কবি যশোধরা রায়চৌধুরীর কবিতা
*
স্বীকার
কবি যশোধরা রায়চৌধুরী

কে তোমাকে মেরেছে বল, আমি তার পাঁজরের হাড়
খুলে নিয়ে পিঞ্জর বানাব আর তার মধ্যে ভাঁড়
ভর্তি করে দেব দুধ রক্ত জল যা যত পানীয়
পুষে রাখ তাকে তুই পাখির মত অন্ধকার
রাতে। তোকে কে বেসেছে বল ভালবাসা।
আমার তরমুজ মজ্জা ছেঁচে তাকে দিয়ে আসি রং
লালা টুকটুকে, স্বাদু, নিজস্ব টুঁটির
ছেঁড়া অংশ ভোগ দিয়ে আসি, আর তার
সংকেতের জন্য বসে থাকি এক সংক্ষিপ্ত জানালা
চোখে নিয়ে, মারাত্মক আদি অহংকার
জ্বালিয়ে রেখেছি যাকে, তার থেকে চুঁয়ানো কী আলো---
সামান্যই তবু তাতে দৃশ্যমান হয়েছে শৃঙ্খলও
যা ভুলেছিলাম এতদিন, তুই এত করে সে যন্ত্রণাখানি
এনে দিলি প্লেটে করে, পূজার থালায়
রক্তচন্দনও ছিল, ছেঁড়া বেলপাতা, বলাত্কার . . .
উল্টে আমি তোর জন্য এটুকু পারব না ?
কে তোকে চেয়েছি বল্। বলছি তার নাম নিয়ে আমি
তোকে আর কোনোদিন সেভাবে চাইব না।

.             *************************  

.                                                                                       
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
দুই বোন
কবি যশোধরা রায়চৌধুরী

রখনও দিদির প্রেমিকের প্রেমে পড়িনি।
গল্পে লিখেছে, সেটা নাকি ঘটা স্বাভাবিক।
কই, ঘটল না---দিদির পুরুষ বন্ধুর
প্রতি কোনওদিন কোনও টান অনুভব করিনি।

দিদি আর আমি পিঠোপিঠি বোন, দুজনে
এক্কাদোক্কা, পুতুল খেলেছি সারাদিন
কোণের ঘরের জানালায় বসে বিকেলে
মেপেছি দুজনে টিউশনে যাওয়া ছেলেদের
বন্ধু তো হল অনেকেই ; তারা আমারও
বন্ধু হয়েছে, ভালই লেগেছে, তবুও
প্রেমে পড়েছিল দিদি ঠিক যেই ছেলেটির---
পরাশরদার প্রতি কিছু ফিল করিনি।
দিদি যে কি করে পরাশরদাকে বাছল
পিঠোপিঠি বোন, তবুও বুঝতে পারিনি

দিদি আর আমি ছোটবেলা থেকে দুজনে
গল্পের বই টানাটানি করে পড়েছি
পোশাক, সাবান, চুলের বিনুনি, ফিতে, ক্লিপ
সবকিছু নিয়ে কাড়াকাড়ি হোত সারাদিন

দিদির যখন সাত বছরের বিবাহ
বেশ দেরী করে আমিও তো শেষে বুঝলাম
আলোক-আমার দুচোখের আলো
আলোক---আমার প্রভু যীশু, তাই, মিষ্টি . . .

অথচ দিদি কি বিচ্ছিরি করে বলল :
‘বাবা কি ক্যাবলা তোর ওই আলোক ছেলেটা’
বোনের প্রেমিক, এরকম করে বলে কেউ ?
‘ছাগলের মতো দাড়ি---ভাবেটা কি নিজেকে ?’
পরাশরদাকে আমি তো ভালুক বলিনি!

দিদি আর আমি চুপি চুপি স্কুল পালিয়ে
নুন-শো মেরেছি সিনেমা পাড়ায় : দুজনেই
নানা পাটেকারে মজেছি এক সময়ে
একটা সময়ে সানি দেওলেও মজেছি
শুধু এই এক জায়গায় কেন দুজনেই
মানতে পারিনি একে অন্যের প্রেমকে ?

তবে কি গোপনে দিদির সঙ্গে আমারই
প্রেম ছিল কোনও একদিন, কেউ জানিনি ?

.         *************************  

.                                                                                       
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
বইয়েরা
কবি যশোধরা রায়চৌধুরী

শরত্কালে বাতাস মন্থর, সিঁড়িতে উল্টানো পড়ার বই।
স্মৃতির বিষয়ের সঙ্গে খুবই দ্রুত বিষয় পাল্টায় জীবনমুখ।
এখনও কোনো কোনো মানুষ ভাসবাসে, মেয়েরা চেখে
.                                        দেখে ছেলের মুখ।
বাহুও আজও আছে, অতি কোমল বাহু। সেসব বাহু দিয়ে
.                                        বাঁধন হয়।
এখনও কেউ কেউ মথিত হয় দেখে ঘাসের উপর ও শিশিরের
.                                        শয্যাদাগ।
এবং এখনো সে পুরনো ধরনের কথিত কাঙ্খিত রমণ হয়।

বন্ধু হাত ধরে, হাত তা ভালবাসে। নাগর কাছে আসে,
.                                        শরীর চায়।
শিশুরা বেঁচে থাকে, শিশুরা খায়দায় গভীর সুনিবিড়
.                                        প্রেমদশায়।
পড়ার বইগুলি এসব কথা লেখে ; পাড়ার বই লিখে মিনুষে
.                                        খায়।
পড়ার বইয়েদেরও কখনও ঘুম আসে, অন্ধকার কোনো
.                                        বারান্দায়  ?  

.               *************************  

.                                                                                       
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
কবিতা কানেকশান ৩
কবি যশোধরা রায়চৌধুরী

সারাদিন বানচাল, তার কারণ, সারাদিন বানচাল, বাকি জীবনের
হিসেব বলতে তো শুধু ওইটুকুই---কাজ, ইতিউতি
ডোরাকাটা মনখারাপ, পারলে যাকে বনে রেখে আসা যায়, আর
একলা থাকার সেই ডুকরে ওঠা চাহিদা, যা গর্তে গিয়ে সেঁধিয়েছে, ইঁদুরের মত

যা ছিল বনের টিয়ে, সবুজ সবুজ
আজ হিসেবের মধ্যে ঢোকা ও বেরোনো করে, ভাগ্য বলে তাস টেনে টেনে

সারাদিন বানচাল, ধান আর চাল নিয়ে দরাদরি, ব্যাবসাপত্তর
ভেবে দেখো, কত না সহজে তুমি ছেড়ে যাচ্ছো কবিকীর্তী, খ্যাতি
হিসেবনিকেশ আর খাঁচা সামলানোর মৃদু ছলে

একটিবার জঙ্গলে ঢুকলেই
বেরোনোর ইচ্ছেই হবে না . . .

.         *************************  

.                                                                                       
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
পিকনিক
কবি যশোধরা রায়চৌধুরী

উড়াতে এসেছি মজা, মাঠভর্তি। তোরা যে চাদর
পাতবি বলে এনেছিলি, তাতে সব বড় বড় ছোপ
সে কি রে, রক্তের নাকি : রুণি তোর হানাবাড়ি থেকে
আর কী কী এনেছিস : শৌখিন চামচ, কাঁটা, ছুরি . . .

দে তো কাঁটাদুটো আমি লোফালুফি দেখাব, ব্যালেন্স
বাঁদিকে আপনারা বৌদি ডানদিকে তোরা খুকুমণি
আমি ঠিক মধ্যখানে সোডার বোতল
কিছুক্ষণ ভুসভুসিয়ে তারপর চুপ মেরে যাব, নেশা হলে . . .

মাঠময় উড়ে যাচ্ছে হাসি ও ফড়িং
মাঠময় উড়ে যাচ্ছে ইয়ার্কি, মজাক
উনুন, যা কোনোদিন ধরে উঠতে পারবে না পুরোটা
তাকে আমরা জ্বেলে দেব হৃদয়ের মুহব্বত, মায়া দিয়ে দিয়ে

সেবারের পিকনিকে মায়াদিও ছিল না রে ? ডিসেম্বর মাসে
কাপড়ে আগুন লেগেছিল, ওও শেষ সময়ে ভুল বুঝতে পেরে
নেভানোর ইচ্ছে নিয়ে বিছানায় এসে গড়াচ্ছিল
বেডকভারে . . . বেডকভারে . . . এটা তবে সেই বেডকভার ?

আমরা সকলে মিলে মজা করছি যেটার ওপরে . . .

.              *************************  

.                                                                                       
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
খাদ্যশৃঙ্খলের গান
কবি যশোধরা রায়চৌধুরী

আমার থালার থেকে আমি উঠে আসি
কোনোখানে বিরোধিতা নেই
কেউ কারো শত্রু নই : খাবার ও খাদক এখন
এক হয়ে গেছি : এই জীবন, জীবন। ধন, ধন।

আমার হৃদয় জানে কিভাবে হৃদয়
আমার শরীরবৃক্ষ জানে তার শাখাপ্রশাখাকে
বাদবাকি হাওয়া জানে, রোদ জানে, বাসস্টপ জানে
আমি জানি চূড়ান্ত থাকাকে

এই আছি এই আছি স্বাদ করে বেঁচে থাকব বলে
রোমকূপ ফাঁক করে টেনে নিই ভেতরে তো সমস্যা সমস্ত বিশুদ্ধ আলোহাওয়া
ঝগড়াঝাঁটি কান্নাকাটি শুদ্ধু এই আস্ত ভূবন---খাদ্য---খাওয়া---

আমার খাদ্যের মধ্যে আমিও রয়েছি
রয়েছে আমার ছেলেপুলে
ছেলেপুলেদের ভিড়ে গেছে প্রেমিকও আমার
কেউ কারও শত্রু নয় বলে

.        *************************  

.                                                                                       
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
কর্মসংস্কৃতি
কবি যশোধরা রায়চৌধুরী

সংঘাতে যাবেন না আপনি, দূর থেকে দেখে যান, একটু
সাবধান . . . আমাদের বন্ধুজনের কথা শুনে চলুন . . . গরিব
লোক হই, যা বলছি তা কাজে আসবে, (বন্ধু বললাম বলে
গম্ভীর হলেন ? আমাদের মধ্যে কিন্ত উর্দ্ধতন অধস্তন নেই)
যা বলছি তা ভেবে বলছি, আপনারই ভালর জন্য, আমাদের
কিন্তু কোন ভেস্টেড ইন্টারেস্ট নেই, যা বলছি শুনুন , নতুন
কোনও নিয়ম বহাল করতে যাবেন না এখনই
আমাদের কিন্তু কোন আলাদা ব্যাপার নেই, ইয়ে টিয়ে নেই
আপনারই ভালর জন্য . . . লোক চালানোর কাজ এত সোজা
নয় কিন্তু . . . মানুষ সামলানো এত ফক্কিকারি নয়, সমঝে
চলবেন . . . কোনভাবে চোখ রাঙানোর চেষ্টা করলে কিন্তু
নিজেই ভুগবেন, বয়সও আপনার অল্প, তারপর মহিলা
এসব তো টেকনিকাল ব্যাপার, আমরাও বুঝি কতখানি
অসুবিধে হয় তার উপর সংসার, সংসার আছে না ?
বেচারি, বেচারি আপনি, কি ঝঞ্ঝাটে এসে পড়েছেন
বুঝি তো, বুঝি না নাকি ? কিন্তু ওই তো বললাম, আমাদের
কোনও ভেস্টেড ইন্টারেস্ট নেই সমঝে চলবেন আর সংঘাতে
যাবেন না কোনও, এইটুকু বলে রাখছি, আর এটার অন্যথা
করলে কিন্তু কোনও গ্যারান্টিই
দিতে পারছি না দিদি, সম্মানের, ভদ্রমহিলার . . .

.            *************************  

.                                                                                       
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
ননদ
কবি যশোধরা রায়চৌধুরী

রাগের অক্ষম ভঙ্গি। ওরা তোকে ক্ষেপাচ্ছিল, বুঝেও কীভাবে
কিচ্ছু করতে পারছিলি না--- চোখ বড় বড় করা ছাড়া
হাতে ধরা ছোট্ট ব্যাগ তুলে ব্যার্থ মার দেখাচ্ছিলি . . .
হাতের মুদ্রাটি খুবই মনোরম . . যে দেখবে সে পুলকিত হবে।

এভাবেই পুরুষেরা নরমসরমভাবে মেয়েদের  অত্যাচার করে
এভাবেই মেয়েরা তরল, সরলভাবে ছেলেদের প্ররোচনা করে
ওরা তোকে অকারণ খুনসুটি করতে করতে যে-সীমায় পৌঁছে যাচ্ছিল
যে সীমায় ময়েরাও নিজেদের অজান্তেই ভোগের বিষয় হয়ে যায়

হাত থেকে ব্যাগ কেড়ে নিয়ে গিয়ে এক দৌড়ে লম্বা ছেলেটি
ব্রিজের উপর থেকে নীচে ফেলবে . . . এরকম নাটক করছিল
তুই তীক্ষ্ণ হাসি ভর্তি ভয়ভর্তি সরু চিত্কারে
মুচড়ে যাচ্ছিলি দেখে মোটা লোকটি ছুটে এসে হাত ধরে ফ্যালে
ধরাটা শক্তই হয় অকারণ . . . অকস্মাৎ তোর হাসি আর্ত হয়ে যায়
বিকৃত মুখের ভঙ্গি। অজান্তে বেরিয়ে যাওয়া “উঃ”
আমি তবু অদ্ভূত স্মিত থাকি, অনতিবিস্মিত থাকি, দেখে যাই, ভাবি
মৃদু প্রতিবাদ করবো ? ভিতরে ভিতরে ব্যস্ত হই
অথচ এক উত্তেজক দৃশ্যে যদি বাধ সেধে ফেলি
কী ভাববে কে জানে তোর নতুন বন্ধুরা ?
রসকষহীন বৌদি, নারীত্ব খোয়ানো ? ধ্বসে যাওয়া ?
এভাবেই তোকে আমি অবাধে ধর্ষিত হতে দিই . . .
এটাও তো সত্যি, আমি একটু একটু ইর্ষা করছি তোকে ?

.                *************************  

.                                                                                       
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
বিজ্ঞাপন
কবি যশোধরা রায়চৌধুরী

হাওয়া এসে পর্দা সরিয়েছে
দৃশ্য দেখানোর ইচ্ছা : ব্যক্তিগত জীবনযাপন
দেখাতে পারেনি : ক’টা দৃশ্য হয় আজকাল রুমে
সকলই তো মাঠে হয়, আবুদানা-সাবুদানা ঢুঁড়ে
আউটডোর আউটডোর, বাতাসে যেও না উড়ে
ওহো, শ্যাম্পু দেওয়া চুল, ওহো সূক্ষ্ম সাবানের কাচা
রঙিন কাপড়, তুমি উড়ে উড়ে ঠ্যাং দেখিও না

এ বড় অনন্য ঠ্যাং বড় বেশি মোবময় ঠ্যাং
এ বড় নির্লোম বড় চেয়েচিন্তে ধার করা ঠ্যাং

বড় বড় গাছ থাকো, পাতার ভিতরে জালিরোদ
পৃথিবীর সব সূর্য শীতের রোদ্দুর দিতে দিতে

ম্যাদা মেরে যাক, পাণ্ডু হয়ে যাক, ঠাণ্ডা বনে যাক
থাকো রে সুনীল চশমা সুন্দরীর নীলচক্ষু ঘুমে
মোহাবিষ্ট করে আর বড় বড় গাছ ছায়া দাও
পিছনে দাঁড়ানো লোক, সামনে লোক, পর্দা টর্দা নেই
জুম করো, জুম করো, দৃশ্যে দৃশ্যে স্থিরচিত্র করো

রমণ চলেছে দ্যাখো, ফেনার সহিত, বাথরুমে॥

.             *************************  

.                                                                                       
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর