কবি সুরমাসুন্দরী দেবীর কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।  www.milansagar.com
*
বসন্তের প্রতি পিক
কবি সুরমাসুন্দরী ঘোষ
১৩০৯ বঙ্গাব্দে (১৯০২ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত কবির “রঞ্জিনী” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
মিলনসাগরে প্রকাশ
২৯.৭.২০২০।


আসিয়াছি আমি, প্রভু,
.                তোমার আহ্বানে,
মৃতসঞ্জীবনী-সুধা
.                মিশাইয়া তানে !

কি যেন কুহকে আজ
.                বক্ষের দুয়ারে
উচ্ছ্বসি উঠিছে ধ্বনি
.                আনন্দের ভারে।

কুজ্ঝটী সরায়ে ধীরে
.                ওই দিল দেখা
তব রবিকিরণের
.                বৈজয়ন্তী রেখা

দ্রুতপদে ম্লানমুখে
.                কম্পিত হিয়ায়
প্রাচীনা হিমানী হের,
.                মাগিছে বিদায়।

উড়ায়ে উত্তরী পীত,
.                হরিৎ পতাকা,
মুক্ত করি মনোগামী
,                স্বপনের পাখা

নেমে এস ঋতুরাজ
.                মলয়-বাহনে ;
অরাজক মর্ত্ত্যপুরী
.                তোমার বিহনে !

---পরশের মাঝে নাই
.                শিহরণ লেশ ;
বচনে জড়িমা নাই,
.                নয়নে আবেশ!

দাও আজি ফলফুলে
.                ভরি শত ডালা ;
গাঁথা হোক্ ঘরে ঘরে
.                প্রিয়-তরে মালা

হে কিশোর, এস তবে
.                উদাস প্রবাসে
মধুর মধুর করি
.                হাস্যে রসে বাসে !

কুহু মোর বিশ্বজয়ী
.                তব বরে, নাথ,
বল আজ কোথা হবে
.                আনন্দ-উৎপাত?

কোথায় জ্বালা’ব বহ্নি
.                তুলিব তুফান ;
কোন্‌ দিক্‌ বিজয়েতে
.                যাবে মোর গান?

.               ***************  
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
নববর্ষ
কবি সুরমাসুন্দরী ঘোষ
১৩০৯ বঙ্গাব্দে (১৯০২ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত কবির “রঞ্জিনী” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
মিলনসাগরে প্রকাশ
২৯.৭.২০২০।

নিরমল শান্ত স্নিগ্ধ ঊষার আলোকে
জাগিয়া দেখিনু হৃদি-প্রান্তরে ঝলকে
প্রদীপ্ত কিরণ কার,---দিব্য মহিমার
প্রসন্ন প্রসাদ সম ! পুলকে আমার
সর্ব্বাঙ্গ উঠিল নাচি ; শুধাইনু হাসি,---
কে তুমি নবীন পান্থ দাঁড়াইলে আসি

জীর্ণ শীর্ণ অন্ধকার কুটীরের দ্বারে
আনন্দ আশ্বাস আশা ল’য়ে ভারে ভারে?---
শুনিনু উত্তর,---আামি বিশ্বের অতিথি,
আমারে বরিয়া লহ,--- দিব সুখ, প্রীতি
নব ভাবে পূর্ণ করি ; হায়-হাহাকারে
সাথী র’ব বর্ষ তরে ! ---এ যে চারিধারে
হাসি-কান্না পাশাপাশি ! নাহি যায় বুঝা,---
কে দিতেছে শাপ মোরে, কে দিতেছে পূজা !

.               ***************  
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
দুইবোন
কবি সুরমাসুন্দরী ঘোষ
১৩০৯ বঙ্গাব্দে (১৯০২ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত কবির “রঞ্জিনী” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
মিলনসাগরে প্রকাশ
২৯.৭.২০২০।

এক বৃন্তে ফোটা দুটি শুভ্র যুঁই ফুল ;
কিম্বা রমণীর কর্ণে হীরকের দুল !
স্তব্ধ সরসীর বক্ষে কমসের কুঁড়ি,
তারি শোভা দুটি বোন্‌ করিয়াছে চুরি !
অমানিশা-অন্ধকার হৃদয়-অম্বরে,
পাশাপাশি দুটি তারা ঝল্ মল্‌ করে !

ঊষার আলোকে দীপ্ত নিহারের হার
কোথা হ'তে পড়িল রে জীবনে আমার
অনুপম সুষমার দিব্য ছবিখানি
নিয়েছি হৃদয় পেতে বিধি কৃপা মানি।
বাধিতে সংসার-পথে উদাসীন প্রাণ
মানবের গৃহে শিশু দেবতার দান !
উহাদেরি মুখে পড়ি প্রীতিপুলকিতা,---
আমার জীবন-কাব্য যুগল কবিতা !

.               ***************  
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
জন্মতিথির আশির্ব্বাদ
কবি সুরমাসুন্দরী ঘোষ
১৩০৯ বঙ্গাব্দে (১৯০২ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত কবির “রঞ্জিনী” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
মিলনসাগরে প্রকাশ
২৯.৭.২০২০।

নিরমল পারিজাত-পরিমল হ'তে
লভিয়া জনম, বাছা, এসেছ মরতে !
অপূর্ণ অভাবময় জননীর প্রাণে
বহাইলে স্বিগ্ধধারা স্বর্গ-সুধা দানে।
দীপ্তিহীন সুপ্তিলীন দীন গৃহখানি
আলো করি, পূর্ণ করি এলে যবে, রাণী,
সে সুলগ্নে উঠেছিল কি সুখ-লহরী ;
নেচেছিল কি উচ্ছ্বাসে জীবনের তরী।
বরষের পরিচয় ধরা সনে তব,
লীলাখেলা এরি মাঝে কত নব নব।
তুমি মা ত্রিদিব-ছবি দুঃখময় ভবে ;
বেঁচে থাক, সুখী হও, সুখী কর সবে !
বাজিছে মঙ্গল সুর হৃদয়ের বীণে,
কল্যাণী, আশীষ মম লও জন্মদিনে।

.               ***************  
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
কাশীবাসিনী
কবি সুরমাসুন্দরী ঘোষ
১৩০৯ বঙ্গাব্দে (১৯০২ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত কবির “রঞ্জিনী” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
মিলনসাগরে প্রকাশ
২৯.৭.২০২০।

জ্ঞানবৃদ্ধ ধর্ম্মরত বিপ্র একজন
ব্রত-হোমে পূণ্য-ধন করিছে অর্জ্জন।
একদা প্রভাতে দ্বারে এল ভিক্ষা লাগি
ম্লেচ্ছ-ভিখারিণী এক ; নিদ্রা হতে জাগি
অপবিত্র মূর্ত্তি হেরি ক্রোধান্ধ ব্রাহ্মণ
লয়ে কমণ্ডুলুখানি করিল তাড়ন
ভয়ভীতা রমণীরে। ব্রাহ্মণী কল্যাণী
পতিরে নিবৃত্ত করি, করে ধরি আনি
বসাইলা অনাথারে। পাত্র পূর্ণ করি
যায় ভিখারিণী । বিপ্র উঠে গরজিয়া,---
ছুঁইলি যবনী?---ত্যাজ্যা তুই আজ হতে,
যাবৎ না হ’স শুদ্ধ ফিরি পথে গথে
পূণ্য কাশীধামে ! ব্রাহ্মণী কহিলা হাসি,
পতিপূজা দীনসেবা, তাই মোর কাশী !

.               ***************  
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
জন্মভূমি
কবি সুরমাসুন্দরী ঘোষ
১৩০৯ বঙ্গাব্দে (১৯০২ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত কবির “রঞ্জিনী” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
মিলনসাগরে প্রকাশ
২৯.৭.২০২০।


শৈশবের নীলাভূমি,
.        সুখের আলয়,
আজ আর তোর সাথে নাই পরিচয়!
এই ত সে পথ বাঁকা, দীঘীখানি ঝোপে ঢাকা,
.        হেমন্তের শাম মাঠ
.                পীত শমাময়।
আজ আর তোর সাথে নাই পরিচয়!

শৈশবের স্বর্ণভূমি,
.        সুখের ভবন,
আাজ কেন তোর তরে ঝরিছে নয়ন?
আম্রমুকুলের ঘ্রাণ        উদাস করিছে প্রা@
.        কোন অতীতের গান
.                গাথিছে পবন ;
আজ কেন তোর তবে ঝরিছে নয়ন?

শৈশবের লীলাভূমি,
.        জননী আমার,
মনে পড়ে তোর কথা আজ বারবার
এখনো সহাস্য মুখে        ধরিয়া রয়েছে @
.        সেই সুখ, সেই হাসি,
.                সেই অত্যাচার ;
মনে পড়ে তোরি কথা আজি বারবার

শৈশবের স্বপ্নভূমি,
.        মধুর আশ্রম
আজিকে সোদন ব’লে হয় কেন ভ্রম?
সারাদিন হ’ত খেলা ;--- ঘরে ফিরে সন্ধ্যাবেলা
.        দিদিমার রূপকথা
.                ছিল যে নিয়ম ;
আজিকে সেদিন ব’লে হয় কেন ভ্রম?

শৈশবের লালাভূমি,
.        আনন্দ-আবাস,
সে দিনের মত আজি স্নেহ-হাসি হাস্ !
দিয়েছিলি ভরি বুক        যে শুভ, সুকৃতি, সুখ,
.        দ্যাথ তার কিছু নাই,
.                আছে হা হুতাশ ;
সো দিনের মত আজি স্নেহ-হাসি হাস্ !

শৈশবের রঙ্গভূমি,
.        পুণ্য গৃহখানি,
ফিরেছি তোমারি বুকে আবার, কল্যানী !
এসেছি তোমার ছায়ে        শ্রান্ত প্রাণে, ক্লান্ত কায়ে,
.        জপ' মোর কাণে ধীরে
.                সোহাগের বাণী ;
ফিরেছি তোমারি বুকে আবার, কল্যাণী !

.               ***************  
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
কবিকাহিনী
কবি সুরমাসুন্দরী ঘোষ
১৩০৯ বঙ্গাব্দে (১৯০২ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত কবির “রঞ্জিনী” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
মিলনসাগরে প্রকাশ
২৯.৭.২০২০।

চোষে আছে মুগ্ধ কবি নিস্তব্ধ আকাশে ;
হইয়াছে চন্দ্রোদয়,                     সারা বিশ্ব হাস্যময়,
কলধ্বনি বাজিছে বাতাসে ;
নীল গাহাড়ের গায়                    তারাগুলি হেসে চায়,
অতি দূর আশার মতন !
ফুলগন্ধে কুহুস্বরে                         পুলকিত স্বপ্নভরে
মুদে আসে কবির নয়ন !

আকুল হৃদয় খোঁজে মানস প্রতিমা ;
কোথা শূন্যে জলে স্থলে                   বসি ফুল্ল শতদলে
বিরাজিছে সে মূর্ত্ত মহিমা।
অপরূপ রূপবতী                     হোক না প্রকৃতি সতী,
সে সৌন্দর্য্যে নাই মাদকতা,
ও যে শুধু ছায়া-মায়া,                 নাই স্পর্শ, নাই কায়া,
@@@@@@@@@@

হেনকালে খুলি কক্ষ-বাতায়নখানি
নীরব গবাক্ষতলে                        কে দাঁড়াল কুতূহলে,
উন বুঝি লাবণ্যের রাণী?
ঊর্দ্ধ হতে ছুটি ছুটি                 জ্যোত্স্না পড়িতেছে লুটি
আলু-থালু হয়ে এলোকেশে ;
ভাবে ঢুলু ঢুলু আঁখি,                   যেন দু'টি নৈশ পাখী
নীলাম্বরে নিমগ্ন আবেশে।

কৰি ধীরে শূন্য হাতে ফিরায়ে নয়ন
হেরিল প্রিয়ার মাঝে                  সব তৃপ্তি শান্তি রাজে,
ফলে সেথা রূপের স্বপন ;
ছিঁড়ি কল্পনার মালা                       হৃদয়ের অর্ঘ্যডালা
রাখি দিল প্রত্যক্ষের পায় !
খুলিয়া কবির প্রাণ                        নারীর বন্দনা-গান
ব্যাপ্ত হয়ে পড়িল ধরায়।

@@@@@@@@@@@ - কবিতার রূপ ও ছন্দের কথা ভাবলে মনে হয় যে, এখানে একটি কলি
থাকার কথা, যা সম্ভবত ছাপা হয়নি।

.               ***************  
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
শাপান্তে
কবি সুরমাসুন্দরী ঘোষ
১৩০৯ বঙ্গাব্দে (১৯০২ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত কবির “রঞ্জিনী” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
মিলনসাগরে প্রকাশ
২৯.৭.২০২০।

অভিশাপতাপমুক্ত দুষ্মন্ত যখন
দেখিল মানবশিশু করে আস্ফালন
নির্ভিক অন্তরে সিংহশাবকের সনে,
সহসা সে শকুন্তলা পড়িল স্মরণে ;
জ্বালিছে শিশুর মুখে সে রূপের শিখা ;
তরুণ ললাটে ভাতে রাজ-ললাটিক !

আপনার প্রতিরূপ হেরি শিশুমুখে
বিস্মিত ব্যাকুল রাজা বিযাদে ও সুখে !
হাসে বিদ্রূপের হাসি দেববালাগণ ;
দিকে দিকে প্রতিধ্বনি বহিল পবন,---
কোথা আজি তব পিয়া, হে মূঢ় রাজন্ ,
বিনা দোষে অবিচারে করেছ বর্জ্জন
সেই সতী প্রতিমারে।---নতা শির সনে
রাজগর্ব্ব লুটে আজ প্রীতির চরণে।

.               ***************               
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
অজ্জুনের প্রতি চিত্রাঙ্গদা
কবি সুরমাসুন্দরী ঘোষ
১৩০৯ বঙ্গাব্দে (১৯০২ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত কবির “রঞ্জিনী” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
মিলনসাগরে প্রকাশ
২৯.৭.২০২০।

যখন ছিলাম মুগ্ধ কর্ত্তব্যের মাঝে,
ক্ষুদ্র সুখ দুঃখ ল'য়ে সংসারের কাজে
সদা নিমগন, অভাব-অপূর্ণ-গাথা‌
পড়ি নাই প্রেম-গ্রন্থে উলটিয়া পাতা!
কতই গরবে করি আপনারে জয়
সরল অমল স্নিগ্ধ একটি হৃদয়
তুলেছিনু গড়ি! কি জানি কি মন্ত্রবলে
ভাঙ্গি সব বাধা-বন্ধ কি ছলে, কৌশলে
পশিলে অন্তর-গেহে ; করুণ কোমল
নয়ন দুখানি তব হরিল সকল
মোর আপনার যত ! বসি দূর পারে
আজ গাঁথিতেছি মালা নয়ন-আসারে ;
ভুমি মোর জীবনের অকূল পাখার ;
কেমনে হইব পার, জানি না সাঁতার !

.               ***************               
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
উত্তরার বৈধব্য
কবি সুরমাসুন্দরী ঘোষ
১৩০৯ বঙ্গাব্দে (১৯০২ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত কবির “রঞ্জিনী” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
মিলনসাগরে প্রকাশ
২৯.৭.২০২০।

কুরুক্ষেত্রে বয়েছিল যে অন্ধ ঝটিকা,
তার ঘূর্ণিপাকে পড়ি একটি বালিকা
অকালে হারাল তার জীবনের মণি ; ---
অন্ধকার হ'য়ে গেল সংসার অমনি !
করুণ তরুণ মূর্ত্তি খেলাধূলা ছাড়ি
সেইক্ষণে আপনারে জানিল ভিখারী
জীবনের কর্ম্মক্ষেত্রে ! চুর্ণ করি বীণা,
খেলার পুতুল ফেলি ভূষণবিহীনা,
দাঁড়াল বিধবাবেশে ! নাই চপলতা,
নাই অশ্রু-হাহাকার ; মর্ম্মাহতা লতা
দাঁড়ায়ে রহিল শুধু স্নেহ-মন্ত্রবলে
বিশ্ব-গহনের কোণে, অন্ধকার তলে!
অসম্পূর্ণ জীবনের আশাসাধগুলি
সংসারের পদতলে হ’য়ে গেছে বলি।

.               ***************               
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর