কবি সুতপা ভট্টাচার্য চক্রবর্তীর কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
*
কবি সুতপা ভট্টাচার্য চক্রবর্তীর পরিচিতির পাতায় . . .
জাগরুক খুরশীদা
কবি সুতপা ভট্টাচার্য চক্রবর্তী

গায়ে আগুন লাগানোর পরে
খুরশীদা দৌড়তে শুরু করে
সে এক ভয়ানক দৌড়...

গাছপালা, নদীনালা,
মেয়েবেলা, যৌবনবেলা
সব পেরিয়ে যায় খুরশীদা...

গায়ে তার জ্বলন্ত আগুন
মনে তার বেঁচে থাকার সাধ
দিন সন্ধ্যা ও রাত কাটে...

ঢেউয়ের বিরুদ্ধগামী গাছেদের সমাজে
বৃন্ততটে। আদিবাসিনীর সিক্ত চিবুকের মাঝে
জাগরুক যৌনতার কাল। জঙ্গল পেরোনো ক্ষিপ্রতা অবাধ...

*********************









*
স্পর্ধা
কবি সুতপা ভট্টাচার্য চক্রবর্তী

ছোটখাটো স্পর্ধার দন্ডের সময় এসে গেছে
শেষ হয়ে গেছে সমস্ত নীরব কথাগুলো
দূরে দেখি অমৃতসভা ভেঙে গেছে
ঘন অন্ধকারে ঘুরে ফিরে আসছে
আসন্ন আলোর সঙবাদমালা সমুহ

গোলাকার আগুনে কে বা কারা যেন
আহুতি দিচ্ছে সকল ধূসর পান্ডুলিপি
লজ্জা ভয় মেলানো স্মৃতি ক্ষয় রোগ নিয়ে
ওরা বলে যায় --- আজও ভালো আছি।

*********************









*
কালা দিবস
কবি সুতপা ভট্টাচার্য চক্রবর্তী

ছিঁড়ে খুঁড়ে খেয়েছো দেশের
ইট কাঠ পাথর মাটি সহ ইতিহাস
তারপরও তোমার নিরন্ন উপবাসের ছবি
পোস্টারে দেখলে খিলখিল করে হাসে
মায়ের কোলে শোয়া নিরন্ন শিশুটি...

বার্তা রটে গেল এবছর
সবুজ ফসলের ক্ষেতে
ভীষণ বিপদের শব্দ
খনার বচন থেকে
বিড়বিড় করে আউড়ে যাচ্ছে
মাঠের কোণার বুড়োটা...

আমাদের ক্ষিদে নেই আজ
খালি পেটে পানি চিবুতে চিবুতে
ঘুমোবার জন্য আশ্রয় নিচ্ছি --

তোমাকে বলা হয়নি
ঐ নিরন্ন উপবাসের
পোস্টার থেকে
একদিন আমাদের সব
কৌতুহল চলে যাবে

সেদিনের জন্য প্রস্তুত থেকো হে শ্মশানচারী
সেদিন হবে আমাদের কালাদিবস...

*********************









*
শহীদের উচ্চারণ
কবি সুতপা ভট্টাচার্য চক্রবর্তী

আগুন রক্তের সোয়াদে

শহীদের উচ্চারণ -- ঘরে ফেরা হবে না।

সোনালী গমের শীষ সুগন্ধি রুটি,

গাঢ় অথচ কোমল গেহুবীজের আকর্ষণ

বিদায় বন্ধুরা যারা আমাদের ভালবেসেছিলে

গান গাইতে গাইতে প্রান্তর পেরিয়ে যাই

ফিরে যাই মাটির শিকড়ে

নিজেকে উজ্জীবিত করব বলে --

ঠিকানায় শীতার্ত তাঁবুর অবসর

বাস করি উত্তুঙ্গ প্রান্তিক প্রবেশ দুয়ারে।

পুরো দেশটাই আমাদের তামাম পৃথিবী।

রাস্তা মানেই তো -- আমাদের চলে যাওয়া,

সঙ্খ্যা মানে -- রয়ে যাবে আমাদের দৃঢ় শপথ।

*********************









*
ধর্ষিতার দিব্যি
কবি সুতপা ভট্টাচার্য চক্রবর্তী

চোখে চোখ রেখে

ভালোবাসো এক পৃথিবী
এই দুনিয়ার জল আকাশ
আর দুন্দুভির দিব্যি দিয়ে
ভালোবাসো প্রিয় আমার।

ভালোবাসো রোজ রাতে
হাত বদলানো মেয়েদের
স্তনবৃন্তের উপচে পড়া
দুধের আস্বাদন এবং...

ঘর বাঁধার স্বপ্ন ভেঙে
গুঁড়িয়ে গেছে যে মেয়েটার
তার কাঁধে হাত রেখে বলো
আমি তো মানুষ...

মহিলা কামরায় যে মেয়েটি
রোজ ঘরে ফেরার পথে
বেচে দেয় সোনালী টিপ, দুল
আর বাড়ি ফেরার অঙ্গীকার...

এদের সবাইকে নিয়েই
গড়ে উঠুক আমাদের
ঘর বারান্দা উঠোন
আর রান্নাঘরের কানাচ

কথা দিলাম বিনিময়ের
ভালবাসায় ভরিয়ে দেব
তোমার হৃদয় মস্তিষ্ক
এবং সকল ইচ্ছার বিস্তার...

*********************









*
আগুন
কবি সুতপা ভট্টাচার্য চক্রবর্তী

চলমান জীবনের স্রোত
মাথায় হাড়ি পাতিল
কাঁধে দুটো ছেলে বাচ্চা
মেয়েবাচ্চাটার আঙুলে
বুক ভাঙা আগুন ----
মেয়েমানুষের তো
কই মাছের জান...

বাপমা খুড়াখুড়ি
সব্বাই মিলে জ্বলেছে
দেশ-গা-ঘরের টানে
ঘরে দেউড়িতে
চাল উড়ে গেছে
ঘরের আগুন ছাপিয়ে যাচ্ছে
ভাতের হাঁড়িতে চাল
মাঙসের কুঁচিতে
হাড্ডিসার পাঁজরের
কঙ্কালময় শরীর।

অনেকদিনের পুরনো
দিগদর্শন যন্ত্রের
হাকুপাকু আওয়াজে
স্বর ওঠেনা আর।
বাপটা মাটা খুড়োখুড়ি
পথ চেয়ে থাকে
আগুন জুড়ে আজ
বহু সন্ততি
সব্বাই আজ জ্বলছে
জ্বলে যাচ্ছে, পুড়ে যাচ্ছে
মাথায় হাঁড়ি পাতিল
কাঁধে আরো সন্ততি
মেয়ে বাচ্চাটার
বুকভাঙা আগুন
ভাড়াঘরের চাল উড়ে গেছে

আগুনের শরীর জুড়ে
দখলদারদের লকলকে
লোভের ছ্যাকা...

*********************









*
ঈদ আর লেনিনের জন্মদিনে
কবি সুতপা ভট্টাচার্য চক্রবর্তী
মিলনসাগরে প্রকাশ ২৮.৫.২০২৩।

ঈদের বাজার সেরে
ফেরার সময়
মহম্মদ লেনিনের
বাপ কাকা আর মামারা
জড়িয়ে পড়েছিল
একটা ছোট্ট মারামারিতে...

এদিকে বেচারা ক্ষুদে
মহম্মদ লেনিন
জানলার গরাদ ধরে
ঠায় তাকিয়েছিল
রাস্তার দিকে
বাপ কাকা মামাজান সব্বাই
তাকে কথা দিয়ে গেছে
একটা ইয়াব্বড়
কেক আনবে বলে

মামি কাকি আর আম্মু
ঈদের পায়েস তৈরিতে
কাটিয়ে দিল সারাটা বিকেল
চুল বাঁধতে এদিন একটুখানি
বেশিই সময় লাগিয়ে দিল
নিখাদ আপা

দুদিন পরেই ওর মেহেন্দি...

পাত্তর মালয়েশিয়ায় থাকে
ঘরঘরিয়ে মেশিন চালিয়ে
অনেক ডলার কামায়।

ক্ষুদে লেনিনের খুব মনখারাপ
দূরদেশে চলে যাবে নিখাদ আপা
আম্মু খুন্তি নিয়ে তেড়ে আসলে
তাকে বাঁচানোর আর কেউ থাকবে না

এই শেষ জন্মদিন আর ঈদে
নিখাদ আপা মোম আলোয়
সাজাল ঘর দুয়ার বারান্দার জাফরি

তবু লেনিনের জন্মদিন হল না
বাপ কাকা আর মামারা
অনেক রাতে ফিরে এল
ইয়াব্বড় কেক নিয়ে নয়

পুলিশের গাড়িতে চেপে
হাতে কাঁধে মাথায় ইয়াব্বড় বড়
ব্যান্ডেজ নিয়ে...

জন্মদিনে লেনিন
জানালার গরাদ ধরে
ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল একাই।

*********************









*
হোলিকার দহনে পুড়তে পুড়তে...
কবি সুতপা ভট্টাচার্য চক্রবর্তী
মিলনসাগরে প্রকাশ ২৮.৫.২০২৩।

আমার হোলিকা সেদিন
লোকাল ট্রেনের মহিলা কামরায়
খুব ঝগড়া করছিল

কোনো একটা দিদিমণি নাকি
তার কোলের ছেলেটাকে
ট্রেন থেকে ছুঁড়ে ফেলে
দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল

কিছুই না, বসার জায়গায়
গায়ে ঠেস লাগানো নিয়ে
ঝগড়া করতে করতেই
একা এবং একদল দিদিমণি
ঝাকার দিয়ে বলে উঠল
এদের ট্রেন থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে হয়।

এতো বাচ্চা বলেই না
দেশে এত্ত গণ্ডগোল
এই কথা শোনা মাত্রই
আমার হোলিকা সঙ্গে সঙ্গে
মা যশোদা হয়ে
বুকে বাচ্চাটা আগলে ধরে
ট্রেনসুদ্ধ একপাল দিদিমণি দের সঙ্গে
একাই লড়াই করতে শুরু করে দিল।

দিদিমণি র দল একদিকে আর
আমার রাক্ষুসে হোলিকা একাই
মা যশোদা হয়ে তাঁর
কোলের গোপালকে বাঁচানোর জন্য
সব অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়ে গেল।

প্ল্যাটফর্ম আসছে যাচ্ছে
লোকাল ট্রেনের মহিলা কামরায়
মেয়েরা উঠছে নামছে
আর আমার পার্ক সার্কাসের
রাক্ষুসে হোলিকা মা যশোদা হয়ে
তাঁর রাগী আগুনে পুড়িয়ে দিচ্ছে
সমস্ত প্রাণহীন ধর্মের বাউন্ডুলেপনাকে...

*********************









*
জনৈক ক্ষেতমজুর কন্যার অভিসারযাত্রা
কবি সুতপা ভট্টাচার্য চক্রবর্তী
মিলনসাগরে প্রকাশ ২৮.৫.২০২৩।

সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে
পিঠে চাপড় মারল সময়
সেই সময় যে একদিন
অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়তে শিখিয়েছিল।

দুপুরে বাড়ি থেকে বের হচ্ছি
দেখি রাস্তার মোড়ে ঝগড়া হচ্ছে খুব
প্রোমোটার বাড়ি তৈরি করছে
স্থানীয় একদল টাকা নিয়েছে
অন্য দল টাকা পায়নি।

লাইনের পাশে জবরদখল কলোনিতে
দেখলাম একটা মন্দির গড়ে উঠেছে রাতারাতি
পাশাপাশি গজিয়ে গেল একটা মসজিদও
পাশেই গির্জা নাকি গুরুদোয়ারা বানাতে গিয়ে
মার খেলো ওপাড়ার কালুয়া।
ওসব আরাধনার লোককে নাকি
জবরদখল কলোনিতে ফিরিতে জমি
বিলিয়ে দিতে চাইছে কালূয়ার দলবল।
শোনা যাচ্ছে কাটমানিও
খানিকটা খাবে নাকি তারা

গভীর রাতে ঘরে ফিরে
মায়ের ঘরে উঁকি মেরে
দেখলাম আমার বৃদ্ধা মা
বিছানায় শুয়ে তাঁর
ছানি কাটানো চোখে
কোনও এক অনাগতকালের অপেক্ষায়
স্বপ্নের বুনটে ব্যস্ত

সেখানে অনেক আলো
অনেক সবুজ গোলাভরা ধান
মাছভরা জলাশয়
আর মাঠভরা মেয়েদের জয়গান...

*********************









*
নরক পেরোনোর দিনে
কবি সুতপা ভট্টাচার্য চক্রবর্তী
মিলনসাগরে প্রকাশ ২৮.৫.২০২৩।

অগণন শহীদের আত্মোৎসর্গের গল্প বলা
দেওয়ালগুলোর সীমাহীন নিস্তব্ধতায়
ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল অপরাধের চিহ্ন
আর শুকনো রক্তের দাগছোপ...

বুলেটের কালো গর্তের মধ্যে
প্রতারিত, আহত, বিধ্বস্ত মেঝেতে
স্মৃতিভ্রষ্ট মা মৃত সন্তানদের বুকে নিয়ে
শুয়ে আছে আকাশের দিকে তাকিয়ে

মৃত্যু আকীর্ণ ঝোপের থেকে বেরিয়ে
যতক্ষণ না উন্মত্ত পশুরা
পাথরের ওপর আছড়ে মারে
তাদের নবজাত শিশুদের।

কমরেড আমার ....

তখনই দেখলাম
তোমার দু'চোখ ভর্তি স্বপ্ন গাঁথা
হারিয়ে যাওয়া হৃদয়ে
পৃথিবীর সমুহ আত্মপ্রত্যয়

একটা নিভৃত গৃহকোণ
হারানো স্বদেশভূমি
আর আশাহত চোখে
জেগে ওঠা ভালবাসা।

*********************