ছাড়পত্র  
(ছাড়পত্র)

যে শিশু ভূমিষ্ঠ হল আজ রাত্রে
তার মুখে খবর পেলুম ;
সে পেয়েছে ছাড়পত্র এক,
নতুন বিশ্বের দ্বারে তাই ব্যক্ত করে অধিকার
জন্মমাত্র সুতীব্র চিত্কারে |
খর্বদেহ নিঃসহায়, তবু তার মুষ্টিবদ্ধ হাত
উত্তোলিত, উদ্ভাসিত
কী এক দুর্বোধ্য প্রতিজ্ঞায় |
সে ভাষা বোঝেনা কেউ,
কেউ হাসে, কেউ করে মৃদু তিরস্কার |
আমি কিন্তু মনে মনে বুঝেছি সে ভাষা
পেয়েছি নতন চিঠি আসন্ন যুগের-----
পরিচয়-পত্র পড়ি ভূমিষ্ঠ শিশুর
অস্পষ্ট কুয়াশাভরা চোখে |
এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান ;
জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ , মৃত আর ধ্বংসস্তুপ--পিঠে
চলে  যেতে হবে আমাদের |
চলে যাব----তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,
এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য ক’রে যাব আমি-----
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার |
অবশেষে সব কাজ সেরে,
আমার দেহের রক্তে নতুন শিশুকে
করে যাব আশীর্বাদ,

তারপর হব ইতিহাস ||


.            ***************     

.                                                                        
ছাড়পত্র-র সূচিতে. . .   
.                                                                        
সুকান্ত-র মূল সূচিতে. . .   


মিলনসাগর
সুকান্ত ভট্টাচার্যর কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
*
আগামী    
(ছাড়পত্র)

জড় নই, মৃত নই, নই অন্ধকারের খনিজ,
আমি তো জীবন্ত প্রাণ, আমি এক অঙ্কুরিত বীজ ;
মাটিতে লালিত, ভীরু , শুধু আজ আকাশের ডাকে
মেলেছি সন্দিগ্ধ চোখ, স্বপ্ন ঘিরে রয়েছে আমাকে |
যদিও নগণ্য আমি, তুচ্ছ বটবৃক্ষের সমাজে
তবুও ক্ষুদ্র এ শরীরে গোপনে মর্মরধ্বনি বাজে,
বিদীর্ণ করেছি মাটি, দেখেছি আলোর আনাগোনা
শিকড়ে আমার তাই অরণ্যের বিশাল চেতনা |
আজ শুধু অঙ্কুরিত, জানি কাল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাতা
উদ্দাম হাওয়ার তালে তাল রেখে নেড়ে যাবে মাথা :
তারপর দৃপ্ত শাখা মেলে দেব সবার সম্মুখে ,
ফোটাব বিস্মিত ফুল প্রতিবেশী গাছেদের মুখে |
সংহত কঠিন ঝড়ে দৃঢ়প্রাণ প্রত্যেক শিকড় :
শাখায় শাখায় বাধা, প্রত্যাহত হবে জানি ঝড় ;
অঙ্কুরিত বন্ধু যত মাথা তুলে আমারই আহ্বানে
জানি তারা মুখরিত হবে নব অরণ্যের গানে |
আগামী বসন্তে জেনো মিশে যাব বৃহতের দলে ;
জয়ধ্বনি কিশলয়ে  :  সম্বর্ধনা জানাবে সকলে |
ক্ষুদ্র আমি তুচ্ছ নই----- জানি আমি ভাবী বনস্পতি,
বৃষ্টির, মাটির রসে পাই আমি তারি তো সম্মতি |
সেদিন ছায়ায় এসো : হানো যদি কঠিন কুঠারে,
তবুও তোমায় আমি হাতছানি দেব বারে বারে ;
ফল দেব, ফুল দেব , দেব আমি পাখিরও কূজন
একই মাটিতে পুষ্ট তোমাদের আপনার জন ||

.            ***************     

.                                                                        
ছাড়পত্র-র সূচিতে. . .   
.                                                                        
সুকান্ত-র মূল সূচিতে. . .   


মিলনসাগর
*
রবীন্দ্রনাথের প্রতি    
(ছাড়পত্র)

এখনো আমার মনে তোমার জ্জ্বল উপস্থিতি,
প্রত্যেক নিভৃত ক্ষণে মত্ততা ছড়ায় যথারীতি,
এথনো তোমার গানে সহসা উদ্বেল হয়ে উঠি,
নির্ভয়ে উপেক্ষা করি জঠরের নিঃশব্দ ভ্রূকুটি |
এখনো প্রাণের স্তরে স্তরে,
তোমার দানের মাটি সোনার ফসল তুলে ধরে |
এখনো স্বগত ভাবাবেগে,
মনের গভীর অন্ধকারে তোমার সৃষ্টিরা থাকে জেগে |
তবুও ক্ষুধিত দিন ক্রমশ সাম্রাজ্য গড়ে তোলে,
গোপনে লাঞ্ছিত হই হানাদারী মৃত্যর কবলে ;
যদিও রক্তাক্ত দিন, তবু দৃপ্ত তোমার সৃষ্টিকে
এখনো প্রতিষ্ঠা করি আমার মনের দিকে দিকে |

তবুও নিশ্চিন্ত উপবাস
আমার মনের প্রান্তে নিয়ত ছড়ায় দীর্ঘশ্বাস----
আমি এক দুর্ভিক্ষের কবি,

আমার বিনিদ্র রাতে সতর্ক সাইরেন ডেকে যায়,
আমার রোমাঞ্চ লাগে অযথা নিষ্ঠুর রক্তপাতে,
আমার বিস্ময় জাগে নিষ্ঠুর শৃঙ্খল দুই হাতে |

তাই আজ আমারো বিশ্বাস,
“শান্তির ললিত বাণী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস |”
তাই আমি চেয়ে দেখি প্রতিজ্ঞা প্রস্তুত ঘরে ঘরে,
দানবের সাথে আজ সংগ্রামের তরে ||


.            ***************     

.                                                                        
ছাড়পত্র-র সূচিতে. . .   
.                                                                        
সুকান্ত-র মূল সূচিতে. . .   


মিলনসাগর
*
চারাগাছ    
(ছাড়পত্র)  
কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয় যামিনীমোহন কর সম্পাদিত মাসিক বসুমতী পত্রিকার মাঘ
১৩৫৩ (জানুয়ারী ১৯৪৭) সংখ্যায়।

ভাঙা কুঁড়ে ঘরে থাকি :
পাশে এক বিরাট প্রাসাদ
প্রতিদিন চোখে পড়ে ;
সে প্রাসাদ কী দুঃসহ স্পর্ধায় প্রত্যহ
আকাশকে বন্ধুত্ব জানায় ;
আমি তাই চেয়ে চেয়ে দেখি |
চেয়ে চেয়ে দেখি আর মনে মনে ভাবি -----
এ অট্টালিকার প্রতি ইঁটের হৃদয়ে
অন্ক কাহিনী আছে অত্যন্ত গোপনে,
ঘামের, রক্তের আর চোখের জলের |
তবু এই প্রাসাদকে প্রতিদিন হাজারে হাজারে
সেলাম জানায় লোকে, চেয়ে থাকে বিমূঢ় বিস্ময়ে |
আমি তাই এ প্রাসাদে এতকাল ঐশ্বর্য দেখেছি,
দেখেছি উদ্ধত এক বনিয়াদী কীর্তির মহিমা |

হঠাৎ সেদিন
চকিত বিস্ময়ে দেখি
অত্যন্ত প্রাচীন সেই প্রাসাদের কার্নিশের ধারে
অশ্বথ্ব গাছের চারা |

অমনি পৃথিবী
আমার চোখের আর মনের পর্দায়
আসন্ন দিনের ছবি মেলে দিল একটি পলকে |

ছোট ছোট চারাগাছ------
রসহীন খাদ্যহীন কার্নিশের ধারে
বলিষ্ঠ শিশুর মতো বেড়ে ওঠে দুরন্ত উচ্ছাসে |
হঠাৎ চকিতে,
এ শিশুর মধ্যে আমি দেখি এক বৃদ্ধ মহীরুহ
শিকড়ে শিকড়ে আনে অবাধ্য ফাটল
উদ্ধত প্রাচীন সেই বনিয়াদী প্রাসাদের দেহে |

ছোট ছোট চারাগাছ-----
নিঃশব্দে হাওয়ায় দোলে, কান পেতে  শোনে :
প্রত্যেক ইঁটের নীচে ঢাকা বহু গোপন কাহিনী
রক্তের, ঘামনের আর চোখের জলের |

তাইতো অবাক আমি, দেখি যত অশ্বথ্বচারায়
গোপনে বিদ্রোহ জমে, জমে দেহে শক্তির বারুদ ;
প্রাসাদ-বিদীর্ণ-করা বন্যা আসে শিকড়ে শিকড়ে |

মনে হয়, এইসব অশ্বথ্ব-শিশুর
রক্তের, ঘামের আর চোখের জলের
ধারায় ধারায় জন্ম,
ওরা তাই বিদ্রোহের দূত  ||


.            ***************     

.                                                                        
ছাড়পত্র-র সূচিতে. . .   
.                                                                        
সুকান্ত-র মূল সূচিতে. . .   


মিলনসাগর
*
খবর    
(ছাড়পত্র)  

খবর আসে !
দিগ্ দিগন্ত হতে বিদ্যুদবাহিনী খবর ;
যুদ্ধ, বিদ্রোহ, বন্যা, দুর্ভিক্ষ , ঝড়------
-----এখানে সাংবাদিকতার নৈশ নৈঃশব্দ্য |
রাত গভীর হয় যন্ত্রের ঝঙ্কৃত ছন্দে------প্রকাশের ব্যগ্রতায় ;
তোমাদের জীবনে যখন নিদ্রাভিভূত মধ্যরাত্রি
চোখে স্বপ্ন আর ঘরে অন্ধকার |
অতল অদৃশ্য কথার সমুদ্র থেকে নিঃশ্ব্দ শব্দেরা উঠেআসে ;
অভ্যস্ত হাতে খবর সাজাই ------
ভাষা থেকে ভাষান্তর করতে কখনো চমকে উঠি,
দেখি যুগ থেকে যুগান্তর |
কখনো হাত কেঁপে ওঠে খবর দিতে ;
বাইশে শ্রাবণ, বাইশে জুনে |
তোমাদের ঘুমের অন্ধকার পথ বেয়ে
খবর--পরীরা এখানে আসেতোমাদের আগে,
তাদের পেয়ে কখনো কন্ঠে নামে ব্যথা, কখনো বা আসে গান ;
সকালে দিনের আলোয় যখন তোমাদের কাছে তারা পৌঁছোয়
তখন আমাদের চোখে তাদের ডানা ঝরে গেছে |
তোমরা খবর পাও,
শুধু খবর রাখো না কারো বিনিদ্র চোখ আর উত্কর্ণ কানের |
ঐ কম্পোজিটর কি কখনো চমকে ওঠে নিখুঁত যান্ত্রিকতার
.                                               কোনো ফাঁকে ?
পুরনো ভাঙা চশমায় ঝাপসা মনে হয় পৃথিবী-----
৯ই আগষ্ট কি আসাম সীমান্ত আক্রমণে ?
জ্বলে ওঠে কি স্তালিনগ্রাদের প্রতিরোধে, মহাত্মাজীর মুক্তিতে,
প্যারিসের অভ্যুথ্বানে ?
দুঃসংবাদকে মনে হয় না কি
কালো অক্ষরের পরিচ্ছদে শোকযাত্রা ?
যে খবর প্রাণের পক্ষপাতিত্বে অভিষিক্ত
আত্মপ্রকাশ করে না কি বড় হরফের সম্মানে ?
এ প্রশ্ন অব্যক্ত অনুচ্চারিত থাকে
ভোরবেলাকার কাগজের পরিচ্ছন্ন ভাঁজে ভাঁজে |

শুধু আমরা দৈনন্দিন ইতিহাস লিখি !
তবু ইতিহাস মনে রাখবে না আমাদের-----
কে আর মনে রাখে নবান্নের দিনে কাটা ধানের গুচ্ছকে ?
কিন্তু মনে  রেখো তোমাদের আগেই আমরা খবর পাই
মধ্যরাত্রির অন্ধকারে
তোমাদের তন্দ্রার অগোচরেও |
তাই তোমাদের আগেই খবর-পরীরা এসেছে আমাদের চেতনার পথ বেয়ে
আমার হৃদ্ যন্ত্রে ঘা লেগে বেজে উঠেছ কয়েকটি কথা-----
পৃথিবী মুক্ত----জনগণ চূড়ান্ত সংগ্রামে জয়ী |
তোমাদের ঘরে আজো অন্ধকার, চোখে স্বপ্ন |
কিন্তু জানি একদিন সে সকাল আসবেই
যেদিন এই খবর পাবে প্রত্যেকের চোখেমুখে
সকালের আলোয়, ঘাসে ঘাসে পাতায় পাতায় |

আজ তোমরা এখনো ঘুমে ||


.            ***************     

.                                                                        
ছাড়পত্র-র সূচিতে. . .   
.                                                                        
সুকান্ত-র মূল সূচিতে. . .   


মিলনসাগর
*
একটি মোরগের কাহিনী    
(ছাড়পত্র)  


একটি মোরগ হঠাৎ আশ্রয় পেয়ে গেল
.   বিরাট প্রসাদের ছোট্ট এক কোণে,
.        ভাঙা প্যাকিং বাক্সের গাদায়----
.            আরো দু’তিনটি মুরগীর সঙ্গে |

আশ্রয় যদিও মিলল,
.        উপযুক্ত আহার মিলল না |
সুতীক্ষ্ম চিৎকারে প্রতিবাদ জানিয়ে
.        গলা ফাটাল সেই মোরগ
.             ভোর থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত----
তবুও সহানুভূতি জানাল না সেই বিরাট শক্ত ইমারত |

তারপর শুরু হল তার আঁস্তাকুড়ে আনাগোনা :
.        আশ্চর্য !সেখানে প্রতিদিন মিলতে লাগল
ফেলে দেওয়া ভাত-রুটির চমৎকার প্রচুর খাবার !

তারপর এক সময় আঁস্তাকুড়েও এল অংশীদার----
.        ময়লা ছেঁড়া ন্যাকড়া পরা দু’তিনটে মানুষ ;
.   কাজেই দুর্বলতর মোরগের খাবার গেল বন্ধ হয়ে |

খাবার ! খাবার ! খানিকটা খাবার !
.        অসহায় মোরগ খাবারের সন্ধানে
.             বার বার চেষ্টা ক’রল প্রাসাদে ঢুকতে,
.                প্রত্যেকবারই তাড়া খেলো প্রচন্ড |
ছোট্ট মোরগ ঘাড় উঁচু করে স্বপ্ন দেখে-----
.        ‘প্রাসাদের ভেতরে রাশি রাশি খাবার !’

তারপর সত্যিই সে একদিন প্রাসাদে ঢুকতে পেল,
.        একেবারে সোজা চলে এল
ধব্ ধপে সাদা দামী কাপড়ে ঢাকা খাবার টেবিলে ;
.            অবশ্য খাবার খেতে নয়-------
.                খাবার হিসেবে ||

.                   ***************     

.                                                                        
ছাড়পত্র-র সূচিতে. . .   
.                                                                        
সুকান্ত-র মূল সূচিতে. . .   


মিলনসাগর
*
আগ্নেয়গিরি    
(ছাড়পত্র)     

কখনো হঠাৎ মনে হয় :
আমি এক আগ্নেয় পাহাড় |
শান্তির ছায়া-নিবিড় গুহায় নিদ্রিত সিংহের মতো
চোখে আমার বহু দিনের তন্দ্রা |
এক বিস্ফোরণ থেকে আর এক বিস্ফোরণের মাঝখানে
আমাকে তোমরা বিদ্রূপে বিদ্ধ করেছ বারংবার
আমি পাথর :  আমি তা সহ্য করেছি |

মুখে আমার মৃদু হাসি,
বুকে আমার পুঞ্জীভূত ফুটন্ত লাভা |
সিংহের মতো আধ-বোজা চোখে আমি কেবলি দেখেছি :
মিথ্যার ভিতে কল্পনার মশলায় গড়া তোমাদের শহর,
আমাকে ঘিরে রচিত উৎসবের নির্বোধ অমরাবতী,
বিদ্রূপের হাসি আর বিদ্বেষের আতস-বাজি----
তোমাদের নগরে মদমত্ত পূর্ণিমা |

দেখ, দেখ :
ছায়াঘন, অরণ্য-নিবিড় আমাকে দেখ ;
দেখ আমার নিরুদ্বিগ্ন বন্যতা
তোমাদের শহর আমাকে বিদ্রূপ করুক,
কুঠারে কুঠারে আমার ধৈর্যকে করুক আহত,
কিছুতেই বিশ্বাস ক’রো না ----
আমি ভিসুভিয়াস-ফুজিয়ামার সহোদর |
তোমাদের কাছে অজ্ঞাত থাক
ভেতরে ভেতরে মোচড় দিয়ে ওঠা আমার অগ্ন্যুদ্ গার,
অরণ্যে ঢাকা অন্তর্নিহিত উত্তাপের জ্বালা |

তোমরা আকাশে ফ্যাকাশে প্রেত আলো,
বুনো পাহাড়ে মৃদু-ধোঁয়ার অবগুন্ঠন :
ও কিছু নয়, হয়তো নতুন এক মেঘদূত |
উত্সব কর, উত্সব কর-----
ভুলে যাও পেছনে আছে এক আগ্নেয় পাহাড়,
ভিসুভিয়স-ফুজিয়ামার জাগ্রত বংশধর |
আর,
আমার দিনপঞ্জিকায় আসন্ন হোক
বিস্ফোরণের চরম, পবিত্র তিথি ||


.            ***************     

.                                                                        
ছাড়পত্র-র সূচিতে. . .   
.                                                                        
সুকান্ত-র মূল সূচিতে. . .   


মিলনসাগর
*
ঠিকানা
( ছাড়পত্র )

ঠিকানা আমার চেয়েছ বন্ধু---
ঠিকানার সন্ধান,
আজও পাও নি ? দুঃখ যে দিলে করব না অভিমান ?
ঠিকানা না হয় না নিলে বন্ধু,
পথে পথে বাস করি
কখনো গাছের তলাতে
কখনো পর্ণকুটির গড়ি |
আমি যাযাবর, কুড়াই পথের নুড়ি,
হাজার জনতা যেখানে , সেখানে
আমি প্রতিদিন ঘুরি |
বন্ধু, ঘরের খুঁজে পাই নাকো পথ,
তাইতো পথের নুড়িতে গড়ব
মজবুত ইমারত |


.      বন্ধু, আজকে আঘাত দিও না
.             তোমাদের দেওয়া ক্ষতে,
.    আমার ঠিকানা খোঁজ ক’রো শুধু
.             সূর্যোদয়ের পথে |
.    ইন্দোনেশিয়া,  যুগোশ্লোভিয়া,
.              রুশ ও চীনের কাছে,
.    আমার ঠিকানা বহুকাল ধ’রে
.              জেনো গচ্ছিত আছে |
.    আমাকে কি তুমি খুঁজেছ কখনো
.              সমস্ত দেশ জুড়ে ?
.    তবুও পাওনি ? তাহলে ফিরেছ
.              ভুল পথে ঘুরে ঘুরে  |
.    আমার হদিশ জীবনের পথে
.              মন্বন্তর থেকে
.    ঘুরে গিয়েছে যে কিছু দূর গিয়ে
.              মুক্তির পথে বেঁকে |
.    বন্ধু,  কুয়াশা,  সাবধান এই
.              সূর্যোদয়ের  ভোরে :
.    পথ হারিও না আলোর আশায়
.             তুমি একা ভূল ক’রে |
.    বন্ধু, আজকে জানি অস্থির
.              রক্ত, নদীর  জল,
.    নীড়ে পাখি আর সমুদ্র চঞ্চল |
.      বন্ধু , সময় হয়েছে এখনো
.              ঠিকানা অবজ্ঞাত
.    বন্ধু, তোমার  ভুল হয় কেন এত ?
.    আর কতদিন দু’চক্ষু কচ্ লাবে,
.    জালিয়ানওয়ালার যে পথের শুরু
.              সে পথে আমাকে পাবে,
.    জালালাবাদের পথ ধ’রে ভাই
.              ধর্মতলার পরে,
.    দেখবে ঠিকানা লেখা প্রত্যেক ঘরে
.    ক্ষুদ্ধ এদেশে রক্তের অক্ষরে |
.      বন্ধু , আজকে বিদায় !
.                      দেখেছ উঠল যে হাওয়া ঝোড়ো,
.    ঠিকানা রইল ,
.               এবার মুক্ত স্বদেশেই দেখা ক’রো ||

.            ***************     

.                                                                        
ছাড়পত্র-র সূচিতে. . .   
.                                                                        
সুকান্ত-র মূল সূচিতে. . .   


মিলনসাগর
*
লেনিন
( ছাড়পত্র )

লেনিন ভেঙেছে রুশে জনস্রোতে অন্যায়ের বাঁধ,
অন্যায়ের মুখোমুখি লেনিন প্রথম প্রতিবাদ |
আজকেও রশিয়ার গ্রামে ও নগরে
হাজার লেনিন যুদ্ধ করে,
মুক্তির সীমান্ত ঘিরে বিস্তীর্ণ প্রান্তরে |
বিদ্যুৎ-ইশারা চোখে, আজকেও অযুত লেনিন
ক্রমশ সংক্ষিপ্ত করে বিশ্বব্যাপী প্রতীক্ষিত দিন,----
বিপর্যস্ত ধনতন্ত্র , কন্ঠরুদ্ধ, বুকে আর্তনাদ ;
---- আসে শত্রুজয়ের সংবাদ |


সযত্ন মুখোশধারী ধনিকেরও বন্ধ আস্ফালন,
কাঁপে হৃৎযন্ত্র তার, চোখে মুখে চিহ্নিত মরণ |
বিপ্লব হয়েছে শুরু, পদানত জনতার ব্যগ্র গাত্রোথ্বানে,
দেশে দেশে বিস্ফোরণ অতর্কিতে অগ্ন্যুৎপাত হানে |
দিকে দিকে কোণে কোণে লেনিনের পদধ্বনি
.                         আজো যায় শোনা,
দলিত হাজার কন্ঠে বিপ্লবের আজো সম্বর্ধনা |
পৃথিবীর প্রতি ঘরে ঘরে,
লেনিন সমৃদ্ধ হয় সম্ভাবিত উর্বর জঠরে |
আশ্চর্য উদ্দাম বেগে বিপ্লবের প্রত্যেক আকাশে
লেনিনের সূর্যদীপ্তি রক্তের তরঙ্গে ভেসে আসে ;
ইতালী, জার্মান , জাপ, ইংলন্ড, আমেরিকা, চীন
যেখানে মুক্তির যুদ্ধ সেখানেই কমরেড লেনিন |
অন্ধকার ভারতবর্ষ  :  বুভুক্ষায় পথে মৃতদেহ---
অনৈক্যের চোরাবালি ;  পরস্পর অযথা সন্দেহ ;
দরজায় চিহ্নিত নিত্য শত্রুর উদ্ধত পদাঘাত,
অদৃষ্ট ভৎর্সনা-ক্লান্ত কাটে দিন, বিমর্ষ রাত
বিদেশী শৃঙ্খলে পিষ্ট, শ্বাস তার ক্রমাগত ক্ষীণ----
এখানেও আয়োজন পূর্ণ করে নিঃশব্দে লেনিন |
লেনিন ভেঙেছে বিশ্বে জনস্রোতে অন্যায়ের বাঁধ,
অন্যায়ের মুখোমুখি লেনিন জানায় প্রতিবাদ |
মৃত্যুর সমুদ্র শেষ ;  পালে লাগে উদ্দাম বাতাস
মুক্তির শ্যামল তীর চোখে পড়ে,  আন্দোলিত ঘাস |
লেনিন ভূমিষ্ঠ রক্তে, ক্লীবতার কাছে নেই ঋণ,
বিপ্লব স্পন্দিত বুকে, মনে হয় আমিই লেনিন ||


.            ***************     

.                                                                        
ছাড়পত্র-র সূচিতে. . .   
.                                                                        
সুকান্ত-র মূল সূচিতে. . .   


মিলনসাগর
*
.                অনুভব
.                ( ছাড়পত্র )

.                || ১৯৪০ ||

অবাক পৃথিবী ! অবাক করলে তুমি
জন্মেই দেখি ক্ষুদ্ধ স্বদেশভূমি |
অবাক পৃথিবী !  আমরা যে পরাধীন
অবাক,  কী দ্রুত জমে ক্রোধ দিন দিন ;
অবাক পৃথিবী অবাক যে করলে আরো----
দেখি এই দেশে অন্ন নেইকো কারো |
অবাক পৃথিবী !  অবাক যে বারবার
দেখি এই দেশে মৃত্যুরই কারবার |
হিসেবের খাতা যখনি নিয়েছি হাতে
দেখেছি লিখিত ----- ‘রক্ত খরচ’ তাতে ;
এদেশে জন্মে পদাঘাতই শধু পেলাম,
অবাক পৃথিবী !  সেলাম, তোমাকে সেলাম !


.                || ১৯৪৬ ||

বিদ্রোহ আজ বিদ্রোহ চারিদিকে,
আমি যাই তারি দিন-পঞ্জিকা লিখে,
এত বিদ্রোহ কখনো দেখেনি কেউ,
দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ ;
স্বপ্ন-চূড়ার থেকে নেমে এসো সব------
শুনেছ ?  শুনছ উদ্দাম কলরব ?
নয়া ইতিহাস লিখছে ধর্মঘট,
রক্তে রক্তে আঁকা প্রচ্ছদ-পট |
প্রত্যহযারা ঘৃণিত ও পদানত,
দেখ আজ তারা সবেগে সমুদ্যত ;
তাদেরই দলের পিছনে আমিও আছি,
তাদেরই মধ্যে আমিও যে মরি-বাঁচি |
তাইতো চলেছি দিন-পঞ্জিকা লিখে-----
বিদ্রোহ আজ !  বিপ্লব চারিদিকে ||

.            ***************     

.                                                                        
ছাড়পত্র-র সূচিতে. . .   
.                                                                        
সুকান্ত-র মূল সূচিতে. . .   


মিলনসাগর
*
সিগারেট
( ছাড়পত্র )

আমরা সিগারেট |
তোমরা আমাদের বাঁচতে দাও না কেন ?
আমাদের কেন নিঃশেষ করো পুড়িয়ে ?
কেন এত স্বল্প-স্থায়ী আমাদের আয়ু ?
মানবতার কোন্ দোহাই তোমরা পাড়েবে ?
আমাদের দাম বড় কম এই পৃথিবীতে
তাইকি তোমরা আমাদের শোষণ করো ?
বিলাসের সামগ্রী হিসাবে ফেলো পুড়িয়ে ?
তোমাদের শোষণের টানে আমরা ছাই হই :
তোমরা নিবিড় হও আমাদের উত্তাপে |

তোমাদের আরাম  :  আমাদের মৃত্যু |
এমনি ক’রে চলবে আর কত কাল ?
আর কতকাল আমরা এমন নিঃশব্দে ডাকব
আয়ু-হরণকারী তিল তিল অপঘাতকে ?

দিন আর রাত্রি ------রাত্রি আর দিন :
তোমরা আমাদের শোষণ করছ সর্বক্ষণ----
আমাদের বিশ্রাম নেই, মজুরি নেই------
নেই কোনো অল্প-মাত্রার ছুটি |

তাই,  আর নয়  ;
আর আমরা বন্দী থাকব না
কৌটোয় আর প্যাকেটে,
আঙুলে আর পকেটে ;
সোনা-বাঁধানো ‘কেসে’ আমাদের নিঃশ্বাস হবে না রুদ্ধ |
আমরা বেরিয়ে পড়ব,
সবাই একজোটে, একত্রে-----
তারপর তোমাদের অসতর্ক মুহূর্তে
জ্বলন্ত আমরা ছিট্ কে পড়ব তোমাদের হাত থেকে
বিছানায় অথবা কাপড়ে ;
নিঃশব্দে হঠাৎ জ্বলে উঠে
বাড়িসুদ্ধ পুড়িয়ে মারব তোমাদের
যেমন করে তোমরা আমাদের পুড়িয়ে মেরেছ এতকাল ||

.            ***************     

.                                                                        
ছাড়পত্র-র সূচিতে. . .   
.                                                                        
সুকান্ত-র মূল সূচিতে. . .   


মিলনসাগর
*
দেশলাই কাঠি   

আমি একটা ছোট্ট দেশলাইয়ের কাঠি
এত নগণ্য, হয়তো চোখেও পড়ি না;
তবু জেনো
মুখে আমার উসখুস করছে বারুদ---
বুকে আমার জ্বলে উঠবার দুরন্ত উচ্ছ্বাস;
আমি একটা দেশলাইয়ের কাঠি।

মনে আছে সেদিন হুলুস্থুল বেধেছিল?
ঘরের কোণে জ্বলে উঠেছিল আগুন -
আমাকে অবজ্ঞাভরে না-নিভিয়ে ছুঁড়ে ফেলায়!
কত ঘরকে দিয়েছি পুড়িয়ে,
কত প্রাসাদকে করেছি ধূলিসাত্‍‌
আমি একাই- ছোট্ট একটা দেশলাইয়ের কাঠি।

এমনি বহু নগর, বহু রাজ্যকে দিতে পারি ছারখার করে
তবুও অবজ্ঞা করবে আমাদের?
মনে নেই? এই সেদিন-
আমরা সবাই জ্বলে উঠেছিলাম একই বাক্সে;
চমকে উঠেছিলে--আমরা শুনেছিলাম তোমাদের বিবর্ণ মুখের আর্তনাদ।

আমাদের কী অসীম শক্তি
তা তো অনুভব করেছো বারংবার;
তবু কেন বোঝো না,
আমরা বন্দী থাকবো না তোমাদের পকেটে পকেটে,
আমরা বেরিয়ে পড়ব, আমরা ছড়িয়ে পড়ব
শহরে, গঞ্জে, গ্রামে-- দিগন্ত থেকে দিগন্তে।
আমরা বার বার জ্বলি, নিতান্ত অবহেলায়-
তা তো তোমরা জানোই!
কিন্তু তোমরা তো জানো না:
কবে আমরা জ্বলে উঠব-
সবাই-- শেষবারের মতো!

.            ***************     

.                                                                        
ছাড়পত্র-র সূচিতে. . .   
.                                                                        
সুকান্ত-র মূল সূচিতে. . .   


মিলনসাগর
*
কাশ্মীর
( ছাড়পত্র )

সেই  বিশ্রী দম-আটকানো কুয়াশা আর নেই
নেই সেই একটানা তুষার-বৃষ্টি,
হঠাৎ জেগে উঠেছে----
সূর্যের ছোঁয়ায় চমকে উঠছে  ভূস্বর্গ |
দুহাতে তষারের পর্দা সরিয়ে ফেলে
মুঠো মুঠো হলদে পাতাকে দিয়েছে উড়িয়ে,
ডেকেছে রৌদ্রকে,
ডেকেছে তুষার-উড়িয়ে-নেওয়া বৈশাখী ঝড়কে,
পৃথিবীর নন্দন-কানন কাশ্মীর |

কাশ্মীরের সুন্দর মুখ কঠোর হল
প্রচন্ড সূর্যের উত্তাপে |
গলে গলে পড়ছে বরফ----
ঝরে ঝরে পড়ছে জীবনের স্পন্দন :
শ্যামল আর সমতল মাটির
স্পর্শ লেগেছে ওর মুখে,
দক্ষিণ সমুদ্রের হাওয়ায় উড়ছে ওর চুল  :
আন্দোলিত শাল, পাইন আর দেবদারুর বনে
ঝড়ের পক্ষে আজ সুস্পষ্ট সম্মতি |
কাশ্মীর আজ আর জমাট-বাঁধা বরফ নয় :
সূর্য-করোত্তোপে জাগা কঠোর গ্রীষ্মে
হাজার হাজার চঞ্চল স্রোত |

তাই আজ কাল-বৈশাখীর পতাকা উড়ছে
ক্ষুব্ধ কাশ্মীরের উদ্দাম হাওয়ায় হাওয়ায় ;
দুলে দুলে উঠছে
লক্ষ লক্ষ বছর ধরে ঘুমন্ত , নিস্তব্ধ
বিরাট ব্যাপ্ত হিমালয়ের বুক ||


.                || ২ ||

দম-আটকানো কুয়াশা তো আর নেই
নেই আর সেই বিশ্রী তুষার-বৃষ্টি,
সূর্য ছুঁয়েছে ‘ভূস্বর্গ চঞ্চল’
সহসা জেগেই চমকে উঠেছে দৃষ্টি |

দুহাতে তুষার-পর্দা সরিয়ে ফেলে
হঠাৎ হলদে পাতাকে দিয়েছে উড়িয়ে,
রোদকে ডেকেছে নন্দনবন পৃথিবীর
বৈশাখী ঝড় দিয়েছে বরফ গুঁড়িয়ে |

সুন্দর মুখ কঠোর করেছে কাশ্মীর
তীক্ষ্ণ চাহনি সূর্যের উত্তাপে,
গলিত বরফে জীবনের স্পন্দন
শ্যামল মাটির স্পর্শে ও আজ কাঁপে |

সাগর-বাতাসে উড়ছে আজ ওর চুল
শাল দেবদারু পাইনের বনে ক্ষোভ,
ঝড়ের পক্ষে চূড়ান্ত সম্মতি-----
কাশ্মীর নয়, জমাট বাঁধা বরফ |

কঠোর গ্রীষ্মে সূর্যোত্তাপে জাগা----
কাশ্মীর আজ চঞ্চল-,স্রোত লক্ষ :
দিগ্ দিগন্তে ছুটে ছুটে চলে দুর্বার
দুঃসহ ক্রোধে ফুলে ফুলে ওঠে বক্ষ |


ক্ষুব্ধ হাওয়ায় উদ্দাম উঁচু কাশ্মীর
কালবোশেখীর উতাকা উড়ছে নভে,
দুলে দুলে ওঠে ঘুমন্ত হিমালয়
বহু যুগ পরে বুঝি জাগ্রত হবে ||

.            ***************     

.                                                                        
ছাড়পত্র-র সূচিতে. . .   
.                                                                        
সুকান্ত-র মূল সূচিতে. . .   


মিলনসাগর
*
*
দুরাশার মৃত্যু
( ছাড়পত্র )

দ্বারে মৃত্যু,
বনে বনে লেগেছে জোয়ার,
পিছনে কি পথ নেই আর ?
আমাদের এই পলায়ন
জেনেছে মরণ,
অনুগামী ধূর্ত পিছে পিছে,
প্রস্থানের চেষ্টা হল মিছে |


দাবানল !
ব্যর্থ হল শুষ্ক অশ্রুজল,
বেনামী কৌশল
জেনেছে যে আরণ্যক প্রাণী
তাই শেষে নির্মূল বনানী  ||


.     ***************     

.                                                                        
ছাড়পত্র-র সূচিতে. . .   
.                                                                        
সুকান্ত-র মূল সূচিতে. . .   


মিলনসাগর
*
কলম  
(,ছাড়পত্র )

কলম, তুমি কত না যুগ কত না কাল ধরে
অক্ষরে অক্ষরে
গিয়েছ শুধু ক্লান্তিহীন কাহিনী শুরু করে |
কলম, তুমি কাহিনী লেখো, তোমার কাহিনী কি
দুঃখে জ্বলে তলোয়ারের মতন ঝিকিমিকি ?
কলম, তুমি শুধু বারংবার,
আনত ক’রে ক্লান্ত ঘাড়
গিয়েছ লিখে স্বপ্ন আর পুরনো কত কথা,
সাহিত্যের দাসত্বের ক্ষুধিত বশ্যতা |
ভগ্ন নিব,  রুগ্ন দেহ,  জলের মতো কালি,
কলম,  তুমি নিরপরাধ,  তবুও গালাগালি
খেয়েছ আর সয়েছ কত লেখকদের ঘৃণা,
কলম, তুমি চেষ্টা কর, দাঁড়াতে পারো কি না |

.        হে কলম ! তুমি কত ইতিহাস গিয়েছ লিখে
.        লিখে লিখে শুধু ছড়িয়ে দিয়েছ চতুর্দিকে |
.        তবু ইতিহাস মূল্য দেবে না, এতটুকু কোণ
.        দেবে না তোমায়, জেনো ইতিহাস বড়ই কৃপণ ;
.        কত লাঞ্ছনা , খাটুনি গিয়েছে  লেখকের হাতে
.        ঘুমহীন চোখে অবিশ্রান্ত অজস্র রাতে |
.        তোমার গোপন অশ্রু তাইতো ফসল ফলায়
.        বহু সাহিত্য বহু কাব্যের বুকের তলায় |
.        তবু দেখ বোধ নেই লেখকের কৃতজ্ঞতা,
.        কেন চলবে এ প্রভুর খেয়ালে, লিখবে কথা ?


হে কলম ! হে লেখনী  ! আর কত দিন
ঘর্ষণে ঘর্ষণে হবে ক্ষীণ ?
আর কত মৌন-মূক, শব্দহীন দ্বিধান্বিত বুকে
কালির কলঙ্ক চিহ্ন রেখে দেবে মুখে ?
আর কত আর
কাটবে দুঃসহ দিন দুর্বার লজ্জার ?
এ দাসত্ব ঘুচে যাক, এ কলঙ্ক মুছে যাক আজ,
কাজ কর-----কাজ |

.        মজুর দেখ নি তুমি ?  হে কলম, দেখনি বেকার ?
.        বিদ্রোহ দেখনি তুমি ? রক্তে কিছ পাও নি শেখার ?
.        কত না শতাব্দী , যুগ থেকে তুমি আজো আছ দাস,
.        প্রত্যেক লেখায় শুনি কেবল তোমার দীর্ঘশ্বাস !


দিন নেই, রাত্রি নেই, শ্রান্তিহীন , নেই কোনো ছুটি,
একটু অবাধ্য হলে তখুনি ভ্রূকুটি ;
এমনি করেই কাটে দুর্ভাগা তোমার বারো মাস,
কয়েকটি পয়সায় কেনা,  হে কলম, তুমি ক্রীতদাস |
তাই যত লেখ, তত পরিশ্রম এসে হয় জড়ো :
----কলম ! বিদ্রোহ আজ ! দল  বেঁধে ধর্মঘট করো |
লেখক স্তম্ভিত হোক, কেরানীরা ছেড়ে দিক হাঁফ,
মহাজনী বন্ধ হোক,  বন্ধ হোক মজুরের পাপ ;
উদ্বেগে-আকুল হোক প্রিয়া যত দূর দূর দেশে,
কলম !  বিদ্রোহ আজ, ধর্মঘট হোক অবশেষে ;
আর কালো কালি নয়,  রক্তে আজ ইতিহাস লিখে
দেওয়ালে দেওয়ালে এঁটে,  হে কলম,
.        আনো দিকে দিকে ||

.                   ***************     

.                                                                        
ছাড়পত্র-র সূচিতে. . .   
.                                                                        
সুকান্ত-র মূল সূচিতে. . .   


মিলনসাগর
*
সিঁড়ি
( ছাড়পত্র )

আমরা সিঁড়ি,
তোমরা আমাদের মাড়িয়ে
.           প্রতিদিন অনেক উঁচুতে উঠে যাও,
তারপর ফিরেও তাকাও না পিছনের দিকে ;
.          তোমাদের পদধূলিধন্য আমাদের বুক
পদাঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায় প্রতিদিন |

তোমরাও তা জানো
তাই কার্পেটে মুড়ে রাখতে চাও আমাদের বুকের ক্ষত,
ঢেকে রাখতে চাও তোমাদের অত্যাচারের চিহ্নকে
আর চেপে রাখতে চাও পৃথিবীর কাছে
.           তোমাদের গর্বোদ্ধত,  অত্যাচারী পদধ্বনি |

তবু আমরা জানি,
.           চিরকাল আর পৃথিবীর কাছে
.                চাপা থাকবে না
আমাদের দেহে তোমাদের এই পদাঘাত |
একদিন তোমাদেরও হতে পারে পদস্খলন ||

.                   ***************     

.                                                                        
ছাড়পত্র-র সূচিতে. . .   
.                                                                        
সুকান্ত-র মূল সূচিতে. . .   


মিলনসাগর
*
প্রার্থী
( ছাড়পত্র )

.            হে সূর্য  !  শীতের সূর্য  !
হিম শীতল সুদীর্ঘ রাত তোমার প্রতীক্ষায়
.                       আমরা থাকি,
যেমন প্রতীক্ষা ক’রে থাকে কৃষকদের চঞ্চল চোখ,
.         ধানকাটার রোমাঞ্চকর দিনগুলির জন্যে |

.             হে সূর্য, তুমি তো জানো,
আমাদের গকম কাপড়ের কত অভাব !
.           সারারাত খড়কুটো জ্বালিয়ে,
.           এক-টুকরো কাপড়ে কান ঢেকে,
কত কষ্টে আমরা শীত আটকাই !

সকালের এক-টুকরো রোদ্দুর----
.          এক- টুকরো সোনার চেয়েও মনে হয় দামী |
ঘর ছেড়ে আমরা এদিক-এদিক যাই----
.          এক-টুকরো রোদ্দুরের তৃষ্ণায় |

.             হে সূর্য !
তুমি আমাদের স্যাঁতসেঁতে ভিজে ঘরে
.           উত্তাপ আর আলো দিও,
.           আর উত্তাপ দিও,
রাস্তার ধারে ঐ উলঙ্গ ছেলেটাকে |

         হে সূর্য !
তুমি আমাদের উত্তাপ দিও---
শুনেছি, তুমি এক জ্বলন্ত অগ্নিপিন্ড,
.          তোমার কাছে উত্তাপ পেয়ে পেয়ে
একদিন হয়তো আমরা প্রত্যেকেই এক একটা জ্বলন্ত অগ্নিপিন্ডে
.          পরিণত হব !
তারপর সেই উত্তাপে যখন পুড়বে আমাদের জড়তা,
.         তখন হয়তো গরম কাপড়ে ঢেকে দিতে পারবো
.        রাস্তার ধারের ঐ ঊলঙ্গ ছেলেটাকে |
আজ কিন্ত আমরা তোমার অকৃপণ উত্তাপের প্রার্থী ||

.                   ***************     

.                                                                        
ছাড়পত্র-র সূচিতে. . .   
.                                                                        
সুকান্ত-র মূল সূচিতে. . .   


মিলনসাগর
*
প্রস্তুত
( ছাড়পত্র )

কালো মৃত্যুরা ডেকেছে আজকে স্বয়ম্বরায়,
নানাদিকে নানা হাতছানি দেখি বিপুল ধরায় |]
ভীত মন খোঁজে সহজ পন্থা, নিষ্ঠুর চোখ ;
তাই বিষাক্ত আস্বাদময় এ মর্তলোক,
কেবলি এখানে মনের দ্বন্দ্ব আগুন ছড়ায় |

অবশেষে ভুল ভেঙেছে, জোয়ার মনের কোণে,
তীব্র ভ্রূকুটি হেনেছি কুটিল ফুলের বনে ;
অভিশাপময় যে স আত্মা আজো অধীর,
তাদের সকাশে রেখেছি প্রাণের দৃঢ় শিবির;
নিজেকে মুক্ত করেছি আত্মসমর্পণে |

চাঁদের স্বপ্নে ধুয়ে গেছে মন যে-সব দিনে,
তাদের আজকে শত্রু বলেই নিয়েছি চিনে,
হীন স্পর্ধারা ধূর্তের মতো শক্তিশেলে-----
ছিনিয়ে আমায় নিতে পারে আজো সুযোগ পেলে
তাই সতর্ক হয়েছি মনকে রাখি নি ঋণে |

অসংখ্য দিন কেটেছে প্রাণের বৃথা রোদনে
নরম সোফায় বিপ্লবী মন উদ্বোধনে ;
আজকে কিন্তু জনতা-জোয়ারে দোলে প্লাবন,
নিরন্ন মনে রক্তিম পথ অনধাবন,
করছে পৃথিবী পূর্ব-পন্থা সংশোধনে |
অস্ত্র ধরেছি এখন সমুখে শত্রু চাই,
মহামারণের নিষ্ঠুর ব্রত নিয়েছি তাই ;
পৃথিবী জটিল, জটিল মনের সম্ভাষণ
তাদের প্রাভাবে রাখি নি মনেতে কোনো আসন,
ভুল হবে জানি তাদের আজকে মনে করাই ||


.                   ***************     

.                                                                        
ছাড়পত্র-র সূচিতে. . .   
.                                                                        
সুকান্ত-র মূল সূচিতে. . .   


মিলনসাগর
*
ইউরোপের উদ্দেশে
( ছাড়পত্র )
কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয় যামিনীমোহন কর সম্পাদিত মাসিক বসুমতী পত্রিকার আষাঢ়
১৩৫৩ (জুন ১৯৪৬) সংখ্যায়।

ওখানে এখন মে-মাস তুষার-গলানো দিন,
এখানে অগ্নি-ঝরা বৈশাখ নিদ্রাহীন ;
হয়তো ওখানে শুরু মন্থর দক্ষিণ হাওয়া ;
এখানে সেখানে ফুল ফোটে আজ তোমাদের দেশে
কত রঙ, কত বিচিত্র নিশি দেখা দেয় এসে |
ঘর ছেড়ে পথে বেরিয়ে পড়েছে কত ছেলেমেয়ে
এই বসন্তে কত উত্সব কত গান গেয়ে |
এখানে তো ফুল শুকনো, ধূসর রঙের ধুলোয়
খাঁ-খাঁ করে সারা দেশটা, শান্তি গিয়েছে চুলোয়
কঠিন রোদের ভয়ে ছেলেমেয়ে বন্ধ ঘরে,
সব চুপচাপ : জাগবে হয়তো বোশখী ঝড়ে  |
অনেক খাটুনি, অনেক লড়াই করার শেষে
চারিদিকে ক্রমে ফুলের বাগান তোমাদের দেশে ;
এদেশে যুদ্ধ, মহামারী, ভুখা জ্বলে হাড়ে হাড়ে -----
অগ্নিবর্ষী  গ্রীষ্মের মাঠে তাই ঘুম কাড়ে
বেপরোয়া প্রাণ ; জমে দিকে দিকে আজ লাখে লাখ-----
তোমাদের দেশে মে-মাস ;  এখানে ঝোড়ো বৈশাখ ||

.            ***************     

.                                                                        
ছাড়পত্র-র সূচিতে. . .   
.                                                                        
সুকান্ত-র মূল সূচিতে. . .   


মিলনসাগর
*