গান কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয় যামিনীমোহন কর সম্পাদিত মাসিক বসুমতী পত্রিকার আশ্বিন ১৩৬৩ (সেপ্টেম্বরন ১৯৫৬) সংখ্যায়, কবির অপ্রকাশিত কবিতা হিসেবে।
আমরা জেগেছি আমরা লেগেছি কাজে . আমরা কিশোর বীর | আজ বাংলার ঘরে ঘরে আমরা যে সৈনিক মুক্তির | . সো আমাদের হাতের অস্ত্র . দুঃখীকে বিলাই অন্ন বস্ত্র দেশের মুক্তি-দূত যে আমরা . স্ফুলিঙ্গ শক্তির | আমরা ভেঙেছি চীনে সোভিয়েটে . দাসত্ব-শৃঙ্খল | আমার সাথীরা প্রতি দেশে দেশে আজো উদ্যত একই উদ্দেশে---- এখানে শত্রুনিধনে নিয়েছি প্রতিজ্ঞা গম্ভীর |
বাঙলার বুকে কালো মহামারী মেলেছে অন্ধপাখা আমার মা.য়ের পঞ্জরে নখ বিঁদেছে রক্তমাখা তবু আজো দেখি হীন ভেদাভেদ আমরা মেলাব যত বিচ্ছেদ ; আমরা সৃষ্টি করব পৃথিবী নতুন শতাব্দীর ||
স্বাধীন হবে ভারতবর্ষ থাকবে না বন্ধন, আমরা সবাই স্বরাজ-যঞ্জে হব রে ইন্ধন বকের রক্ত দিব ঢালি স্বাধীনতারে, রক্ত পণে মুক্তি দেব ভারত-মাতারে | মুর্খ যারা অজ্ঞ যারা যে জেন বঞ্ছিত তাদের তরে মুক্তি-সুধা করব সঞ্চিত | চাষী মজুর দীন দরিদ্র সবাই মোদের ভাই, একস্বরে বলব মোরা স্বাধীনতা চাই || থাকবে নাকো মতভেদ আর মিথ্যা সম্প্রদায় ছিন্ন হবে ভেদের গ্রন্থি কঠিন প্রতিজ্ঞায় | আমরা সবাই ভারতবাসী শ্রেষ্ঠ পৃথিবীর আমরা হব মুক্তিদাদা আমরা হব বীর ||
বদ্যিনাথের সর্দি হল কলকাতাতে গিয়ে, আচ্ছা ক’রে জোলাপ নিল নস্যি নাকে দিয়ে | ডাক্তার এসে, বল্ল কেশে, “বড়ই কঠিন ব্যামো, এ সব কি সুচিকিত্সা ?------আরে আরে রামঃ | আমার হাতে পড়লে পরে ‘এক্ সরে’ করে দেখি, রোগটা কেমন, কঠিন কিনা----আসল কিংবা মেকি | থার্মোমিটার মুখে রেখে সাবধানেতে থাকুক, আইস-ব্যাগটা মাথায় দিয়ে একটা দিন তো রাখুক | ‘ইনজেক্শান’ নিতে হবে ‘অক্সিজেন’টা পরে তারপরেতে দেখব এ রোগ থাকে কেমন ক’রে |” পল্লীগ্রামের বদ্যিনাথ অবাক হল ভারী, সর্দি হলেই এমনতর ? ধন্য ডাক্তারী
ও পাড়ার শ্যাম রায় কাছে পেলে কামড়ায় . এমনি সে পালোয়ান, একদিন দুপরে ডাকে বলে গুপুরে . ‘এক্ষুনি আলো আন্’ | কী বিপদ তা হ’লে আলো তার না হ’লে . মার খাব আমরা ? দিলে পরে উত্তর . রেগে বলে ‘দুত্তোর, . যত সব দামড়া’ | কেঁদে বলি, শ্রীপদে বাঁচাও এ বিপদে----- . অক্ষম আমাদের | হেসে বলে শাম-দা নিয়ে আয় রামদা . ধুবড়ির রামাদের ||
আজিকার দিন কেটে যায়,----- অনলস মধ্যাহ্ন বেলায় যাহার অক্ষম মূর্তি পেয়েছিনু খুঁজে তারি পানে আছি চক্ষু বুজে | আমি সেই ধনুর্ধর যার শরাসনে অস্ত্র নাই, দীপ্তি মনে মনে, দিগন্তের স্তিমিত আলোকে পূজা চলে অনিত্যের বহ্নিময় স্রোতে | চলমান নির্বিরোধ ডাক, আজিকে অন্তর হতে চিরমুক্তিপাক | কঠিন প্রস্তরমূর্তি ভেঙে যাবে যবে সেই দিন আমাদের অস্ত্র তার কোষমুক্ত হবে | সুতরাং রুদ্ধতায় আজিকার দিন হোক মুক্তিহীন | প্রথম বাঁশির স্ফুর্তি গুপ্ত উত্স হতে জীন-সিন্ধুর বুকে আন্তরিক পোতে আজিও পায় নি পথ তাই আমার রুদ্রের পূজা নগণ্য প্রথাই তবুও আগত দিন ব্যগ্র হয়ে বারংবার চায় আজিকার দিন কেটে যায় ||
কাব্যকে জানিতে হয়, দৃষ্টি দোষে নতুবা পতিত শব্দের ঝঙ্কার শুধু যাহা ক্ষীণ জ্ঞানের অতীত | রাতকানা দেখে শুধু দিবসের আলোক প্রকাশ, তার কাছে অর্থহীন রাত্রিকার গভীর আকাশে | মানুষ কাব্যের স্রষ্টা, কাব্য কবি করে না ,সৃজন, কাব্যের নতুন জন্ম, যেই পথ যখনই বিজন | প্রগতির কথা শুনে হাসি মোর করুণ পর্যায় নেমে এল ( স্বেচ্ছাচার বুঝি বা গর্জায়.) যখন নতুন ধারা এনে দেয় দুরন্ত প্লাবন স্বেচ্ছাচার মনে করে নেমে আসে তখুনি শ্রাবণ ; কাব্যের প্রগতি-রথ ? ( কারে কহে বুঝিতে অক্ষম ) অশ্বগুলি ইচ্ছামতো চরে খায়, খুঁজিতে মোক্ষম, ) সুজীর্ণ প্রগতি-রথ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উইয়ের জ্বালায় সারথি-বাহন ফেলি ইতস্তত বিপথে পালায় | নতুন রথের পথে মৃতপ্রায় প্রবীণ ঘোটক, মাথা নেড়ে বুঝে, ইহা অ-রাজযোটক ||
অকস্মাৎ মধ্যদিনে গান বন্ধ ক’রে দিল পাখি, ছিন্নভিন্ন সন্ধ্যাবেলা প্রত্যহিক মিলনের রাখী ; ঘরে ঘরে অনেকেই নিঃসঙ্গ একাকী |
ক্লাব উঠে গিয়েছে সফরে, শূন্য ঘর, শূন্য মাঠ, ফুল ফোটা মালঞ্চ প’ড়ে ত্যক্ত এ ক্লাবের কক্ষে নিষ্প্রদীপ অন্ধকার নামে | সূর্য অস্ত গিয়েছে কখন, কারো আজ দেকা নেই----- কোথাও বন্ধুর দল ছড়ায় না হাসি, নিষ্প্রভ ভোজের স্বপ্ন ; একটি কথাও শব্দ তোলে না বাতাসে----- ক্লাব-ঘরে ধুলো জমে, বিনা গল্পে সন্ধ্যা হয় ; চাঁদ ওঠে উন্মুক্ত আকাশে |
খেলোয়ার খেলে নাকো, গায়কেরা গায় নাকো গান------ বক্তারা বলে না কথা সাঁতরুর বন্ধ আজ স্নান | সর্বস্ব নিয়েছে গোরা তারা মারে ঊরুতে চাপড়, যে পথে এ ক্লাব গেছে কে জানে সে পথের খবর ? সন্ধ্যার আভাস আসে, জ্বলে না আলোক ক্লাব কক্ষের কোলে, হাতে হাতে নেই সিগারেট---- তর্কাতর্কি হয় নাকো বিভক্ত দু’দলে ; অযথা সন্ধ্যায় কোনো অচেনার পদশব্দে মালীটা হাঁকে না |
মনে পড়ে লেকের সে পথ ? মনে পড়ে সন্ধ্যাবেলা হাওয়ার চাবুক | অনেক উজ্জ্বল দৃশ্য এই লেকে করেছিল উৎসাহিত বুক | কেরানী, বেকার, ছাত্র, অধ্যাপক, শিল্পী ও ডাক্তার সকলের কাছে ছিল অবারিত দ্বার, কাজের গহ্বর থেকে পাখিদের মতো এরা নীড় সন্ধানে, সন্ধ্যায় ডেকে এনেছিল এইখানে ভিড় | রাজনীতি, অর্থনীতি, সাহিত্য ও সিনেমার কথা, এদের রসনা থেকে প্রত্যহ স্খলিত হ’ত অলক্ষ্যে অযথা ; মাঝে মাঝে অনর্থক উচ্ছ্বাসিত হাসি, বাতাসে ছড়াত নিত্য শব্দ রাশি রাশি |
তারপর অকস্মাৎ ভেঙে গেল রুদ্ধশ্বাস মন্ত্রমুগ্ধ সভা, সহসা চৈতন্যোদয় ; প্রত্যেকের বুকে ফোটে ক্ষুদ্ধ রক্তজবা ; সমস্ত গানের শেষে যেন ভেঙে গেল এক গানের আসর, যেমন রাত্রির শেষে নিঃশেষে কাঙাল হয় বিবাহ-বাসর |
‘জীবন-রক্ষক’ এই সমাজের দারুণ অভাবে, এদের ‘জীবন-রক্ষা’ হয়তো কঠিন হবে, . হয়তো অনেক প্রাণ যাবে ||
“নব জ্যামিতি” র ছড়া Food- Problem ( একটি প্রাথমিক সম্পাদ্যের ছায়া অবলম্বনে )
সিদ্ধান্ত :
আজকে দেশে রব উঠেছে , দেশেতে নেই খাদ্য ; ‘আছে’, সেটা প্রমাণ করাই অধুনা ‘সম্পাদ্য’ |
কল্পনা :
মনে করো, আসছে জাপান অতি অবিলম্বে, সাধারণকে রাখতে হবে লৌহদৃঢ় ‘লম্ব’ | “খাদ্য নেই” এর প্রথম পাওয়া খুব ‘সরল রেখা’তে, দেশরক্ষার ‘লম্ব’ তোলাই আজকে হবে শেখাতে |
অঙ্কন :
আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবীর ক্ষুদ্র বিন্দু থেকে, প্রতিরোধের বিন্দুতে নাও ঐক্য-রেখা এঁকে ‘হিন্দু’—‘মুসলমানে’র কেন্দ্রে, দুদিকের দুই ‘চাপে’, যুক্ত করো উভয়কে এক প্রতিরোধের ধাপে | প্রতিরোধের বিন্দুতে দুই জাতি যদি মেলে, সাথে সাথেই খাদ্য পাওয়ার হদিশ তুমি পেলে |
প্রমাণ :
খাদ্য এবং প্রতিরোধের উভয়কে চাই, হিন্দু এবং মুসলমানে মিলনে হবে তাই | উভয়েরই চাই স্বাধীনতা, উভয় দাবীই সমান, দিকে দিকে ‘খাদ্যলাভ’ একতারই প্রমাণ | প্রতিরোধের সঠিক পথে অগ্রসর যারা, ঐক্যবদ্ধ পরস্পর খাদ্য পায় তারা ||
তোমাকে দেখেছি আমি অবিচল, দৃপ্ত দুঃসময়ে ললাটে পড়েনি রেখা ক্রূরতম সংকটের ভয়ে ; তোমাকে দেখেছি আমি বিপদেও পরিহাস রত দেখেছি তোমার মধ্যে কোনো এক শক্তি সুসংহত | দুঃখে শোকে, বারবার অদৃষ্টের নিষ্ঠুর আঘাতে অনাহত, আত্মমগ্ন সমুদ্যত জয়ধ্বজা হাতে | শিল্প ও সাহিত্যরসে পরিপুষ্ট তোমার হৃদয় জীবনকে জানো তাই মান নাকো কোনো পরাজয় ; দাক্ষিণ্য সমৃদ্ধ মন যেন ব্যস্ত ভাগীরথী জল পথের দু’ধারে তার ছড়ায় যে দানের ফসল, পরোয়া রাখে না প্রতিদানের তা এমনি উদার, বহুবার মুখোমুখি হয়েছে সে বিশ্বাসহন্তার | তবুও অক্ষুণ্ণ মন, যতো হোক নিন্দা ও অখ্যাতি সহিষ্ণু হৃদয় জানে সর্বদা মানুষের জ্ঞাতি, তাইতো তোমার মুখে শুনে বাণপ্রস্থের ইঙ্গিত মনেতে বিস্ময় মানি, শেষে হবে বিরক্তির জিত ? পৃথিবীকে চেয়ে দেখ, প্রশ্নে ও সংশয়ে থরো থরো, তোমার মুক্তির সঙ্গে বিশ্বের মুক্তিকে যোগ করো ||
চারুটাও হয়ে গেছে বেজায় বেয়াড়া, মাথার ওপরে ঝোলে যা খুশির খাঁড়া | নতেদা’র বেড়ে গেছে অঙ্গুলি হাড়া, ঘেলুর পরীক্ষাও হয়ে গেছে সারা ; এবার খরচ ক’রে কিছু রেল ভাড়া মাতিয়ে তুলতে বলি রামধন পাড়া |
এবার বোধহয় ছাড়তে হল কাশী, ছাড়তে হল শৈলর মা, ইন্দু ও ন’মাসি | দুঃখ কিসের, কেউ কি সেথায় থাকে বারোমাসই ? কাশী থাকতে চাইবে তারা যারা স্বর্গবাসী, আমি কিন্ত কলকাতাতেই থাকতে ভালবাসি | আমর যুক্তি শুনতে গিয়ে পাচ্ছে কি খুব হাসি ? লেখা বন্ধ হোক তা হলে, এবার আমি আসি |
আজকে হঠাৎ সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হ’তে সাধ জাগে, মনে হয় তবু যদি পক্ষপাতের বালাই না নিয়ে পক্ষীরাজ, চাষার ছেলের হাতে এসে যেত হঠাৎ আজ | তা হলে না হয় আকাশবিহার হ’ত সফল, টুকরো মেঘেরা যেতে-যেতে ছুঁয়ে যেত কপোল ; জনারণ্যে কি রাজকন্যার নেইকো ঠাঁই ? কাস্তেখানাকে বাগিয়ে আজকে ভাবছি তাই |
অসি নাই থাক, হাতে তো আমার কাস্তে আছে, চাষার ছেলের অসিকে কি ভালবাসতে আছে ? তাই আমি যেতে চাই সেখানেই যেখানে পীড়ন, যেখানে ঝলসে উঠবে কাস্তে দৃপ্ত-কিরণ | হে রাজকন্যা, দৈত্যপুরীতে বন্দী থেকে নিজেকে মুক্ত করতে আমায় নিয়েছে ডেকে | হেমন্তে পাকা ফসল সামনে, তবু দিলে ডাক ; তোমাকে মুক্ত করব, আজকে ধান কাটা থাক |
রাজপুত্রের মতন যদিও নেই কৃপাণ, তবু মনে আশা, তাই কাস্তেতে দিচ্ছি শান, হে রাজকুমারী, আমারে ঘরে আসতে তোমার মন চাইবে তো ? হবে কষ্টের সমুদ্র পার ? দৈত্যশালার পাথরের ঘর, পালঙ্গ-খাট, আমাদের শুধু পর্ণ-কুটির, ফাঁকা ক্ষেত-মাঠ ; সোনার শিকল নেই, আমাদের মুক্ত আকাশ, রাজার ঝিয়ারী এখানে নিদ্রাহীন বারো মাস |
এখানে দিন ও রাত্রির পরিশ্রমেই কাটে সূর্য এখানে দ্রুত ওঠে, নামে দেরিতে পাটে | হে রাজকন্যা, চলো যাই,আজ এলাম পাশে, পক্ষীরাজের অভাবে পা দেব কোমল ঘাসে | হে রাজকন্যা, সাড়া দাও, কেন মৌন পাষাণ ? আমার সঙ্গে ক্ষেতে গিয়ে তুমি তুলবে না ধান ? হে রাজকন্যা, ঘুম ভাঙলো না ? সোনার কাঠি কোথা থেকে পাব, আমরা নিঃস্ব, ক্ষেতেই খাটি | সোনার কাঠির সোনা নেই, আছে ধানের সোনা, তাতে কি হবে না ? তবে তো বৃথাই অনুশোচনা ||