বর্ষা--বাণী
বৈশাখী ( গান )
---আহ্বান---

এসো এসো এসো হে নবীন
.    এসো এসো হে বৈশাখ,
এসো আলো এসো হে প্রাণ
.    ডাকো কালবৈশাখীর ডাক |
.    বাতাসে আনো ঝড়ের সুর
.    যুক্ত করো নিকট-দূর |
মুক্ত করো শতাব্দীর দিনের প্রতিদানে,
ঝঞ্ঝা আনো বজ্র হানো বিজালী জ্বাল প্রাণে |
পুরানো দিন তপ্ত বায়ে আজকে ঝ’রে যাক |


বসন্তেরই শান্ত বায়ে পল্লবিনী-লতা
তরুর কোলে দোলনরত লজ্জা-অবনতা  |
প্রভাতী-ডাকে তাহারে ডাকো
.      একেলা কানে কানে
প্রলয় সুরে নাট্যশালা ভরিয়া তোল গানে |
মেঘের বুকে কাজল আঁকো,
.      জাগাও ঘুর্ণিপাকে  ||
নিঃস্ব করো বিশ্ব ভুবন দুঃখ দহন-তাপে
শুষ্ক করো রুক্ষ করো কঠিন অভিশাপে |
হে সন্নাসী একেলা আসি
.      রিক্ত-ঝুলি হ’তে
দিলে যে দান জ্বলিল প্রাণ
.      পুড়িল আরও ওতে |
তৃষ্ণাময়ী ধরণী আজি করুণা মাগে তব
নবীনপ্রাণ নবীনদান আনো হে নব বন |
পিছনে তাই বৈশাখী ঝড় আশাসে তোলে হাঁক ||


.            ***************     

.                                                            
অন্যান্য গান ও কবিতার সূচিতে. . .   
.                                                                        
সুকান্ত-র মূল সূচিতে. . .   


মিলনসাগর
সুকান্ত ভট্টাচার্যর কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
*
গান

যেমন ক’রে তপন টানে জল
তেমনি ক’রে তোমায় অবিরল
.     টানছি দিনে দিনে
.     তুমি লও গো তোমায় চিনে
শুধু ঘোচাও তোমার ছল ||


জানি আমি তোমায় বলা বৃথা
তুমি আমার আমি তোমার মিতা,
.     রুদ্ধ দুয়ার খুলে
.     তুমি আসবে নাকো ভুলে
.     থামবে নাকো আমার চলাচল ||

.            ***************     

.                                                            
অন্যান্য গান ও কবিতার সূচিতে. . .   
.                                                                        
সুকান্ত-র মূল সূচিতে. . .   


মিলনসাগর
*
জনযুদ্ধের গান

জনগণ হও আজ উদ্বুদ্ধ
শুর করো প্রতিরোধ, জনযুদ্ধ,
জাপানী ফ্যাসিস্টদের ঘোর দুর্দিন
মিলছে ভারত আর বীর মহাচীন |
সাম্যবাদীরা আজ মহা ক্রদ্ধ
শুরু করো প্রতিরোধ, জনযুদ্ধ |
জনগণ শক্তির ক্ষয় নেই,
ভয় নেই আমাদের ভয় নেই |
নিষ্ক্রিয়তায় তবে কেন মন মগ্ন
কেড়ে নাও হাতিয়ার, শুবলগ্ন |
করো জাপানের আজ গতি রদ্ধ ;
শুরু করো, প্রতিরোধ, জানযুদ্ধ ||

.            ***************     

.                                                            
অন্যান্য গান ও কবিতার সূচিতে. . .   
.                                                                        
সুকান্ত-র মূল সূচিতে. . .   


মিলনসাগর
*
গান  
কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয় যামিনীমোহন কর সম্পাদিত মাসিক বসুমতী পত্রিকার আশ্বিন
১৩৬৩ (সেপ্টেম্বরন ১৯৫৬) সংখ্যায়, কবির অপ্রকাশিত কবিতা হিসেবে।

আমরা জেগেছি আমরা লেগেছি কাজে
.     আমরা কিশোর বীর |
আজ বাংলার ঘরে ঘরে আমরা যে সৈনিক মুক্তির |
.     সো আমাদের হাতের অস্ত্র
.     দুঃখীকে বিলাই অন্ন বস্ত্র
দেশের মুক্তি-দূত যে আমরা
.               স্ফুলিঙ্গ শক্তির |
আমরা ভেঙেছি চীনে সোভিয়েটে
.                দাসত্ব-শৃঙ্খল |
আমার সাথীরা প্রতি দেশে দেশে
আজো উদ্যত একই উদ্দেশে----
এখানে শত্রুনিধনে নিয়েছি প্রতিজ্ঞা গম্ভীর |

বাঙলার বুকে কালো মহামারী মেলেছে অন্ধপাখা
আমার মা.য়ের পঞ্জরে নখ বিঁদেছে রক্তমাখা
তবু আজো দেখি হীন ভেদাভেদ
আমরা মেলাব যত বিচ্ছেদ ;
আমরা সৃষ্টি করব পৃথিবী নতুন শতাব্দীর ||

.            ***************     

.                                                            
অন্যান্য গান ও কবিতার সূচিতে. . .   
.                                                                        
সুকান্ত-র মূল সূচিতে. . .   

মিলনসাগর
*
গান   

শৃঙ্খল ভাঙা সুর বাজে পায়ে
.     ঝন্ ঝনা ঝন্ ঝন
সর্বহারার বন্দী-শিবিরে
.                ধ্বংসের গর্জন |
দিকে দিকে জাগে প্রস্তুত জনসৈন্য
পালাবে কোথায় ? রাস্তা তো নেই অন্য
হাতে রচা এই খোঁয়ার তোমার জন্য
.       হে শত্রু দুষমন
যুগান্ত জোড়া জড়রাত্রির শেষে
.       দিগন্ত দেখি স্তম্ভিত লাল আলো,
রুক্ষ মাঠেতে সবুজ ঘনায় এসে
.       নতুন দেশের যাত্রীরা চমকালো |
চলতি ট্রেনের চাকায় গুঁড়ায়ে দম্ভ
পতাকা উড়াই : মিলিত জয়স্তম্ভ
মুক্তির ঝড়ে শত্রুরা হতভম্ভ |
.                আমরা কঠিন পণ ||

.            ***************     

.                                                            
অন্যান্য গান ও কবিতার সূচিতে. . .   
.                                                                        
সুকান্ত-র মূল সূচিতে. . .   


মিলনসাগর
*
ভবিষ্যতে

স্বাধীন হবে ভারতবর্ষ থাকবে না বন্ধন,
আমরা সবাই স্বরাজ-যঞ্জে হব রে ইন্ধন
বকের রক্ত দিব ঢালি স্বাধীনতারে,
রক্ত পণে মুক্তি দেব ভারত-মাতারে |
মুর্খ যারা অজ্ঞ যারা যে জেন বঞ্ছিত
তাদের তরে মুক্তি-সুধা করব সঞ্চিত |
চাষী মজুর দীন দরিদ্র সবাই মোদের ভাই,
একস্বরে বলব মোরা স্বাধীনতা চাই ||
থাকবে নাকো মতভেদ আর মিথ্যা সম্প্রদায়
ছিন্ন হবে ভেদের গ্রন্থি কঠিন প্রতিজ্ঞায় |
আমরা সবাই ভারতবাসী শ্রেষ্ঠ পৃথিবীর
আমরা হব মুক্তিদাদা আমরা হব বীর ||

.            ***************     

.                                                            
অন্যান্য গান ও কবিতার সূচিতে. . .   
.                                                                        
সুকান্ত-র মূল সূচিতে. . .   


মিলনসাগর
*
সুচিকিত্সা

বদ্যিনাথের সর্দি হল কলকাতাতে গিয়ে,
আচ্ছা ক’রে জোলাপ নিল নস্যি নাকে দিয়ে |
ডাক্তার এসে, বল্ল কেশে, “বড়ই কঠিন ব্যামো,
এ সব কি সুচিকিত্সা ?------আরে আরে রামঃ |
আমার হাতে পড়লে পরে ‘এক্ সরে’ করে দেখি,
রোগটা কেমন, কঠিন কিনা----আসল কিংবা মেকি |
থার্মোমিটার মুখে রেখে সাবধানেতে থাকুক,
আইস-ব্যাগটা মাথায় দিয়ে একটা দিন তো রাখুক |
‘ইনজেক্শান’ নিতে হবে ‘অক্সিজেন’টা পরে
তারপরেতে দেখব এ রোগ থাকে কেমন ক’রে |”
পল্লীগ্রামের বদ্যিনাথ অবাক হল ভারী,
সর্দি হলেই এমনতর ?  ধন্য ডাক্তারী

.            ***************     

.                                                            
অন্যান্য গান ও কবিতার সূচিতে. . .   
.                                                                        
সুকান্ত-র মূল সূচিতে. . .   


মিলনসাগর
*
পরিচয়

ও পাড়ার শ্যাম রায়
কাছে পেলে কামড়ায়
.     এমনি সে পালোয়ান,
একদিন দুপরে
ডাকে বলে গুপুরে
.     ‘এক্ষুনি আলো আন্’ |
কী বিপদ তা হ’লে
আলো তার না হ’লে
.      মার খাব আমরা ?
দিলে পরে উত্তর
.  রেগে বলে ‘দুত্তোর,
.   যত সব দামড়া’ |
কেঁদে বলি, শ্রীপদে
বাঁচাও এ বিপদে-----
.      অক্ষম আমাদের |
হেসে বলে শাম-দা
নিয়ে আয় রামদা
.       ধুবড়ির রামাদের ||

.            ***************     

.                                                            
অন্যান্য গান ও কবিতার সূচিতে. . .   
.                                                                        
সুকান্ত-র মূল সূচিতে. . .   


মিলনসাগর
*
আজিকার দিন কেটে যায়

আজিকার দিন কেটে যায়,-----
অনলস মধ্যাহ্ন বেলায়
যাহার অক্ষম মূর্তি পেয়েছিনু খুঁজে
তারি পানে আছি চক্ষু বুজে |
আমি সেই ধনুর্ধর যার শরাসনে
অস্ত্র নাই, দীপ্তি মনে মনে,
দিগন্তের স্তিমিত আলোকে
পূজা চলে অনিত্যের বহ্নিময় স্রোতে |
চলমান নির্বিরোধ ডাক,
আজিকে অন্তর হতে চিরমুক্তিপাক |
কঠিন প্রস্তরমূর্তি ভেঙে যাবে যবে
সেই দিন আমাদের অস্ত্র তার কোষমুক্ত হবে |
সুতরাং রুদ্ধতায় আজিকার দিন
হোক মুক্তিহীন |
প্রথম বাঁশির স্ফুর্তি গুপ্ত উত্স হতে
জীন-সিন্ধুর বুকে আন্তরিক পোতে
আজিও পায় নি পথ তাই
আমার রুদ্রের পূজা নগণ্য প্রথাই
তবুও আগত দিন ব্যগ্র হয়ে বারংবার চায়
আজিকার দিন কেটে যায় ||

.            ***************     

.                                                            
অন্যান্য গান ও কবিতার সূচিতে. . .   
.                                                                        
সুকান্ত-র মূল সূচিতে. . .   


মিলনসাগর
*
চৈত্রদিনের গান

চৈত্ররাতের হঠাৎ হাওয়া
.   আমায় ডেকে বলে,
“বনানী আজ সজীব হ’ল
.   নতুন ফুলে ফলে |
এখনও কি ঘুম-বিভোল ?
পাতায় পাতায় জানায় দোল
.   বসন্তেরই হাওয়া |
তোমার নবীন প্রাণে প্রাণে,
কে সে আলোর জোয়ার আনে ?
নিরুদ্দেশের পানে আজি তোমার তরী বাওয়া ;
তোমার প্রাণে দোল দিয়েছে বসন্তেরই হাওয়া |
.      ওঠ্ রে আজি জাগরে জাগ
.      সন্ধ্যাকাশে উড়ায় ফাগ
.       ঘুমের দেশের সুপ্তিহীন মেয়ে |
তোমার সোনার রথে চ’ড়ে
মুক্তি-পথের লাগান ধ’রে
.      ভবিষ্যতের পানে চল আলোর গান গেয়ে |
রক্তস্রোতে তোমার দিন,
চলেছে ভেসে সীমানাহীন |
.           তারে তুমি মহান্ ক’রে তোল,
তোমার পিছে মৃত্যুমাখা দিনগুলিরে ভোল ||

.            ***************     

.                                                            
অন্যান্য গান ও কবিতার সূচিতে. . .   
.                                                                        
সুকান্ত-র মূল সূচিতে. . .   


মিলনসাগর
*
সুহৃদ্ বরেষু

কাব্যকে জানিতে হয়, দৃষ্টি দোষে নতুবা পতিত
শব্দের ঝঙ্কার শুধু যাহা ক্ষীণ জ্ঞানের অতীত |
রাতকানা দেখে শুধু দিবসের আলোক প্রকাশ,
তার কাছে অর্থহীন রাত্রিকার গভীর আকাশে |
মানুষ কাব্যের স্রষ্টা, কাব্য কবি করে না ,সৃজন,
কাব্যের নতুন জন্ম, যেই পথ যখনই বিজন |
প্রগতির কথা শুনে হাসি মোর করুণ পর্যায়
নেমে এল ( স্বেচ্ছাচার বুঝি বা গর্জায়.)
যখন নতুন ধারা এনে দেয় দুরন্ত প্লাবন
স্বেচ্ছাচার মনে করে নেমে আসে তখুনি শ্রাবণ ;
কাব্যের প্রগতি-রথ ? ( কারে কহে বুঝিতে অক্ষম )
অশ্বগুলি ইচ্ছামতো চরে খায়, খুঁজিতে মোক্ষম, )
সুজীর্ণ প্রগতি-রথ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র  উইয়ের জ্বালায়
সারথি-বাহন ফেলি ইতস্তত বিপথে পালায় |
নতুন রথের পথে মৃতপ্রায় প্রবীণ ঘোটক,
মাথা নেড়ে বুঝে, ইহা অ-রাজযোটক ||

.            ***************     

.                                                            
অন্যান্য গান ও কবিতার সূচিতে. . .   
.                                                                        
সুকান্ত-র মূল সূচিতে. . .   


মিলনসাগর
*
পটভূমি

অজাতশত্রু, কতদিন কাল কাটলো :
চিরজীবন কি আবাদ-ই ফসল ফলবে ?
ওগো ত্রিশঙ্কু , নামাবলী আজ সম্বল
টংকারে মূঢ় স্তব্ধ বুকে রক্ত |

কখনো সন্ধ্যা জীবনকে চায় বাঁধতে
সাদা রাতগুলো স্বপ্নের ছায়া মনে হয়,
মাটির বুকেতে পরিচিত পদশব্দ,
কোনো আতঙ্ক সৃষ্টি থেকেই অব্যয় |

ভীরু একদিন চেয়েছিল দূর অতীতে
রক্তের গড়া মানুষকে ভালবাসতে ;
তাই বলে আজ পেশাদারী কোন মৃত্যু
বিপদকে ভয় ? সাম্যের পুনরুক্তি |

সখের শপথ গলিত কালের গর্ভে-----
প্রপঞ্চময় এই দুনিয়ার মুষ্ঠি,
তবু দিন চাই, উপসংহারে নিঃস্ব
নইলে চটুল কালের চপল দৃষ্টি |

পঙ্গু জীবন ; পিচ্ছিল ভীত আত্মা,-----
রাত্রির বুকে উদ্যত লাল চক্ষু ;
শেষ নিঃশ্বাস পড়ুক মৌন মন্ত্রে,
যদি ধরিত্রী একটুও হয় রক্তিম ||

.            ***************     

.                                                            
অন্যান্য গান ও কবিতার সূচিতে. . .   
.                                                                        
সুকান্ত-র মূল সূচিতে. . .   


মিলনসাগর
*
ভারতীয় জীবনত্রাণ-সমাজের মহাপ্রয়াণে
(  শচীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য-কে )

অকস্মাৎ মধ্যদিনে গান বন্ধ ক’রে দিল পাখি,
ছিন্নভিন্ন সন্ধ্যাবেলা প্রত্যহিক মিলনের রাখী ;
ঘরে ঘরে অনেকেই নিঃসঙ্গ একাকী  |

ক্লাব উঠে গিয়েছে সফরে,
শূন্য ঘর, শূন্য মাঠ,
ফুল ফোটা মালঞ্চ প’ড়ে
ত্যক্ত এ ক্লাবের কক্ষে নিষ্প্রদীপ অন্ধকার নামে |
সূর্য অস্ত গিয়েছে কখন,
কারো আজ দেকা নেই-----
কোথাও বন্ধুর দল ছড়ায় না হাসি,
নিষ্প্রভ ভোজের স্বপ্ন ;
একটি কথাও শব্দ তোলে না বাতাসে-----
ক্লাব-ঘরে ধুলো জমে,
বিনা গল্পে সন্ধ্যা হয় ;
চাঁদ ওঠে উন্মুক্ত আকাশে |

খেলোয়ার খেলে নাকো,
গায়কেরা গায় নাকো গান------
বক্তারা বলে না কথা
সাঁতরুর বন্ধ আজ স্নান |
সর্বস্ব নিয়েছে গোরা তারা মারে ঊরুতে চাপড়,
যে পথে এ ক্লাব গেছে কে জানে সে পথের খবর ?
সন্ধ্যার আভাস আসে,
জ্বলে না আলোক ক্লাব কক্ষের কোলে,
হাতে হাতে নেই সিগারেট----
তর্কাতর্কি হয় নাকো বিভক্ত দু’দলে ;
অযথা সন্ধ্যায় কোনো অচেনার পদশব্দে
মালীটা হাঁকে না |

মনে পড়ে লেকের সে পথ  ?
মনে পড়ে সন্ধ্যাবেলা হাওয়ার চাবুক |
অনেক উজ্জ্বল দৃশ্য এই লেকে
করেছিল উৎসাহিত বুক |
কেরানী, বেকার, ছাত্র, অধ্যাপক, শিল্পী ও ডাক্তার
সকলের কাছে ছিল অবারিত দ্বার,
কাজের গহ্বর থেকে পাখিদের মতো এরা নীড়
সন্ধানে, সন্ধ্যায় ডেকে এনেছিল এইখানে ভিড় |
রাজনীতি, অর্থনীতি, সাহিত্য ও সিনেমার কথা,
এদের রসনা থেকে প্রত্যহ স্খলিত হ’ত অলক্ষ্যে অযথা ;
মাঝে মাঝে অনর্থক উচ্ছ্বাসিত হাসি,
বাতাসে ছড়াত নিত্য শব্দ রাশি রাশি |

তারপর অকস্মাৎ ভেঙে গেল রুদ্ধশ্বাস মন্ত্রমুগ্ধ সভা,
সহসা চৈতন্যোদয় ; প্রত্যেকের বুকে ফোটে ক্ষুদ্ধ রক্তজবা ;
সমস্ত গানের শেষে যেন ভেঙে গেল এক গানের আসর,
যেমন রাত্রির শেষে নিঃশেষে কাঙাল হয় বিবাহ-বাসর |

‘জীবন-রক্ষক’ এই সমাজের দারুণ অভাবে,
এদের ‘জীবন-রক্ষা’ হয়তো কঠিন হবে,
.       হয়তো অনেক প্রাণ যাবে ||

.            ***************     

.                                                            
অন্যান্য গান ও কবিতার সূচিতে. . .   
.                                                                        
সুকান্ত-র মূল সূচিতে. . .   


মিলনসাগর
*
“নব জ্যামিতি” র ছড়া
Food- Problem
(  একটি প্রাথমিক সম্পাদ্যের ছায়া অবলম্বনে  )

সিদ্ধান্ত :

আজকে দেশে রব উঠেছে , দেশেতে নেই খাদ্য ;
‘আছে’, সেটা প্রমাণ করাই অধুনা ‘সম্পাদ্য’ |

কল্পনা :

মনে করো, আসছে জাপান অতি অবিলম্বে,
সাধারণকে রাখতে হবে লৌহদৃঢ় ‘লম্ব’ |
“খাদ্য নেই”  এর প্রথম পাওয়া খুব ‘সরল রেখা’তে,
দেশরক্ষার ‘লম্ব’ তোলাই আজকে হবে শেখাতে |


অঙ্কন :

আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবীর ক্ষুদ্র বিন্দু থেকে,
প্রতিরোধের বিন্দুতে নাও ঐক্য-রেখা এঁকে
‘হিন্দু’—‘মুসলমানে’র কেন্দ্রে, দুদিকের দুই ‘চাপে’,
যুক্ত করো উভয়কে এক প্রতিরোধের ধাপে |
প্রতিরোধের বিন্দুতে দুই জাতি যদি মেলে,
সাথে সাথেই খাদ্য পাওয়ার হদিশ তুমি পেলে |

প্রমাণ :

খাদ্য এবং প্রতিরোধের উভয়কে চাই,
হিন্দু এবং মুসলমানে মিলনে হবে তাই |
উভয়েরই চাই স্বাধীনতা, উভয় দাবীই সমান,
দিকে দিকে ‘খাদ্যলাভ’ একতারই প্রমাণ |
প্রতিরোধের সঠিক পথে অগ্রসর যারা,
ঐক্যবদ্ধ পরস্পর খাদ্য পায় তারা ||

.            ***************     

.                                                            
অন্যান্য গান ও কবিতার সূচিতে. . .   
.                                                                        
সুকান্ত-র মূল সূচিতে. . .   


মিলনসাগর
*
জবাব

আশংকা নয় আসন্ন রাত্রিকে
মুক্ত-মগ্ন প্রতিজ্ঞা চারিদিকে
হানবে এবার অজস্র মৃত্যুকে ;
জঙ্গী-জনতা ক্রমাগত সম্মুখে |

শত্রুদল গোপনে আজ, হানো আঘাত
এসেছে দিন ; পতেঙ্গার রক্তপাত
আনে নি ক্রোধ, স্বার্থবোধ দুর্দিন ?
উষ্ণমন শাণিত হোক সঙ্গীণে |

ক্ষিপ্ত হোক, দৃপ্ত হোক তুচ্ছ প্রাণ
কাস্তে ধরো, মুঠিতে এক গুচ্ছ ধান |
মর্ম আজ বর্ম সাজ আচ্ছাদন
করুক : চাই এদেশে বীর উৎপাদন |
শ্রমিক দৃঢ় কারখানা৩য়, কৃষক দৃঢ় মাঠে,
তাই প্রতীক্ষা, ঘনায় দিন স্বপ্নহীন হাটে |
তীব্রতর আগুন চোখে, চরণপাত নিবিড়
পতেঙ্গার জবাব দেবে এদেশে জনশিবির ||

.            ***************     

.                                                            
অন্যান্য গান ও কবিতার সূচিতে. . .   
.                                                                        
সুকান্ত-র মূল সূচিতে. . .   


মিলনসাগর
*
চরমপত্র

তোমাকে দিচ্ছি চরমপত্র রক্তে লেখা ;
অনেক দুঃখে মুথিত এ শেষ বিদ্যে শেখা |
অগণ্য চাষী-মজুর জেগেছে শহরে গ্রামে
সবাই দিচ্ছি চরমপত্র একটি খামে :
পিত্র এই মাটিতে তোমার মুছে গেছে ঠাঁই,
ক্ষুব্ধ আকাশে বাতাসে ধ্বনিত স্বাধীনতা’ চাই’ |
বহু উপহার দিয়েছে,---শাস্তি, ফাঁসি ও গুলি,
অরাজক, মারী মন্বন্তরে মাথার খুলি |
তোমার যোগ্য প্রতিনিধি দেশে গড়েছে শ্মশান,
নেড়েছে পর্ণকুটির, কেড়েছে ইচ্ছত, মান
এতদিন বহু আঘাত হেনেছ, পেয়ে গেছ পার,
ভুলিনি আমরা, শুরু হোক শেষ হিসাবটা তার,
ধর্মতলাকে ভুলি নি আমরা, চট্টগ্রাম
সর্বদা মনে অঙ্কুশ হানে নেই বিশ্রাম |
বোম্বাই থেকে শহীদ জীবন আনে সংহতি,
ছড়ায় রক্ত প্লাবন, এদেশে বিদ্যুৎগতি |
আমাদের এই দলাদলি দেখে ভেবেছ তোমার
আয়ু সুদীর্ঘ, যুগ বেপরোয়া গুলি ও বোমার,
সে স্বপ্ন ভোলো চরমপত্র সমুখে গড়ায়,
তোমাদের চোখ-রাঙানিকে আজ বলো কে ডরায় ?
বহু তো অগ্নি বর্ষণ করো সদলবলে,
আমরা জ্বালছি আগুন নেভাও অশ্রুজলে |
স্পর্ধা, তাইতো ভেঙে দিলে শেষ-রক্তের বাঁধ
রেখো বন্যাকে, চরমপত্রে ঘোষণা :  জেহাদ ||

.            ***************     

.                                                            
অন্যান্য গান ও কবিতার সূচিতে. . .   
.                                                                        
সুকান্ত-র মূল সূচিতে. . .   


মিলনসাগর
*
মেজদাকে :  মুক্তির অভিনন্দন

তোমাকে দেখেছি আমি অবিচল, দৃপ্ত দুঃসময়ে
ললাটে পড়েনি রেখা ক্রূরতম সংকটের ভয়ে ;
তোমাকে দেখেছি আমি বিপদেও পরিহাস রত
দেখেছি তোমার মধ্যে কোনো এক শক্তি সুসংহত |
দুঃখে শোকে, বারবার অদৃষ্টের নিষ্ঠুর আঘাতে
অনাহত, আত্মমগ্ন সমুদ্যত জয়ধ্বজা হাতে |
শিল্প ও সাহিত্যরসে পরিপুষ্ট তোমার হৃদয়
জীবনকে জানো তাই মান নাকো কোনো পরাজয় ;
দাক্ষিণ্য সমৃদ্ধ মন যেন ব্যস্ত ভাগীরথী জল
পথের দু’ধারে তার ছড়ায় যে দানের ফসল,
পরোয়া রাখে না প্রতিদানের তা এমনি উদার,
বহুবার মুখোমুখি হয়েছে সে বিশ্বাসহন্তার |
তবুও অক্ষুণ্ণ মন, যতো হোক নিন্দা ও অখ্যাতি
সহিষ্ণু হৃদয় জানে সর্বদা মানুষের জ্ঞাতি,
তাইতো তোমার মুখে শুনে বাণপ্রস্থের ইঙ্গিত
মনেতে বিস্ময় মানি, শেষে হবে বিরক্তির জিত ?
পৃথিবীকে চেয়ে দেখ, প্রশ্নে ও সংশয়ে থরো থরো,
তোমার মুক্তির সঙ্গে বিশ্বের মুক্তিকে যোগ করো ||

.            ***************     

.                                                            
অন্যান্য গান ও কবিতার সূচিতে. . .   
.                                                                        
সুকান্ত-র মূল সূচিতে. . .   


মিলনসাগর
*
পত্র

কাশী গিয়ে হু হু ক’রে কাটলো কয়েক মাস তো,
কেমন আছে মেজাজ ও মন আছে স্বাস্থ্য ?
বেজায় রকম ঠান্ডা সবাই করছে তো বরদাস্ত ?
খাচ্ছে সবাই সস্তা জিনিস, খাচ্ছে পাঁঠা আস্ত ?

সেলাউ কলের কথাটুকু মেজদার দু’কান
স্পর্শ ক’রে গেছে বলেই আমার অনুমান |
ব্যবস্থাটা হবেই, করি অভয় বর দান ;
আশাকরি, শুনে হবে উল্লিসিত প্রাণ |
এতটা কাল ঠাকুর ও ঝি লোভ সামলে আসতো,
এবার বুঝি লোভের দায়ে হয় তারা বরখাস্ত |

চারুটাও হয়ে গেছে বেজায় বেয়াড়া,
মাথার ওপরে ঝোলে যা খুশির খাঁড়া |
নতেদা’র বেড়ে গেছে অঙ্গুলি হাড়া,
ঘেলুর পরীক্ষাও হয়ে গেছে সারা ;
এবার খরচ ক’রে কিছু রেল ভাড়া
মাতিয়ে তুলতে বলি রামধন পাড়া  |

এবার বোধহয় ছাড়তে হল কাশী,
ছাড়তে হল শৈলর মা, ইন্দু ও ন’মাসি |
দুঃখ কিসের, কেউ কি সেথায় থাকে বারোমাসই ?
কাশী থাকতে চাইবে তারা যারা স্বর্গবাসী,
আমি কিন্ত কলকাতাতেই থাকতে ভালবাসি |
আমর যুক্তি শুনতে গিয়ে পাচ্ছে কি খুব হাসি ?
লেখা বন্ধ হোক তা হলে, এবার আমি আসি |

.            ***************     

.                                                            
অন্যান্য গান ও কবিতার সূচিতে. . .   
.                                                                        
সুকান্ত-র মূল সূচিতে. . .   


মিলনসাগর
*
মার্শাল তিতোর প্রতি

কমরেড, তুমি পাঠালে ঘোষণা দেশান্তরে,
কুটিরে কুটিরে প্রতিধ্বনি,-----
.      তুলেছ মুক্তি দারুণ তুফান প্রাণের ঝড়ে
তুমি শক্তির অটুট খনি |
কমরেড, আজ কিষাণ শ্রমি তোমার পাশে
তমি যে মুক্তি রটনা করো,
তারাই সৈন্য : হাজারে হাজারে এগিয়ে আসে
তোমার দু’পাশে সকলে জড়ো |
হে বন্ধু, আজ তুমি বিদ্যুৎ অন্ধকারে
সে আলোয় দ্রুত পথকে চেনা :
সহসা জনতা দৃপ্ত গেরিলা----অত্যাচারে,
দৃঢ় শত্রুর মেটায় দেনা  |
তোমার মন্ত্র কোণে কোণে ফেরে সংগোপনে
পথচারীদের ক্ষিপ্রগতি ;
মেতেছে জনতা মুক্তির দ্বার উদঘাটনে :
---- ভীরু প্রস্তাবে অসম্মতি |
ফসলের ক্ষেতে শত্রু রক্ত-সেচন করে,
মৃত্যুর ঢেউ কারখানাতে----
তবুও আকাশ ভরে আচমকা আর্তস্বরে :
শত্রু নিহত স্তব্ধ রাতে |
প্রবল পাহানে গোপনে যুদ্ধ সঞ্চারিত
দৃঢ় প্রতিজ্ঞা মুখর গানে,
বিপ্লবী পথে মিলেছে এবর বন্ধু তিতো :
মুক্তির ফৌজ আঘাত হানে |
শত্রু শিবিরে লাগানো আগুনে বাঁধন পোড়ে
--- অগ্নি ইশারা জনান্তিকে
ধ্বংসস্তূপে আজ মুক্তির পতাকা ওড়ে
ভাঙার বন্যা চতুর্দিকে |
নামে বসন্ত, পাইন বনের শাখায় শাখায়
গাঢ়-সংগীত তুষারপাতে,
অযুত জীবন ঘনিষ্ঠ দেহে সামনে তাকায় :
মারণ-অস্ত্র সবল হাতে |
লক্ষ জনতা রক্তে শপথ রচনা করে----
‘আমরা নই তো মৃত্যুভীত,
তৈরি আমরা ; যুগোশ্লাভের প্রতিটি ঘরে
তুমি আছ জানি বন্ধু তিতো |’
তোমার সেনানী পথে প্রান্তরে দোসর খোঁজে :
‘কোথায় কে আছ মুক্তিকামী ?’
ক্ষিপ্ত করেছে তোমার সে ডাক আমাকেও যে
তাইতো তোমার পেছনে আমি ||

.            ***************     

.                                                            
অন্যান্য গান ও কবিতার সূচিতে. . .   
.                                                                        
সুকান্ত-র মূল সূচিতে. . .   


মিলনসাগর
*
ব্যর্থতা

আজকে হঠাৎ সাত সমুদ্র তেরো নদী
পার হ’তে সাধ জাগে, মনে হয় তবু যদি
পক্ষপাতের বালাই না নিয়ে পক্ষীরাজ,
চাষার ছেলের হাতে এসে যেত হঠাৎ আজ |
তা হলে না হয় আকাশবিহার হ’ত সফল,
টুকরো মেঘেরা যেতে-যেতে ছুঁয়ে যেত কপোল ;
জনারণ্যে কি রাজকন্যার নেইকো ঠাঁই ?
কাস্তেখানাকে বাগিয়ে আজকে ভাবছি তাই |

অসি নাই থাক, হাতে তো আমার কাস্তে আছে,
চাষার ছেলের অসিকে কি ভালবাসতে আছে ?
তাই আমি যেতে চাই সেখানেই যেখানে পীড়ন,
যেখানে ঝলসে উঠবে কাস্তে দৃপ্ত-কিরণ |
হে রাজকন্যা, দৈত্যপুরীতে বন্দী থেকে
নিজেকে মুক্ত করতে আমায় নিয়েছে ডেকে |
হেমন্তে পাকা ফসল সামনে, তবু দিলে ডাক ;
তোমাকে মুক্ত করব, আজকে ধান কাটা থাক |

রাজপুত্রের মতন যদিও নেই কৃপাণ,
তবু মনে আশা, তাই কাস্তেতে দিচ্ছি শান,
হে রাজকুমারী, আমারে ঘরে আসতে তোমার
মন চাইবে তো ? হবে কষ্টের সমুদ্র পার ?
দৈত্যশালার পাথরের ঘর, পালঙ্গ-খাট,
আমাদের শুধু পর্ণ-কুটির, ফাঁকা ক্ষেত-মাঠ ;
সোনার শিকল নেই, আমাদের মুক্ত আকাশ,
রাজার ঝিয়ারী এখানে নিদ্রাহীন বারো মাস |

এখানে দিন ও রাত্রির পরিশ্রমেই কাটে
সূর্য এখানে দ্রুত ওঠে, নামে দেরিতে পাটে |
হে রাজকন্যা, চলো যাই,আজ এলাম পাশে,
পক্ষীরাজের অভাবে পা দেব কোমল ঘাসে |
হে রাজকন্যা, সাড়া দাও, কেন মৌন পাষাণ ?
আমার সঙ্গে ক্ষেতে গিয়ে তুমি তুলবে না ধান ?
হে রাজকন্যা, ঘুম ভাঙলো না ? সোনার কাঠি
কোথা থেকে পাব, আমরা নিঃস্ব, ক্ষেতেই খাটি |
সোনার কাঠির সোনা নেই, আছে ধানের সোনা,
তাতে কি হবে না ?  তবে তো বৃথাই অনুশোচনা ||

.            ***************     

.                                                            
অন্যান্য গান ও কবিতার সূচিতে. . .   
.                                                                        
সুকান্ত-র মূল সূচিতে. . .   


মিলনসাগর
*
দেবদারু গাছে রোদের ঝলক

দেবদারু গাছে রোদের ঝলক, হেমন্তে ঝরে পাতা,
সারাদিন ধ’রে মুরগীরা ডাকে, এই নিয়ে দিন গাঁথা |
রক্তের ঝড় বাইরে বইছে, ছোটে হিংসার ঢেউ,
খবরে কাগজ জানায় সেকথা, চোখে দেকি নাকো কেউ ||

.            ***************     

.                                                            
অন্যান্য গান ও কবিতার সূচিতে. . .   
.                                                                        
সুকান্ত-র মূল সূচিতে. . .   


মিলনসাগর
*