যে গোসেবায় এগোয়, সে-
হতভাগা  কখনো না কখনো গোরুর গুঁতো খায়ই---যদি তার নিজেরও সমান গরুত্ব না থাকে। দুঃখের কথা,
এই জ্ঞান আগের থেকে কারুর হয় না। হলে পর হাড়ে হাড়ে সেই শিক্ষা লাভের পর তা আর যাবার নয়।  
সেই শিক্ষা কখনই সে হারায় না আবার।  তাবৎ  প্রতিভার  থকে  তার  পর  থেকে  সে সুদূরপরাহত হয়ে
থাকে। অবশ্য দূরের একটা নমস্কার রাখেই
। . . .”

এই দুঃখজনক ঘটনার মধ্যে আমরা যে যে বিষয় উল্লেখনীয় মনে করছি তা হলো . . .

১। ষোড়শীর নাট্যরূপ
শিবরাম চক্রবর্তী নিজেই লিখে প্রথমে শিশির ভাদুড়ীর কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন।

২। শিশির ভাদুড়ী তা ফিরিয়ে দিলে তিনি, অর্থসংকটে থাকার দরুণ ভারতী পত্রিকায় প্রকাশিত করতে  
দিলেন তাঁর বন্ধু জগৎ ভট্টাচার্যকে, যিনি তখন ছিলেন ভারতীর সহযোগী সম্পাদক। এই পর্যন্ত আমরা দেখছি
যে শরত্চন্দ্র এই ঘটনাবলীতে প্রবেশ করেন নি। কারণ নাট্যরূপ দেবার আগে, তাঁর সঙ্গে কোন কথা  বলেন
নি শিবরাম। তেমন কোনও উল্লেখ কেউই করেননি। আমরাও সেরকম কিছু লেখা পাইনি।

৩। ভারতীতে ছাপাতে গিয়ে তারাই
শরত্চন্দ্রের কাছে এটি ছাপাবার অনুমতি চায়। শরত্চন্দ্র এই প্রথম এই
কাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হলেন।

৪। লেখাটি, সরলা দেবী চৌধুরাণী সম্পাদিত ভারতী পত্রিকায় ছাপা হলো ঠিকই, কিন্তু নাট্যরূপ দেবার জন্য
ভারতীতে
শিবরামের নাম না রেখে শরত্চন্দ্রের নাম রাখা হলো।

৫। এই বিষয়ে উল্লেখ করতে হচ্ছে যে সে সময় বেশিরভাগ পত্র-পত্রিকাতেই নবীন লেখকদের নাম  রাখা  
হোত না। এমন কি তাঁর প্রথম দিককার বহু লেখায়
রবীন্দ্রনাথের নামও ভারতীতে রাখা হয় নি। তখনকার  
দিনে এটাই রেওয়াজ ছিল। নবীনদের কিছুকাল নাম ছাড়াই লেখালেখি করতে হতো। যতদিন না তাঁর লেখার
চাহিদা হচ্ছে।

৬। কিন্তু
শিবরামের ক্ষেত্রে তা হয়নি। তাঁর কবিতা একাধিক বার তাঁর নামেই ভারতী পত্রিকায় ততদিনে  
ছেপে বেরিয়েছে। সেগুলি হলো . . .
  • ভারতী, জ্যৈষ্ঠ ১৩৩১ সংখ্যায় কবিতা “ভুল ভাঙা”। প্রথম কলি “সত্য হে কবি, এ যে ভুল ভাঙা”।  
    কবিতাটি “রবীন্দ্রনাথের ভুলভাঙা পড়িয়া” লিখেছিলেন।
  • ভারতী, শ্রাবণ ১৩৩৩ সংখ্যায় কবিতা “বর্ষা-স্বপন”। প্রথম কলি “ওগো সেদিন গগন পারে”।
  • ভারতী, ভাদ্র ১৩৩৩ সংখ্যায় কবিতা “প্রেম---?”। প্রথম কলি “প্রেম সে চিরদিনের,---কেঁদে বল্ চে
    তারা”।
  • এই সব কটি কবিতা মিলনসাগরের কবি শিবরাম চক্রবর্তীর কবিতার এই পাতায় রয়েছে।

৭। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে
শরত্চন্দ্রকে খুশি করতে গিয়ে  ভারতী পত্রিকাতে  শিবরামের ষোড়শীর  
নাট্যরূপ তাঁর নাম ছাড়াই প্রকাশিত হয়েছিল। শরত্চন্দ্রের সঙ্গে ভারতী পত্রিকার কি কথার আদান  প্রদান
বা চুক্তি হয়েছিল তা আমরা জানি না। তবে
শরত্চন্দ্র ভারতী থেকে পাওয়া ৩০০ টাকা থেকে ১০০ টাকা
শিবরামকে দিতে রাজি হয়েছিলেন একথা আমরা জানতে পারছি। সুতরাং এখানে আমরা মনে করছি যে
ভারতী পত্রিকার তরফে অন্তত চিত্রনাট্যকার হিসেবে
শিবরাম চক্রবর্তীর নামটি রাখার উপর জোর দেওয়া
এবং সে ভাবে শরত্চন্দ্রের সঙ্গে কথা বলা উচিত ছিল।

৮। ভারতীতে ছেপে বার হওয়ার পরে দুটি জিনিষ হয়েছে। প্রথমে সেই খবর পেয়ে শিশির ভাদুড়ী  
শরত্চন্দ্রের সঙ্গে নাটক মঞ্চস্থ করার চুক্তি সাক্ষর করেছেন। দ্বিতীয়ত শরতচন্দ্রের মনে হয়েছে যে  
শিবরামের লেখা ষোড়শীর নাট্যরূপটি তাঁর মনের মতো হয়নি।

৯। তিনি নাটকটির আমূল পরিবর্তন করে নিজেই আবার লিখলেন। এখানে উল্লেখ করতে হচ্ছে যে আমরা
১৩৩৩ বঙ্গাব্দের ভারতী পত্রিকার পূজা সংখ্যায় (অক্টোবর ১৯২৬) প্রকাশিত ষোড়শী এবং আনন্দ  
পাবলিশারস থেকে প্রকাশিত, সুকুমার সেন সম্পাদিত, “শরৎ সাহিত্য সমগ্র”-এর ষোড়শী নাটকটি মিলিয়ে
দেখেছি। দুটির মধ্যে সত্যিই কোনও মিল নেই।
শরত্চন্দ্র সত্যি সত্যি খোল-নলচে পালটে নতুন নাট্যরূপ
দিয়েছিলেন। ভারতীতে প্রকাশিত
শিবরামের ষোড়শীতে কোন গান নেই। কিন্তু “শরৎ সাহিত্য সমগ্র”-এর  
ষোড়শীতে গান আছে। সুতরাং ষোড়শীর গানগুলি
শিবরাম চক্রবর্তীর লেখা নয় তাতে কোন সন্দেহ নেই।

১০। এখানে আমাদের শিবরামের কৃতিত্ব আগ্রাহ্য করলে চলবে না। “দেনা-পাওনা” উপন্যাসটিকে যে একটি
নাটকের রূপ দেওয়া যায় এবং তার নাম “ষোড়শী” রাখা, এটা সম্পূর্ণ শিবরামেরই মস্তিষ্ক-প্রসূত। খোল-নলচে
বদলে লিখলেও,
শরত্চন্দ্রের সামনে ছিল শিবরামের লেখা নাট্যরূপ! তাই শরত্চন্দ্রকে নাট্যরূপ লিখতে   
অপেক্ষাকৃত কম খাটতে হয়েছিল। তাঁই শিবরামকে তাঁর কৃতিত্বের সম্মানটা সবারই দেওয়া উচিত ছিল।

১১।
শরত্চন্দ্র তাঁর নিজের মতো করে ষোড়শীর নাট্যরূপ লেখার পরে গানের জন্য রবীন্দ্রনাথের কাছে
অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু
রবীন্দ্রনাথ সে অনুরোধ রক্ষা করতে পারেন নি, তাই নিজেই গান  লিখেছিলেন
যা আমাদের কবির কবিতার পাতায় দেওয়া রয়েছে। এই ঘটনাটি সম্বন্ধে এই পাতায় পূর্বেই বিস্তারিতভাবে  
দেওয়া রয়েছে।

১২। এবার আসা যাক শিশির ভাদুড়ীর নাট্য মঞ্চে। সরলা দেবী চৌধুরণী সম্পাদিত ভারতী পত্রিকার  
১৩৩৩, আশ্বিন
(Puja) সংখ্যায় ( অক্টোবর ১৯২৬ ) শিবরাম চক্রবর্তীর  লেখা ষোড়শীর নাট্যরূপ প্রকাশিত
হয়। “শরৎ সাহিত্য সমগ্রের” ষোড়শীর গ্রন্থ-পরিচিতি থেকে জানতে পারছি যে ১৩ই আগস্ট ১৯২৭ নাটকটি
বই আকারে প্রকাশিত হয় গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স থেকে। নাটকটি প্রথম মঞ্চস্থ হয় ২১শে শ্রাবণ  
১৩৩৮  (৫ই  আগস্ট ১৯২৭), কলকাতার নাট্যমন্দির লিমিটেডে। অভিনয় করেছিলেন জীবানন্দের ভূমিকায়  
শিশির ভাদুড়ী এবং ষোড়শীর ভূমিকায় চারুশীলা দেবী।

১৩। নাটকটি মঞ্চস্থ হয়েছিল,
শরত্চন্দ্রের সঙ্গে চুক্তি করার পরে। তাই আন্দাজ করা অন্যায় হবে না যে   
তিনি তাঁর নিজের লেখা নাট্যরূপই শিশির ভাদুড়ীকে দিয়েছিলেন, অভিনয়ের জন্য। সেখানে গানও ছিল   
নিশ্চয়ই।

১৪। শিশির ভাদুড়ী
শরত্চন্দ্রেরই নাট্যরূপে অভিনয় করিয়েছিলেন কারণ সেই অভিনয় একদিন (প্রথম দিন)
স্বয়ং শরত্চন্দ্র দেখছিলেন এবং সেই কথা চিঠিতে জানিয়েছিলেন তাঁর স্নেহভাজন বেহালার মণীন্দ্রনাথ   
রায়কে। “শরৎ সাহিত্য সমগ্রের” ষোড়শীর গ্রন্থ-পরিচিতি তে সেই চিঠির এই অংশটি দেওয়া রয়েছে . . .  
ষোড়শী অভিনয় আমি একবার মাত্র দেখেছি, এবং তারই জের চলছে। . . . তুমি যদি পার তো একবার
গিয়ে দেখে এসো। বাস্তবিকই শিশির এবং চারুর  (জীবানন্দ-ষোড়শী) অভিনয় দেখার মত বস্তু
।”     
তিনি দেখতে বসে
শিবরামের নাট্যরূপ দেখতে পেলে নিশ্চয়ই আপত্তি করতেন বা ধরতেন। তা তিনি করেন
নি। অর্থাৎ মঞ্চে তাঁর লেখা নাট্যরূপই অভিনীত হয়েছিল।

১৫। সামতাবেড়, পাণিত্রাস পোস্ট থেকে,
কবি রাধারাণী দেবীকে লেখা এক চিঠিতে রত্চন্দ্র
তাঁকেও ষোড়শী বইটি পড়া এবং দেখার কথা বলেছেন। এই চিঠি অন্য একটি কারণে আমাদের কাছে
গুরুত্বপূর্ণ। এই চিঠিতে দেখা যাচ্ছে যে, যেদিন শরত্চন্দ্র ষোড়শী দেখতে গিয়েছিলেন সেদিন তাঁর জ্বরের মত
হয়েছিল। চিঠির  অংশবিশেষ এখানে তুলে দিচ্ছি . . .
“. . .
ষোড়শী বইটা পোড়ো। বোধ হয় তোমার মন্দ লাগবে না। আর অভিনয় দেখবার যদি সময় পাও,
সত্যিই খুসি হবে। শিশির কি শেখানোই শিখিয়েছে। আমি একটি দিন মাত্র দেখেচি, সেদিন আবার
ইনফ্লুয়েঞ্জার মত হয়ে শরীরটা পীড়িত হয়ে ছিল। তবু চমত্কার লেগেছিল
।”

১৬। এবার ষোড়শীর প্রথম অভিনয়ের দিনে, শিবরাম চক্রবর্তীর কথায় আসি। দেখা যাচ্ছে তিনি সেখানে
গিয়েছিলেন শিশির ভাদুড়ীর এই আশ্বাসে যে সেদিন তাঁর কিছু প্রাপ্তি হতে পারে। তাঁর লেখা “ঈশ্বর পৃথিবী
ভালবাসা” থেকে পাচ্ছি যে তিনি “অভিনয় শেষে গ্রীনরুমে” গিয়ে শিশির ভাদুড়ীর সঙ্গে দেখা করে কথাবার্তা
বলেছিলেন। আমাদের মনে হচ্ছে না যে তিনি নাটকটা হলে বসে সেদিন দেখেছিলেন। মনে হচ্ছে যে  শো
শেষ হবার পরে গিয়েছিলেন প্রাপ্তির আশায়। কারণ যদি অভিনয় দেখতেন তাহলে বুঝতে পারতেন যে  
নাটকটি তাঁর লেখা চিত্রনাট্যে মঞ্চস্থ হচ্ছে না। এ নিয়ে অন্তত তিনি কিছু কথা তার লেখায় উল্লেখ করতেন।
তিনি সে রকম কোত্থাও কিছুই লেখেন নি। অন্যদিকে
শরত্চন্দ্র আদ্যোপান্ত হলে বসে নাটকটি দেখে প্রচণ্ড
খুশি হয়েছিলেন এবং চিঠি পত্রে তা অন্যদেরও দেখতে বলেছিলেন। যদি তাঁর লেখা নাট্যরূপে না হয়ে থাকে
তাহলে তিনি ছেড়ে কথা কইতেন না তাতে কোন সন্দেহ নেই। তাতে যে গানও ছিল!
শিবরামের নাট্যরূপে
তো গান ছিল না। তাই সেটা আভিনীত হলে, গানগুলি যদি না গাওয়া হয়ে থাকে তা হলেও কি শরত্চন্দ্র  
বুঝতে পারতেন না যে এটা তাঁর লেখা নাট্যরূপ নয়?
.         তাই আমরা নিশ্চিত যে সেইদিন শরত্চন্দ্রের লেখা নাটকটি অভিনীত হয়েছিল এবং
শিবরাম তা
জানতেন না কারণ তিনি নাটকটা সেইদিন দেখেন নি।

১৭। শিশির ভাদুড়ীর কাছে টাকা চাইতে তিনি বলেন যে শরত্চন্দ্র সব টাকা নিয়ে চলে গেছেন এবং তাঁকে
বলেছেন ‘শিবরাম টাকা নিয়ে কী করবে? বিয়ে করেনি কিচ্ছু না! তার ছেলে নেই পুলে নেই, ঘর  নেই  
সংসার নেই---টাকার তার কিসের দরকার!’ ক্ষমাঘেন্না করে কিছু দেবার কথা বলতে
শরত্চন্দ্র নাকি আরও
বলেন ‘আমার বেনিফিট নাইটের বখরা ওকে দিতে যাব কেন? এ রাত্তিরে টিকিট বিক্রি হয়েছে  আমার  
নামে, আমার জন্য টাকা দিয়ে দেখতে এসেছে সবাই। এর ভেতর সে আসছে কোথা থেকে?’
রাধারাণী দেবীকে লেখা চিঠি থেকে জানতে পারছি যে সেদিন শরত্চন্দ্রেরইনফ্লুয়েঞ্জার মত হয়ে শরীরটা  
পীড়িত হয়ে ছিল
”। সুতরাং স্বাভাবিকভাবে তিনি ফিরে যাবার তাড়ায় ছিলেন। সেদিন যে নাটক অভিনীত
হয়েছিল তা যে তাঁরই করা নাট্যরূপের অভিনয় এটা তিনি জানতেন এবং তিনি সেখানে শিবরামের নাম
শুনে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন, তা বোঝা যাচ্ছে। কারণ তার মতে
শিবরামকে তো তিনি ভারতী পত্রিকা থেকে  
পাওয়া কিছু টাকা দিয়েই দিয়েছিলেন। সেটা ন্যায্য না অন্যায্য সেটা পরের কথা। অন্যদিকে শিবরাম  
ভেবেছিলেন যে তাঁরই লেখা নাট্যরূপ অভিনীত হয়েছে। তাই তাঁর প্রচণ্ড খারাপ লেগেছিল শিশির ভাদুড়ীর
কথা শুনে এবং পরবর্তীতে তিনি এ সব কথা লিখেছেন এবং আলাপচারিতায় বলেছেন।

১৮। একটি বিষয় অজ্ঞাত থেকেই যায়। শরত্চন্দ্র কি শিশির ভাদুড়ীকে ওসব কথা ওরকম ভাবে সত্যিই
বলেছিলেন? কারণ সে কথার সত্যতা যাঁচাই করার কোন উপায় আমাদের কাছে নেই। এমন কি  হতেই   
পারে না যে, ও সব কথা
শরত্চন্দ্রের নামে বলে, শিবরামকে বেশী টাকা দেবার দায় এড়িয়ে গিয়েছিলেন   
শিশির ভাদুড়ী সে দিন! মাত্র ১২০ টাকার চেক কেটেই কাজ সেরেছিলেন! অর্থাৎ শরত্চন্দ্র আর শিশির   
ভাদুড়ীর মধ্যে ঠিক কি কথোপকথন হয়েছিল, তা আমরা জানি না এবং আর সম্ভবত জানার উপায়ও নেই।
শিবরাম তাই লিখেছিলেন যা তাঁকে শিশির ভাদুড়ী বলেছিলেন। এই পুরো ঘটনাবলীরর মধ্যে শিশির ভাদুড়ী
আর
শরত্চন্দ্রের মধ্যে আসলে কি কথা হয়েছিল সেটাই উহ্য রয়ে গেছে।

১৯। এই অবধি  পড়ে মনে করবেন না যেন, যে আমরা শিশির ভাদুড়ীকে যত নষ্টের গোঁড়া করে দেখাতে  
চাইছি। শিশির ভাদুড়ী জানতেন যে
শরত্চন্দ্রের নাট্যরূপেই নাটকটা অভিনীত হচ্ছে। কারণ তাঁর সঙ্গেই   
শরত্চন্দ্রের চুক্তি হয়েছিল এবং তিনি অবশ্যই জানতেন যে অভিনীত নাটকের নাট্যরূপ শিবরামের নয়।   
কারণ তিনি আগেই
শিবরামের লেখা নাট্যরূপ পড়ে ‘ভেরি ক্লেভারলি ডান্’ বলে ফেরত দিয়েছিলেন।  
অভিনীত নাট্যরূপ শিবরামের নয় জেনেও তিনি সেকথা বলে শিবরামকে টাকা দিতে অশ্বীকার না  করে,   
তাঁর ব্যাঙ্কে যা ছিল তা চেক কেটে দিয়ে দেন। তিনি এরকম একজন নাট্যরূপকারকে হারাতে চান নি।  
দুঃখের বিষয় এই যে তিনি শিবরামকে তাঁর এবং
শরত্চন্দ্রের মধ্যকার যে কথোপকথনটি শুনিয়েছিলেন  
তার জেরেই
শিবরামের চোখে “শরত্চন্দ্রের মর্মর মূর্তির স্খলন” ঘটেছিল এবং পরবর্তী জীবনে, এর   
ফলস্বরূপ, তাঁর লেখা থেকে
শরত্চন্দ্র সম্বন্ধে বহু মানুষের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সূত্রপাত হয়েছিল।

উপসংহার -
আজীবন সততা ও মানবিক মূল্যবোধের অজশ্র পরিচয় যাঁর জীবন কথায়  পাওয়া যায় এমন কি যে ব্যক্তি  
একটি মেয়েকে তার মদ্যপ পিতা ও তার মদ্যপ বন্ধুবর্গদের থেকে বাঁচাতে তাকে বিয়ে করতে পিছপা  হন
নি (
শরত্চন্দ্রের ১ম বিয়ে শান্তি দেবীর সঙ্গে) তার সম্বন্ধে এরকমের নিষ্ঠুর কথা বলার অভিযোগের   
বিশ্বাসযোগ্যতা কতখানি?
শরত্চন্দ্রের জীবিতাবস্থায়, তাঁর অনুমতি ছাড়াই শিবরাম, দেনা-পাওনার  
নাট্যরূপ দিয়েছিলেন, যা এই কপিরাইটের যুগে আইন-আদালতের আঙিনায় পৌঁছে যাবার যোগ্য। তা সত্বেও
শরত্চন্দ্র ভারতী পত্রিকা থেকে প্রাপ্ত অর্থ শিবরামের সাথে, সমান না হলেও, ভাগ করে নিয়েছিলেন।  
সাধারণভাবে দেখলে শরত্চন্দ্রের তরফে শিবরামের সঙ্গে এ নিয়ে আর কোন দেনা-পাওনার কথা  হতেই
পারে না। এরপর তিনি নিজে প্রায় নতুন করে নাট্যরূপটি লিখেছিলেন। দুটি নাট্যরূপ পাশাপাশি  রাখলেই
তা পরিষ্কার বোঝা যায়। তাই তিনি যদি শিশির ভাদুড়ীর কাছে আবার
শিবরামের দাবীর কথা শোনেন,
তাতে রেগে ওঠা বিচিত্র নয়। তবুও আমাদের কাছে, শিশির ভাদুড়ী উবাচে তাঁর মুখে অত ঔদ্ধত্বপূর্ণ কথা
বেমানান লাগছে।

শিশির ভাদুড়ীর সঙ্গে
শরতচন্দ্রের ঠিক কি কথা হয়েছিল তাই এই ঘটনাবলীর একমাত্র অজানা তথ্য।   
দুর্ভাগ্যের বিষয় এই যে তা আর জানার উপায় নেই।
শরত্চন্দ্রের মুখে এত ঔদ্ধত্বপূর্ণ শ্লেষাত্মক কথা দেখতে
ও শুনতে আমরা অভ্যস্ত নই। তবুও সব জেনে শুনে শিশির ভাদুড়ী
শিবরামকে খালি হাতে ফিরিয়ে দেননি।
আমাদের বলতেই হবে এটা তাঁর উদারতারই পরিচয়।

শিবরাম চক্রবর্তী জীবনে অসত পথ অবলম্বন করেছেন, এটা তাঁর শত্রুরাও বলবেন না। অর্থের অপ্রতুলতার
জন্য তাঁর জীবনের অনেক কাজই হয়তো তিনি করে উঠতে পারেননি ঠিকই, কিন্তু এই ঘটনাবলীর  সময়ে  
তাঁর চারিত্রিক দৃঢ়তার অভাব আমরা স্পষ্ট দেখতে পাই। তিনি যদি তাঁর প্রাপ্য অর্থ এবং নাম  দুটোর  
জন্যই ভারতী পত্রিকাকে চেপে ধরতেন, তাহলে তাঁরা হয় বাধ্য হতেন তাঁর নাম নাট্যরূপকার হিসেবে উল্লেখ
করতে, নয়তো তাঁর নাট্যরূপ ছাপানো থেকেই বাদ দেওয়া হতো। তাঁকে এভাবে ভিখারীর মত অপমানিত  
হতে হতো না।
শরত্চন্দ্রকেও পুরোটা খেটে নতুন করে ষোড়শীর নাট্যরূপ লিখতে হতো। খোল-নলচে বদলে
নয়।

প্রতিষ্ঠান-বিরোধী এবং অপরাধের বিরুদ্ধে কথা বললে যেমন অন্যায়ের প্রতিকার হতে পারে তেমনি তার  
ফল ভোগ করার জন্য তৈরীও থাকতে হয়।
শিবরাম সেই কাজটি করার “সাহস” দেখাননি। শুধুমাত্র সামান্য
কিছু টাকার বিনিময়ে তিনিই ওদের “বিরূপ প্রস্তাবে” রাজি হয়ে অর্থ ও নাম দুটোই হারিয়েছেন। পরে এই  
ঘটনার কথা লিখে, (তাও কোনো ঘোষিত আত্মজীবনীতে নয়, আত্মকথা নির্ভর একটি উপন্যাসের মাধ্যমে)  
পাঠকের করুণা পেতে চাওয়ার একটা প্রচ্ছন্ন চেষ্টা কি আমরা এখানে দেখতে পাই?

পরিশেষে, আমাদের বিনম্র নিবেদন যে নতুন তথ্যের আলোকে যদি কোনও সাহিত্য পাঠক বা গবেষক এই
প্রসঙ্গে আমাদের বর্তমান সিদ্ধান্তাদি যুক্তি ও তর্কনিষ্ঠভাবে সংশোধন বা পরিমার্জন করতে চান, তা আমরা
কৃতজ্ঞতার সঙ্গে গ্রহণ করে এখানে সংযোজন করবো।


********  "ষোড়শী নাটকের নাট্যরূপ নিয়ে একটি ঐতিহাসিক বিতর্ক" প্রবন্ধটি
লিখেছেন মিলন সেনগুপ্ত,
কবি রাজেশ দত্তর দেওয়া তথ্য সমূহের সাহায্যে।