কবি রসরাজ অমৃতলাল বসুর গান ও কবিতা
*
পতি মলে হাতের বালা খুলব না লো খুলবো না
কবি রসরাজ অমৃতলাল বসু
দুর্গাদাস লাহিড়ী সম্পাদিত “বাঙ্গালীর গান” ( ১৯০৫ ) সংকলন থেকে নেওয়া।


পতি মলে হাতের বালা খুলব না লো খুলবো না।
বিচ্ছেদ-আগুন প্রাণে আর তো
জ্বালবো না লো জ্বালবো না॥
আমরা সবাই বিদ্যেবতী,
আসলে পরে দোসরা পতি,
টানলে প্রাণ তার পানে সই,
কেন ঢলবো না লো ঢলবো না॥
হালের পতি হাতে ধরে,
বলে আমি পটল তুললে পরে,
আনতো ঘরে নূতন বরে,
সতি ভুলে না তো ভুলবে না॥

.               ***************************                
.                                                                                              
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
হাওয়ার তালে দুলে দুলে নাচোরে ফোটা ফুল
কবি রসরাজ অমৃতলাল বসু
দুর্গাদাস লাহিড়ী সম্পাদিত “বাঙ্গালীর গান” ( ১৯০৫ ) সংকলন থেকে নেওয়া।


হাওয়ার তালে দুলে দুলে নাচোরে ফোটা ফুল।
গাওয়ার তানে ঢুলে ঢুলে গাও রে অলিকুল।
পাতার ছায়ার বিকেল বেলা,
অতি ফুলে ছেলে খেলা,
( বড়ো ) ভালোবাসি, তাইতো আসি,
তাইতো আসি ভাই ;
ও ফুল অলি, মোরাও খেলি,
শুধ্ রে দে রে ভুল॥

.               ***************************                
.                                                                                              
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
আজ বাগানে ফুল তুলেছি দুজনে
কবি রসরাজ অমৃতলাল বসু
দুর্গাদাস লাহিড়ী সম্পাদিত “বাঙ্গালীর গান” ( ১৯০৫ ) সংকলন থেকে নেওয়া।


আজ বাগানে ফুল তুলেছি দুজনে।
মুখোমুখি হয়ে বসে হার গেঁথেছি যতনে॥
ফুলের সিঁথি, ফুলের বালা, ফুলের চন্দ্রহা,
মুদিত কুঁদে বাঁধা বাজু বেহদ্দ বাহার---
সারের সার গোলাপের হার নূতন ধরনে॥
বেণিতে পরালে পরে মজায় মোহনে॥
উড়ে যা উড়ে যা অলি,
মধু আজ দেবে না কলি,
সোহাগেতে ঢলাঢলি---
পিয়ারে পরাবে মালা যুবক জনে।
পাঁজর করে নজর দেবে কোমল চরণে॥

.               ***************************                
.                                                                                              
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
প্রাণে কার প্রেম আছে গো ভিক্ষা দিয়ে যা
কবি রসরাজ অমৃতলাল বসু
দুর্গাদাস লাহিড়ী সম্পাদিত “বাঙ্গালীর গান” ( ১৯০৫ ) সংকলন থেকে নেওয়া।


প্রাণে কার প্রেম আছে গো ভিক্ষা দিয়া যা।
আমরা সখের ভিখারিনী নয়ন কোণে চা॥
চাঁদা সেধে বারে বার, পুরুষ হারিয়েছে পসার,
তারো বলে তাই এবারে ধরসে নারীর পা॥
মোরা বিদ্যাবতী মেয়ে ( তাই ) বেরিয়ে এলাম ধেয়ে,
খালি পতির পেটের দায়ে বুঝছও তো তা---
জয় রাধেকৃষ্ণ রাধেকৃষ্ণ ( ওগো ) ভিক্ষা দাওসে না॥

.               ***************************                
.                                                                                              
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
ছি ছি ছি ছি! তুমি পাগল হলে কি
কবি রসরাজ অমৃতলাল বসু
দুর্গাদাস লাহিড়ী সম্পাদিত “বাঙ্গালীর গান” ( ১৯০৫ ) সংকলন থেকে নেওয়া।


ছি ছি ছি ছি! তুমি পাগল হলে কি॥
ওগো লজ্জা দিয়ো না ধরি তোমার পায়,
দেখো কাঁপছে বুক মুখ শুকিয়ে গেছে হায়,
পরপুরুষের কাছে বাবু যাওয়া কি গো যায়---
ভুলছো কেন ও প্রাণনাথ আমি বাঙালির ঝি॥

.               ***************************                
.                                                                                              
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
আমরা সব কাঁচা এঁটেছি
কবি রসরাজ অমৃতলাল বসু
দুর্গাদাস লাহিড়ী সম্পাদিত “বাঙ্গালীর গান” ( ১৯০৫ ) সংকলন থেকে নেওয়া।


আমরা সব কাঁচা এঁটেছি।
কে দেয় বাবা চুলোয় কাঠ,
ভাতার দেখে, করে ঠাট,
প্রাণটা আমার গড়ের মাঠ,
তাইতো মাল টেনেছি।
ছোঁড়ারা নাড়ুক হাঁড়ি,
ছুঁড়ির দল চড়বো গাড়ি,
যাব যার তার বাড়ি, তাইতে ফুরতি করেছি॥
শালারা সব পড়ুক নথ, করুক মোদের দণ্ডবৎ,
আমরা পেয়েছি পথ, মদ খেয়ে মেতেছি॥

.               ***************************                
.                                                                                              
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
জুড়াই ভাই আয় মরণে
কবি রসরাজ অমৃতলাল বসু
দুর্গাদাস লাহিড়ী সম্পাদিত “বাঙ্গালীর গান” ( ১৯০৫ ) সংকলন থেকে নেওয়া।


জুড়াই ভাই আয় মরণে।
জুড়াতে পাইনে এ ছার জীবনে।
বলে হরিনাম, যাই শান্তিধাম,
আরাম পাব গিয়ে হরির চরণে।
হরে হরে হরে, নামে ভয় হরে,
ব্যথা যাবে দূরে সে পদ-স্মরণে॥

.               ***************************                
.                                                                                              
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
সরস্বতীর ছলনা
কবি রসরাজ অমৃতলাল বসু
সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ও সত্যেন্দ্রকুমার বসু সম্পাদিত মাসিক বসুমতী পত্রিকার মাঘ
১৩৩৯ সংখ্যা (ফেব্রুয়ারী ১৯৩৩) থেকে নেওয়া। কবির পরলোক গমনের চার বছর পরে
প্রকাশিত এই কবিতাটি তখন অপ্রকাশিত রচনা হিসেবে প্রকাশিত হয়েছিল।


এস এস উঁকি মেরে কেন গো লুকাও ?
অমৃত ঢালিতে এসে কোথা চ’লে যাও ?
ছলনায় ললনার এতই আদর।
আনিয়া কানের কাছে সরাও অধর!
অপ্সরী কিন্নরী হোন্ দেবী অমরার।
নারীপ্রাণে ধরা আছে ধারাটি ধরার॥
কটাক্ষে কাঁপায়ে বক্ষ দোলাইয়া অঙ্গ।
যান্ যান্ ফিরে চান ভেবে ভারি রঙ্গ॥
ঠোঁটে হাসি ফুটে ওঠে বেণী দোলে পিঠে।
প্রেমিকে লোটায় পায় সাধ নাহি মিটে॥
কবিতা দুহিতা তব কমলে বসতি।
সঙ্গীত-সঙ্গিণী রঙ্গে নাম সরস্বতী॥
নয়নে শয়ন ক’রে আছে নবরস।
চরণ শরণে নৃত্য, করে বীণা বশ॥
অমরা ভূমি বুঝি বেজেছে কঠিন।
তরল সরসী-জলে তাই যাপ দিন॥
কোমল কমল হ’তে সুললিত কায়া।
বরণে বিমল বিভা কর্পূরের ছায়া॥
হেন আভরণ মাঝে রাজে যেই মন।
তাও কি গো ধরণীর নারীর মতন!

.               ***************************                
.                                                                             
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ
কবি রসরাজ অমৃতলাল বসু
সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ও সত্যেন্দ্রকুমার বসু সম্পাদিত মাসিক বসুমতী পত্রিকার ফাল্গুন ১৩৩৯ সংখ্যা
(মার্চ ১৯৩৩) থেকে নেওয়া।


জয় জয় রামকৃষ্ট                         অতিশয় শুভাদৃষ্ট
করি দৃষ্টি নর-দেহে হরি-নারায়ণ।
কলির কলুষরাজ্য                       এ কথা না করি গ্রাহ্য
কোন যুগে বার বার আকার ধারণ॥

প্রথমে সাজিয়া বুদ্ধ                       সাস্ত্র-অর্থ ল’য়ে যুদ্ধ
বিশুদ্ধ জ্ঞানের দীক্ষা দয়াধর্ম্ম শিক্ষা।
জন্মে রাজপুত্র হয়ে                     কৈশোরে সন্ন্যাস লয়ে
নির্ব্বাণ করিলে দান ল’য়ে অন্নভিক্ষা॥

মিমাংসা কে করে এই                 তুমি কি না পুনঃ সেই
শঙ্কররূপেতে যেই আইল ধরায়।
ঘুচায়ে বুদ্ধির ভ্রান্তি                        বিগ্রহে দানিল শান্তি
শিব শিব শিব রব উঠে পুনরায়॥

ওদিকে ইহুদিগণ                                পাপপঙ্কে নিমগন
বর্ব্বর পাশ্চাত্য জাতি হইল স্মরণ।
করুণা করে আকৃষ্ট                           নাম ধ’রে যীশুখৃষ্ট
কুমারী মেরীরে মাতা বল নিরঞ্জন॥

ক্রুশে দিয়ে আত্মবলি                      রক্ত রেখে গেলে চলি
সেই রক্তে হ’ল মুক্ত ধরা-পাপভার।
মত্সজীবীশিষ্যদল                           লঙ্ঘি’ সিন্ধু-চলালচল
য়ুরোপে খৃষ্টানধর্ম্ম করিল প্রচার॥

হেথা পঞ্চনদ-তীরে                         স্বধর্ম্মে জাগাতে বীরে
নানক গুরুর রূপে মন্ত্র করে দান।
ধর্ম্মভ্রাতা শিখ জাতি                        মর্ম্মতেজে ওঠে মাতি
স্বেচ্ছাচার অনাচার হ’ল অন্তর্ধান॥

পরে হের পুনরায়                                বঙ্গভূমে নদীয়ায়
গৌরাঙ্গ-লীলায় রঙ্গ ল’য়ে ভক্তদল।
আলো ক’রে শচী-কোল                         হরি বলে হরিবোল
প্রেমেতে মাতিল জীব ধরা টলমল॥

চণ্ডাল, পাষণ্ড, হীন,                          বাঙালী ভিখারী দীন
দুঃখীর দুয়ারে প্রভু প্রেম ভিক্ষা করে।
রাজা ত্যাজি’ সিংহাসন                          নষ্ট ভ্রষ্ট দুষ্ট জন
প্রেমদায় প্রভুপায় লুটায় কাতরে॥

জীবভাবে হৃষিকেশ                           দেখালেন কৃপাশেষ
কাঙালের বেশে আসি তাপিতে তারিতে।
এত প্রেম পেয়ে নরে                           যদি ভোলে নটবরে
উপায় হবে না তা’র সন্তাপ বারিতে॥

.               ***************************                
.                                                                             
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
শনিবারের বারবালা
কবি রসরাজ অমৃতলাল বসু
সুকুমার সেন সম্পাদিত বাংলা কবিতা সমুচ্চয় সংকলনের ( ১৯৯১ ) থেকে নেওয়া।


ঝিরা ঘুলুলো, পাড়া জুড়ুলো, জল ফুরুলো কলে।
বাজিয়ে শাঁক, ডাকায় নাক, সাঁজের বাতি জ্বলে॥
বিএলে---বেলে  পড়ছে ছেলে, মাষ্টার বসে ঢোলে।
বিছিয়ে পাটি, চায়ে বাটি, বউ-মা মুখে তোলে॥
শরীর কাঠি, গতর মাটি, বসেন নাকো ন’ড়ে।
কাটান বেলা, বেগার ঠেলা, পানের খিলি গ’ড়ে॥
ঘরের গিন্নি, মানেন সিন্নি, বৌয়ের বেটা হ’লে।
ফুলের কুঁড়ি, ননদ ছুঁড়ি, বিষের ভিষে জ্বলে॥
কুর্ শি মেজে, গুড়ুক সেজে, কর্তা ফুড়ুক টানে।
আফিঙ খেয়ে, চেঁচিয়ে চেয়ে, দেখেন আলো পানে॥
ময়লা বেশে, গয়লা এসে, কড়ায় মাপে দুধ।
পাড়ায় পূণে, দেখায় গুণে’, গেল মাসের সুদ॥
নকল দানা, গরম চানা, হাঁকছে মিহিসুরে।
সইস্ পইস্, চেঁচায় সইস্, বাতাস লাগে নুরে॥
সাজিয়ে ডালা, ফুলের মালা, বেচছে বসে মালী।
মেছোর মেয়ে, খদ্দের পেয়ে, দিচ্ছে দেদার গালি॥
ছ্যাকড়া গাড়ি, ডাকছে হাড়ী, বিবির বাড়ি যাবে।
পাতায় মোড়া, ফুলের তোড়া, টাট্ কা তাড়ি খাবে॥
মাতুল শুঁড়ি, ফুলিয়ে ভুঁড়ি, ভরছে পিপে জলে।
মাপছে দেশী, বেচবে বেশী, দোকান বন্ধ হ’লে॥
বিশেষ কাবু, আপিস্-বাবু, চলছে এঁকে বেঁকে।
ডোগ দে দাঁড়া, ট্রামের ভাড়া, মামার বাড়ি রেখে॥
বিজলি ছুঁড়ি, হয় না বুড়ি, টানছে দেখ গাড়ি।
জ্বালছে আলো, ঘোরায় ভালো, পাঙ্খা বাড়ি বাড়ি॥
কতক কুঠি, দুটোয় ছুটি, কম কেরানা পথে।
কেউ বা হেঁটে, হাত দে পেটে, কেউ ভাড়াটে রথে॥
নাট্যশালায় আলো জ্বালায়, টিকিট ঘরে মেলা।
বাজবে ন’টা, লাগবে ঘটা, করবে শুরু খেলা॥
গর্ভ-বখাট, মুর্খ-আকাট, ব্যাদড়া ছেলেগুলো।
সয়না দেরি, বাগিয়ে টেরি, খুঁজ্ ছে কোথা চুলো॥
মাড়োয়ারীরে, জরোয়া হীরে, হাতে গলায় পরে।
ফেটিং চড়ে, ঘুরছে মোড়ে, চোখ যেতেছে ক্ষরে।
মইনে ছুটে গ্যাসের মুটে, চলছে আলো জ্বেলে।
দাঁড়িয়ে মোড়ে, জুঁয়ের গোড়ে, হাঁকে মালীর ছেলে॥
মেঠাইওলা, ঘিয়ের খোলা, চাপিয়ে দেছে আঁচে।
ড্রেনের গন্ধ, নয়কো মন্দ, ঘৃত সিন্ধুর কাছে॥
দাঁড়ির ফেরে, তিন পো সেরে, বেচবে লুচির পোয়া।
পাপ কাটাতে, তাই পাটাতে, দিচ্ছে ধুনোর ধোঁয়া॥
পাহারাওলা, লোকের চলা, ঠাউরে চোখে দেখে।
কার বগলে, কালো বোতলে, মাল চলেছে ঢেকে॥
এগিয়ে গিয়ে, ধমক দিয়ে, বলছে মাতোয়ালা।
চুকাও দাবি, নেই তো আবি, থানায় চলো শালা॥
এহে হে হে হ্যা, গ্যাল গ্যাল গ্যা, পড়্ লো মাগী চাপা।
ট্রামের গাড়ি, মারলে পাড়ি, বোগ্ নো-ডাঙা লাফা॥
শনির সাঁজে, শহর মাঝে, বারবেলাটা ফলে।
কেউবা মরে, কেউ বা ধরে, কারুর মজা চলে॥

.               ***************************                
.                                                                             
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর