কবি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর-এর কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
শকুন্তলা,
(তৃতীয় পরিচ্ছেদ থেকে)

[
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের “শকুন্তলা” (১৮৫৪), সংস্কৃতে কালিদাসের “অভিজ্ঞান শকুন্তলম্”
অবলম্বনে রচিত | আক্ষরিক অনুবাদ নয় |
]

লতামণ্ডপে শকুন্তলা ও রাজা দুষ্মন্ত

রাজা, একাকী লতামণ্ডপে অবস্থিত হইয়া, শকুন্তলাকে উদ্দেশ করিয়া
কহিতে লাগিলেন, প্রিয়ে! আমি তোমা বই আর জানি না ; কিন্তু তুমি
নিতান্ত নির্দ্দয় হইয়া আমায় এক বারেই পরিত্যাগ করিয়া গেলে ; তুমি
বড় কঠিন | পরে তিনি কিয়ত্ক্ষণ মৌনভাবে থাকিয়া কি ফল ? এই
বলিয়া তথা হইতে চলিয়া যান, এমন সময়ে শকুন্তলার মৃণালবলয় ভূতলে
পতিত দেখিয়া, তত্ক্ষণাৎ তাহা উঠাইয়া লইলেন এবং পরম সমাদরে
বক্ষস্থলে স্থাপন পূর্ব্বক, কৃতার্থম্মন্য চিত্তে শকুন্তলাকে উদ্দেশ করিয়া,
কহিতে লাগিলেন, প্রিয়ে! তোমার মৃণালবলয় অচেতন হইয়াও এই
দুঃখিত ব্যক্তির দুঃখশান্তি করিলেক ; কিন্তু তুমি তাহা করিলে না |
শকুন্তলা,  আর ইহা শুনিয়া বিলম্ব করিতে পারি না, কিন্তু কি বলিয়াই
যাই ; এই মৃণালবলয়ের ছলেই যাই ; এই বলিয়া পুনরায় লতামণ্ডপে
প্রবেশ করিলেন | রাজা দর্শন মাত্র হর্ষসাগরে মগ্ন হইয়া কহিলেন, এই যে
আমার জীবিতেশ্বরী আসিয়াছেন! বুঝিলাম দেবতারা আমার পরিতাপ
শুনিয়া সদয় হইলেন, তাহাতেই পুনরায় প্রিয়ারে দেখিতে পাইলাম | চাতক
পিপাসায় শুষ্ককণ্ঠ হইয়া জল প্রার্থনা করিল, অমনি নব জলধর হইতে
শীতল জলধারা তাহার মুখে পতিত হইল |

শকুন্তলা রাজার সম্মুখবর্ত্তিনী হইয়া কহিলেন, মহারাজ! অর্দ্ধ পথে স্মরণ
হওয়াতে, আমি এই মৃণালবলয় লইতে আসিয়াছি, আমার  মৃণালবলয়
দাও | রাজা কহিলেন, যদি তুমি আমায় যথাস্থানে নিবেশিত করিতে দাও,
তোমার মৃণালবলয় তোমায় ফিরিয়া দি, নতুবা দিব না | শকুন্তলা অগত্য
সম্মতা হইলেন | রাজা কহিলেন, এস এই শিলাতলে বসিয়া পরাইয়া দি |
উভয়ে শিলাতলে উপবিষ্ট হইলেন | রাজা শকুন্তলার হস্ত লইয়া মৃণালবলয়
পরাইবার উদ্যোগ করিতে লাগিলেন | শকুন্তলা একান্ত আকুলহৃদয় হইয়া
কহিলেন, আর্য্যপুত্র! সত্বর হও, সত্বর হও | রাজা, আর্য্যপুত্র সম্ভাষণ
শ্রবণে যত্পরোনাস্তি হর্ষ প্রাপ্ত হইয়া, মনে মনে কহিতে লাগিলেন,
স্ত্রীলোকরা স্বামীকেই আর্য্যপুত্র শব্দে সম্ভাষণ করিয়া থাকে ; বুঝি আমার
মনোরথ সম্পন্ন হইল | অনন্তর, তিনি শকুন্তলাকে সম্বোধন করিয়া
কহিলেন, সুন্দরি! মৃণালবলয়ের সন্ধি সম্যক্ সংশ্লিষ্ট হইতেছে না ; যদি
তোমার মত হয়, অন্য প্রকারে সঙ্ঘটন করিয়া পরাই | শকুন্তলা ইষৎ
হাসিয়া কহিলেন, তোমার যা অভিরুচি |

অনন্তর রাজা নানা ছলে বিলম্ব করিয়া,  শকুন্তলার হস্তে মৃণালবলয়
পরাইয়া দিলেন এবং কহিলেন, সুন্দরি! দেখ দেখ, কেমন সুন্দর হইয়াছে |
শকুন্তলা কহিলেন, দেখিব কি, কর্ণোত্পলরেণু আমার নয়নে নিপাপিত
হইয়াছে, দেখিতে পাই না | রাজা ঈষৎ হাসিয়া কহিলেন, যদি তোমার
মত হয় ফুত্কার দিয়া পরিষ্কার করিয়া দি | শকুন্তলা কহিলেন তাহা
হইলে অত্যন্ত উপকৃত হই বটে, কিন্তু তোমায় অত দূর বিশ্বাস হয় না |
রাজা কহিলেন সুন্দরি! অবিশ্বাসের বিষয় কি, নূতন ভৃত্য কি
কখন প্রভুর আদেশের অতিরিক্ত করিতে পারে? শকুন্তলা কহিলেন, ঐ
অতি ভক্তিই অবিশ্বাসের কারণ | অনন্তর রাজা, শকুন্তলার চিবুকে ও
মস্তকে হস্ত প্রদান করিয়া, তাঁহার মুখকমল উত্তোলন করিলেন | শকুন্তলা,
শঙ্কিতা ও কম্পিতা হইয়া, রাজাকে বারংবার নিষেধ করিতে লাগিলেন |
রাজা, সুন্দরি! শঙ্কা কি, এই বলিয়া শকুন্তলার নয়নে ফুত্কার প্রদান প্রদান
করিতে লাগিলেন |

কিয়ত্ক্ষণ পরে শকুন্তলা কহিলেন, আর তোমার পরিশ্রম করিতে হইবে
না ; আমার নয়ন পূর্ব্ববৎ হইয়াছে ; আর কোন অসুখ নাই | মহারাজ!
আমি অত্যন্ত লজ্জিত হইতেছি ; তুমি আমার এত উপকার করিলে, আমি
তোমার কোন প্রত্যুপকার করিতে পারিলাম না | রাজা কহিলেন সুন্দরি!
আর কি প্রত্যুপকার চাই? আমি যে তোমার সুরভি মুখকমলের আঘ্রাণ
লাভ করিয়াছি, তাহাই আমার পরিশ্রমের যথেষ্ট পুরস্কার হইয়াছে ;
মধুকর কমলের আঘ্রাণ মাত্রেই সন্তুষ্ট হইয়া থাকে | শকুন্তলা ঈষৎ হাসিয়া
কহিলেন, সন্তুষ্ট না হইয়াই বা কি করে |



.                 ****************                                        
উপরে   


মিলনসাগর
*
মিলনসাগরের কবিতার পাতায় বিদ্যাসাগরের কবিতা - প্রসঙ্গে বলতে চাই যে আমরা জানি না বিদ্যাসাগর
কোন কবিতা রচনা করেছিলেন কি না | তবুও তাঁর “শকুন্তলা”, “সীতার বনবাস” প্রভৃতি গ্রন্থের ভাষা, যা মূল
গ্রন্থের ভাবানুবাদ মাত্র, এত ছন্দময় ও মধুর যে আমাদের মনে হয়েছে যে তা কাব্যেরই শামিল |

বিদ্যাসাগরের কথা চিন্তা করলেই কল্পনায় ভেসে ওঠে এক গম্ভীর শাস্ত্রজ্ঞানী পণ্ডিতের মুখ যেখানে কর্তব্য,
আদর্শবাদ আর কর্মযজ্ঞ ছাড়া, প্রেম-ভালবাসার মত জীবনের কোমল দিকগুলি সম্পূর্ণ অনুপস্থিত! কিন্তু তাঁর
সাহিত্য পাঠ করতে গিয়ে বিদ্যাসাগরের যে প্রেমময় ভাবমূর্তী চোখে ভেসে ওঠে তা এক পরিপূর্ণ প্রেমিকের!  
তাই আমরা তাঁর উপরোক্ত দুটি রচনার যত্সামান্য এখানে তুলে ধরেছি |
বিদ্যাসাগর বাংলার এমন এক মনীষী ছিলেন যাঁকে নিয়ে অগণিত কবিতা-গীত রচনা করা
হয়েছে পরবর্তী কালের কবি-সাহিত্যিকদের দ্বারা |  নিচে, কবিতার পাতায় আমরা সেই
রকম কিছু কবিতাও তুলে দিচ্ছি, যেগুলি আমাদের ওয়েবসাইটেই সেই সেই কবিদের
পাতায় তোলা আছে | নিচের কবিতায় ক্লিক্ করলেই তা অন্য একটি জানালা খুলে আপনার
সামনে চলে আসবে | আমরা তাঁকে এভাবে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলী জানাতে পেরে, নিজেদের
ধন্য মনে করছি |
সীতার বনবাস

(দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ থেকে)

[
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের “সীতার বনবাস” (১৮৬০), সংস্কৃতে ভবভূতির “উত্তররামচরিত”
অবলম্বনে রচিত | আক্ষরিক অনুবাদ নয় |
]

বিশ্রামভবনে রাম ও সীতা

লক্ষ্মণ নিষ্ক্রান্ত হইলে পর, রাম ও সীতা, বিশ্রামভবনে প্রবেশ করিয়া,
অসঙ্কুচিত ভাবে অশেষবিধ কথোপকথন করিতে লাগিলেন | কিয়ত্ক্ষণ
পরে, সীতার নিদ্রাকর্ষণের উপক্রম হইল | তখন রাম কহিলেন, প্রিয়ে! যদি
ক্লান্তি বোধ হইয়া থাকে, আমার গলদেশে ভুজলতা অর্পণ করিয়া ক্ষণ
কাল বিশ্রাম কর | সীতা কোমল বাহুবল্লী দ্বারা রামের গলদেশ অবলম্বন
করিলে, তিনি অনির্বচনীয় স্পর্শসুখ অনুভব করিয়া কহিতে লাগিলেন,
প্রিয়ে! তোমার বাহুলতাস্পর্শে আমার সর্ব্ব শরীরে যেন অমৃতধারা বর্ষণ
হইতেছে, ইন্দ্রিয় সকল অভূতপূর্ব্ব রসাবেশে অবশ হইয়া আসিতেছে,
চেতনা বিলুপ্তপ্রায় হইতেছে ; অকস্মাৎ আমার নিদ্রাবেশ, কি মোহাবেশ
উপস্থিত হইল, কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না | সীতা, রামমুখবিনিঃসৃত
অমৃতায়মাণ বচনপরম্পরা শ্রবণগোচর করিয়া, হাস্যমুখে কহিলেন, নাথ!
আপনি চিরানুকূল ও স্থিরপ্রসাদ | যাহা শুনিলাম, ইহা অপেক্ষা স্ত্রীলোকের
পক্ষে আর কি সৌভাগ্যের বিষয় হইতে পারে! প্রার্থনা এই, যেন চিরদিন
এইরূপ স্নেহ ও অনুগ্রহ থাকে |

সীতার মৃদু মধুর মোহন বাক্য কর্ণগোচর করিয়া, রাম কহিলেন, প্রিয়ে!
তোমার বচন শ্রবণ করিলে, শরীর শীতল হয়, কর্ণকুহর অমৃতরসে
অভিষিক্ত হয়, ইন্দ্রিয় সকল বিমোহিত হয়, অন্তঃকরণের সজীবতা
সম্পাদন হয় | সীতা লজ্জিত হইয়া কহিলেন, নাথ! এই নিমিত্তই সকলে
আপনাকে প্রিয়ংবদ বলে | যাহা হউক অবশেষে এ অভাগিনীর যে এত
সৌভাগ্য ঘটিবে ইহা স্বপ্নের অগোচর | এই বলিয়া সীতা শয়নের নিমিত্ত
উত্কণ্ঠিতা হইলে, রাম কহিলেন, প্রিয়ে! এখানে অন্যবিধ শয্যার সঙ্গতি
নাই ; অতএব, যে অনন্যসাধারণ রামবাহু বিবাহসময় অবধি, কি গৃহে, কি
বনে, কি শৈশবে, কি যৌবনে, উপধানস্থানীয় হইয়া আসিয়াছে, আজও
সেই তোমার উপধান কার্য সম্পাদন করুক | এই বলিয়া, রাম বাহুবিস্তার
করিলেন ;  সীতা তদুপরি মস্তক বিন্যস্ত করিয়া তত্ক্ষণাৎ নিদ্রাগত
হইলেন |

রাম, স্নেহভরে কিয়ত্ক্ষণ সীতার মুখারবিন্দ নিরীক্ষণ করিয়া, প্রীতিপ্রফুল্ল
নয়নে কহিতে লাগিলেন, কি চমত্কার! যখনই প্রিয়ার বদনসুধাকর
সন্দর্শন করি, তখনই আমার চিত্তচকোর চরিতার্থ ও অন্তরাত্মা
অনির্বচনীয় আনন্দরসে আপ্লুত হয় | ফলতঃ ইনি গৃহের লক্ষ্মীস্বরূপা ;
বাহুলতা, কণ্ঠদেশে বিনিবেশিত হইলে, শীতল মসৃণ মৌক্তিক হারের কার্য
করে | কি আশ্চর্য্য! প্রিয়ার সকলই অলৌকিকপ্রীতিপ্রদ | রাম মনে মনে
এইরূপ আলোচনা করিতেছেন, এমন সময়, সীতা, স্বপ্ন দেখিয়া, নিদ্রাবেশে
কহিয়া উঠিলেন, হা নাথ! কোথায় রহিলে |

সীতার স্বপ্নভাষিত শ্রবণ করিয়া, রাম কহিতে লাগিলেন, কি চমত্কার!
চিত্রদর্শনে প্রিয়ার অন্তঃকরণে যে অতীত বিরহভাবনার আবির্ভাব
হইয়াছিল, তাহাই স্বপ্নে  অস্তিত্বপরিগ্রহ করিয়া যাতনাপ্রদান করিতেছে |
এই বলিয়া, সীতার গাত্রে হস্তাবর্ত্তন করিতে করিতে, রাম প্রেমভরে
প্রফুল্লকলেবর হইয়া কহিতে লাগিলেন, আহা! অকৃত্রিম প্রেম কি পরম
পদার্থ! কি সুখ, কি দুখ, কি সম্পত্তি, কি বিপত্তি, কি যৌবন, কি বার্দ্ধক্য,
সকল অবস্থাতেই একরূপ ও অবিকৃত | ঈদৃশ প্রণয়সুখের অধিকারী
হওয়া অল্প সৌভাগ্যের কথা নহে ; কিন্তু আক্ষেপের বিষয় এই, এরূপ
প্রণয় জগতে নিতান্ত বিরল ও একান্ত দুর্লভ ; যদি এত বিরল ও এত
দুর্লভ না হইত, সংসারে সুখের সীমা থাকিত না |


.                 ****************                                        
উপরে   


মিলনসাগর
*