কবি সুনীল মাজি-র কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।  www.milansagar.com
*
বসন্ত বাউরির গান    

বসন্তের বার্তা কেবলই কি আনে কোকিল যাযাবর ?

সারস্বত বন্দনায় মুক্তি পায় আমার রুদ্ধ কণ্ঠস্বর |
লাল হলুদ সবুজ পালক শরীর পাতায় আড়াল,
নিজস্ব শব্দ (লোকে বলে টংক টংক) মন্ত্র "ওঁ" উচ্চারণে
শাখায় শাখায় বসে বৃক্ষগহ্বরে বসে শোনাই হৃদয়কন্দরের গান |
বুকের প্রসূনে জেগে ওঠে অনন্তবীজ, প্রেমমূর্তি, সৌরভ স্মারক
বুকের সলীলে স্নান সেরে শব্দকাক হয়ে ওঠে হংস শুভ্রা ...
আমার ঘনকৃষ্ণবর্ণ কলমের মতো চঞ্চু থেকে ঝরে প্রেমের স্বরলিপি ঝরনা
.            তুমি কর্তা তুমি কর্ম তুমি ক্রিয়া তুমি বিশেষণ তুমি উপমা
.                                               আমি তো কেবলই করণ |

বাসন্তীর প্রেমে উন্মাদ আমি করি নির্মাণ নিজস্ব শিল্পে সূত্রধরের মতো গৃগকোণ
এবং পালন করি সন্তান-সন্ততি : এক পত্নীক জীবন |

প্রেম আর সংগীত প্রকৃতির মতো চিরন্তন
এক সুতোয় বাঁধা সেই সুর সৃষ্টির ধারায় সঞ্জীবন ;
খুঁজি তাই আপন তাগিদে প্রয়সীর সন্ধান |
গান আর বিজ্ঞাপনে চাই নির্বাচন, আত্মনিবেদনে মাতি
ঋতুও গান গায় নিজস্ব ঢঙে ; সৃষ্টি করে রংলিপি
আমারও মন্ত্র তাই আত্মনির্বাচন |

বসন্ত বাইরি আমি গান গাই নিজস্ব বাখানে আপন নিয়মে....


.              *************************                                                  
কবিতার সূচি
*
অস্ত্র ইস্তেহার    

কত হাড় লাগে মন্ত্রীর চেয়ার বানাতে ?
কত রক্তরং লাগে সেই চেয়ার করতে পালিশ ?

ঈশ --- একী দেখি ইস্তেহার ডোবে, কার রক্তে স্নান!
এমনি দুর্ভাগা আমরা নেই পরিত্রাণ, প্রতি ইলেকশন
যূপকাষ্ঠ যেন গলার নালী কাটে |

যে দীক্ষা প্রাণ নেয়, প্রাণ নিতে বলে মাঠে ঘাটে
সবুজ ডালপালা কাটে, চেয়ার বানাতে
সে তো সারস্বত নয়, কেবল অস্ত্র ঝনঝনায়
হাওয়া খায়, হাওয়া কাড়ে, পোড়ে অযুত হৃদয় |
শকুনি মন্ত্রী হলে যে খেলা চলে রাতদিন
তা কি আহ্বান করে ?
মহাভারতের প্রিয় পাঠক-পাঠিকাগণ, বুঝে নিন |


.              *************************                                       
বিতার সূচি
*
আত্মজীবনীর অংশ    

বন্দুক আর কামান দিয়ে হত্যা করেছি সুমধুর শব্দ
জীবনের সুদীর্ঘ বছর,
আমার পেশা আমাকে বাধ্য করেছিল এই হত্যালীলা |
তখন আমার শরীরে ছিল সৈনিকের পোশাক
তাই মন বিদ্রোহ করলে
নিজেরই ইচ্ছের বিরুদ্ধে আগ্রাসন ; ফলে,
শরীরের ভিতর সেই জুঁই ফুলের বাগানে জ্বালিয়েছিলাম বারুদ |
হৃৎপিণ্ডের মোম মাটিতেও করেছিলাম বিস্ফোরণ
সাদা পৃষ্ঠায় ঢেলেছিলাম কামনার পিচ্ছিল জল
পদতল করেছিল আঘাত বারবার সূক্ষ্ম বালুর কণা |
ফলে, কেঁপেছিল ঘিলু তির তির অস্থির জলের মতন |

বিশটা বছর আমার কেটেছিল দাবানল ঘেরা এক অরণ্যে
গনগনে আগুনে হৃৎপিণ্ড হয়ে গেল রক্তকুমুদ,
আর আমি আগুনের পাহারা টপকে চলে এলাম শিকল খুলে
স্বেচ্ছায় ; নির্বাসন চাইলাম পুরানো ভিটেয়, যেখানে
অপেক্ষা করেছিল নিভানো চিতাবুকে আমার মা, আমার বাবা
আর কান্নার ঈশ্বরী |
এখন আমি শব্দবীজে জলসিঞ্চন করি প্রতিনিয়ত,
যদি সে বৃক্ষ হয়ে ওঠে আর তার পাপড়িগুলো ভরে তোলে
সুভাষিত ঘ্রাণ পাতায় পাতায় |


.              *************************                                            
কবিতার সূচি
*
নদীর বুক বিষাদ হলে    

বনলতা সেন বিষাদ হলে কেঁদে ওঠে সুনীলের নীরা
নদী বুক বিষাদ হলে পাহাড়ের বুকে নামে ধারা
ধারা লুকিয়ে রাখলে চোখের জমিতে পড়ে জোছনা
কম্পন হৃদয়ের কোণে ঝরে অম্লান অজস্র ঝরনা
সিক্ত করে পাথর বুক ; নিজের অজান্তে জন্ম নেয় চারা
প্রেম নক্ষত্র হলে আকাশে জ্যোত্স্না পায় সমস্ত গ্রহেরা |


.                ***********************                                    
বিতার সূচি
*
কবির ঘর    

কবি বললেন : এত কবি কেন ? এত কবি ....

কবি বললেন : আট কোটি বাঙালির দুই কোটি কবি
.                প্রতি ঘরে গড়ে একজন |

জনান্তিকে বলি : ভালোই তো, কবি তো করে না ধর্ষণ
.                  এই মাটি, এই আকাশ |
.                  প্রতি শ্বাসে তার বিশ্বাস :
.                  গাছ পাখি পতঙ্গ মানুষকে শোনায় গান প্রতিদিন |
জনান্তিকে বলি : তাই সে কবিতা শোনায় শোধ করে ঋণ |
.                  প্রতিটি ঘর যদি হয় কবিদের ঘর
.                  বাল্মীকি সবাই, থাকে না রত্নাকর |
.                  আর যে কাহিনি শোনো
.                  সেটাই শতাব্দীর মহাকাব্য জেনো |


.                    ***********************                                         
কবিতার সূচি
*
ঢেউ    

জলে যে দেখছ ঢেউ, ঢেউ নয়
গোপিনীর দল রূপসী
কেউ ত্রয়োদশী, কেউ ষোড়শী
আমারই অঙ্গে বাঁধা
জলে নামলেই তারা ছুঁতে আসে, নাচে
কেউ নাভিকুন্ডে, কেউ অধরে, খাঁজে...

সব ঢেউ এক নয়, নাম ও পদবী আলাদা
যে ঢেউ ডুবিয়ে দেয় সমগ্র শরীর
.                                সে-ই রাধা |


.           ***********************                                         
কবিতার সূচি
*
হরিণখোলা    

হরিণখোলা নামে এখন এখানে কোন গ্রাম নেই |
কেবল এক হরিণীর মতো মুণ্ডেশ্বরী নদীর চপল শরীর
.                             বাঁয়ে ডাঁয়ে ঘুরে গেছে |
এখানে এলেই আমি এক গন্ধ পাই হরিণাভির |
থমকে দাঁড়াই --- দেখি, সেতুর নাভিতল খুঁড়ে বালির সঙ্গে
শহরে পাচার হচ্ছে শিশির কুঁচোর মতো অভ্রকণা |

বুঝে নিই, হরিণী মরে গেলেও তার গন্ধটা রয়ে গেছে অন্যরূপে
আর শিকারীর দল তির বর্শার বদলে কোদাল গাঁইতি হাতে
.                              কেটে নিচ্ছে মাংসের চাপ |


.           ***********************                                         
কবিতার সূচি
*
বর্ণলিপি প্রেম    

প্রতিটি দিন পিয়ন |
অজস্র কথার থলি নিয়ে ঘুড়ে বেড়ায়,
খুঁজে ফেরে ঠিকানার সন্ধান |
আসলে, প্রতিটি দিনলিপি এক একটি ঠিকানা মাত্র
আসল খবর থাকে হলুদ খামের ভেতর |
ঠিকানা দেখেই নির্দিষ্ট দিনটির কথা মনে পড়ে যায় |
পিয়ন যদি হয় প্রেমিক,
অতি অনায়াসে খুঁজে পায় প্রেমিকার মুখ
যতই মেঘ ঢাকুক সূর্যের ময়ূখ
পৃথিবী যতই পরুক আঁধার কুয়াশার শাড়ি
প্রতিদিনকার মেধা ও শ্রম যদি বাঁধে ঘরবাড়ি
বিস্মৃতির ভগ্নস্তূপ থেকে জেগে ওঠে এক এক শৈশব |
অভিশপ্ত দিনও মুক্তি পায় প্রেমরৌদ্রের ছোঁয়ায়
যেমন অহল্যা শাপমুক্তা হন বিষ্ণুরূপী রামের স্পর্শে
এবং গৌতমের সাথে পুনর্মিলিত হন --- একইভাবে
কথারাও মিলিত হয়, যদি হৃদয়ে বিষ্ণু জাগে |
পুরোনো পোষাক ফিরে আসে শরীরে,
শরীরের ভেতরেই গড়ে ওঠে পাড়া গ্রাম ডাকঘর |
প্রতিটি সূর্যের রশ্মি কবির কলমের মত অক্ষক আঁকে |
জীবনের প্রতিটি ডোবা খানা বিল দিঘি ও নদীর বুকে
মন মাছরাঙার মতো উড়ে বেড়ায় | অর্জুনের দৃষ্টি
বিদ্ধ করে মাছের চোখ --- সেই চোখই
ভালোবাসে কাঙ্খিত নারী অথবা ইপ্সিত ফুল |

প্রতিটি দিনই ইচ্ছার সৌরভ নিয়ে চিঠি সংগ্রহ করে |
ফিরে আসে নতুন ডাকঘরে |
কখনো হাস্যধ্বনি --- কখনো অশ্রুর স্ট্যাম্প পড়ে |
হাসি আর অশ্রুতে প্রতিদিন
পৃথিবীর আয়ু গড়ে বর্ণলিপি প্রেম |


.           ***********************                                         
কবিতার সূচি
*
শব    

বোরখায় ঢাকা শরীর অন্ধকার ঘরের মতো
দৃশ্যত দুটি করুণ করজোড়
যেন জানালার বাইরে দুটি কাটা হাত |

কাকে নমস্কার করো ইমরানা ? আতংককে ?

মৃতসব দিন | এখন গভীর রাত !
পুরুষ কি তবে দর্জি ? পুরুষতান্ত্রিক আইনে পোষাক বানায় ?
নারী কি কেবল পুরুষের পোষাক ? যদি হয়,
তবে ধ্বস্ত ছিন্ন পোষাকেও পুরুষ নগ্ন |

শরিয়তি আইনে ইমরানা এক আণবিক বোমা |
এক মৌলের বিস্ফোরণ
ছিন্ন ভিন্ন করে ধর্মীয় অক্ষরমালা
বোরখার ময়লা জমে এতই কঠিন ভাষা
সেই রাত্রির প্রাকৃত ভাষা আমার অভিধানে নেই |

অভিধান নেই, তবু শব্দকোষ খুঁজি
নারীকোষ শব্দটি মাথায় এলে
আমি চিত্কার করি :
যারা প্রতিদিন পোড়াকাঠের মতো পোড়ে
.                               এবং জ্বলে
দাও, একফোঁটা চোখের জল দাও
যদি মানুষের বুক বাণভাসী বন্যায় ভাসে
তবে ভেসে যাবে আমার মায়ের শব |


.           ***********************                                         
কবিতার সূচি
*
প্রতীপ       

প্রেমের লীলা আসলে এক অনুবাদ |
যেমন চাঁদ তার ভিন্ন ভিন্ন জ্যোতির অক্ষরে---
এক মায়াবী রহস্যের উজ্জ্বল বর্ণে পৃথিবীকে করে অনুবাদ |
প্রেমের বাদ্য যেন ঈশ্বর-ঈশ্বরীর কাছে নীরব প্রার্থনা |

যুদ্ধও আসলে এক অনুবাদ |
যুদ্ধের রং গিরগিটি, ছায়া ফেলে আলোর বুকে---
আলোকে গোগ্রাসে গেলে |
যুদ্ধের বাজনা যেন সাপের চোয়ালে ব্যাঙের আর্তনাদ |

প্রেম যদি হয় আলোর চুম্বন, তবে
যুদ্ধ এক বিশাল আকারের কালো বৃষ্টি |


.           ***********************                                       
কবিতার সূচি   


মিলনসাগর  
*
মেঘ আছে বৃষ্টি নেই - ৪৫            

অদূরে শুয়ে আছে কাঁসাই, ছুঁয়ে দিতে পারি
হাত বাড়ালেই |
কে ছোঁয় ?  হাত না আঙুল না বড় নখ-কাটা ?

এডস্ রুগীর মতো শুয়ে আছে কাঁসাই |
বিজ্ঞাপন যতই বলুক চুম্বনে দোষ নেই
তবু, তার শরীর ছুঁতে ভয় পাই, কেননা
জলে ভেসে যাচ্ছে বি প্লাস ভাইরাস এবং শব ...

সব হারিয়ে গেল, যেন গেল গেল রব
এই আষাঢ়েও তার বুকে কোনও মেঘাঞ্জন নেই
ওল্টানো ভাঙা কলসির মতো তার স্তন
যে আমাকে শক্তি যোগাবে, সেই নারী কই ?

"সেও গেছে রণে ... দলে দলে সার্জারি করতে
পুরুষকে চমকে দেবে মুখের গড়নে ও স্তনে,
পুরুষও গেছে নারীকে দিতে সুঠাম শীশ্ন উপহার |"

অরফান মেঘ ভাসছে, তার নীচে নদীর চিতা |


.           ***********************                                       
কবিতার সূচি   


মিলনসাগর