তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা
পাষাণের প্রতি
কবি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়


তারা এসেছিল            তারা চলে গেছে
কত ভেঙে গড়ে, রেখে স্মৃতি তার |
তারা গেয়েছিল             গান থেমে গেছে
শুধু জেগে আছে ক্ষীণ ঝঙ্কার ||
|পান্থ আসে যায়          পান্থ নিবাসে
নিজ স্মৃতিটুকু রেখে যেতে চায় |
কেহ ছবি আঁকে             কেহ নাম লিখে
থাকে কত দিন পরে মুছে যায় ||
কত হেসে কেঁদে            দিন চলে গেছে
আজিকে কথা তা কাহিনী সবি যে |
স্মৃতি অবশেষ                 আর সব শেষ
যেন মুছে যাওয়া পুরানো ছবি এ ||
ওগো এযে তাই           এ যে অতীতের
আঁকা ছবিখানি মুছে যেতে চায় |
কটি ছেলে মেয়ে                খেলে চলে গেছে
ভাঙা খেলাঘর পড়ে কাঁদে হায় ||
ওগো বল বল             তব বুকে আছে
কি কার কাহিনী মাখা হাসি ব্যথা |
আমিও চলে যাব                গিয়ে শুনাইব
যারা চলে গেছে তাদের এ গাথা ||
যাহারা আসিবে               তারাও শুনিবে
মোর ক্ষীণ সুরে তোমার এই গান |
ধন্য আসা যাওয়া              যদি যেতে পারি
হোক যত ছোট দিয়ে কোন দান ||

************
.                                                                            
উপরে   


মিলনসাগর
ভূগর্ঙস্থ পাটলীপুত্র
কবি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

অস্ত গেল ক্লান্ত সূর্য জাহ্নবীর নীরে |
শ্যামা সন্ধ্যাবধু ওই আসে ধীরে ধীরে ||
শরম জড়িত পদে বনবীথি-ছায়ে |
আলোক দেখায়ে পথ চলেছে পিছায়ে ||
পরপার পানে ; ওই দূরে ঘরে ঘরে |
জ্বলে দীপ বাজে শঙ্খ, শান্ত বায়ুভরে ||
আসে স্নিগ্ধ ধূপগন্ধ ; ফেরে ধেনু গেহে |
গোধূলির রক্তরাগ মাখি সারা দেখে----
কটী নারী ফিরে যায় ভরে লয়ে জল |
ধীরে স্তব্ধ হয়ে আসে জনকোলাহল ||
আমি বসে আছি কোথা মুগ্ধ স্তব্ধ প্রাণে !
কত দীর্ঘ অতীতের স্মৃতির শ্মশানে ||
মৌর্যরাজ রাজধানী এই এই কিরে |
সে কাহিনী রাখিয়াছে যত্নে বক্ষনীড়ে ||
এরি পদে নত হ’ল গ্রীসের সে শির |
আজ তার একি দশা পরাণ অধীর ||
পাত্র গেছে কাল গেছে আছে শুধু নাম |
আর এই গৌরবের লীলানহী ধাম ||
কত শত অব্দ ধরি কত না সম্রাট |
সেরে গেছে এইখানে জীবনের হাট ||
চলে গেছে নন্দ, মৌর্য, গুপ্ত একে একে |
ভোগে, ত্যাগে, হেসে, কেঁদে, স্মৃতি এঁকে রেখে ||
তারা গেছে পড়ে আছে ভাঙা খেলাঘর |
সে ঐশ্বর্য-ভূমি আজি মরুর প্রান্তর ||
শত আয়োজন যথা সাজাইয়া মেলা |
আলোকে উত্সবে করে কত লীলাখেলা ||
মেলা ভেঙে যার জাগে প্রান্তর আবার |
বিচিত্র রেখায় জাগে স্মৃতিটুকু আর ||
আর সেথা যায় না ত কেউ তবু হায় |
অজ্ঞাতে ব্যথিত দৃষ্টি সে পানে তাকায় ||
আনন্দের লীলা-ছবি ছোট ছেলে মেয়ে |
উত্সব সন্ধানে ব্যগ্র আসে সেথা ধেয়ে ||
ফিরে যায় ব্যর্থ হয়ে, ওগো সেই মত |
এসেছিনু দেখিবারে, আনন্দ অতীত ||
দেখিয়া আনন্দে নয় ব্যথার হতাশে |
মেলা ভাঙাচোরা দেখে চোখে জল আসে ||
চারিপাশে গাঢ় হয়ে ঘিরেছে আঁধার---
আলোক উত্সবময় রাজার আগার ||
দূরে জ্বলিতেছে দীপ দীনের ও কুটিরে |
রাজার প্রাসাদ রবে মগ্ন অন্ধকারে ||
দীপ দীপ একটি প্রদীপ দে রে জ্বেলে |
দেখাইতে সন্ধ্যা-আলো লীলাভূমি তলে ||
ভাঙা হাটে ক্ষুব্ধ-বক্ষ ছেলেটির মত |
দীপশিখা উঙ্গলিয়া দিই অবিরত ||
ক্ষীণালোক জ্বালাইয়া এই ভাঙা ঘরে |
অতীতেরে বর্তমানে আনি বুকে করে ||

.             **********
                                                        
উপরে   


মিলনসাগর
জীর্ণ মসজিদ
কবি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

অতি ক্ষুদ্র জীর্ণ মসজিদ
.             কেঁপে উঠে বায়ুর তাড়নে |
অতীতের হে জীর্ণ কঙ্কাল
.             নমি আমি তোমার চরণে ||
অতি জীর্ণ অবহেলা মাখা
.              ছেয়ে আছে শুধু ধুলিরাশি |
আঁকা শুধু কটি পদরেখে
.              ( কোন ) ভক্ত বুঝি নমেছিল আসি ||
দেবতার ওগো পাদপীঠ
.              ভকতের আত্মনিবেদন |
হও জীর্ণ শোভাহীন তুমি
.              তবু মুগ্ধ আমার নয়ন ||
দেবতায় করি নিবেদন
.               ভক্ত কবে দিয়েছিল ফুল |
শুষ্ক এবে সৌরভবিহীন
.               নাহি তার সৌন্দর্য অতুল ||
তবু তারে কে পারে ফেলিতে
.               দেবতার পাদস্পর্শ মাখা |
থাকে তার প্রতি পাপড়িটিতে
.                ভকতের মর্মবাণী আঁকা ||
তুমি তাই ওগো তুমি তাই
.                 ভকতের নিবেদিত ফুল |
শুষ্ক এবে শুধু ধুলিমাখা
.                  নাই তব সৌন্দর্য অতুল ||
দাও ওগো এ নতমস্তকে
.                   দেবতার পাদস্পর্শ লেখা |
ভক্ত-মর্মবাণী দাও এঁকে
.                   ধরি বুকে পাষাণের রেখা ||

.                ************

                                                      
উপরে   


মিলনসাগর
নিশীথে
কবি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

রজনীর ওই কালো কোলে
.              ওই কালো মেঘ আসে ছেয়ে |
আদ্র বায়ু করি হাহাকার
.              বয়ে যায় কাঁপিয়ে কাঁপিয়ে ||
আমার মন্দিরে আমি একা
.              চেয়ে কালো আকাশের পানে |
নাহি জানি কি মধু-পরশ
.              পেতে চাই তাপ-তপ্ত প্রাণে ||
ঝর ঝর জল এল ওই
.              আকাশ ধরার ব্যবধান |
মিলাইয়া দিল পূর্ণ করি
.              ধরণীর পিয়াসী পরাণ ||
হে অজ্ঞাত দরিত আমার
.               তুমি আমি দুজনা মাঝারে |
এ অজ্ঞাত ব্যবধানে কি গো
.               দূরে দূরে রব চিরতরে ||
অতৃপ্ত মিলন তৃষা মোর
.               মিটাইয়া দাও ওগো দাও |
চলিতে শকতি নাহি মোর
.               তুলে নাও ওগো টেনে নাও ||
এ তৃষা মিটাতে পার তুমি
.                তোমারেই মিটাতে তা হবে |
আকাশ দিয়েছে বারিধারা
.                ধরণীর তৃষা তৃপ্ত হবে ||


.                 *********
.                                                                            
সূচিতে . . .     


মিলনসাগর
মিনতি
কবি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়


মরমের মাঝে                           প্রেম মর্মরে
রচিত দেউলে আসিয়া |
মধু-কামনার                         আলিপন ‘পরে
দাঁড়াও চরণ রাখিয়া ||
এস নীরবে                              এস গোপনে
এস নিরাশ রজনী-স্বপনে |
মানে-অভিমানে                     প্রেম-আলাপনে
অধরে অধর মিলনে
(দাও) অভিসারিকার                 নিরালা বাসর
শেষ নিমেষে ঢাকিয়া ||

*************

.                                                                                  
সূচিতে . . .     


মিলনসাগর
প্রতীক্ষায়
কবি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়


আলোক-আঁধারে মাতামাতি
.            কত দিবা গেল কত রাতি
.                         কই তবু তুমি আসিলে না !
উত্সবের ধারা বস্ত্রে নেয়ে
.             কত বর্ষা গেল বর্ষ বেয়ে
.                          কই দ্বারে আঘাত দিলে না |
প্রয়জনে উপহার দিয়ে
.              গেল কত শরৎ চলিয়ে
.                          দেওয়া দূর---কিছু জানালে না |
হেমন্তের পূর্ণিমায় রাস
.               অভিসারে ত্যজিনু আবাস
.                          কই তুমি বাঁশী বাজালে না |
বক্ষের উত্তাপ লয়ে শীতে
.                বসেছিনু তব পদে দিতে
.                           কই তুমি ভুলেও ছুঁলে না!
বসন্ত চলিয়া গেল হাসি
.                 এ চোখে ঝরিল বারিরাশি
.                           সে জলে ত চরণও ধুলে না!
না আসিয়া সুখী যদি হও
.                 থাক সখা---শেইখানে রও
.                            তৃপ্ত আমি শুধু ভালবেসে |
পশিতেও হবে না কুটিরে
.                  “ভালবাসি” এ কথা দুটিরে
.                             শুনে যাও দুয়ারেতে এসে ||


.                   ***************

.                                                                                 
সূচিতে . . .     


মিলনসাগর
বাঞ্ছিত
কবি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়


তোমাতে দেখেছি আঁধারেতে আলো
.                    বিপথেতে পথ পেয়েছি গো |
তোমাতে পেয়েছি পিপাসার বারি
.                     হতাশায় আশা পেয়েছি গো ||
.          তোমাতে পেয়েছি মরম গান
.          তোমাতে পেয়েছি মরণে প্রাণ
যাতনায় কত বুকভরা স্নেহ---
.                     সাধনা আমি পেয়েছি গো ||
.           তোমাতে পেয়েছি পূজার দেবতা
.           তোমাতে পেয়েছি মন্ত্রের কথা
.           ব্যথিত সাধনা সাধিয়া কত না
.                     হে প্রিয় তোমাকে পেয়েছি গো ||


.               ***************


.                                                                   
সূচিতে . . .     


মিলনসাগর
খস্রু সমাধি
কবি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

কে গো, ঘুমায় এখানে কেগো
.            মায়ের পরম মরমে রে |
আহা, কত না বেদনা ফুটেছে গো
.            পাষাণে রক্ত ধমে রে ||
এ যেন সাঁঝের মৌন বেদনা
.             ফুটি গোধূলির রক্তরূপে |
শ্বেতমর্মর তার অন্দরে
গোধূলির মাঝে শোভে সুন্দরে
দীপ্ত শুভ্র শুকতারকাটি
.              নীল জ্যোতি আহা মণিদীপে ||
এ সেই কাহিনী রাজার দুলাল
.               ঘুমায় জীবন অবসানে |
বাদশার রোষ মৃত্যুর আদেশ
পিতার ভ্রুকুটি, দৈন্যের শেষ
প্রতিহত করি বাঁচায়ে রাখিতে
.                আপন পরাণ প্রিয়জনে ||
জননীর স্নেহ, পত্নীর প্রেম
.                জেগে আছে হেথা নিরজনে ||
অন্ধ নয়ন নৃপনন্দন
সিংহাসনের রঙীন স্বপন
ত্যজি হতাশায় ঢালিল জীবন
.                এইখানে ওগো এইখানে |
সমাধির রূপে মায়ের মরম
.                লুকায়েছে তারে সাবধানে |
তুচ্ছ করিয়া স্তুতিগুঞ্জন
.                 আশা-নিরাশার মোহ অঞ্জন
জননীর স্নেহশয্যায় পড়ি
.                 সম্বল প্রিয়া প্রেমসনে |
ঘুমায় খস্রু অশ্রুধারার
.                 শ্বেতমর্মর আবরণে ||


.             **************


.                                                                        
সূচিতে . . .     


মিলনসাগর
খস্রু পত্নীর সমাধি
কবি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

বল গো শোনাব কোন গান
পাষাণের মুখে              প্রেমের কাহিনী
শুনে জুড়াইব কার প্রাণ!
আছে শুধু তাই             আর কিছু নাই
ক্ষুদ্র প্রেমের ইতিহাস |
দেখিয়াছি চোখে            ঢাকিয়াছি বুকে
ওগো তাই শোন মোর পাশ ||
বিরহবিধুরা                   রাজতনয়ারে
নীল আকাশের পরপারে |
উদাস নয়নে                খুঁজিতে দেখেছি
পরাণের প্রিয় দেবতারে ||
কত দিন ওগো                কত দিন গেল
পাইনিক তারে খুঁজে আর |
শুধু দিনশেষে                পড়িত হতাশে
ভাঙিয়া হৃদয়খানি তার ||
একদিন ওগো                   একদিন বুঝি
আহ্বান বাণী পেয়ে কার |
সন্ধ্যামণির                         মতন শুভ্র
হাসিটি ফুটিল মুখে তার |
আর পড়েছিল            কে জানে সে শ্বাস
নিরাশা নাকি সে সান্ত্বনা!
বলিতে কি পার              তাই নিয়ে মোর
ভাবনার আজও অন্ত না ||
ভাসিয়া উঠিল                 অধরে হাসিটি
নয়নের কূলে কূলে জল |
উচ্ছ্বাসে ঘন                    কম্পিত হৃদি
আবেগেতে করে টলমল ||
দেখেছি যাইতে               অভিসারিকায়
মণিদীপ হাতে মরণের |
অজানা পন্থে                    সে এক পন্থা
বাঞ্ছিত অনুসরণের ||
সেই সেযে গেছে                 হ’ল কতদিন
কই সে ত ফিরিল না আর |
একটি নিশান                   দু-ফোঁটা অস্রু
বুকে ক’রে পড়ে আছি তার ||

**************

.                                                                                             
সূচিতে . . .     


মিলনসাগর
এলাহাবাদ দুর্গ
কবি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

স্তব্ধ দ্বিপ্রহর
যমুনার বুকে                নিমীলিত চোখে
চলেছি তরণী পর |
জনকোলাহল               ক্ষীণ শোনা যায়
মাঝে মাঝে কভু            কাক ডেকে যায়
শ্রান্ত শরীরে                   তন্দ্রার ঘোরে
তরীতে বেঁধেছি ঘর ||


কি এ মধুর গান
কেন দূরাগত                     মুরলীর তান
আকুল করিল প্রাণ |
এ কি যমুনার                  কুলু কুলু ধ্বনি
নাকি গীতধ্বনি সত্যই শুনি
এ কি এ কে বলে          “দেখ চোখ মেলে”
“আমি রে প্রতিষ্ঠান!”


দেখিনু নয়ন মেলি
বিরাট পাষাণ                 না না প্রাণময়
দাঁড়ায়ে আকাশ ঠেলি ||
হুনের আঘাত                পাঠানের অসি
মোগলের ছুরি              আছে বুকে বসি
বর্গী প্লাবন                     আপন আপন
দাগ এঁকে গেছে চলি ||


পাষাণ তুমি ত নও
ইতিহাসে তুমি            এক অধ্যায়
কথা কও কথা কও ||
স্মৃতির আখরে           প্রতি পাষাণেতে
অতীত আকারে বর্তমানেতে
কহগে তরুণে             পুরাতন কথা
মরমে ডাকিয়া লও ||
চাহি না শুনিতে           বিজয়-বারতা
আছে ইতিহাস          কহিতে সে কথা
কহ বিজিতের           ব্যথিত কাহিনী
গোপনে যে ব্যথা বও ||


ওই সে লৌহদ্বার
বীর ছাড়া নাই              কাপুরুষের
প্রবেশের অধিকার ||
কত বিজিতের            কত বিজয়ীর
পদরেখা আঁকা             ঢালু পথটির
কে ক’বে কাহিনী         নীরে তটিনীর
আজও উঠে ধ্বনি যার ||


আসা যাওয়া মোর হ’ল কতবার
একবারও কিগো কভু মাঝে তার
বিজিত কিন্বা                 বিজয়ীর সাথে
পশিনি দিয়ে ও দ্বার ?
মুগ্ধ নয়ন তাই বুঝি ফেরে
অতীত স্মৃতির রেখাটির তরে
কোথা মেরে ছুরি              কোথা শুয়েছিনু
কোথা আঁকা রেখা তার ||


ভাসিয়া চলেছে তরী |
অতীতের মত                  দুধারের ছবি
থাকিছে পিছন পড়ি ||
দুর্গসীমার হয়ে গেল শেষ
পিছন ফিরিল আঁখি অনিমেষ
অতীতের পানে                  বর্তমানের
আঁখি রহে যথা ফিরি ||

***********

.                                                                                             
সূচিতে . . .     


মিলনসাগর