তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
তৃপ্ত
কবি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

ওগো অযাচিত বন্ধু আমার!
কোমল শীতল কর বুলাইয়ে দাও নয়নে আমার |
ঘনায়ে আসুক চোখে শেষ নিমেষপাত
ভাঙা বুক মিশে যাক ধরণীর ধূলি-সাথ
দেবহীন দেউলের                      পূজাহীন হাহাকার
সান্ত্বনা ল’ক খুঁজে মাঝারে ধুলার ||
অজানিত সথা ওগো তব প্রেমে মধুময়
মরম মথিত মম অতীত করিয়া লয়
টেনে লও ব্যথিতেরে                  ধরণীর ঘৃণিতেরে
ধরা হতে মুছে দিয়ে সব স্মৃতি তার ||


***************
.                                                                                             
সূচিতে . . .     


মিলনসাগর
অভিনব আনন্দ উত্সব |
কঙ্কালের জাতি করে কলরব ||
এস শক্তি ধারায় ধারায় |
আছ কোথা সূর্যে কি তারায় ||
অমৃতের অম্বুধি হইতে |
জীবনের কল্লোল-সংগীতে ||
শিবময় শুভ্র নিরমল |
বিস্ফুরিত প্রলয় অনল ||
সুবিক্ষিপ্ত অণু রেণু সনে |
মৃতপ্রায় জাতির জীবনে ||
অতীতের শুভ সন্ধিক্ষণে!
নিপীড়িত দেবতামিলনে---
অংশ দিল পূর্ণতায় ধরা |
ভীমা ভীম-প্রহরণত্করা ||
দেবত্বের প্রতিষ্ঠা আবার |
কঙ্কালের করুণ চিত্কার ||
চাই শুধু জীবন্ত মানব |
একি তব ধ্বংসের উত্সব ||
আনন্দ এ নয় কভু নয় |
উদ্বোধনে সাধন সময় ||
আয় ব’স ওরে আত্মহারা |
মোহে বধি শোণিতের ধারা ||
ব্রতশেষ বিজয়ার দিনে |
একতার প্রীতির মিলনে ||
ব্রত শেষে যোগীর উত্থান |
এস এস এস জাতির কল্যাণ ||

*************
.                               
সূচিতে . . .     
শরতের সপ্তমী প্রভাতে
দগ্ধোদর নগ্নপ্রায়
শক্তি চাই শক্তি চাই ;
আনন্দের অপূর্ব প্লাবন,
স্রষ্টার কল্পনা নব
পাঞ্চজন্যে উচ্ছ্বসিত
এস এস মহাশক্তি
মহাকাল ললাট হইতে
এস আছ কোথায় কোথায়
এস আজ পুঞ্জীভূত হয়ে
কন্ সে স্মরণাতীত
হিমাচল উপত্যকা-ভূমে
কেন্দ্রীভূতা বিশ্বশক্তি
দশ দিক রক্ষয়িত্রী
মহাশক্তি জাগরণে
সেই শক্তি আবাহনে
নহে দেবত্বের তরে মানবতা
ধ্বংস হবে দধীচির জাতি
উত্সব এ নয় ওরে
এ জাতীয় জীবনের
দৃঢ়তার শবাসনে
জ্ঞানের খর্পরে ঢাল
মহাশক্তি কর আবাহন
সিদ্ধিলাভ হবে ওরে
বিজয়ায় নহে বিসর্জন
এস শক্তি এস সিদ্ধি

.                             ************




মিলনসাগর
শারদোত্সব
কবি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
মরণোন্মাদ
কবি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়


.       কে রে মম অন্তরে |
.       ভীষণ মধুরে এ কোন সুরে
.                              ঘা দেয় হৃদি-অন্তরে |
.        নহে হাহাকারে হা হা ক’রে
.        ঝড়ের মতন প্রাণ মাতে ওরে
ভাঙিয়া আগল                 পরণে পাগল
.                          যাবে কোথা কোন প্রান্তরে ||
.         এ রঙীন বুকে কি বিকট নেশা
.         মায়া হ’ল ছায়া মুছে গেল আশা
অমৃতে গরল                    গরলে অমৃত
.                          হ’ল কার কোন্ মন্তরে ||
.          সুন্দর যাহা দেরে মুছে দেরে
.          নয়ন ব্যকুল ভীষণের তরে
উল্কা প্রপাতে                    নিষ্ঠুরাঘাতে
.                          সুন্দর হ’ক অন্ত রে ||
.                  কত রাঙা রাগ আছে বল দাগে
.           শোণিতের চেয়ে রাঙা কিবা লাগে
ফেল পিচকারী                   নিয়ে আয় ছুরী
.                           উল্লাসে প্রাণ সন্ত্ররে ||
.           নাহি প্রয়োজন ফুলের মালায়
.           কোথা অহি আর জড়াই গলায়
নহে ফুলবাসে                    গরলের শ্বাসে
.                            ভরে দে বক্ষকন্দরে ||
.           কুৎসিত আলো নিভারে নিভারে
.           মত্ত নয়ন সহিতে না পারে
এ নেশা বিকট                     হবেরে প্রকট
.                             উত্কটতম অন্দরে ||
.            অন্ধকারের মাঝ হতে কেরে
.            ডাকছে আমায় দেরে ছেড়ে দেরে
যাই যাই যাই                      ওই সে যে যায়
.                              ধরিতে হবে ও সুন্দরে ||
.             মোহিনীর পাছু শিবের মতন
.             তাণ্ডবে মেতে চলেছে ভীষণ
ওই ওই সে যে                     ওই ওই হা হা
.                               পেয়েছি বাহুর অন্দরে ||

.                    **************

(কোন আত্মঘাতী যুবকের মৃত্যুতে)

.                                                                               
সূচিতে . . .     


মিলনসাগর
প্রেমাকুল আঁখি দুটি কার |
নারে প্রাণ বুঝিতে আমার ||
কত না আদর পেয়েছে সে |
ঘোমটার আড়ে চাহনি ও ||
লুকোচুরি খেল দূরে থাকি |
প্রিয়জন তাই ডাকাডাকি ||
না এস চাব না ফিরিয়ে আর |
সাধিতে দুয়ারে প্রিয় আমার ||
                           

                  
.                                    
সূচিতে . . .     


মিলনসাগর
পরপারে ওই
কি বলে আমার
চিত্ত বিভোর
কত না মধুর
কো তুমি আমার
মধু কামনার
এস কাছে এস
এস কিনা দেখি

***************
নীল গগনের
নীরব ভাষায়
তবু কেন মোর
কিশোরী বধুর
ওগো তুমি কে গো
(বুঝি) চির সাধনার
কেন অত দূরে
যদি সেই হও
অভিমানে
কবি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
চন্দন অনুলেপন যায়
গন্ধ ডালা ধরিতে তুলে
নয়ন দুটি আপনা হতে
প্রিয় স্মরণে করুণ ব্যথা
একটি জন বিহনে আজি
হরষে বাঁশী গাহিয়া উঠে
সাধের গাছে মুকুল নব
পাখীটি আজি গাহিল যদি
কেমনে গান হইবে সারা
অধরে হাসি কেমনে মাখি


.                           *************


(কোন বিবাহ-উত্সবে মৃত
প্রিয়জন স্মরণে  )
উত্সবের ব্যথা
কবি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
চন্দন অনুলেপন যায়
গন্ধ ডালা ধরিতে তুলে
নয়ন দুটি আপনা হতে
প্রিয় স্মরণে করুণ ব্যথা
একটি জন বিহনে আজি
হরষে বাঁশী গাহিয়া উঠে
সাধের গাছে মুকুল নব
পাখীটি আজি গাহিল যদি
কেমনে গান হইবে সারা
অধরে হাসি কেমনে মাখি


**************
.                                
সূচিতে . . .     


মিলনসাগর
পূজারিণী
কবি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়


দ্বারে তব দীনা পূজারিণী ওগো দেবতা
.                            খোল মন্দির দ্বার |
ধ্বনিয়া উঠিছে মরমের শত আহ্বান
.                            নীরব থেক না আর ||
জীবনে কখনও দেবপূজা করা হয়নি তার
এসেছে যদি সে অকরুণ তুমি হয়ো না আর
শুনাতে এসেছে মরম-ব্যথার কথা সে যে
.                            শুন ব্যথা-কথা তার ||
খোল গো দুয়ার শঙ্কিত প্রভু হয়ো না তুমি
ফুল নাই মোর দিব না চরণে নিঃস্ব আমি
শুধু দাও গো নয়ন ভরিয়ে দেখিতে তোমা
.                             পুরাও কামনা তার ||

.              ****************
.                                                                                  
সূচিতে . . .     


মিলনসাগর
মুগ্ধ
কবি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়


প্রকৃতি রে তোর এত রূপ!
.             তাই তোরে এত ভালবাসি ||
আলোক-আঁধার সুখ-দুখ
.              মমতা-বেদনা-মাখা হাসি---
আঁখি দুটি মুদিয়াও হেরি ;
.              আমি তোরে নিশিথ শয়নে
হারাই হারাই পাছে তাই
.               আবাহন করি স্বপনে ||
রূপসী রে! একি লীলা তোর
.               পলকে পলকে নানা রূপ |
আত্মহারা, বুঝিতে না পারি
.                শুধু হেরি লীলা অপরূপ ||
রৌদ্রে ঝড়ে উন্মাদিনী বেশ
.                 ভীত তবু মুগ্ধ আত্মহারা |
যথা মার ক্রোধে কাঁদে শিশু
.                 থাকে নাক’ মার কোল ছাড়া |
বরষার কাম রূপে তোর
.                 উদ্দাম যৌবন লীলা হেরি,
মিলনের তপ্ত তৃষা জাগে
.                  ডাকি তোরে দুবাহু পশারি ||
আর আর নিতি নব রূপে
.                  প্রিয়া রূপে দে লো বুকে ধরা
নিবিড় নিবিড়তম ভাবে
.                  চিরকাল সর্বদুঃখহরা ||


.                **************

.                                                                                  
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
কত দিন রব আর
নয়নের মণি গেল
দূর হতে সমীরণ
বাসের সুবাস ভেবে
মাঝে মাঝে ছুটে এসে
কত আশে খুলি দ্বার
দোলা দিয়ে গাছ-পাতা
মনে হয় রথ তব
গৃহ-কাজে রত কভু
পাছে এসে ফিরে যাও
একদিন একবার
আঁখিজলে ভরে গেল
দৃষ্টির বেদনায়
সেই ফাঁকে কপোলেতে



.                           *************
প্রথম চুম্বন
কবি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
আশাপথ চাহিয়া |
হতাশায় কাঁদিয়া ||
নিয়া আসে ফুলবাস |
জাগে মনে কত আশ ||
দুয়ারেতে দেয় ঘা |
হাসে বায়ু হা হা ||
তোলে ধ্বনি মর্মর
এল ওই ঘর্ঘর ||
হইনি ত জীবনে |
র’লে আন্-মননে ||
পথে আঁখি পাতিতে
দেখে এক ব্যথিতে ||
পাতা এল ঢাকিয়া |
গেল চুমা আঁকিয়া ||



**************

.                                
সূচিতে . . .     


মিলনসাগর
আকিঞ্চন
কবি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়


সারাটি দিনের                     কর্ম সাঙ্গ
হল প্রভু এই সাঁঝে |
তবু কেন আমি                  পূর্ণতা খুঁজি
পাই না মর্ম মাঝে ||
এইবার ভাবি                 মোহিনী রূপসী
মহানিদ্রার সাথে |
সব শোক দুখ                 দূর করি দিব
ভারাতুর প্রাণ হতে ||
সব সারা হ’ল               তবু কেন মোর
নিদ্রা আসে না হায় |
মনে করে দাও             কি কাজ ভুলেছি
মিনতি তোমার পায় ||
বেজেছিল যবে                মোহন বাঁশরী
হৃদয় বৃন্দাবনে |
যায় নাই বুঝি                 পরাণ রাধিকা
শ্রীচরণ দরশনে ||
কুটিলা মোহের                পীড়নের ভয়ে
পারেনিক সে যে যেতে |
তাই বুঝি আর                নাহি অধিকার
কারা হতে ছুটি পেতে ||
আর একবার                 বাজায়ে বাঁশরী
জানাও আছ কি সেথা ?
সহিতে না পারি                   অপূর্ণতার
দারুণ মরম-ব্যথা ||
চলেছি এখনি               ভেবে যাক মোর
শরম ভরম মান |
বাহুবন্ধনে                         করহে বদ্ধ
কম্পিত তনুখান !
যদি নাহি থাক               গিয়ে থাক চলে
( তব ) চরণ-রেণুর পরে |
করিয়া শয়ন                   দাও ঘুমাইতে
শান্তিতে চিরতরে ||

*************

.                                                                                             
সূচিতে . . .     


মিলনসাগর
হাঘ’রে
কবি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়


গ’ড়ে কুঁড়ে ভেঙে চুরে
.              আজকে হেথা কালকে সেথা |
রে প্রকৃতির মরম দুলাল
.              মুক্ত পাখীর ওরে কল-কথা ||
শিশু যেমন হেথায় বেঁধে ঘর
ভেঙে, হোথায় গড়ে নিরন্তর
তেমনিতর বেড়াস ঘুড়ে তোরা
.              আজকে হেথা কালকে সেথা |
শঙ্কাবিহীন মুক্ত স্বাধীন প্রাণ
.               মুর্তিমন্ত ওরে সরলতা
পাখীর পালক ভূষণগুলি নিয়ে
গাছের পাতার শয্যা বেঁধে নিয়ে |
পিঠে বেঁধে ছোট ছেলে মেয়ে
.               এখান ছেড়ে কাল চলেছিস হোথা |
লেখা, নদীর ঢেউয়ের আখরে
.               ( ওরে ) অবিশ্রান্ত গতির মধুর গাথা ||
সন্ন্যাসেরই মন্ত্র তোদের বুকে
বিধাতা চকি পাঠিয়েছেন রে এঁকে
বিষয়েরই নাই ব্যাকুলতা
.               পেলেও তাতে নাইক মমতা
ভাঙা ঘরের ভাঙা বুকে ওই
.                ব্যথায় লেখা রয়েছে সে কথা ||
পূর্ণানন্দের পূর্ণ সাধক ওরে
অভাব দিয়ে ভাব ভরেছিস ঘরে
ক্ষূদ্রস্থানে হয় না সাধন তার
.                তাই বিশ্ব জুড়ে ঘুরিস যেথা সেথা
পূরবীতে গাওয়া গানের মাঝে
.                করুণ সুরে ওরে কোমল ব্যথা ||
প্রকৃতিরই ওরে নীরব কবি---
পরমহংস ভোগীর অতুল ছবি---
বসলি যেথা তোরাই সেথা রাজা---
.                 ধারিস না ক বিশ্বে কারও কথা |
পূর্ণানন্দ নীরব কবি
.                  মুক্ত পাখীর কণ্ঠে কল-কথা ||


.              *******************

.                                                                  
সূচিতে . . .     


মিলনসাগর