পদ্মপাতা উল্টে যাচ্ছে জলে
কবি উত্পলকুমার বসু
বক্সীগঞ্জে পদ্মাপারে কাব্যগ্রন্থের ১২ নম্বর কবিতা





















.         *************************      
.                                                                               
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর   
কবি উত্পলকুমার বসুর কবিতা
*
সংসার
কবি উত্পলকুমার বসু
খণ্ডবৈচিত্র্যের দিন কাব্য গ্রন্থ থেকে নেওয়া


যেন সে ফুটেছে ফুল, জলে নয়, জলান্তরে নয়,
জলন্ত উনোন ব্যেপে যে-লতা জন্মে ওঠে তারই ফুলে
আমার সময় লেলিহান,  তারও বাস্তবতা হয়---
ক্ষুধা ও বায়ুর মতো, যৌনতায় উঠেছিল দুলে
এই তো আজকে ভোরে, আমি বাথরুমে যাবার নামে
খুলে রেখেছি দুয়ার হেঁসেলের, ভয়
ও-পথেই এসে থাকে,  দেখি প্রচণ্ড আগুন,  দেখি শাদা ফুল ঘামে,
দেখি বিছানায় পদচিহ্ন,  দৈত্যের এখানে আশ্রয়
তা-হলে নিশ্চিত হল, নিশ্চয়তা-নাম্নী এক উনোনের পাশে
আমার দু’দণ্ড বসা, ফুঁ দেওয়া, জৈবফুল পুড়ছে নিশ্বাসে |


জর্দালতায় তুমি পানপাখি বসে আছো, ঠোঁট লাল, সবুজ পালকে
সুপুরি লুকানো আছে, পায়ে বিষ্ঠা, চুনাদাগ | তোমার স্বাতন্ত্র্য বলে
কিছু নেই, জেদ আছে, খোঁড়াখুঁড়ি আছে,
মাটির অল্প নিচে রাঙা আলু, প্রকৃতিতে যথার্থ হেঁসেল, উপরে আগুন,
নুনজল বাতাসে ফুটছে----
আমি শুধু বোঝাতে এসেছি | শোনো, আমার উনোন
অমনই একান্নবর্তী,  প্রকৃতিরই মতো,  রবিবার,  অনেক অতিথি,
পেঁয়াজ-হলুদে শিলপাটা থৈ থৈ, এসো, মাথা পাতো ছুরির ধারের নীচে---
     
জর্দালতার রৌদ্র ঝলসে ওঠে, রক্ত ঝরে--- রান্না ও নিয়তি প্রস্তুত |

.                   *************************      
.                                                                               
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর   
*
*
সংহিতা
কবি উত্পলকুমার বসু
শ্রেষ্ঠ কবিতা কাব্য গ্রন্থ থেকে নেওয়া


রঙে ছুপানো হাত এই,  হে বৈয়াকরণিক,
জানি, পাণিনি তোমার নাম, ঋকনাথ, দিক
তোমাতে চিহ্নিত হয়, বর্ণভাঙা শ্লেষাত্বক লাল
রাক্ষসরক্তের বুকে মীনাঙ্কন হলুদ সকাল,
দ্যাখো পাথরবালিশ, এই কব্জির উথ্বান, এই পাতাছেঁড়া বই
অযত্নে লিখিত, পাশে গালামোহরের উল্কি, কই
চর্চাফুল, স্নেহফল ? কিছু যারা দিতে পারে তারা
বুঝি এখনো আসেনি ? হায়, হাত দুটি অন্ধপারা
রঙে লিপ্ত, জ্যোতিহীন, দেয়াল আঁকড়ে ধরে আগুয়ান----
প্রকৃতিপ্রত্যয়বোধে, ধাতুরূপে, যা-কিছু প্রমাণ
মানবউক্তিতে আছে--- এই ধন্দে ; তাকে ছন্দের নিয়তি
গুহার গভীরে ডাকে, খাদের খনিজে ডাকে, সতী
জ্বলন্ত আগুনে ডাকে ;আজ কবিতা বা অন্ত্যমিল তথা
শুধু রঙ, চিত্রার্পিত রেখাপাত---- নয় কোনো কথা |


এ-দেহ সঙ্কেতময়, তুমি পড়ো, তুমি পাঠ করো,
পাঁচটি আঙুলে ধরা অস্ত্রখণ্ড, তবু মন ভয়ে জড়োসড়ো---

ললাট আলেখ্যপ্রায়, ধাতা জগতের এ-প্রতিফলন,
দেহ,  যার ক্ষয় নেই, অশ্বহীন রণ,

সেতুহীন নদী, তার ঘাটে ঘাটে জ্বলছে শিবির,
গতরাত্রির যুদ্ধে, ক্ষণপক, তুমি নাকি বীর

প্রতিপন্ন হয়েছিলে ? অন্য পাড়ে কারা ছিল—কাদের বিলাপ
এখনও শুনছ তুমি ? জানো, যুদ্ধ শেষ | শুধু হিংসার অবলীঢ় তাপ

কিছু অবশিষ্ট আছে | আছে বটবৃক্ষে মানত, বাঁধুনি
এবং দেয়াল ঘেঁষে, মৃত্তিকায়, ফেটে যাওয়া মূর্তি শাক্যমুনি |

.                *************************      
.                                                                               
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর   
*
বারাণসী
কবি উত্পলকুমার বসু
অগ্রন্থিত কবিতা সংকলন থেকে নেওয়া

তাঁর আঁকা ছবির সামনে চুপচাপ বসে থাকি, দেখি ভাঙছে
বারাণসী, দেখি নদী, তার ঘাট মণিকর্ণিকার, দেখি ছায়াছন্ন
মানুষের আকারপ্রকার, জলে স্নানেও নামেনি কেউ, যা অসম্ভব
মনে হয়, তাহলে কি ছবির আড়ালে নিভৃত বার্তা আছে ধ্বংসের,
ধসে-পড়া সিঁড়ি-দালানের ---স্রোতহীন, নৌকাহীন নগরলেখায়
দু-একটি বানর দেখেছি, হয়ত-বা গবাদিপশুর গমনপথ---শুনি গান,
শুনি সানাইবাদন, বিসমিল্লা খান নামে এক দেবদূত যন্ত্র হাতে
তুলে নিয়েছেন, আমাদের বলছেন----আমি আমেরিকাতেও চলে
যেতে পারি, কিন্তু এই বৃদ্ধা গঙ্গা কি সঙ্গে যাবেন, নিয়ে যেতে
পারব কি ঐ গাছ যার নীচে সূর্যাস্তে ও উষাকালে রোজ বসে থাকি,
আর ঐ কয়েকজন অতিথি-ভিখারি, তাদের নিত্য আহার যোগাবে কে,
কোন প্রেসিডেন্ট, কোন রাষ্ট্রনেতা ----

ভাবি এ-সব প্রশ্নের জবাব চিত্রকর গনেশ হালুই জানতেও পারেন |

.                *************************      
.                                                                               
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর   
পরমা, আহত-গতি, ছিন্ন মিথ্যা ও প্রত্যয়
কবি উত্পলকুমার বসু
বক্সীগঞ্জে পদ্মাপারে কাব্যগ্রন্থের ২২ নম্বর কবিতা














.         *************************      
.                                                                               
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর   
*
*
ছায়াপথ
কবি উত্পলকুমার বসু
অগ্রন্থিত কবিতা সংকলন থেকে নেওয়া


যে-পাখি ডাকল আজ ভোরবেলা, অনিশ্চিত ভাবে,
সে-ও জানে আমার যাত্রা শুধু নিরক্ষরতার দিকে-----
পড়ে রইল ভাঙা চশমা, ছেঁড়া খাতা, দু-টুকরো পেনসিল,
আর ফাটা শ্লেট, খড়িগুঁড়ো, উলটানো দোয়াতের কালি,
যেন রাক্ষস নেমেছে পথে
যেন দৈত্যের কালো চুল ঢেকে ফেলছে চতুর্দিক----
সবিতা কোথায় ?


প্রতিটি স্বপ্ন আজ উদ্বেগের, ভয়াবহতার |
গভীর ঘুমের মধ্যে কেটে গেল রাত | বৃষ্টি হয়েছিল |
তবু সে-ঘুম ভাঙেনি |
পথে পথে কুকুর ডেকেছে আর সৈন্যরা ঢুকেছে স্বপ্নে
ত্রাস ও হিংসা হয়ে---
খুঁড়ে ফেলেছে ক্ষেত, জমি, মরুপথ,  গ্রামের কবর,
খুঁজে ফিরছে সুপ্ত হাড়, মৃত মাংস, মুক্তির বাসনা
আজকের, বহু পলাতক প্রাণের


ওদের চিনেছি |
ঐ স্মৃতি, ঐ মনে-পড়া, ঐ বিস্মরণ-স্মরণের মুখাবয়ব
এত লজ্জার কথা, এত হতাশার অশ্রু, এত ধূর্ত প্রতারণা,
ব্যক্তি ও প্রতিপুরুষের প্রাণ, তার হাহাকার, তার অমর ইশারা,
স্বপ্নের প্রান্ত জুড়ে শ্বাপদের নখে উপরানো
রক্ষীর পায়ের শব্দে, নিদ্রাহীন তালা ও চাবির আর্তনাদে-----


কোথাও নেমেছে বৃষ্টি
কাল রাতে, এই দেশে নয়, আমরা তো লোভের শিকার,
মাটি-পৃথিবীর নর, ভূকম্পিত প্রকৃতির নারী, তবু পরাধীন নই, নই
ঋণগ্রস্ত , দায়দাস, বাতাস বইছে দূর লোকালয়ে জলকণাবাহী,
আজ প্রাচীরে দ্বারস্থ আমরা, আমাদের প্রবেশের অনুমতি নেই,
ঐ ফকটের বাইরে দাঁড়িয়ে–থাকা মানুষজনের মধ্যে আমিও আছি
ওখানেই অস্তিত্ব আমার-----


একদিন ছিল বিচরণ
কোমল আলোর দেশে, গোধূলিবেলায়
চাঁদ ছিল সারারাত, ভ্রূণরূপী সূর্য ছিল ঊষাকালে ,
শস্যের সুবাতাস ছিল,  ছিল সব্ জির স্বাধীনতা, ছিল জলে-ভরা হ্রদ,
শুনেছি কিন্নরকন্ঠ, মরু-উদ্যানের কলোচ্ছ্বাস, দিন মানে কাজ,
রাত্রি মানে বিশ্রাম, যূথগান, বাহুবদ্ধ নাচের শৃঙ্খলা,
বাজারে, পাহাড়প্রান্তে, বাড়ির অঙ্গনে----


হায়,  দিন কাটে জ্বরের তাড়সে,
বন্দীশালার দ্বারে, দুরারোগ্য অসুখে মানুষ যেন-বা প্রতিটি
অযুধে আস্থা পায়, সব অনুপান সহজে গ্রহণ করে, ভাবে
এ-ভাবেই ব্যাধিমুক্তি, রক্ষীদল প্রযুক্তির হাভাতে সন্তান, আমিও কি বিপরীত
মূর্খের মিছিলে স্বেচ্ছায় নামিনি,  উপলব্ধিহীন চিত্কারে
নাগরিক ঘরে ঘরে ভয়ের সংক্রমণ
নির্দ্বিধায় বিস্তার করিনি----


ক্রমে মূক চৈতন্যের
মুখোমুখি আর এক চৈতন্যোদয় হতে থাকে,
তাই আশা, তাই ঐ ভূয়োদর্শী পাখিটির স্বর, সে-ও জানে
প্রতিটি পুস্তকে আজ বিষের ছত্রাক, প্রতিটি গ্রন্থাগার
শ্বাপদসঙ্কুল, তত্ত্বের গভীরে ত্রাস, জ্ঞানের পিছনে মিথ্যা,
বিদ্যার আড়ালে বিকার, সবিতা কোথায়, সবাই খুঁজছে তাকে অন্ধকারে,
বুঝি ভোর হয়ে এল, বুঝি আলো দেখা যায়,
তাই আশা -----


চাই চিকিত্সা যা নিরঞ্জন,
রোগ যেন কেটে যায়, মেঘ আসে, ছায়া নিয়ে আসে, আলো আসে
রামধনু নিয়ে, বর্ণালীর সাত রং ইরাক ও আফগানিস্তান প্লুত করে,
শুনি সহাস্য শিশুর কন্ঠ, মায়ের অমৃত গান, রাক্ষসের বিরুদ্ধে পুরুষ
দানবের সম্মুখে কিশোর, যুদ্ধবাজ সৈন্যের সামনে বালিকা,

এই ভালো হয়ে-ওঠা, এই আরোগ্যদর্পণে
কবিতার আশ্চর্য উদ্ভাস |

.                *************************                 
.                                                                               
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর