
| কবি উত্পলকুমার বসুর কবিতা |

| ছায়াপথ কবি উত্পলকুমার বসু অগ্রন্থিত কবিতা সংকলন থেকে নেওয়া ১ যে-পাখি ডাকল আজ ভোরবেলা, অনিশ্চিত ভাবে, সে-ও জানে আমার যাত্রা শুধু নিরক্ষরতার দিকে----- পড়ে রইল ভাঙা চশমা, ছেঁড়া খাতা, দু-টুকরো পেনসিল, আর ফাটা শ্লেট, খড়িগুঁড়ো, উলটানো দোয়াতের কালি, যেন রাক্ষস নেমেছে পথে যেন দৈত্যের কালো চুল ঢেকে ফেলছে চতুর্দিক---- সবিতা কোথায় ? ২ প্রতিটি স্বপ্ন আজ উদ্বেগের, ভয়াবহতার | গভীর ঘুমের মধ্যে কেটে গেল রাত | বৃষ্টি হয়েছিল | তবু সে-ঘুম ভাঙেনি | পথে পথে কুকুর ডেকেছে আর সৈন্যরা ঢুকেছে স্বপ্নে ত্রাস ও হিংসা হয়ে--- খুঁড়ে ফেলেছে ক্ষেত, জমি, মরুপথ, গ্রামের কবর, খুঁজে ফিরছে সুপ্ত হাড়, মৃত মাংস, মুক্তির বাসনা আজকের, বহু পলাতক প্রাণের ৩ ওদের চিনেছি | ঐ স্মৃতি, ঐ মনে-পড়া, ঐ বিস্মরণ-স্মরণের মুখাবয়ব এত লজ্জার কথা, এত হতাশার অশ্রু, এত ধূর্ত প্রতারণা, ব্যক্তি ও প্রতিপুরুষের প্রাণ, তার হাহাকার, তার অমর ইশারা, স্বপ্নের প্রান্ত জুড়ে শ্বাপদের নখে উপরানো রক্ষীর পায়ের শব্দে, নিদ্রাহীন তালা ও চাবির আর্তনাদে----- ৪ কোথাও নেমেছে বৃষ্টি কাল রাতে, এই দেশে নয়, আমরা তো লোভের শিকার, মাটি-পৃথিবীর নর, ভূকম্পিত প্রকৃতির নারী, তবু পরাধীন নই, নই ঋণগ্রস্ত , দায়দাস, বাতাস বইছে দূর লোকালয়ে জলকণাবাহী, আজ প্রাচীরে দ্বারস্থ আমরা, আমাদের প্রবেশের অনুমতি নেই, ঐ ফকটের বাইরে দাঁড়িয়ে–থাকা মানুষজনের মধ্যে আমিও আছি ওখানেই অস্তিত্ব আমার----- ৫ একদিন ছিল বিচরণ কোমল আলোর দেশে, গোধূলিবেলায় চাঁদ ছিল সারারাত, ভ্রূণরূপী সূর্য ছিল ঊষাকালে , শস্যের সুবাতাস ছিল, ছিল সব্ জির স্বাধীনতা, ছিল জলে-ভরা হ্রদ, শুনেছি কিন্নরকন্ঠ, মরু-উদ্যানের কলোচ্ছ্বাস, দিন মানে কাজ, রাত্রি মানে বিশ্রাম, যূথগান, বাহুবদ্ধ নাচের শৃঙ্খলা, বাজারে, পাহাড়প্রান্তে, বাড়ির অঙ্গনে---- ৬ হায়, দিন কাটে জ্বরের তাড়সে, বন্দীশালার দ্বারে, দুরারোগ্য অসুখে মানুষ যেন-বা প্রতিটি অযুধে আস্থা পায়, সব অনুপান সহজে গ্রহণ করে, ভাবে এ-ভাবেই ব্যাধিমুক্তি, রক্ষীদল প্রযুক্তির হাভাতে সন্তান, আমিও কি বিপরীত মূর্খের মিছিলে স্বেচ্ছায় নামিনি, উপলব্ধিহীন চিত্কারে নাগরিক ঘরে ঘরে ভয়ের সংক্রমণ নির্দ্বিধায় বিস্তার করিনি---- ৭ ক্রমে মূক চৈতন্যের মুখোমুখি আর এক চৈতন্যোদয় হতে থাকে, তাই আশা, তাই ঐ ভূয়োদর্শী পাখিটির স্বর, সে-ও জানে প্রতিটি পুস্তকে আজ বিষের ছত্রাক, প্রতিটি গ্রন্থাগার শ্বাপদসঙ্কুল, তত্ত্বের গভীরে ত্রাস, জ্ঞানের পিছনে মিথ্যা, বিদ্যার আড়ালে বিকার, সবিতা কোথায়, সবাই খুঁজছে তাকে অন্ধকারে, বুঝি ভোর হয়ে এল, বুঝি আলো দেখা যায়, তাই আশা ----- ৮ চাই চিকিত্সা যা নিরঞ্জন, রোগ যেন কেটে যায়, মেঘ আসে, ছায়া নিয়ে আসে, আলো আসে রামধনু নিয়ে, বর্ণালীর সাত রং ইরাক ও আফগানিস্তান প্লুত করে, শুনি সহাস্য শিশুর কন্ঠ, মায়ের অমৃত গান, রাক্ষসের বিরুদ্ধে পুরুষ দানবের সম্মুখে কিশোর, যুদ্ধবাজ সৈন্যের সামনে বালিকা, এই ভালো হয়ে-ওঠা, এই আরোগ্যদর্পণে কবিতার আশ্চর্য উদ্ভাস | . ************************* . সূচিতে . . . মিলনসাগর |