কবি অজিত বাইরীর কবিতা
*
আবরণ
কবি অজিত বাইরী


বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই
মানুষের ভেতরে এত হাহাকার

হৈ-চৈ, কোলাহল, মত্ততার মধ্যে
মানুষ ডুবে আছে নেশাগ্রস্তের মত

তা থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিলেই
এক একজন মানুষ কবরের মত নির্জন
তার ভেতরে জমাট ঠাণ্ডা অন্ধকার

.                  ****************                                
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
ঢেউ
কবি অজিত বাইরী


নিস্তরঙ্গ বয়ে যাওয়া নয় ; তোমার কাজ
ঢেউ জাগান |

ঘটনার সঙ্গে সংঘর্ষে তুমুল আলোড়িত
হাওয়া, আর বয়ে নিয়ে যাওয়া উত্তরকালে
অভিঘাত থেকে অর্জিত সময়ের অভিজ্ঞান |

পাথর নিশ্চল নদীবক্ষে, তার কোন
অভিব্যক্তি নেই ; তাকে জাগান, ধ্বনিত করা
তোমারই কাজ ; ইতিহাস তৈরি হয় না,
সৃষ্টি করে মানুষ --- সংঘর্ষে, সংগ্রামে |

নইলে শিল্পের জরায়ুতে তোমার কলম বন্ধ্যা |

.                  ****************                                
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
লিটল ম্যাগাজিনের কবি
কবি অজিত বাইরী


স্বভাবে দ্বিচারিতা করিনি কখনও;
নীল নদের মত বাহিত ছিল
রক্তে সেই ধারা, যা দরিদ্র স্কুল-শিক্ষক পিতা
আজীবন বহন করেছিলেন বংশপরম্পরায় |
ফলত অমেরুদন্ডী  প্রাণীর মত কুঁজো হতে
.                          শিখিনি কখনও
খোলামকুচি কুড়োনোর মত কুড়োতে শিখিনি
.                                  আনুগত্য |
এর জন্য মূল্যও দিতে হয়েছে ঢের—
তবু থেমে থাকেনি কলম |
কবিতার জন্য রক্তক্ষরণ যেসব কাগজের ধর্ম
তাদের প্রতি থেকেছি কৃতজ্ঞ |
কেননা, এরাই আমার কলমকে কখনও বন্ধা
.                                হতে দেয়নি,
এরাই ছিল বিপন্ন কবির আত্মরক্ষার বর্ম |
আমি যেদিন সত্যিকার আগুনে পুড়ব,
লিটল ম্যাগাজিন, পাখার বাতাস দিও
.                            চিতার আগুনে |

.                  ****************                                
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
আকাশ আজ গীতবিতান
কবি অজিত বাইরী


ঝোড়ো-হাওয়া বইছে পুবে পশ্চিমে,
ডিস্ কে বাজছে রবিঠাকুরের গান ;
আমার মন কেয়াপাতার নৌকো |

বদর বদর ডাক অনেককাল পর হঠাৎ যেন
উথলে উঠল হাওয়ায়, পদ্মায় ভাঙন,
মাঝনদীতে বৃষ্টিধারার মধ্যে মাল্লাদের
বৈঠা-টানা ছন্দময় শরীর |

এই ঘাটে বাঁধা থাকত না কি কবির বোট ?
শিলাইদহে এসে যে-বোটে ভাসতেন পদ্মায়,
ভাসতে ভাসতে দেখতেন ঈশান
কোণ থেকে ধেয়ে আসত বৃষ্টিধারা আর ভাসাত
আউসের ক্ষেত, মসিলিপ্ত গ্রামরেখা
ঝাপ্ সা হয়ে যেত ক্রমে |

বর্ষার আকাশে মেঘের আনাগোনা দেখি,
কী ভাল লাগছে
রূপোর ধারায় স্নাত শ্রাবণ-সন্ধ্যা | মন কেয়াপাতার নৌকো |
ডিস্ কে বাজছে রবিঠাকুরের গান |
আকাশ আজ গীতবিতানের আধখোলা পৃষ্ঠা |

.                  ****************                                
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
বর্ম
কবি অজিত বাইরী


ঘনঘোর বর্ষার ভেতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছ,
পিঠের উপর মস্ত বোঝা ;
ঐ বোঝা তুমি নামাতে পার না |

মাঝে মাঝে মুখ বের করে দেখে নাও
পৃথিবীর ঋতু বদল,
আলোকসামান্য রোদ্দুর পড়েছে তৃণে |

ঐ বর্ম, ঐ আত্মরতির খোলস
বয়ে বেড়াতে ভাল লাগে আজীবন ?

কখনও ভাগ করে নাওনি অন্যের জীবন :
ধরিত্রীর ত্রিভুজ উঁচু ডাঙায়
তুমি শুধু, তুমি শুধু শামুক |

.                  ****************                                
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
কবির বাড়ি
কবি অজিত বাইরী
মিলনসাগরে প্রকাশ ৯.৫.২০১৭ তারিখে, ২৫শে বৈশাখ ১৪২৪।

যত অবহেলা আর বঞ্চনার মধ্যে কাটুক জীবন
লোকে চিনুক বা না-চিনুক, খ্যাতি, পুরস্কার
না-জুটুক, তাতে কি কিছু যায় আসে ?
সারমেয় যেমন দাঁতে চেপে ধরে হাড়ের খণ্ড
কলমকে সেইমতো কামড়ে আছি সারাজীবন
কোনো কিছুর প্রলোভনে চোয়াল আলগা করিনি।
আমি যখন থাকব না, তখন যেন
বাড়ির সমুখ দিয়ে যাবার সময়
লোকে আঙুল তুলে দেখায়, এটা কবির বাড়ি।

.                  ****************                                
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
গফুর
কবি অজিত বাইরী
মিলনসাগরে প্রকাশ ৯.৫.২০১৭ তারিখে, ২৫শে বৈশাখ ১৪২৪।


শরৎবাবু, আজ আপনার গফুর জোলার সঙ্গে
দেখা হল।
সেদিন গফুরকে যেমন দেখেছি, আজও তেমনি।
আর আমিনা,
সে-ও তো সেই আমিনাই রয়ে গেছে।
দিনকাল বদলালেও বদলায়নি মানুষগুলো ;
একইরকম দারিদ্য, একইরকম সামাজিক লাঞ্ছনা।
পাঁজর-গোনা মহেশের বড়ো বড়ো চোখ বেয়ে জল
পড়ে ; অবলা জীব জানে না
গফুর কত অসহায়, বুকে তার কত দয়া, মায়া।
ক্ষুধা যেমন মানুষকে তাড়ায়, পশুকেো তাড়ায়,
তেষ্টায় ছাতি ফাটে, হিতাহিত জ্ঞানশূন্য গফুরের
হাতে সাধের মহেশ মরে ; শেষ আবেদনটুকু শোনে কী খোদা ?
গফুররা বদলায় না, চিরকাল গফুরই থেকে যায়।

.                  ****************                                
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
হাত
কবি অজিত বাইরী
মিলনসাগরে প্রকাশ ৯.৫.২০১৭ তারিখে, ২৫শে বৈশাখ ১৪২৪।


মানুষকে অতো সামর্থ্যহীন ভেবো না হে
তার কাঁধের দু’পাশের দুটি হাতে উপর
আস্থা রেখো।
ওই দুটি হাতই অসাধ্য সাধন করে,
অসম্ভবকে করে সম্ভব।
ওই দুটি হাতই খাদান কাটে,
পাহাড়ে পথ বানায়, নৌকোর গুণ টানে।

হাত দুটোকে অত সহজ ভেবো না হে।

বিপর্যয় যত ভয়ঙ্কর হোক,
ধ্বংস যে বিভত্স চেহারাই নিক,
ওই দুটি হাতই পুনর্নিমাণ করে
বন্দর, শহর, সড়ক, সেতু, মানমন্দির।

মানুষের যাবতীয় স্বপ্নসৌধ যখন চূর্ণ হয়,
অন্ধকার যখন শ্বাপদের মতো
থাবা উঁচিয়ে ঘাড়ের উপর ফেলে নিশ্বাস ;
ওই দুটি ভয়হীন হাতই
ধ্বংসস্তুপে জ্বালে আলো।

কাঁধের দু’পাশের ওই দুটি হাতের উপর
ভরসা রাখো।
দুর্গমকে সুগম, অনিশ্চিতকে নিশ্চিত, দুর্লভকে সুলভ করতে
ওদের জুড়ি নেই।
সম্ভাবনা ও সামর্থ্যে মানুষই মানষের তুলনা।
কাঁধের দু’পাশ থেকে দুটি হাত---
ওই দুটি হাত আত্মারই অংশ ;
ওদের কখনও অক্ষম দুর্বল ভেবো না হে।

.                  ****************                                
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
মেঘের ঝালর
কবি অজিত বাইরী
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৪.৭.২০১৭


বাড়ির চাদ্দিকে নেমে এসেছে মেঘের ঝালর ;
মনে হল,  বাড়ি তো নয়,  বিমূর্ত কবিতা !
দিনের আলো নিভতে-না-নিভতে নিবিড়
হয়েছে আঁধার,  শ্রাবণ-শেষের সন্ধ্যা—
সবকিছু আড়াল হবার আগেও একচিল্ তে
কনে-দেখা-আলোয় সাদা কবুতরের মতো
এই আমার বাড়ি | জুঁইলতা কিছু বলবে বলে
গ্রিলের ফাঁক দিয়ে চলে এসেছে ভেতরে
কলম হাতে বাইরের আকাশে তাকাই
অঝোর ধারা নামল বলে... বৃষ্টি, না মায়াবী অক্ষর !

.                  ****************                                
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
হরিণের মাংস
অজিত বাইরী
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৪.৭.২০১৭


রসিকবিলের সংরক্ষিত এলাকায়
কয়েকটি হরিণ তারের জালে ঘেরা
চত্বরের ভেতর চরে বেড়াচ্ছে |
অতীব সুন্দর দেহসৌষ্ঠব ;
মায়াকাজল পরা দুটি চোখ
ক্যাকটাসের শাখা-প্রশাখার মতো আঁকাবাঁকা শিং
নির্ভয়ে কাছে এসে দাঁড়াল |
কী অপরূপ দৃষ্টিনন্দন স্রষ্টার সৃষ্টি !
তবু কারও কারও কাছে হরিণের সৌন্দর্যের থেকে
হরিণের মাংসের কদর বেশি |

.                  ****************                                
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর