স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় “বাংলার বাঘ” - জন্মগহণ করেন কলকাতার বৌবাজারের মঙ্গলা
লেনের পৈতৃক বাসভবনে। পিতা চিকিত্সক ডঃ গঙ্গাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এবং মাতা জগৎতারিণী দেবী।

সুচিকিত্সক ও বিদ্যানুরাগী পিতার সতর্ক নজরে থেকে আশুতোষের শিক্ষালাভ শুরু হয়। ১৮৬৯ সালে, পাঁচ
বছর বয়সে তাঁকে ভর্তি করা হয় চক্রবেড়িয়া শিশু বিদ্যালয়ে। ১৮৭৫ সালে তিনি ভর্তি হন সাউথ সুবার্বান
স্কুলে। সেই সময় স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন
শিবনাথ শাস্ত্রী

১৮৭৫ সালে একদিন
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসগর, কলকাতায় থ্যাকার স্পিঙ্ক কোম্পানীর বইয়ের দোকানে ১১
বছরের  আশুতোষকে  দেখে
Daniel Defoe-র লেখা Life and Adventures of Robinson Crusoe বইটি উপহার
দিয়েছিলেন।

বাল্যকাল থেকেই আশুতোষের গণিতের দিকে বিশেষ ঝোঁক ছিল। স্কুলে পড়ার সময়েই “কেম্ব্রিজ মেসেঞ্জার
অফ ম্যাথেমাটিক্স”-এ তাঁর দূরহ গাণিতিক সমস্যার সমাধান প্রকাশিত হয়। এডওয়ার্ডস এর ডিফারেনসিয়াল
ক্যালকুলাস ও ফরমাইসের ডিফারেনসিয়াল ইকুয়েশন এর গনিতশাস্ত্রে আশুতোষের পারদর্শিতা ও সমাধান
দক্ষতার স্বীকৃতি আছে। ১৮৮০-১৮৯০ এই দশ বছরের মধ্যে আশুতোষ উচ্চ গণিতের প্রায় কুড়িটির মতো
মূল্যবান প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন।

১৮৭৯ সালে তিনি এনট্রান্স পরীক্ষায় দ্বিতীয় ও ১৮৮১ সালে এফ.এ. (ফার্স্ট আর্টস) পরীক্ষায় তৃতীয় স্থান
অধিকার করে উত্তীর্ণ হন। ১৮৮৪ সালে তিনটি বিষয়ে সর্বোচ্চ নম্বর তুলে তিনি বি.এ. পরীক্ষায় প্রথম স্থান
নিয়ে উত্তীর্ণ হন। ১৮৮৫ সালে তিনি পরীক্ষা দিয়ে প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ বৃত্তি লাভ করেন এবং পদার্থ বিজ্ঞানে এম.
এ. ডিগ্রি লাভ করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি প্রথম ছাত্র যে দুটি বিষয়ে এম.এ. ডিগ্রি লাভ করেন।

১৮৮৬ সালে তাঁর বিয়ে হয় কৃষ্ণনগরের পণ্ডিত রামনারায়ণ  ভট্টাচার্যের কন্যা যোগমায়া দেবীর সঙ্গে।

ছোটবেলা থেকে তাঁর বাসনা ছিল হাইকোর্টের বিচারপতি হবেন। ১৮৮৮ সালে তিনি বি.এল পাশ করেন।
সেই বছর থেকেই তিনি কলকাতা হাইকোর্টে ওকালতী শুরু করেন। ১৮৯৩ সালে অনার্স-ইন-ল এবং ডক্টর-
অফ-ল উপাধি লাভ করেন পরীক্ষা দিয়ে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁকে অনারারী ডি.এসসি. ডিগ্রিও
প্রদান করা হয়।

১৮৮৯ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো নির্বাচিত হন। সেবছরই তিনি বাংলা কে অন্যান্য
ভাষার সঙ্গে অবশ্যপাঠ্য করার চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রবল বিরোধিতার জন্য তা সম্ভব হয়নি সেবছর। ১৯০৬
সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েই তিনি স্নাতকোত্তর বিভাগের প্রবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে
প্রবেশিকা থেকে বি.এ. পর্যন্ত মাতৃভাষাকে  অবশ্যপাঠ্য ও পরীক্ষার বিষয়রূপে নির্ধারণ করেন। তিনি
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছিলেন দুবার। প্রথমে ১৯০৬ – ১৯১৮ ও পরে ১৯২১ থকে ১৯২৩
সাল পর্যন্ত।

১৯০৮ সালে তিনি কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি নিযুক্ত হন। ১৯২০ সালে কিছুদিনের জন্য তিনি
হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি হয়েছিলেন। ১৮৯৯ ও ১৯০১ সালে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বঙ্গীয় আইনসভার
সভ্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯১১ সালে তিনি “নাইটেড” হয়ে “স্যার” উপাধী লাভ করেন। ১৯১০ থেকে ১৯২৪
সাল পর্যন্ত তিনি ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরীর ( বর্তমানের ন্যাশনাল লাইব্রেরী ) সভাপতি ছিলেন।   ১৯১৪ সালে
ইণ্ডিয়ান সায়েন্স কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশনে তিনি সভাপতি হয়েছিলেন। এছাড়াও তিনি আরও বহু বহু
সম্মানের প্রাপক ছিলেন।

একবার বড়লাট লর্ড কারজন স্যার আশুতোষকে অনুরোধ করেছিলেন ইংল্যাণ্ডে যাবার জন্য যাতে ব্রিটিশ
শাসনের অন্তর্গত শিক্ষা ব্যবস্থায় কেমন শিক্ষিত মানুষ তৈরী হচ্ছে, তা সেখানকার মানুষ দেখতে পান।
আশুতোষ তার উত্তরে বড়লাটকে জানান যে তা সম্ভব নয় কারণ তাঁর মা তাঁকে সমুদ্র পার করার অনুমতি
দেবেন না। এতে বড়লাট লিখেছিলেন
"Tell your mother the Viceroy and Governor-General of India commands
her son to go"
. বাংলার বাঘ উত্তর দিয়েছিলেন "Then I will tell the Viceroy and Governor General of India that
Ashutosh Mukherji refuses to be commanded by any other person except his mother, be he Viceroy or be he
somebody higher still"
.

তাঁর উপাচার্যকালে প্রেসিডেন্সী কলেজের এক ছাত্রের বিরুদ্ধে এক ইংরেজ শিক্ষককে অপমান (কোথাও
কোথাও বলা হয় মারধোর) করার শাস্তি হিসেবে রাস্টিকেট করার কথা ওঠে। সেই ছাত্রটি পরবর্তীতে
“নেতাজী” সুভাষচন্দ্র বসু হয়ে কোটি কোটি ভারতবাসীর হৃদয়ে আজও বিরাজ করছেন। স্যার আশুতোষের
কাছে সুভাষচন্দ্র যেতেই তিনি তাঁকে স্কটিশ চার্চ কলেজে ভর্তির অনুমতি দিয়ে দিয়েছিলেন।  

ব্রিটিশ শাসকদের সঙ্গে আপোসহীন মনোভাব, প্রখর ব্যক্তিত্ব, অগাধ জ্ঞানের অধিকারী, বজ্রের মতো কঠিন,
আদর্শনিষ্ঠ, অথচ ফুলের মতো কোমল অন্তরের মানুষ ছিলেন স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। এই সব
কারণেই তাঁকে “বাংলার বাঘ” বলা হতো।

একটি মামলায় হেরে যাবার পর ২৫.৫.১৯২৪ তারিখে পাটনায় তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পরলোক গমন
করেন।  

লীলা মজুমদারের সংকলিত, নারায়ণ পুস্তকালয় দ্বারা প্রকাশিত, শিশুদের ছড়ার বই “শ্রেষ্ঠ ছড়া”-তে আমরা
স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের একটি ছড়া পেয়েছি। তা-ই আমরা
মিলনসাগরে  পাতায় তুলে এই মহান
মানুষটিকে মিলনসাগরের শ্রদ্ধার্ঘ্য প্রদান করতে পেরে আমরা নিজেদের ধন্য মনে করছি।


উত্স – সুনন্দা দত্ত, বাঙলার মনীষা, ২য় খণ্ড, ১৯৮৭।
.        
উইকিপেডিয়া


স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন।  

আমাদের ই-মেল -
srimilansengupta@yahoo.co.in     


এই পাতার প্রথম প্রকাশ - ০৩.০৮.২০১৩
...