কবি উত্তম দাশ-এর কবিতা
যে কোন গানের উপর ক্লিক করলেই সেই গানটি আপনার সামনে চলে আসবে।
*
সামনে দিঘি ছবির মতো রাজহাঁস ভেসে বেড়াচ্ছে
("ঠাকুরপুকুর থেকে" কাব্যগ্রন্থ থেকে)
কবি উত্তম দাশ

সামনে দিঘি :ছবির মতো রাজহাঁস ভেসে বেড়াচ্ছে
বাগানে সবুজ এত ঘন যেন বৃষ্টি ঝরাবে এক্ষুনি
দুপাশে আত্মীয়ের মেলা যারা পরিজনদের জন্য
উত্কন্ঠায় গোল হয়ে ঘিরে গল্প করছে,
পেছনে ঝিকঝিক শব্দে চলে গেল ট্রয় ট্রেন
পরের স্টেশনে কলকাকলি ঘিরে ধরবে
শনগাছের সবুজ খুব গভীর, অথচ স্নেহ শব্দের
কোন সন্মোহন তারা শেখেনি, এমন জড়িয়েছে
বাহারি ঝাউয়ের দল শুধু অক্সিজেন চাইছে
আর সালোকসংশ্লেষের মতো একটু খানি স্পেস |
কিন্তু সেই তুমি শুয়ে আছ যে কেবিনে
মাদার টেরেজার শান্তির কুটির
সেখানে রেডিয়েশন নিতে নিতে কতজন জীবনের
স্বপ্ন দেখেছে, আহা বেঁচে থাকার আনন্দ
এই প্রকৃতিলগ্ন আবাসনে কত ভাবে
আস্বাদ করছি আমরা |

এই প্রকৃতি কত কুহক ছড়াচ্ছে
ঝিলের মাছেরা রূপ দেখিয়ে যাচ্ছে সারাবেলা
চারদিকে ঘুরছে, বেড়াচ্ছে কত মানুষ
তারা কেউ প্রকৃতি দেখছে না, তাদের চলাচলে
চোখে মুখে যেন জীবন থেমে আছে |

এই সৌন্দর্যভূমিতে সবুজ কথা বলছে
বর্ষার বৃক্ষলতা তরঙ্গ তুলছে শরীরে
অথচ চলমান এই মানুষের মেলায়
কেউ কোন শব্দ করছে না |

.             ******************     
.                                                                                  
সুচিতে...   


মিলনসাগর
*
এত আলো আর সবুজের সমারোহে
("ঠাকুরপুকুর থেকে" কাব্যগ্রন্থ থেকে)
কবি উত্তম দাশ

এত আলো আর সবুজের সমারোহে
শিশুরা যখন কলহাস্য করে উঠল
কেউ সাহস করে আর মৃত্যুর কথা বলে নি  |

লেকের জলে মাছেরা নির্ভীক খেলছে
রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে তোমরা সুন্দরের কথাই
তো বলাবলি করছিলে. তাহলে
এখানে মৃত্যুর কথা আসে কি করে |

অ্যাম্পি থিয়েটারের প্রাঙ্গন উলুবন
ঢেকে ফেলেছে, চাতালে যারা কোমলধৈতবে বসে
তাদের চোখে মুখে কোথাও মৃত্যুর কথা নেই |

পৃথিবীটা বড় সুন্দর হে
শুধু তাকে দেখতে শেখো,
জীবন শব্দের প্রকৃত অর্থ কিন্তু মৃত্যু
তার রঙ নিয়ে এত চিন্তার কি কথা
শুধু আত্মসমর্পণ করতে শেখো, আত্মসমর্পণ |

ঠাকুরপুকুরের সরোজ গুপ্ত, সুছন্দা
সারাক্ষণ মৃত্যু সরিয়ে সরিয়ে জীবনকে খুঁজছেন

হে জীবন হায় জীবন, তোমার ধ্যান কেন
আমার তপস্যা হলো না  |

আমি দাঁড়িয়ে আছি যে সীমান্তে
তার পাশ দিয়ে টয়ট্রেন চলে গেল

এই মুহূর্তে, সামনে লিনাক বিভাগে
জীবনের জন্য হন্যে হয়ে আছে কতজন
ছন্দাদি তাদের নিরাময়ে নিজের উষ্ণতা
জড়িয়ে দিলেন----- আমরা কেউ হেরে যেতে পারিনি  |

জীবন এক আশ্চর্য রহস্য
মৃত্যু তাকে শুধু সুন্দর করে তোলে  ~

.             ******************     
.                                                                                  
সুচিতে...   


মিলনসাগর
*
আমাদের কত স্বপ্ন ছিল
("ঠাকুরপুকুর থেকে" কাব্যগ্রন্থ থেকে)
কবি উত্তম দাশ

আমাদের কত স্বপ্ন ছিল, কত ভালোবাসার গল্প
সব কিছু এই মাদার টেরিজার শান্তির কুটিরের
ছাব্বিশ নম্বর কেবিনের দরজার সামনে থেমে গেল |

বাইরে বৃষ্টি-ভেজা প্রকৃতি, ভরা শ্রাবণ
সত্যিকারের বিরহের ঋতু, এত আক্ষরিকভাবে
এত সদাশয় প্রবচন কেন সত্য হলো আমার জীবনে |

এই বৃষ্টিতে ভিজছে সামনের দিঘি, রাজহাঁসগুলো
নিজের মতো চরে বেড়াচ্ছে, বৃষ্টিধারায়
চারদিকে উথলে উঠছে সবুজ
আমিই যেন এক পরবাসী এই পরিবেশে  |

ঠান্ডা ঘরে রেডিয়েশনের যন্ত্রণা কি কমেছে তোমার,
টিভির এই সব সিরিয়ালে ভুলিয়ে দিচ্ছে যন্ত্রণার অনুভূতি ;
আজ জানো, শিশুবিভাগের
উদ্যান থেকে উলুঘাসের উচ্ছেদ হলো
কাল তুমি নির্ভয়ে হাঁটতে পারবে রাস্তা দিয়ে

শিশুবিভাগের সামনে দিয়ে হাঁটতে তোমার শরীর নয়
মন চায় না, রেডিয়েশনে কালো শরীর, নাকে নল
শৈশবেরা ঘুরে বেড়াচ্ছে, ঈশ্বর কি আর একটু
করুণাময় হতে পারতেন না  !

শিশুরা হলো জগতের নির্মল আনন্দ
তাদের রাজ্যে এই দুরারোগ্য যিনি স়ষ্টি করেন
তাকে আর ঈশ্বর বলা যাবে না কখনো |

চল আমরা  টয় ট্রেনের পত ধরে
স্টাফ ক্যানটিনের সামনে দিয়ে
আমাদের শান্তির কুটিরে ফিরে যাই,
সেখানে সরোজ গুপ্ত তোমার জন্য
নিরাময় বিছিয়ে রেখেছেন  |

.             ******************     
.                                                                                  
সুচিতে...   


মিলনসাগর
*
গাছ গাছালির সঙ্গে ঝিলের একটা সখ্য আছে
("ঠাকুরপুকুর থেকে" কাব্যগ্রন্থ থেকে)
কবি উত্তম দাশ

গাছ গাছালির সঙ্গে ঝিলের জলের সঙ্গে একটা সখ্য আছে
ঝুঁকে পড়ে নিজেদের ছবি দেখে, আর শাখাবাহু মেলে
একি আনন্দ কি আনন্দ বলে ঝিলের জলে যে
আলোড়ন তোলে, তাকে অনায়াসে তুমি বলতে পার জীবন,
কাঠের সাঁকোয় দাঁড়িয়ে যারা মাছের খেলা দেখছিল
তারাও কিন্তু প্রকৃত জীবন নিয়ে ভাবছিল, গাছগাছালি
আর ঝিলের সঙ্গে এই জীবনকে আবার নতুন করে চেনা হলো |

আচ্ছা প্রকৃতির কি মৃত্যুচেতনা আছে
তারা কি বুঝতে পারে জীবনের ভাষা
মানুষকে কেমন মনে হয় তাদের
এ সব ভাবতে ভাবতে লিনাক সেন্টারের সামনে দিয়ে
সেই ঝিলের পাড়ে গিয়ে দাঁড়ালাম,
সাহসী মাছেরা শরীর-শিল্প দেখিয়ে ঘুরছে
জলজ উদ্ভিদ, উলুঘাস, বাহারি ঝাউ
কিংবা কাঠখোট্ট খেঁজুরগাছ কৃষ্ণচূড়া
শিশুগাছের দল মাঝে মাঝে বৃষ্টিতে ভিজছে
আর জীবন শব্দ নিয়ে উদ্দাম লোফালুফি করছে |
চারপাশের মানুষরা এ সব দেখছে
তারা হাঁটছে কিন্তু গতি নেই, কথা বলছে
কিন্তু শব্দ নেই, প্রকৃতির মধ্যে থেকেও তারা নেই,
বহনের যোগ্য একটা শব্দই তারা সঙ্গে নিয়ে ঘুরছে
যে শব্দের অর্থ থেমে যাওয়া

তুমি কার পক্ষে খেলবে জীবন না মৃত্যুর ?

.             ******************     
.                                                                                  
সুচিতে...   


মিলনসাগর
*
সপ্তাহে পাঁচ দিন লিনাক সেন্টারে
("ঠাকুরপুকুর থেকে" কাব্যগ্রন্থ থেকে)
কবি উত্তম দাশ

সপ্তাহে পাঁচ দিন লিনাক সেন্টারে
আলোর সূক্ষ্ণ কণাগুলো তোমার স্তনের মাধুর্য
শুষে নিচ্ছে | হুইল চেয়ারে বসে চিন্তাহরণ দাসের
জলাশয়ে রাজহাঁসের খেলা দেখতে দেখতে
একত্রিশ দিন থেকে আর একটা দিন বাদ দিচ্ছ
আর ঠোঁট চেপে যন্ত্রণার গোপন অনুভূতিগুলো
মুছে ফেলছো শরীর থেকে, তোমার ভঙ্গি বলছে---
দেখো ঠিক ফিরবো জীবনের মধ্যে |

ঠান্ডা ঘরে টিভি চলছে, খবর হচ্ছে, মাঝে মাঝে
সিরিয়াল, সবকিছু ছাপিয়ে আমরা শৈশব নিয়ে
কথকতা করছি, পূর্ববাংলার সেই ধর্ষণ-চিহ্নিত দিন
আর তোমার একাকী শৈশব, খুব ভাব বিনিময় হলো,
কিশোর জীবনের উদ্দাম দিনগুলোর ভেতর দিয়ে
যেতে যেতে আমরা পরস্পরকে চিনছি, আমরা
পাপ শব্দকে জেনেছি, প্রেম শব্দে কেন শরীর
ব্যাকুল হয়, সে সব জিজ্ঞাসার উত্তর তো কারো জানা
ছিল না, তাই আমরা নীলাঙ্গুরীয় পড়তে পড়তে
গোপন করেছি নিজেদের যন্ত্রণা

তোমার কি যন্ত্রণা হচ্ছে খুব, প্রাণায়ামের পরে
ধ্যানস্থ হও, খালি করে দাও নিজেকে

জীবন এক প্রবাহ
এসো সবাই মিলে ভোগ করি তাকে |

.             ******************     
.                                                                                  
সুচিতে...   


মিলনসাগর
*
সেদিন লিনাক সেন্টার থেকে একত্রিশ নম্বর
("ঠাকুরপুকুর থেকে" কাব্যগ্রন্থ থেকে)
কবি উত্তম দাশ

সেদিন লিনাক সেন্টার তেকে একত্রিশ নম্বর
রেডিয়েশন নিয়ে ফিরছো, কাল আমরা
বাড়ি ফিরবো, আজ খুব সবুজ লাগছে গাছপালা
ঝিল থেকে চোদ্দজনের রাজহাঁসের দল নিজেদের
মধ্যে ভাব বিনিময় করছে, এমন সুন্দর গ্রীবা
আর কখনো দেখোনি তুমি, পালকের ধূসর
আজ অনেক উজ্জ্বল, আরে দেখ টয়ট্রেন
যাচ্ছে আর আনন্দ উথলে উঠছে কামরার মুখগুলিতে,
শিশুরা তো মৃত্যুর কথা জানে না, তাই মারণ-ব্যাধি
বয়ে নিয়েও এমন আনন্দের কথা বলতে পারে |

মাদার টেরিজার শান্তির কুটির আজ অনেক
সহনশীল মনে হচ্ছে, সামনের লনের সবুজ বিন্যাসে
এই প্রথম বসতে ইচ্ছে হলো তোমার, হঠাৎ
বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দিল, আজ আর মনখারাপ
হলো না, সেই মালবিকার মতই তুমি
হেসে উঠলে আজ, আজ দিনটা শুভ
সুছন্দা ডাক্তার বলেছিলেন অভিশাপ মুক্তির দিন |
চব্বিশ নম্বরের দরজা খুলে, আজ শুভ দিন তো---- তাই
স্বর্গ থেকে দেবদূত তোমার চেয়ারে বসে----
ঈশ্বরের ভাষায় কথা বললেন সরোজ গুপ্ত,
আপনি ছ’ মাস পরে চেকআপে আসবেন
দেখবেন এ জায়গাটা কি সুন্দর |

.             ******************     
.                                                                                  
সুচিতে...   


মিলনসাগর
*
আমরা এখানে এসেছি জীবনের জন্য
("ঠাকুরপুকুর থেকে" কাব্যগ্রন্থ থেকে)
কবি উত্তম দাশ

আমরা এখানে এসেছি জীবনের জন্য
তুমি আমাদের ভয় দেখাচ্ছ কেন
ভোরবেলায় পাশের কেবিনে যাঁকে দেখেছি চা হাতে
বিকেলের এই রহস্যময় আলোয় শাদা-চাদর মুড়ে
তিনি চলে গেলেন, আমরা ভয় পাবো কেন ?
আমাদের চারদিকে জীবন ছড়িয়ে আছে,
আজ কয়েকদিন বৃষ্টি হচ্ছে খুব, গাছে গাছে
সেই ধারাপাত এক সবুজ করে তুলেছে প্রকৃতি
এরা তো সবাই প্রাণের পক্ষে, ভয় পাব কেন

নতুন শিফটে সেবাময়ীরা নার্স-কোয়াটার থেকে
ছড়িয়ে পড়ছেন চারদিকে, সবাই গিয়ে দাঁড়াবেন
জীবনের পক্ষে, আমরা হারবো কেন

নীচের কেবিন থেকে একজন পায়ে পায়ে উঠে এলেন---
আমরা কাল বাংলাদেশ ফিরে যাচ্ছি
ওনার বায়াপ্সি রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে,
কথা বলতে গিয়ে দেখি সেই মহিলার মুখমন্ডলে
মেরি--র জীবনালেখ্য লেখা রয়েছে |
আমাদের বাড়িতে এখন সন্ধ্যার শাঁখের ধ্বনি উঠবে
ঠাকুরপুকুরের গাছগাছালি উলুবন বৃষ্টির মধ্যে ভিজছে
‘সুন্দরের অসুখ করে না’  শুধু তার কন্ঠে ফেরে
জীবনের গান, বর্ণময় অপরাজিতের কন্ঠস্বর |

.             ******************     
.                                                                                  
সুচিতে...   


মিলনসাগর
*
শীতের পশম সবে গায়ে উঠেছে
("ঠাকুরপুকুর থেকে" কাব্যগ্রন্থ থেকে)
কবি উত্তম দাশ

শীতের পশম সবে গায়ে উঠছে
আর রঙিন হয়ে সাজছে প্রকৃতি,
লেকের জলে শরীরের খেলা-দেখানো মাছেরা
এখন ঘুমুতে যাবে, রাজহাঁসগুলো হাঁটছে মন্থর,
লিনাক সেন্টারের সামনে দিয়ে ঝকমকিয়ে যাচ্ছে
টয়ট্রেন, কার-পার্কিং-এ এবার বর্ষায় কি ভীষণ
জল জমেছিল, ঘেস-ফেলে অনেক উঁচু হয়েছে এবার,
সামনের বর্ষায় নির্ভয়ে দাঁড়াবে গাড়িগুলো |

শিশুবিভাগের খেলার মাঠ ভরে উঠেছে, মৃত্যুকে
ভ্রূকুটি করে শৈশব জেগে উঠেছে কোলাহলে,
দোলনায় জেগেছে স্পন্দন, কাঠের ঘোড়াগুলোও
উঠছে টগ্ বগিয়ে -- এসব দৃশ্যে এলে
জীবনকে বড় সদাশয় মনে হয় |

এতক্ষণে তোমার কেমো শেষ হয়েছে, খুব
ক্লান্ত লাগছে, একটু ঘুমুবে, নাকি ফলের রসে
তৃষ্ণা ভেজাবে --- ডাকবো সেবাময়ীদের কাউকে ?

তোমার বাঁ---চোখ বেয়ে স্ফটিক গড়িয়ে পড়লো
আমার দিকে পাশ ফিরে শুলে তুমি,
কোনো স্মৃতি কি তোমায় ছুঁয়ে গেল,
সেবার গোপালপুরে সারারাত কি অসংলগ্ন
কান্ডই না করলাম আমরা, ভোরে উঠে ব্যাক - ওয়াটারের
বোটে বসেও সে উল্লাস থামে নি আমাদের |

এখন তুমি কেমোর বিষক্রিয়ার বিরুদ্ধে লড়ছ
আর ধীরে ধীরে শরীরে ছড়াচ্ছে জীবনের কুহক
ওষ্ঠাধরে দ্রব হয়ে আছে প্রেম, ছুঁলেই
সারারাত বৃষ্টি হবে খুব |

.             ******************     
.                                                                                  
সুচিতে...   


মিলনসাগর
*
আবার ঠাকুরপুকুর, আবার একটা কষ্টের দিন তোমার
("ঠাকুরপুকুর থেকে" কাব্যগ্রন্থ থেকে)
কবি উত্তম দাশ

আবার ঠাকুরপুকুর, আবার একটা কষ্টের দিন তোমার
বর্ষা তেকে শীত এই ছয়মাস কতভাবে দেখেছি
ঠাকুরপুকুরের রূপান্তর, জল নেমে গিয়ে চিন্তাহরণ তড়াগ
এখন অবয়বে এসেছে, পাড়ের খেজুর গাছগুলোর
জলপান এতদিনে শেষ হয়েছে, খুব সুন্দরী হয়ে
উঠেছে প্রকৃতি, বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচানো চন্দ্রমল্লিকা
টব পালটে এত রঙিন, যেন বললেই বিউটি কনটেস্টে
নামবে, স্টাফ ক্যানটিন থেকে যারা বেরুচ্ছে
তারা হাসতে জানে না কেন, চারদিকে এত
বেঁচে থাকার ছবি অথচ সবাই যেন একটা
হিম-শীতল গুহায় নেমে যাচ্ছে |

এসো, আজ সারারাত প্রেমের গল্প করি,
তোমার মনে আছে, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফেরার পথে
বারুইপুর স্টেশনে --  ‘আপনি বুঝি এখানে থাকেন’,
স্মৃতি একটা সুড়ঙ্গ, সেখানে নামলেই আলো আঁধারি
ছায়ার মধ্যে জীবন্ত সব ছবি ফুটে ওঠে |
গোপালপুরে আমরা কুড়িজনের দল বেঁধে গিয়েছিলাম
হনিমুনে, আড়াল খুঁজতে খুঁজতেই আমাদের
তিন দিন কেটে গেল  | সঙ্গীদের তো যৌবন ছিল না |
তারা কেউ কুমারী, কেউ প্রৌঢ়,
ব্যাক-ওয়াটারে জেলি-ফিসের চলন দেখতে দেখতে
তুমি আমার হাত চেপে ধরেছিলে, যৌবনের
সে সব উপকথা তো আমরা সবই ভুলতে বসেছি |

আগামী কালের জন্য তুমি যে ব্যাগ গোছাচ্ছ
তার মধ্যে পুরোটাই তো জীবনের গল্প
কেমোথেরাপির সেই লাল রঙের বিষ তোমার শরীরে
ছড়িয়ে পড়বে সেই সব শত্রুকে ধ্বংস করার জন্য
যারা প্রেম শব্দের অর্থ জানে না,
ভালোবাসে না জীবনকে |

.             ******************     
.                                                                                  
সুচিতে...   


মিলনসাগর
*
আমরা এখন ঠাকুরপুকুর থেকে দশ হাজার মাইল দূরে
("ঠাকুরপুকুর থেকে" কাব্যগ্রন্থ থেকে)
কবি উত্তম দাশ

আমরা এখন ঠাকুরপুকুর থেকে দশ হাজার মাইল দূরে
যাত্রা সুরু করেছিলাম গভীর রাতে এখন ক্রমান্বয়ে
সূর্য করোজ্জ্বল দিনের মধ্যে প্রবেশ করছি,
এখানে কোন সরোজ গুপ্ত নেই, সুছন্দা গোস্বামী নেই
মেঘমন্ডলের ওপরে আমরা ভাসছি,
তুমি এখনো গভীর ঘুমে, ভারতবর্যের সময়
এখনো তোমাকে নিদ্রিত রেখেছে, নীলবসনা
বিমান সেবিকারা ক্ষুধা ভাঙতে এসেছে,
গরম কফি না ফলের রস কি দিয়ে তোমার
প্রভাত জাগবে, আমার তো এখন কোন
পিপাসা নেই, রাতের চারটে স্কচ এখনো
সম্মোহনে রেখেছে, এক ফুটের জানালাটা
খুলে দিতেই তুমিএকটু হাসলে, এই অনন্ত
আকাশের মাঝে সে হাস্যরেখা বহু দূরের
প্রভাতকে বললো : প্রণাম |

হিথরোর আকাশ থেকে বনঙূমি দেখছি, লোকালয়
লাল টালির ছাওয়া ঘর বাড়ি, কত গাড়ি, রাস্তা,
মাঝে মাঝে যে সব জলের ঘের, এগুলো কোন
হৃদ কিংবা নদী তীরবর্তী ভ্রমণ বিস্তার |
সদা ঘুম থেকে জেগেছো তুমি, ফলের রসে
তোমার প্রভাত এলো, কফির গন্ধ উঠছে
জড়তা কাটাবে, সিট বেল্ট বেঁধে নাও
আমরা এবারে নামবো, কি দুরন্ত ছুটছে
আমাদের পাখিটা, বিশাল দৌড় শেষ করে
বাঁয়ে বাঁকলো, আমরা তবে ঠাকুরপুকুর থেকে
অনেক দূরে চলে এসেছি, লন্ডন শহর
আমাদেক ডাকছে, ছবিটা পুরানো
কিন্তু খুব নতুন মনে হচ্ছে না তোমার ?

.             ******************     
.                                                                                  
সুচিতে...   


মিলনসাগর
*
উইন্ডারমেয়ার পেরিয়ে আমরা এখন গ্রাসমেয়ারের দিকে যাচ্ছি
("ঠাকুরপুকুর থেকে" কাব্যগ্রন্থ থেকে)
কবি উত্তম দাশ

উইন্ডারমেয়ার পেরিয়ে আমরা এখন গ্রাসমেয়ারের দিকে যাচ্ছি,
ওয়ার্ডওয়ার্থের বাড়ি, ডাভ কটেজ -- বৌ ছেলেমেয়ে
আর বোন ডরথিকে নিয়ে এখানে ঘর বেঁধেছিলেন,
পাহাড়ের খাঁজে ছোট বাগান, পাথর খুঁড়ে লাগানো গাছ,
কবির মৃত্যুর পর তিনশ বছর হয়ে গেছে, এখনো সেই বাগান
তাঁর হাতে গড়া, বোঝা যায় শুধু নিরীক্ষণ নয়
পরিচর্যাতেও কত দক্ষ ছিলেন তিনি এবং সংগঠনে |
সাদে, কোলরিজ, চার্লস ল্যাম্ব--- মাঝে মাঝে মহারাণী
ভিক্টোরিয়াও আসতেন লেক পয়েটসদের সেই আড্ডায় |

ষোলটি লেক দিয়ে ঈশ্বর এই লেক জেলাটি
বানিয়েছেন,স্কটল্যান্ডের লক নস ও লক লমন্ডের
মতো তাদের বিস্তার নেই, গভীর লেকে
নৌকা নিয়ে কোন মনস্টার কখনো অতলে
ডুব দেয় নি কিন্তু এ গ্রহের সব নির্জনতা
আর বৃক্ষ-লতার কুহকে তিনি ঢেলে দিয়েছেন এখানে |

এখন কত আধুনিক হয়ে গেছে ডাভ কটেজ
চিঠিপত্র ডায়েরি নিত্য ব্যবহারের জিনিস নিয়ে মিউজিয়াম
সেই পাহাড়ি ডেফোডিলের চাপা কান্না
হাইল্যান্ডের সেই চাষীমেয়েটির উপত্যকা কাঁপানো গান
তুমি চোখ বুঝলেই শুনতে পাবে, এ নিয়ে তুমি
তিনবার এসেছ ডাব কটেজে, কবির শয়ন ঘরে
এবারেও তুমি বিমূঢ়হলে, এইটুকু খাটে
কি ভাবে একজন সমর্থ পুরুষ শুতে পারে,
তৃতীয় প্রহরে প্রভু বেনের পুঁটুলি, লেক অঞ্চলের শীত
জানো সব প্রেম গুটিয়ে ফেলে |
যেমন ঠাকুরপুকুর তোমার শরীর-তৃষ্ণা ভুলিয়েছে
কিন্তু সরোজ গুপ্তকে ধন্যবাদ, কেমোর বিষের সঙ্গে
তোমার শরীরে নতুন করে প্রেমের সংক্রমণ ঘটিয়েছেন
তুমি নতুন করে ভালোবাসতে শিখলে জীবনকে
ডাভ কটেজে কবির ঘরে তুমি সে কথাই বললে কানে কানে |

.             ******************     
.                                                                                  
সুচিতে...   


মিলনসাগর