কবি স্নেহলতা চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা
*
কে সে ?
কবি স্নেহলতা চট্টোপাধ্যায়

এভাবেই আমি আরো কিছুক্ষণ জেগে থাকব :
একটু একটু ক’রে জ্যোত্স্নার মোম গলে
.                        মাটির উপরে
.                        প্রহর বদলায়।
ঘুমের মধ্যে দুটি কাক এইমাত্র গভীর হয়েছে,
আমি কার অপেক্ষায় আছি---আমি তা জানিনা।

শুধু এক ক্লান্ত বেদনা আমার দু’চোখে ছড়িয়ে পড়েছে,
আমি তা কিছুতেই এড়াতে পারছি না।

আসলে আমি নীলিমার স্তব্ধতা চিনি :
সন্ধ্যামলতীর মতো মৃদু, স্বভাবদুঃখী, অভিমানী ;
হঠাৎ অন্ধকারে হাওয়া দিলে ঝরে পড়ে হাহাকারটুকু।

কে ? কে সে ? যে আমার এটুকু বোঝেনা ?
বেশ তাই হোক! আমার গহন চিতায় তীব্র দহন
আরো কিছুক্ষণ জ্বালিয়ে রেখো---
পুড়ে যেতে যেতে আমি বুঝে নেব কে ? কে সে ?

কার জন্য এত অশ্রুপাত, এত ক্ষণ প্রতিদিন,
.                        পবিত্রতম এত ঘৃণা!

.               *************************  

.                                                                                   
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
গোপন, গভীর
কবি স্নেহলতা চট্টোপাধ্যায়

এর নাম প্রেম নয়---
পরিণতিহীন এক ছায়ার গল্প :
ঠিক বাঁকা নয় ভাঙা চাঁদের আড়ালে আরো এক
.                        ক্লান্ত অন্ধকার,---
মর্মন্ত্তদ বৃষ্টির আড়ালে আরো কিছুক্ষণ নিঃসঙ্গ দাঁড়ানো!

একাকী সন্ধ্যা আসে---
বিকেলের ফুল ধুলোবালি পাথরের ফাঁকে নির্ভুল
সবুজ প্রতিভা ওতপ্রোত ক’রে দ্যায় সারারাত ;
তার প্রতি ঈশ্বরও কিছুটা দুর্বল, গোপন শর্তময়---

আচ্ছন্ন আকর্ষনে কাছে আসে---
শর্ত ফুরালে দূরে সরে যায়,
এর নাম প্রেম নয় ;

প্রেমিকের সাথে চিরদিন আলুথালু উদাসীন
.                        গভীর সূত্রে বাস করে!

.               *************************  

.                                                                                   
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
স্বগত
কবি স্নেহলতা চট্টোপাধ্যায়

একখনো ডেকেছ কাছে কখনো স্পর্ধিত অবহেলা :
আজ তুমি এসেছ নিজেই---আমি ফেরাব না।

দ্যাখ, পাতার আড়ালে জাগে ফুলের নির্মাণ,
যে অশ্রুর ধারাবাহিকতা এতদিনে হয়েছে সহজ
আজ তা মধুর গাঢ় ফুটেছে দু’চোখে।
নীলিমা রঙীন . . .
নিপুণ সাজানো কোন ছবির মতন প্রস্ফুটিত
.                        শীতের বাগান!
তুমি দিয়েছিলে অবহেলা :
আমি দিয়ে গেছি একটি হৃদয় যত দিতে পারে
অরব, নিবিড় সম্মান!

.               *************************  

.                                                                                   
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
নতুন ভূবন
কবি স্নেহলতা চট্টোপাধ্যায়

এ কোন্ রাজ্যে নিয়ে এলে ?
এখানে যে শুধু হাহাকার
ফোঁফানো-কান্না ভাসে রুদ্র-শূণ্যতার!

এ কোন্ আকাশ ?
এখানে তো স্বপ্ন নেই হংসবলাকার
এখানে যে শুধু অন্ধকার।

এ কোন্ সাগর ?
তরঙ্গে স্পন্দমান মুক্তি নেই যার
এখানে যে দীর্ঘ ভূমি রুক্ষ বালুকার।

এ কোন্ মানুষ ?
প্রতিপদে শত্রুর ব্যবহার
এ হিংস্র উদ্গার কোন্ সভ্যতার!

না, না, পশ্চিমের করুণ আকাশ তবে
চূর্ম করে একবার
ঝড় উঠুক, ঝড় উঠুক,
সেই ঝড়ে ধ্বনিত হোক নব-পৃথিবীর
নতুন প্রণয় গণিকার!

.      *************************  

.                                                                                   
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
বিষ অন্ধকারে
কবি স্নেহলতা চট্টোপাধ্যায়

জীবনের দ্রাঘিমায় হৃদয়ের দূরত্ব এত ?
বুঝিনি তো আগে---
তার চেয়ে বেশ আছি এই অন্দকারে।

ভয় হয় মাঝে মাঝে --- তবু ?
যদি আমার এই অদ্বিতীয় আঁধার মুছে কোনোদিন
প্রকাশ্যে নেমে আসে মহিষের ক্লান্ত-পদক্ষেপে
চাঁদ--- ?

কী দেখব তখন ? কেউ নেই চারপাশে ?
ইস্পাত-কঠিন পথে আমাকে সে ফেলে রেখে
চলে গ্যাছে ঐ হৃদয় আর জীবন যেমন ?

তাহ’লে ? তার চেয়ে এই ভালো---
দূর-দিগন্তের-ক্লান্তিতে দুঃস্বপ্ন যাপন।

.        *************************  

.                                                                                   
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
আজ বৃষ্টিতে
কবি স্নেহলতা চট্টোপাধ্যায়

অ-দূরে কোথাও বৃষ্টি নেমেছে প্রিয়
ভালো লাগছে না মানবিক কোলাহল,
সাগরে কি আজ উঠেছে ঘূর্ণীঘোর
চেরাপুঞ্জী কি শিহরণে উচ্ছল ?

আজকে হাওয়ায় প্রাণস্পন্দ ঝরে
শার্সির নীচে শ্যামল অন্ধকার ,
ভুলে ফেলে এসো সংশয়, সংসার
চলো ঘর বাঁধি আজকে লোকান্তরে।

বৃষ্টি এখন ঝড় হয়ে গেছে প্রিয়
দুজনে মৌন, মুখর দু’চোখে দাবী,
আলোক-পীড়িত এখনো শয্যাখানি
কেন উদাসীন গৌরবে দেরী কর ?

আমার প্রদীপ যত্নে নেভাও তুমি!

.        *************************  

.                                                                                   
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
ওতপ্রোত
কবি স্নেহলতা চট্টোপাধ্যায়

এ মৌন সরণীতে এলে
মনে পড়ে একদিকে পাহাড়ের সুদীর্ঘ ছায়া,
অন্যদিকে আকাশের উদাস শূন্যতা
.                শীতের নক্ষত্রে সমাচ্ছন্ন ছিল।

তাছাড়া, সমুদ্রের দিকে জনপ্রাণীহীন প্রভাব
বালুচর ধূ-ধূ জ্যোত্স্না মুখরিত।

মনে পড়ে বারবার
নৈশ-অনুভূতি রোমাঞ্চে রঙিন
এবং কিভাবে মদির হয়ে
তুষারাবৃত নিঃসাড় বোবা অবয়বে
বাঙ্ময় শিহরণ সঁপে দিয়ে গেল।
মনে হয়, সে রাতে পৃথিবীর প্রতিচ্ছায়ায়
.        কী একটা কথা লুকনো ছিল।

তাই আজ
নিঃসঙ্গতম জীবনের ধূলিরেণুমাখা প্রান্তর থেকে
অসমসাহসে দেখি আমার চতুঃসীমায়
তোমার নীলাঞ্জন হাজিরা, স্বপ্নমগ্ন, মন্ত্রমুগ্ধ!

.          *************************  

.                                                                                   
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
নালিশ
কবি স্নেহলতা চট্টোপাধ্যায়

দ্যাখো, যে মর্মে মর্মে অভিমানী
জীবনে কখনো সে নিজের হয়ে
ওকালতি করেনি।
তুমি বলেছিলে “ভালো লাগে না”,
আমি বলেছি কেননা নতুন ক’রে
ভাবতে পারনি।
বলেছি, অপরাধ স্বীকার করা চিরদিন
সহজ। অবশ্য অনুতপ্ত হওয়া কঠিন।
যাক্ জীবনের অনেকগুলো দিক তো
দ্যাখা, শোনা হল। সুবিধাবাদের
রাজনীতি কিংবা মেকি সংস্কৃতি আজ
থাক। আমার নালিশ---
আকাশ, মাটি, পাখির গান, সংগ্রাম
না অশ্রু ?
কাকে তুমি পরম ভালোবাসো ?

.       *************************  

.                                                                                   
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর