কবি উমা দেবীর কবিতা
*
বরতনু
কবি উমা দেবী
প্রমথনাথ বিশী ও তারাপদ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত কাব্যবিতান কবিতা সংকলন থেকে নেওয়া


.                                ১

সে বরতনুর কথা যে মুহূর্তে মনে পড়ে যায়
অমনি আকাশ-মন ভরে ওঠে রঙিন জ্যোত্স্নায় -----
স্বপ্নের সৌরভ ভাসে দক্ষিণ হাওয়ায়-----
.        তেমন---- তেমন তনু ক’টি দেখা যায় |
.                              আমার তো সাধ যায় সে বুকের আকাশে হারাতে,
.                    বাহুর সীমানা-ঘেরা অনন্তের নিদ্রাহীন রাতে
.                    সুধার শীতল দুটি চোখের তারাতে-----
.                  সে চোখে কিসের দিশা ক্ষণে ক্ষণে জ্বলে  অকারণ ?
.                                কে জানে ----- সে জিজ্ঞাসা কেমন !
আমি  তো তৃণের মত ভেসে গেছি দেহের জোয়ারে,
স্খলিত অশ্রুর মত ঝরেছি সে চোখের কিনারে,
 অঙ্গে অঙ্গে আবর্তের ক্রুদ্ধ ফেনভঙ্গে ভঙ্গে
.                                করেছি গাহন------
পিপাসার্ত রসনাকে সিক্ত করে দিয়েছে দাহন------
ভ্রূভঙ্গ-শিখায় পুড়ে ছাই হয়ে গেছে কোন্ পতঙ্গের মন ?
.                                কে জানে ------ সে জিজ্ঞাসা কেমন !
.                                আমার লেগেছে ভালো সে দেহের অত্যাশ্চর্য রূপ,
.                     তারই তপস্যায় যাক দগ্ধ হয়ে এ দেহের ধূপ !
.                                আমার লেগেছে ভালো সে চোখের শীতল আগুন,
.                     যাক না বিকল হয়ে বনে বনে সকল ফাগুন !
.                     আমার লেগেছে ভালো সে দেহের বিহ্বল সীমানা----
.                     সেখানে হারিয়ে যেতে আছে কার মানা  ?
.                               হারিয়ে যাওয়ার স্বাদ মধুর এমন !
.                                              কে জানে -------সে জিজ্ঞাসা কেমন !


.                                ২

আমার সে প্রিয় দেহে আছে এক মনোরম দেশ----
সেখানে পৌঁছলে পরে মিলবে না কারো কোনো একটু উদ্দেশ !
দেহের রহস্যে ঘেরা একটি দ্বীপের মত শ্যামল সে মন---
সেখানে পৌঁছতে হলে হারিয়ে আসতে হবে সমস্ত ভুবন !
.            সেখানে অপার এক রহস্যের সোনালি আকাশে
.            জগতের যত অশ্রু ----- তারার আভাসে
.            ভোরের আলোর নীচে ফুলের মতন হয়ে হাসে !
সেখানে অতল এক রহস্যের গভীর পাথারে
গোপন বেদনাগুলি মুক্তা হয় শুক্তির আধারে |
.                  মাঝে মাঝে সেখানেও ওঠে এক দক্ষিণ বাতাস
.            অমনি মুহূর্ত মধ্যে কি যে হয়ে ওঠে চারিপাশ-----
.            সুখ-ভারে বন্ধ  হয়ে আসে যেন বুকের নিঃশ্বাস !
.                                 সব স্বপ্ন গাঢ় হয়ে নামে----
.                      মনের গভীরে এসে থামে------
সে এক রহস্যময় দেহশায়ী মনোরম দেশ------
সেখানে পৌঁছলে আর পৃথিবীর থাকে না উদ্দেশ,
.                      মনে হয় এই তো অশেষ-----
.                            অশেষের আনন্দ এমন !
.                            কে জানে----- সে জিজ্ঞাসা কেমন !

                            
.                               ৩

.       তবু সে অশেষ নয়------আরো কাছে গহন গভীর,
.       সেখানে -----সেখানে নেই কোনো ভিড় এই প়থিবীর,
.       কোনো ঢেউ গান কিংবা স্বপ্ন জলধির |
.                  সেখানে একক এক আত্মা মহীয়ান্
.                  ধ্রুব-তারকার মত অজেয় অম্লান-----
.                  বিরাজিত আছে দিনমান |
সে তারার আলো যদি লাগে এসে পৃথিবীর গায়----
অমনি সমাজ আর সংসারের গ্রন্থিগুলি শ্লথ হয়ে যায় |
আমার প্রিয়ের মধ্যে অমনি মিলায় এসে সহস্র শতেক
.          ভাই বন্ধু পুত্র পিতা সম্পর্ক অনেক !
সমস্ত আলোক এসে একটি আলোয় করে আত্ম-নির্বাপণ-----
.                         গভীরের ব্রত-উদ্ যাপন !
কি ক’রে অনেক এসে তার মধ্যে এক হয়ে যায়-----
কে জানে সে কথা আর কে আছে সে রহস্য বোঝায় !
আমি তো পারি না কিছু বুঝে নিতে কি আছে কোথায় !
আমার দৃষ্টিতে এসে সে আলোক লাগে বার বার,
আমার মুষ্টিতে শুধু ধরা থাকে দেহ-দীপাধার |


.                                ৪

সে দেহ-দীপের কথা-----সে বরতনুর কথা যে মুহূর্তে মনে পড়ে যায়
অমনি আকাশ-মন ভরে  ওঠে নিবিড় জ্যোত্স্নায়-----
.              স্বপ্নের সৌরভ ভাসে দক্ষিণ হাওয়ায়-----
.               তেমন-- তেমন তনু ক’টি দেখা যায় !
আমার তো সাধ যায় সে তনুর আকাশে হারাতে,
অজস্র রূপের শিখা জ্বেলে নিতে চোখের তারাতে,
সহস্র সুখের স্মৃতি বেঁধে নিতে মনের কারাতে-----
.                              হার মেনে নিতে তার হাতে |
আমি তো তৃণের মত ভেসে গেছি দেহের জোয়ারে,
স্খলিত অশ্রুর মত ঝরেছি সে চোখের কিনারে,
একটু হাসির সঙ্গে জ্বলেছি সে অধরের পরে-----
একটু ক্লান্তির মত ডুবে গেছি ঘুমের সাগরে |
তার প্রতি রোমরূপে স্বহস্তে আপনি আমি রসকূপ করেছি খনন,
তার প্রতি বলিদানে পলাতক যৌবনকে করেছি বন্ধন,
অনন্ত ভঙ্গিতে তার-----আমারি-----আমারি শুধু প্রতিক্ষণে জীবন-মরণ !
.                            তাইতো আমারি সাধ সে বুকের আকাশে হারাতে,
.                বাহুর সীমানা-ঘেরা অনন্তের নিদ্রাহীন রাতে,
.                   যৌবন-রহস্যে ভরা বিষাদমধুর দুই নয়ন-তারাতে----
.                                    হার মেনে নিতে তার হাতে  ||

.                                      ***************  
.                                                                                           
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
হে নিশিথ প্রবলবর্ষণ
কবি উমা দেবী
শনিবারের চিঠি কবিতা-সংখ্যা থেকে নেওয়া   

রাত্রির কান্নার শব্দে পৃথিবী চৌচির!
কেঁদো না পৃথিবী আর। দেখ এই বর্ষণধারায়---
আমার চৌচির মন জোড়া লাগে---ধীরে ধীরে---
বর্ষার সমীরে
অজস্র বর্ষণ-পাতে---
অন্ধকার বলে যাকে মনে করো
সর্বস্ব-বিস্মারী সেই একমাত্র শীতল প্রলেপে।

এখন তো তোমরাও এলে।
ধীরে ধীরে---বসন্তসমীরে যেন দোলা লাগে ফুলেদের
.                                শিখরে শিখরে!
এতো বর্ষাকাল--- ভেসে এলো বর্ষণধারায়
অতীতের অন্ধ গুহা থেকে---আমার প্রাণের তটে।

আমার প্রাণের তটে সে প্রবল জোয়ারের নিষ্ঠুর ধাক্কায়
উপলে উপলে ঠেকা লেগে
কত গান কত স্মৃতি ফেনিয়ে ফেনিয়ে
---বয়ে গেল।
আমিও তো ডুবে গেছি।

হে নিশিথ প্রবল বর্ষণ! ধন্যবাদ নাও!
শুধু মুছে দিও না আমাকে।
উপলে উপলে ঠেকা লেগে---
সৃষ্টি করো আবর্তের ফেনিল অসীম
যে অসীমে গলে যায় কালসীমা---
হে নিশিথ প্রবলবর্ষণ!
হে নিশিথ প্রবলবর্ষণ!

.          ***************  
.                                                                                           
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
স্নান করো বিম্ববতী
কবি উমা দেবী
অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত বাংলা কবিতা সমুচ্চয়, দ্বিতীয় ভাগ, থেকে নেওয়া

স্নান করো বিম্ববতী
এ দুপুর বড়ই নির্জন---
এই ঘর নির্জন এখন।
একে একে আবরণ উন্মোচন করো---
শাড়ি সায়া চোলি ও পট্টিকা
দূর করো অঙ্গ থেকে---
স্নান করো বিম্ববতী।

দেখো বাগানের ছায়া রুদ্ধশ্বাস।
ভরা জৈষ্ঠ---নেই কোনো বর্ষণ আভাস।
পিত্তল রঙের রোদ দন্তক্ষত করেছে মাটিকে
পাখিরাও হঠাৎ উদাস!
ঘাম ঝরে---
তারও যেন শব্দ শোনা যায়
স্নান করো বিম্ববতী---
স্নান করো মর্ত্য-অমরায়!

প্রথমে পায়ের পাতা।
ফোলা ফোলা দু’পায়ের পিঠে ঢালো জল---
গড়িয়ে গড়িয়ে
মাটিতে আলপনা দিক জলধারা
পাথরের শীতল মেজেয়
পা রেখে শীতল জল ঢালো---
ঢালো জল পায়ের পাতায়।
ধরিত্রী-জননী যেন
পদতল করেন রক্ষণ।
স্নান করো বিম্ববতী---
সুবৃত্ত সরল দুই জঙ্ঘার দৃঢ়তা
বাসুকি করুন রক্ষা।

জলের ধারায়
জ্বালা দূর করো।
সূর্যতাপে তপ্ত দ্বিপ্রহর---
শিরায় শিরায় ঢালে
মাদকের দাহ!
গুল্ফ-পার্ষ্ণি জানুগ্রন্থি দু’টি
জল ঢেলে ঠাণ্ডা করো।
উপরে ঊরুর ঢাল---
চাপ চাপ কোমল মাংসের
সুবিন্যস্ত পেশীর সুরূপ
ঈষৎ বেপথুমান---
কামের বিশ্রামবেদী
সুরক্ষিত রাখুন নিজেই।

স্নান করো বিম্ববতী---
স্নান করো প্রাণের ধারায়
শীতল সুতীক্ষ্ণ ক্ষিপ্র প্রবাহের চাপ
অঙ্গ থেকে ধুয়ে দিক অতনু-উত্তাপ।
চতুরস্র নিতম্বের প্রতিস্পর্ধী কোমল ত্রিভুজ
সাবিত্রী সহায় হয়ে
যজ্ঞব্রতী চতুর্মুখ করুন রক্ষণ---
সৃষ্টির রহস্য-তীর্থ।

জল ঢালো নিম্নোদরে ত্রিবলী-প্রাকারে---
ক্রমশ উপরে ওঠো।
নাভি ও নিতম্ব কূপে। শ্রোণির ফলকে
ঢালো পুণ্য জলধারা।
ঊর্ধ্ব অঙ্গ ক্রমশ উদার--- স্তব্ধ
বাহুকূপ স্কন্ধ গ্রীবা পৃষ্ঠ বক্ষোদেশ
-সুবৃত্ত-যুগল
চন্দদের সুরক্ষিত রাখুন সর্বদা।

স্নান করো বিম্ববতী,
স্নান করো।
জৈষ্ঠের আকাশ দেখো পিত্তল-পাণ্ডুর
মোহাতুর--- মদাতুর---
জলের ঝাপ্টা দাও
মুখে আর কর্ণপৃষ্ঠে
চিবুকে অধরে ওষ্ঠে কপোলে কপালে
সূর্যদেব সুরক্ষিত রাখুন নয়ন।

ঢালো জল নির্মল শীতল
ব্রহ্মরন্ধ্র-সহস্রারে---
উচ্ছ্বসিত জলধারা
অঙ্গের উত্তুঙ্গ সব শিখরে শিখরে
ঝর ঝর ধারায় ঝরুক
প্রত্যঙ্গ উপাঙ্গ ছুঁয়ে ছুঁয়ে।
মহেশ্বর সে ধারাকে করুন রক্ষণ।

স্নান করো বিম্ববতী---
স্নান করো।
বিশ্বের কাঠিন্য--- আর জড়তা নিঃশেষ করে
নারী-অঙ্গ করুন কোমল,
করুণার্দ্র বরুণ দেবতা!
নারীচিত্ত করুন নির্মল।

স্নান করো বিম্ববতী!
স্নান করো!
উত্তাল ও জলসিক্ত মুক্ত কেশপাশ
কেশব করুন রক্ষা।
নাসারন্ধ্র ভরে যাক অমর্ত্য সৌরভে
অঞ্জলি অঞ্জলি
জল ছুঁড়ে ছুঁড়ে সর্ব দাহকে জুড়াও।

স্নান করো বিম্ববতী--- স্নান করো।
এ জৈষ্ঠের অসহ্য-উত্তাপ দ্বিপ্রহরে
স্নান করে জুড়াও হৃদয়।

.          ***************  
.                                                                                           
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
কেহ শুনিতে কি চাও গোপন প্রাণের প্রথম প্রেম
কবি উমা দেবী
শনিবারের চিঠি, মাঘ ১৩৪৮ (জানুয়ারি ১৯৪২) সংখ্যা থেকে নেওয়া

ছায়া-ছবি


.                          ***********************************  
.                                                                                           
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
সহসা বাদল নামিল আকাশে ফাগুন-দিনে
কবি উমা দেবী
শনিবারের চিঠি, চৈত্র ১৩৪৮ (মার্চ ১৯৪২) সংখ্যা থেকে নেওয়া

মানস-বাদল


.                          ***********************************  
.                                                                                           
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর