কবি অনির্বাণ দত্তর কবিতা
*
আমার ছোট্ট সোনার জন্য
কবি অনির্বাণ দত্ত

মাটিতে দাঁড়িয়ে-ই শুষে নেয় জল ।
ওর জিরাফের গলা
অনায়াস দীর্ঘ্য অতটাই ।
সুগভীর মেঘের ভেতর ।
আর, নতুন মশারী বেয়ে পাহাড়ী ঝরনা ,
কিম্বা একটা হিংস্র সিংহের বন্ধু
একটা তরুণ হরিণ , নীল গালিচার পাশে ।
কঙদ্বীপে অতিকায় দানবের গায়ে
শরীর এলিয়ে এলিয়ে
তারপর খুব ভোরে সৌরঝড় রুখে দেয়
বালিশের পাশে রাখা রঙীন সৈনিক ।

তবু তো , প্রতিদিন-ই বয়স বেড়ে যায়
কথা বলা হলুদ পাখীর ,
লাশের গন্ধমাখা নিউজপেপারে ।
চামড়া কুঁচকে যাবে একদিন ঐ
কানামাছি ভোঁ ভোঁ অপরান্হ বেলার ।

যখন হাপড়ের মতো বুকের ওঠা নামায়
মাপবে সিঁড়ির উচ্চতা ,
বুঝবে, একবার পূর্ণ ঘূর্ণনে চাকার সরণ সেই 2πr ,        
যখন ঘাসের শরীরে জমানো বৃষ্টিতে
পচন ধরাবে এসে শীতল কামড়
মসৃণ রঙীন পাথরের ,
তখন আমার এই ছোট্ট সোনাটা বুঝে নেবে,
ঢেউ-এর উল্টোদিকে কিছুদুর উড়ে যায় গাঙচিল ,
তারপর ফিরে আসে ফের ।

অথচ, এই ফ্ল্যাটবাড়ী , স্পেন্সার ,
ব্যাঙ্ক , বীমা ,
ATM লাইনের ভীড়ে        
সঞ্চয়তো করিনি কখনো
নক্ষত্রের শূণ্যগন্ধ ওর জন্য ,
বিশ্বস্ত কোনো নদীর গভীরে ।

.             ***************  
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
একবার
কবি অনির্বাণ দত্ত

তারপর দিন শেষ হ’য়ে গেলে
একবার দাঁড়াতে হয় আয়নার মুখোমুখি ।
চোখ রাখতে হয় নিজের চোখে ,
আর হাত রাখতে হয়
বুকের ওপর ।

সমস্ত বাজার-হাট সমস্ত রেলপথ
সব সাঁকো , সব গাড়ী শেষ হ’য়ে গেলে
সব পথ গুণে গুণে বাড়ী ফিরে এলে
নিজে নিজে একবার ফিরে যেতে হয়
একেবারে নিজের ভেতর ।

.             ***************  
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
এমন
কবি অনির্বাণ দত্ত

তারপর সেই ‘পাখীর নীড়ের মতো চোখ’
ঢেকে দিল নির্ভুল, এক নৈহাটীগামী ট্রেন ।
মেঘের শরীর থেকে সুনিপুণ  
ছিঁড়লো খসড়া কবিতা , নিউটাউন বাইলেন ।

শ্রীরামপুর অটোর লাইন বেয়ে
মারগাঁও ফিরে গেল শার্লি রডরিগস ।
ততক্ষণে বাগুইয়াটি মোড়ে
চোখ রাঙাচ্ছে এসে টেকনোপলিস ।

জোয়ারের গন্ধমাখা দুঃসাহসী হাওয়া
খুন হোলো
CAD ল্যাবের ভেতর ।
মুরগী কাটে কসাই যেমন একটা
আর একটার পর ।

তবু, কোনো সাঁঝবেলা সাতটা তারা
এক আকাশ প্রশ্ন ছড়ায় যখন ,
মনেহয় , কতবার দেখেছি তোমাকে ,
কখনোতো দেখিনি এমন ।

.             ***************  
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
এতটাই
কবি অনির্বাণ দত্ত

যদিও সকাল নামে শাসকের মতো ,
ইউক্যালিপটাসের কিশোরী পাতায় ।
সস্তা লিপস্টিক ঘষে দেয়
ধোবিঘাটে টিকিটের লাইন ,
একটা নদীর ঘুমভাঙা ঠোঁটে ।

তবু, কখোনো কোনো হাওয়া
এতটা রোমাঞ্চিত থাকে ,
এক বাধ্য কীবোর্ড-ও কোনোদিন
শুধু রাতের কথাই লেখে ।

.             ***************  
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
ঈশ্বর হ’য়ে যেতে হয়
কবি অনির্বাণ দত্ত

সেদিন যখন অঙ্ক কষে
অনেক সমাকলণ , সমীকরণ পার হয়ে এসে
জানা গেলো ঈশ্বর ‘মৃত’ ,
ঠিক তখনই একটা কার্নিশঘেঁষা শালিখ
হঠাৎ কি ম’নে ক’রে উড়ে গিয়েছিলো মাঝরাতে
ক্ষুধায় কুঁকড়ে থাকা শিশুটার পাশে ঐ দূরে ।
ক্ষুদ্র ঠোঁটে প্রাণপণ যতটুকু চাল
যতটুকু ভাঙা ফল , গম, ছোলা রেখে দেওয়া যায় ......

সেইদিন সেই সব ঘুমন্ত শহর ছাড়িয়ে
নদী পথ পাথর পেরিয়ে
ঐ স্থবির পাহাড়ের কানে মুখ নিয়ে
ব’লেছিলো কোনো এক নীরব কথায়    
“ঈশ্বরকে জানতে হ’লে
ঈশ্বর হ’য়ে যেতে হয় ।”

.             ***************  
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
মা
কবি অনির্বাণ দত্ত

আয়তাকার প্রান্তরে অন্তরীণ
ঘাসের আগায় কোনো ল্যাপ্টানো বৃষ্টির মতো
থেকেযেতো হয়তো , শুধুই একরাশ
সান্ধ্য আর্দ্র্যতা ।
কিম্বা,  মরিয়া অন্বেষণ সারারাত
সব নক্ষত্র সরিয়ে বারবার ।

হয়তো বা, স্তব্ধ হাহাকার ঘেঁষে
ঘুরে যেতো নির্বিকার ,
সবগুলো বাস-অটো-ট্যাক্সির
সবকটা চাকা ।
ভীড়াক্রান্ত সৈকতজুরে নিঃসঙ্গ সমুদ্রমাফিক
পাথর হয়েই যেতো হয়তো একদিন ঠিক
কতো কথা , কতো সংবাদ
নিস্ফল ঠিকানা খুঁজে খুঁজে ।

কিন্তু তুমি তো, সেই সব মেঘ
সব ছায়া একে একে মুছে
উচ্চ থেকে উচ্চতর আরো
অনন্ত স্নেহজাত সে অসীম স্পন্দনে,
মরণের দেশ থেকে আলোক পাঠিয়ে
আমাকে অমর ক’রে গেলে ।।

.             ***************  
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
যথেষ্ট ছিলনা বোধহয়
কবি অনির্বাণ দত্ত

প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয় দিয়েছিল
তেঘড়িয়া মোড়ের এক মরিয়া হকার ,
SA-8 , Glister  বা স্যাটিনিক শ্যাম্পু আমার ব্যাগের ভেতরে তখন
টুঁটি টিপে রেখেছে ‘কৃত্তিবাস’, ‘শূন্যজ’ বা খসড়া খাতার ।

অথচ জানো, বৃষ্টি এনেছিল ...
সেই গোধূলি গতকাল ,
হঠাৎ আকুল কোনো ভেজা হাইরোডে দাগ কেটেছিল ,
সব ধাতব আসা আর যাওয়া  বারবার ।
আর, মিশে গেল লাচুং-এ , পেলিং-এ
দূরায়ত সেই গ্লোবাস বা স্পেনসার ,
অতগুলো গাড়ি নিয়ে কেমন অনায়াস
ঢুকে গেল মেঘের ভেতরে কোনো আবছা বাইপাস ।

তারপর তো আবার রোদ্দুর
এলই তো সেই ...
দাগ মুছে কঠিন হোল সব রাজপথ ।
পক্ষীরাজ তো তৈরী-ই ছিলো
অমন উগ্র মেঘজাত মাদক হাওয়ায়  ,
শুধু একটা রাত তবু যথেষ্ট ছিলনা বোধহয় ।

.             ***************  
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
রক্তবাষ্প
কবি অনির্বাণ দত্ত

এক বুক রক্তবাষ্প নিয়ে
টুকরো টুকরো হেঁটে গেছে মেঘ ,
ব্ল্যাকহোলের শূণ্য গভীরে
নিঃসঙ্গ পাহাড়ী আবেগ ।

ঘাস থেকে পাথর
আর আগাছার ঝাঁকড়া শরীরে
সারারাত টুপটাপ আর্দ্র্ আনাগোনা ,
মানুষের কাছে পাওয়া
মানুষের তীব্র যন্ত্রণা ।

.         ***************  
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
সৌরঝড়
কবি অনির্বাণ দত্ত

তারপর সেই আগুন
অনেক শূন্যতা পেরিয়ে,
ঢেলে দিয়ে উষ্ণতা
ইউক্যালিপটাসের আমূল গভীরে ,
রোদ্দুর হয়ে যায়         
রোজকার রঙচটা জানলায়
ল্যাপ্টানো মাকড়সার শরীরে।

এভাবেতো, নিস্তরঙ্গ চামড়ার নীচে
হাপড়ের মতো সীমিত ওঠা নামায়
থেমে আছে ক্ষুধার্ত মাংসের খোঁজ।

তবু, একটু একটু কি
আলগা হচ্ছে স্নায়ুর বাঁধুনী ?
তাই কি শুধুই এখন
চোখ বুজে সৌরঝড় শুনি ?

.         ***************  
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
তাই
কবি অনির্বাণ দত্ত

তারপর যখন সেই টানা চারদিন
বৃষ্টির শরীর শুঁকে শুঁকে ...
বৃষ্টির শরীর খুঁড়ে খুঁড়ে পাওয়া গেলো অবশেষে
সেই কিছু দুর্গন্ধ ,
ঘেমো ঘেমো ,
তখন ,
দু তিনটে কেরানী রোদ্দুর-ই
হয়ে উঠলো হঠাৎ, আপ ব্যান্ডেল লোকালের জানলাগামী
আপাদমস্তক অচেনা সুন্দরী ।

এসব কথা জানে রামধনু , কাঞ্চনজঙ্ঘা
কিম্বা কোনো চাঁদের পাহাড় ...
তাই, আজীবন অনায়াস
শুধু এড়িয়েছে সহবাস ।

.         ***************  
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর