কবি সুরমাসুন্দরী দেবীর কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।  www.milansagar.com
*
নির্ব্বাসিতা সীতা
কবি সুরমাসুন্দরী ঘোষ
১৩০৯ বঙ্গাব্দে (১৯০২ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত কবির “রঞ্জিনী” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। প্রদীপ
পত্রিকার অগ্রহায়ণ ১৩০৮ (নভেম্বর ১৯০১) সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। খণ্ড-কবিতা হিসেবে
মিলনসাগরে প্রথম প্রকাশ - অক্টোবর ২০১১। পূর্ণ কবিতা প্রকাশ -
২৯.৭.২০২০।

উত্তরিল রথ যবে ভাগিরখী পারে,
লক্ষ্মণ করুণ কণ্ঠে কহিলা সীতেরে
রামের কঠিন আজ্ঞা। মূর্চ্ছিলা না সীতা
সামান্যা নারীর মত ; সাধ্বী শুচিস্মিতা
পড়িলা না মহা দুঃখে ভাঙ্গিয়া গলিয়া ;
ক্ষণতরে সতীগর্ব্বে উঠিলা জ্বলিয়া
নিরপরাধিনী শুধু ! কহিলা লক্ষ্মণে,---
আপনার মন্দ ভাগ্য, জেনে নাহি গণে
নির্ব্বাসিতা সীতা ভাবিতেছে মনে,---
ধর্ম্ম কি সহিবে হায়, আজি অকারণে
রাজ হস্তে অপমান ? সে অমূল্য ধন
দেবেন্দ্রদুর্ল্লভ, নিমেষের অযতন
সহে না যে তার ; যশে নাহি ক্রীত হয় ;
বলে নাহি হারে ; রাজদণ্ডে তারি ক্ষয়?
---এত কহি নীরবিলা। ফিরে এল প্রাণে
আম্মবিস্মৃতার ভাব ; পতিপদধ্যানে
সকলি ডুবিয়া গেল ; স্মিত চন্দ্রাননে
বীণা-বিনিন্দিত-কণ্ঠে কহিলা লক্ষ্মণে---
রাজ-আজ্ঞা, ভাতৃ-আজ্ঞা করেছ পালন,
ধন্য তুমি !---যাও ফিরে নগরে এখন ;
কর্তব্যে রহিও স্থির, করি আশীর্ব্বাদ।
কেন লজ্জানত? তোমার কি অপরাধ?
শ্বশ্রূ জাতা সকলেরে প্রবোধিও, বীর ;
ব’লো আর্য্যপুএপদে দীনা জানকীর
এই নিবেদন,---রাজা তিনি, তিনি স্বামী ;
তাঁর কিছু নাহি দোষ, অভাগিনী আমি !
শুনেছি অনলে স্বর্ণ ধরে উজ্জ্বলতা ;
স্বর্ণ নহি,---ঘুচিল না নিন্দা-মলিনতা ;
কিন্তু না হইনু ছাই ! তাঁহার সন্তান
ধরেছি যে গর্ভে আমি, যদি থাকে প্রাণ,
পিতৃগুণে বিমণ্ডিয়া তুলিব বাছারে।
আর এক কথা আছে, বলিও তাঁহারে---
সাধিব দুশ্চর তপ ল’য়ে মনস্কাম
জন্মে জন্মে পতি যেন হ’ন মোর রাম!---
এত বলি নীরবিলা রঘুকুলেশ্বরী
ছিন্নতন্ত্রী বীণাসম! শূন্য তটোপরি
অস্ত গেল সন্ধ্যা-সূর্য্য। মুছিয়া নয়ন,
ফিরিলা পশ্চাতে রাখি’, শোকার্ত্ত লক্ষ্মণ,
স্তব্ধ ব্যোম, স্থির নদী, উদাস অটবী,---
মাঝে তার, একখানি জ্যোতির্ম্ময়ী ছবি!

.               ***************                
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বঙ্গ জননী
কবি সুরমাসুন্দরী ঘোষ
১৩০৯ বঙ্গাব্দে (১৯০২ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত কবির “রঞ্জিনী” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। আমরা
তুলেছি নমিতা চৌধুরী ও অনিন্দিতাবসু সান্যাল সম্পাদিত “মহিলা কবিদের কবিতা  
সংকলন ১৪০০-২০০০ দামিনী” কবিতা সংকলন থেকে।
মিলনসাগরে প্রকাশ - অক্টোবর ২০১১।


.        আমার জন্মভূমি,
.                অভাগিনী মাগো!
.        আর ঘুমায়ো না তুমি,
.                জাগো স্নেহে জাগো!

শত কবি গান গায়                অর্ঘ দেয় তব পায়
.        আজন্ম দিতেছি ভরি অঞ্জলি অঞ্জলি
.        সেই স্তব-স্তুতি বিফল সকলি ?

.        দুঃখিনী জননী, ওগো
.                বিষাদ প্রতিমা,
.        ভাসাবে কি অশ্রু জলে
.                তোমার মহিমা ?

চারি দিকে শুন সব                আনন্দ উত্সাহ-রব,
.        তুমি একা বসে আছ, ধূলি বিমলিনা,
.        হে আমার জন্মভূমি, অভাগিনী দীনা।

.        হে আমার জন্মভূমি
.                পতিতা, তাপিতা
.        মুখে তব অন্ন নাই,
.                বুকে জ্বলে চিতা @

ঘরে ঘরে, মা তোমার,                উঠে শুধু হাহাকার
.        তুমি হাসিতেছ বসি, চির উদাসিনা।
.        তাই মা, তোমার লাগি বাজে না এ বীণা!

.        তাই ত ধিক্কার উঠে
.                হৃদয় মাঝার,
.        মা যাহারে ছেড়ে আছে
.                মিছে গর্ব্ব তার!

তাই ছিন্ন হীন বল                তোমার সন্তান দল
.        নাই শক্তি ভক্তি, নাই মান অপমান,
.        আছে শুধু সভ্যতার লক্ষ কোটি ভাণ!

@ - এই কলিটি অন্যান্য কাব্য সংকলনে থাকলেও “রঞ্জিনী” কাব্যগ্রন্থে, কবিতার পাতায়
(৭৫-পৃষ্ঠায়), দেওয়া নেই। দেখে মনে হয় যে কলিটি ছাপা হয় নি। বাদ পড়ে গেছে।

.                    ***************  
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
কবি প্রসঙ্গে (খণ্ড কবিতা)
কবি সুরমাসুন্দরী ঘোষ
১৯৩০ সালে প্রকাশিত, যোগেন্দ্রনাথ গুপ্তর “বঙ্গের মহিলা কবি” গ্রন্থের ২৭৮-পৃষ্ঠা থেকে
পাওয়া। মিলনসাগরে প্রকাশ ১২.২০১১।


কবির হৃদয় কুঞ্জে ভাব-কলিগুলি
লুক্কায়িত লজ্জাবতী বালবধুবৎ ;
ধীরে ধীরে দলগুলি যায় যবে খুলি
মাতায় সৌরভে রূপে আকুল জগৎ।

.               ***************  
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
হরিষে বিষাদ
কবি সুরমাসুন্দরী ঘোষ
১৩০৯ বঙ্গাব্দে (১৯০২ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত কবির “রঞ্জিনী” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
মিলনসাগরে প্রকাশ ১২.২০১১।


হৃদয় প্লাবিয়া উঠে বিষাদের ছায়া :
মনে হয়, সবি স্বপ্ন, সবি শুধু মায়া !
বিধাতার রাজ্যে হেন উত্সব-কৌতুক,
মোর হিয়া কাঁদি উঠে স্মরি কোন দুখ ?
ভাসে চাঁদ চল চল নির্মল আকাশে ;
করবীর গন্ধ আসে দক্ষিণ বাতাসে ;
নদী বয়ে যায় কাছে তুলিয়া লহরী ;
দূর বনে বাজে ঘন উতলা বাঁশরী ;
সোনার নিখিলে এত আনন্দ সংবাদ
মোর বক্ষ চাপি শুধু একটি বিষাদ
করিতেছে হা হুতাশ | হৃদয়ের ধন
তার মুখে রয়েছে ত যাদুর মতন
সৌন্দর্যের উন্মাদনা ? তবু যে কি নাই ;
যাহা আছে তাও যেন কখন হারাই |

.               ***************  
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
.গোপালকৃষ্ণ গোখেল
কবি সুরমাসুন্দরী ঘোষ
ময়মনসিংহ থেকে প্রকাশিত, কেদারনাথ মজুমদার সম্পাদিত, “সৌরভ” পত্রিকার চৈত্র
১৩২১ (মার্চ ১৯১৫) সংখ্যায় প্রকাশিত। মিলনসাগরে প্রকাশ ২৯.৭.২০২০।

ভারতের ভাগ্যগগনের কোণে
.                হে গোখেল ! শুক তারা,
দুর্দ্দিনের নিশি প্রভাত না হতে,
.                তোমারে হুইনু হারা।
দুর্ভিক্ষ, মারীতে হাহাকার ধবনি
ভীষণ আহবে অস্ত্র ঝন্ ঝনি
লুলুপ রসনা মেলিয়া রাক্ষসী
.                পিয়িছে শোণিত ধারা,
এমন কুক্ষণে ডুবিয়ে গিয়াছে
.                ভারতের শুক তারা।
আশার কিরণে ছেয়ে ছিলে দেশ
অকাতরে কত সহিয়াছ ক্লেশ
অলস বাঙ্গালির ভাঙ্গিতে ঘুম
.                দ্বারে দ্বারে দিয়ে সারা।
স্বার্থের কালিমা পশেনি তোমায়,
ব্রত নিয়েছিলে দেশের সেবায়,
যে সিদ্ধার বীজ রোপিলে যতনে
আজিও জন্মেনি চারা।
দুর্দ্দিনের নিশি প্রভাত না হতে
.                তোমারে হইনু হারা।
সুদূর ‘পুনাতে’ তব জন্ম ভূমি
মনে হয় যেন সহোদর তুমি
করিয়াছ বন্ধু সকল জাতিরে
.                প্রেমে হয়ে মাতোয়ারা।
আজ সবাকার কাঁদিছে পরাণ
মরিয়া, অমর তুমি গরিয়ান,
হৃদয়ে হৃদয়ে বহিছে তোমার
.                গুণের আসিয়া @ ধারা।
অকালে খসিয়া পরিলে তুমি, হে
.                ভারত গৌরব তারা।

.               ***************  
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
রুরু ও প্রমদ্বরা
কবি সুরমাসুন্দরী ঘোষ
বিধুভূষণ গোস্বামী ও সত্যেন্দ্রনাথ ভদ্র সম্পাদিত, ঢাকা থেকে প্রকাশিত, “ঢাকা রিভিউ ও
সম্মিলন” পত্রিকার পৌষ ১৩১৮ (ডিসেম্বর ১৯১১) সংখ্যায় প্রকাশিত। মিলনসাগরে প্রকাশ
২৯.৭.২০২০।

সদ্যোজাত সুতা ত্যাজি মেনকা যখন
চলি গেল, তপোবনে পশিল তখন
“স্থুল বেশ” ঋষি কর্ণে শিশুর ক্রন্দন !

অমনি সে পাতি পাতি করি অন্বেষণ
জীবন্ত ফুলের কুড়ি দেখিতে পাইয়া
নীরস বক্ষেতে “যতি” লইল তুলিয়া।
স্নেহ-স্নিগ্ধ ছায়াহীন তাপস কুটিরে
সে অপূর্ব নারী শিশু লয়ে ধীরে ধীরে
করিল প্রবেশ, স্বপ্নে আবিষ্টের মত!
মায়ার মোহন সুর বাজি শত শত
মুহূর্ত্তে হইল জ্ঞান সন্ন্যাসী হৃদয়ে
বহিল করুণাধারা নির্ঝরিণী হয়ে
সে উপল তলবাহি। দেখিল সংসার
স্নেহ ভালবাসা পূর্ণ সুখের আধার!
গৃহীর কামনা ধন সন্তানের মত
তাপসীর যত্নে শিশু হইয়া লালিত
বাড়িতে লাগিল ক্রমে শুক্লশশী সম
ঢালিয়া রূপের জ্যোতি মহান্‌ আশ্রম
লয়ে গেল উচ্চ হতে সর্বোচ্চ শিখরে।
অমল কমলে পূর্ণ যেন পরিমল
যখনি সুন্দর শিশু হাসে খল খল,
ঋষি ভাবে সেই যেন পূজা উপচার
নির্ম্মল নিষ্পাপ পুষ্প যোগ্য দেবতার।
কঠোর তপস্যা পন্থা সে পুষ্প সৌরভে
সহজ সুগম হ'ল স্নেহের গৌরবে।
কত বর্ষ পরে বর্ষদিনান্তে সে দিন
অনন্ত কালের স্রোতে হ'য়ে গেল লীন।
সাথে সাথে “প্রমদ্বরা” কোরক জীবন
বিকাশি উঠিল স্মিত পদ্মের মতন।
ঝলকিয়া লাবণ্যের ফুটন্ত মহিমা
রূপে গুণে একখানি জীবন্ত প্রতিমা !
বদ্ধছিল যে সৌরভ অস্ফুট মুকুলে
ছুটিল চৌদিকে তাহা যৌবন হিল্লোলে।
মোহিল ‘রুরুর’ প্রাণ হেরি সে মাধুরী,
প্রমদ্বরা প্রাণ সেকি করে নাই চুরি?
কোন অতর্কিত ক্ষণে কেমনে কি জানি
প্রবেশি সিঁদেল চোর নিল প্রাণ খানি।
মহিয়সী সুষমার পূত পদতলে
প্রেমাঞ্জলি দিল দোঁহে হৃদি ফুল দলে ;
দুজনেরি সাধ হ'ল বাঞ্ছিত রতনে
বাঁধিবারে চির তরে বিবাহ বন্ধনে।
তার পরে শুভদিন হ’য়ে গেল স্থির
সে দিনের আশে দোঁহে হইলা অধীর।
এক দিন “প্রমদ্বরা” সখীগণ সনে
মনের হরষে গেল কুসুম চয়নে,
সেথা কাল ফণী তারে সহসা দংশিল
অমনি লাবণ্যলতা ঢলিয়া পড়িল।
হায় রে ! অদৃষ্ট ফের বিধি নিরূপণ,
এত আশা ভালবাসা সুখের জীবন
মুহূর্ত্তে হইল লীন নিশ্বাসের সনে
প্রণয়ের সাধ বুঝি মিশিল ম্বপনে।
নিদারুণ বাণী যবে শ্রবণে পশিল,
প্রেতাত্মার মত রুরু ছুটিয়া আসিল
সংজ্ঞাহীন। কিম্বা ধরে ছিল ব্যেমকেশ
পার্ব্বতীর দেহত্যাগে যে ভীষণ বেশ
সে বিকট বেশে “রুরু” আরম্ভিল স্তব
বিশ্বদেবতার কাছে। সে যে অভিনব
সৃজিয়া উপায়। স্বীয় অর্দ্ধ আয়ু দিয়া
ফিরাইয়া আনিবে সে প্রাণহীন প্রিয়া।
অনাহারে অনিদ্রায় লুটা'য়ে ভুতলে
প্রাণপণে বক্ষ চাপি পীড়ি মর্ম্মস্থলে
চাহে যেন উৎপাটিতে দাবদগ্ধপ্রাণ।
করুণ ক্রন্দনে তার, বিদ্ধ হ'ল বাণ
বন্য পশু পাখী বুকে, শোকের আগুনে
ছার খার করি যেন ফেলিল সে বনে।
“ফিরাইয়া দাও দেব, প্রমদ্বরা প্রাণ"
“রুকর” সম্বল শুধু এই এক ধ্যান।
একাগ্র বিশ্বাস আর শুদ্ধ ভক্তি দলে
আন্তরিক পূজা কভু যায় কি বিফলে?
সহসা টলিল স্বর্গে দেবের আসন,
“রুরুর” মর্ম্মের পুজা করিল গ্রহণ।
নির্মল নিষ্কাম শুদ্ধ স্বরগের প্রেম
স্বার্থপূর্ণ ধরণীতে বিশোধিত হেম,
সে প্রেমের বলে হয় অসাধ্য সাধন
তাই ফিরে পে’ল “রুরু” বাঞ্ছিত রতন।

.               ***************  
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
প্রকৃতির প্রতি
কবি সুরমাসুন্দরী ঘোষ
ঘোড়ামারা, রাজশাহী থেকে প্রকাশিত, সুরেন্দ্রচন্দ্র সাহা এবং ব্রজসুন্দর সান্ন্যাল সম্পাদিত “উত্সাহ”
পত্রিকার (সম্ভবত) কার্তিক ১৩০৭ (অক্টোবর ১৯০০) সংখ্যায় প্রকাশিত। মিলনসাগরে প্রকাশ ২৯.৭.২০২০।

যখন যে ভাবে দেখি, মুগ্ধ তোর রূপে
লো সুরসুন্দরি,
অতুল লাবণ্যলীলা একি মরি মরি !
প্রভাতে সজল আঁখি                অবাক্ চাহিয়ে থাকি,
তোমার তরুণী মূর্ত্তি হেরি নির্নিমেষে।
শিশির সলিলে নাও,                 সিথিঁতে সিন্দূর দাও,
সরমে ফুটিয়া উঠ নববধূ-বেশে।

দেখিতে দেখিতে-ফুল্ল যৌবন বিকাশি
অঙ্গে অঙ্গে তোর,
পরাণ কাড়িয়া নিস্‌ রে পরাণ-চোর !
রূপরাশি টল্‌ মল্‌                      নাই সীমা নাই তল
দেখি দেখি ঢুলে আলে শ্রান্ত দু'নয়ন ;
দহিয়া আপন তাপে                 আচম্বিতে কি সন্তাপে
সর্ব্বাঙ্গে ঢাকিয়া দাও তিমির বসন।

সেকি সাধ জেগে ছিল লো প্রকৃতি'তোর
জীবন প্রভাতে,
তরুণ স্বপন রাগে আভাতে শোভাতে।
আহা, কোন্ ভাগ্যধরে              খুঁজি’ লোক-লোকান্তরে
ফিরে এলে মালা হাতে পাওনি সন্ধান,
পরাণে আগুণ ল’য়ে                    তবু খোঁজ মত্ত হয়ে
বাতাসে নিশ্বাস-বিষ করে যাও দান।

মর্ম্মাহত জীবনের সকরুণ ধ্বনি
বাজে চরাচরে,
জলে স্থলে মেঘে মেঘে আধ চাপা স্বরে।
চন্দ্র তারকায় মিশে                প্রকাশিছে দিশে দিশে
সে নীরব হাহাকার শুনিবারে পাই !
শেষে যবে ম্লান মুখে                  লুকাস্‌ আঁধার বুকে
আমিও আঁধার লয়ে ঘরে ফিরে যাই।

.             ***************              
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বাল্য-স্মৃতি
কবি সুরমাসুন্দরী ঘোষ
ঘোড়ামারা, রাজশাহী থেকে প্রকাশিত, সুরেন্দ্রচন্দ্র সাহা এবং ব্রজসুন্দর সান্ন্যাল সম্পাদিত “উত্সাহ”
পত্রিকার (সম্ভবত) কার্তিক ১৩০৭ (অক্টোবর ১৯০০) সংখ্যায় প্রকাশিত। মিলনসাগরে প্রকাশ ২৯.৭.২০২০।

পেরেছ মুছিতে, সখি, বাল্য-ইতিহাস
নিয়তির চঞ্চল আঁচলে?
আমি দেখি সব আছে                তুমি শুধু নাই কাছে ;
দূরে, বহু দূরে গেছ চলে ;
খুঁজে মরি মিছে হৃদি-তলে !

পড়ে আছে সোহাগের সোণার পিঞ্জর,
ছিন্ন ভিন্ন মায়ার শিকল ;
ছাড়ায়ে বাঁধন-ডোর,                নিদয় পরাণ-চোর,
উড়ে গেছে মোহি’ নভস্তল
সেই এক পক্ষিণী পাগল !

হাসে না শারদ-শশী উদার গগনে,
ম্লান আজি কোটি কোটি তারা ;
বাতাস হতাস ভরে,                কি ব্যথা প্রচার করে?
দোয়েলা কোয়েলা কেঁদে সারা ;
তার মাঝে আমি আত্মহারা !

কাণে আসে অতীতের উষ্ণ দীর্ঘ শ্বাস
গদগদ আঁখি জল-সনে ;
হায় রে! এমনি রাতে                এক সাথে হাতে হাতে
বেড়াতাম দুটিতে কাননে,
সুকুমার কুমারী-জীবনে !

প্রভাতে প্রতাহ দোঁহে যেতাম বাগানে,
ফিরিতাম ভরি’ দুটি ডালা ;
আধ-ফুট’ চাঁপা তুলে                পরিতাম এলো চুলে ;
মনে পড়ে মনে পড়ে, বালা,
দু'টি সদ্য সেফালির মালা?

কবে কোন্‌ বন্যা আসি লইল ডাকিয়া,
চলিলাম ভেসে নিরুদ্দেশে ;
কল কল টল মল                ছুটিল তরঙ্গ-দল ;
যাত্রাপথ ফুরাল নিমেষে ;
উতরিনু অতি দূর দেশে।

তুমি ত পেয়েছ শান্তি সাঁতারি’ পাথার,
আছ সুখস্বপনে মগন !
বসন্তের ছায়াতলে                যৌবনের মায়া-বলে
গড়িয়াছ নূতন জীবন ;
ত্যজিয়াছ জীর্ণ পুরাতন।

ভোলা ভালো। ভয় নাই ! তুলিব না কথা ;
খেদ-গীত আর শুনাব না !
এই মুছিলাম আঁখি                অতীত রাখিব ঢাকি,
কোথা যদি থাকে এক কণা
মুগুধারে করিও মার্জ্জনা।

.             ***************              
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
চক্ষুলাভ
কবি সুরমাসুন্দরী ঘোষ
রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত প্রদীপ পত্রিকার কার্তিক ১৩০৭ (অক্টোবর ১৯০০)
সংখ্যায় প্রকাশিত। মিলনসাগরে প্রকাশ ২৯.৭.২০২০।

আজ টুটিয়াছে মোর মোহের বন্ধন,
গেছে শঙ্কা, গেছে লাজ, জেগেছে ক্রন্দন---
বহিছে জীবন-স্রোত দ্রুতবেগভরে,
সহসা লাগিবে ভাটা উচ্ছল সাগরে !
অতীতের খেলা-ধুলা মিশাবে ধূলায়,
আমি বসে থাকি তবে কার প্রতীক্ষায়?
কৈশোরে ঘোমটা ঢাকা এই দুটি চোক,
দেখে নাই জগতের অক্ষয় আলোক !
আজ বুঝিয়াছি আছে আমারও কাজ
কেহ বৃথা জন্মে নাই ধরণীর মাঝ !
মুক্ত রহিয়াছে মোর স্মৃতির দুয়ার,
পশিবে না মৃত প্রাণে সুরভি সম্ভার?
কল্পনা কবিতা গীতি উথলি নিমেষে,
নিবে মোরে উড়াইয়া অমৃতের দেশে !

.             ***************              
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সেফালিকা / শেফালিকা
কবি সুরমাসুন্দরী ঘোষ
এই কবিতাটি প্রথমে ঘোড়ামারা, রাজশাহী থেকে প্রকাশিত, সুরেন্দ্রচন্দ্র সাহা এবং
ব্রজসুন্দর সান্ন্যাল সম্পাদিত “উত্সাহ” পত্রিকার অগ্রহায়ণ ১৩০৮ (নভেম্বর ১৯০১) সংখ্যায়
প্রকাশিত হয় এই রূপে। মিলনসাগরে প্রকাশ ২৯.৭.২০২০।

সেফালিকা।

উষায় বরষি অশ্রু
.                        শিশিরের জলে
কি খেদে ঝরিয়া পড়
.                        ধরা-পদতলে !
.                        ত্রিদিব-বালিকা,
.                        অয়ি সেফালিকা !
কেন জেগেছিলে, বল,
.                        রজনীর শেষে
শুদ্ধ স্নাত নিরমল

.                        বিধবার বেশে!
.                        মুখে নাই ভাষা,
.                        নাই কোন আশা!
যু ই বেলা বিকসিয়া,
.                        নয়ন জুড়ায় ;
তুলি সবে প্রিয় জনে
.                        যতনে সাজায় !
.                        প্রণয়-পূজার
.                        তারা উপহার !

তোমার সহে না আলো!
.                        করুণ আঁখিতে !
সরমে লুকাতে যাও
.                        ধূলায় মাটিতে !
.                        বিহীন-গরিমা,
.                        তব মধুরিমা !
আমি ত তোমারে ল’য়ে
.                        ভরি মে$র ডালা)
আনমনে গাঁথি বসে
.                        তোর চারু মালা !
.                        জাগে কত স্মৃতি
.                        তোরে হেরি নিতি !
হৃদয়-ঈশ্বরী, ওলো
.                        সঙ্গিনী আমার,
ভালবাসি ওই রূপ
.                        লাজে সুকুমার !
.                        সরলা বালিকা,
.                        তুই সেফালিকা !

ই কবিটি পরে ১৩০৯ বঙ্গাব্দে (১৯০২ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত কবির “রঞ্জিনী” কাব্যগ্রন্থে
প্রকাশিত হয় বহু পরিবর্তন করে এই রূপে।

শেফালিকা।

উষায় বরষি অশ্রু শিশিরের জলে
কি দুঃখে ঝরিয়া পড় ধরাপদতলে ;
উদ্ভিদ্-বালিকা,
তুই শেফালিকা !

কেন জেগে বসে থাক রজনীর শেষে
শুদ্ধ রাত শুভ শুভ্র বিধবার বেশে!
মুখে নাই ভাষা,
বুকে নাই আশা !

যুঁই বেল গন্ধরাজ আর যত ফুল
ফোটে যবে, পড়ে যায় বনে হুলুস্থুল ;
পথিকের আঁখি
লয় তারা ডাকি !

প্রাণ-মনোলোভা সেই ফুল্ল ফুলগুলি
প্রিয়-জনে সাজাইতে আনে সবে তুলি’ ;
প্রণয়-পূজার
তারা উপহার !

তুমিও ত ফুটে থাক আপনার মনে
মধু হ’তে মিষ্ট হয়ে সৌরভে বরণে ;
কিন্তু তোর, বালা,
রূপে নাই জ্বালা !

তোমার সহে না আলো করুণ আঁখিতে,
সরমে লুকাতে চাও ধূলায় মাটিতে ;
বিহীন-গরিমা,
তোমার মহিমা !

আমি ত তোমারে লয়ে ভরি মোর ডালা,
আনমনে গাঁথি ব’সে অকারণে মালা ;
জাগে কত স্মৃতি
তোরে হেরি নিতি !

শৈশবসঙ্গিনীস, ওলো মোহিনী আমার,
ভালবাসি ওই রূপ লাজে সুকুমার ;
অদ্ভূত বালিকা, তুই শেফালিকা !

.             ***************              
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
অমৃত-সন্ধান
কবি সুরমাসুন্দরী ঘোষ
কবিতাটি ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত, শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ও অরুণকুমার মুখোপাধ্যায়
দ্বারা সম্পাদিত “উনবিংশ শতকের গীতিকবিতা সংকলন” থেকে পাওয়া। তাঁরা কবিতার
নীচে লিখেছেন - “রঞ্জিনী” কাব্য হইতে গৃহীত---১৯০২"। আমাদের কাছে “রঞ্জিনী” কাব্য
গ্রন্থের যে সংখ্যাটি রয়েছে তাতে এই কবিতাটি নেই। “রঞ্জিনী” গ্রন্থে “রঞ্জিনী” নামের যে
কাব্য বা কবিতাটি রয়েছে তার সঙ্গেও এই কবিতার কোনও মিল নেই।
মিলনসাগরে প্রকাশ ২
.৭.২০২০।

আজ টুটিয়াছে মোর মোহের বন্ধন,
গেছে শঙ্কা, গেছে লাজ, জেগেছে ক্রন্দন---
বহিছে জীবন-স্রোত দ্রুত বেগভরে,
সহসা লাগিবে ভাঁটা উচ্ছল সাগরে !
অতীতের খেলাধূলা মিশাবে ধূলায়,
আমি বসে থাকি তবে কার প্রতীক্ষায়?
কৈশোরে ঘোমটা-ঢাকা এই দুটি চোক,
দেখে নাই জগতের অক্ষয় আলোক !

আজ বুঝিয়াছি আছে আমারও কাজ
কেহ বৃথা জন্মে নাই ধরণীর মাঝ !
মুক্ত রহিয়াছে মোর স্মৃতির দুয়ার,
পশিবে না মৃতপ্রাণে সুরভি-সম্ভার !
কল্পনা-কবিতা-গীতি উথলি নিমেষে,
নিবে মোরে উড়াইয়া অমৃতের দেশে।

(“রঞ্জিনী” কাব্য হইতে গৃহীত---১৯০২)

.             ***************              
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর