কবি অতীন্দ্রলাল দাশের কবিতা
*
পঙ্কজ
কবি অতীন্দ্র লাল দাশ
রচনা- ২৬ / ১ / ১৯৫৭
শ্রীমতী মাধুরীকণা দাশ প্রকাশিত “পঙ্কজ” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া

হৃদয়ে আমার পঙ্ক জমেছে গভীর গভীরতম
রাতুল বরণ রাখিবে কোথায় ওগো সুন্দরতম ?
ভোগ-মসী মাখা ললাটে আমার এঁকেছি পঙ্কটীকা
লালসা-লিপ্ত নয়নে দিয়েছি কাম-অঞ্জন লিখা |

মানস সাগরে উঠেছে তুফান কামনা বহ্নিসম,
আমার গগনে ঘনায় আঁধার নিভিছে দেউটী মম
জীবন তরণী ভেসেছে অকূলে ঝঞ্ঝার পারাবার
লক্ষ্যবিহীন নাহি পায় দিশা কোথায় কর্ণধার |

আমার জগৎ স্বার্থ-অন্ধ পশুময় মসীময়
ধরম-গ্লানি ঘোর-ঘনতলে জীবনের অপচয় |
অধর্ম-অশনি বিদরে আকাশ বজ্র নিঠুর তাপ
ঘোর চরাচর উদ্বেল আজি শিরে হানে অভিশাপ |

ওগো প্রিয়তম বন্ধু ! আমার কোথা জগতের হরি
কোথায় তোমার পাঞ্চজন্য শঙ্খচক্র ধারী  ?
তুমি যে বলেছ তোমার পার্থে প্রেমঘন অনুরাগে
নাশি অধর্ম স্থাপিবে ধর্ম সম্ভমি যুগে যুগে ||

পতিত পাবন মহাউদ্ধারণ প্রভু পঙ্কজচারী
হৃদয় পঙ্কে সৃজ পঙ্কজ বরষিয়া কৃপাবারি |
পদ্মপলাশ লোচন শ্যমল ললিত ত্রিভঙ্গ বাঁকা
হৃদি পঙ্কজে নবীন কিশোর দাঁড়াও প্রাণের সখা |

.                      ****************                                
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
আগমনী
কবি অতীন্দ্র লাল দাশ
রচনা --১৪ / ৭  / ১৯৫৭
শ্রীমতী মাধুরীকণা দাশ প্রকাশিত “পঙ্কজ” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া

আকাশে বাতাসে                      সোহাগ ছড়ায়ে
হাসিছে সোনার বরণী
শেফালী বিছান                         গ্রাম পথে পথে
শিশিরে ফুটেছে লাবণী |
কোমরপুরেতে                              নব দুর্গার
আবাহন আয়োজন
শম্ভু আরাধন                             সাধনায় রত
করি আত্মনিবেদন ||
শঙ্করী-হারা                                শঙ্কর বুঝি
রুদ্র ভয়ঙ্কর
ক্ষ্যাপা ধূর্জটী                          মেঘ জটাজালে
ঘিরিয়াছে অম্বর |
হিম গিরিরাজ                          বিগলিত আজ
পদ্মা প্রবল মত্তা
কীর্তি নাশিনী                          কাহারে গ্রাসিবে
চঞ্চল উন্মত্তা ||
দুকূল প্লাবিয়া                            ছুটে অবিরল
পদ্মা সর্বনাশী |
কোমরপূরেরে                           ভাসাইয়া চলে
নিঠুর অট্ট হাঁসি |
চক্রবর্তী                                   চক্রে পরিয়া
হইয়াছে দিশাহারা
মায়ের তরণী                           ভাসাইলে জলে
ছুটে চলে পথহারা ||
প্রাণ গোবিন্দে                              ধরিয়া বক্ষে
আকুলিত অভাজন
জননীর পূজা                          কোথায় সাধিবে
চিন্তিত আরাধন |
দুর্গতি হরা                                  দুর্গা ভবানী
দুর্গম পারাবারে
হৃদি গোবিন্দ                                পদার বিন্দ
শোভে গোবিন্দপুরে ||
দিশেহারা তরী                        লাগিয়াছে ঘাটে
উঠে আনন্দ রোল
মুক্তারামের                                  মুক্তিতীর্থে
জাগে প্রাণে হিন্দোল ||
সিদ্ধির পথে                             সাধনা চলেছে
নিতি নিতি এই ভবে
নব নব রূপে                                 সম্ভব করি
দিব্য আবির্ভাবে ||

.                               ****************                                
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
বন্ধুর পথে
কবি অতীন্দ্র লাল দাশ
রচনা --১৯ / ৪ / ১৯৫৭
শ্রীমতী মাধুরীকণা দাশ প্রকাশিত “পঙ্কজ” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া

বন্ধুর পথে নামে অমানিশা রাত্রি
পথ হারা দিশা হারা শঙ্কিত যাত্রী |
দুর্য্যোগ ঘন ঘোর স্তব্ধ ধরিত্রী
ঘিরিয়াছে মেঘজাল ঢাকিয়া সবিতৃ |
বন্ধুর পথে তবু আছে আছে বন্ধু
করুণায় বিগলিত আছে প্রেম-সিন্ধু |
ভক্ত তরে হলাহল পানে আকন্ঠ
বন্ধু শিব বন্ধু শুভ বন্ধু নীলকন্ঠ |
আঁধারের বুক চিরে বিজলীর লিখা |
বন্ধু সে রূপময় আলোকের শিখা |
চরাচর গ্রাসি চলে ছুটে চলে বন্যা
তারি মাঝে ডুবে আছে মুক্তি অনন্যা |
ধ্বংসের ও মাঝে শোভে সুন্দর বন্ধু
সিন্ধুর মন্থনে অমৃত বিন্দু ||

.                ****************                                
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
আবির্ভাব
কবি অতীন্দ্র লাল দাশ
রচনা - ০৩ / ১১ / ১৯৫৭
শ্রীমতী মাধুরীকণা দাশ প্রকাশিত “পঙ্কজ” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া

বৈশাখ আসে রূদ্রের রূপে ক্ষেপা ভোলা শঙ্কর
ধূর্জটী ভালে জ্বলে ত্রিনয়ন মোহন ভয়ঙ্কর
গগনে গগনে লগনে কাল বৈশাখীর খেলা
গরজে করক কাঁপায়ে অলকা দুলিছে ঝড়ের দোলা |
মৃত্যু বিষাণ করে ফিরে ওই সেইত মৃত্যুঞ্জয়
বাজে ডম্বরু ডাকে গুরু গুরু নাহি ভয় নাহি ভয় ||
ভীত শঙ্কিত দীন অভাজন খোলরে দুয়ার খোল
পতিতের সখা বন্ধু শ্রীহরি আসার সময় হল ||
মহাভারতের কুরুক্ষেত্রে জাগো নর নারায়ণ
অন্তরতল অন্তর তলে রচ তাঁর সিংহাসন |
বৈশাখী বিশাখা উচ্ছল হল হৃদয় পাগলপারা
নবমী কিশোরী শিরে শীশ কলা ঢালিছে অমিয় ধারা
বঙ্গাধিপের প্রাসাদ ভবনে বাজে মঙ্গল শঙ্খ
হৃদয় দেবতা আসিবে হৃদয়ে বাজে আরতির ডঙ্ক |

*      *       *

গভীরা রজনী শ্রান্ত ধরণী সুপ্তা মুখরা নগরী
বামা দীননাথ কন্ঠলগ্না দিব্য স্বপনচারী
নবমীর চাঁদ ডুবু ডুবু পাটে ছড়ায় জোছনা লাবণী
স্নিগ্ধা শান্তা ধীরে বয়ে যায় গঙ্গা পতিত-পাবনী |
সদ্য স্নাত বামা দীননাথ ধ্যানে নিমীলিত নেত্র
দিব্য লাস্যে পূরব আস্যে পুলকে শিহরে গাত্র
ধূলি ধুসরিত ব্যথিত বিশ্বে শিহরে অশোক শাখা
শোকের মাঝে কি ফুটিবে অশোক তরুণ প্রাণের শিখা |
অত্যাচারের তীব্র দাহনে জীবকুল দিশাহারা
গোমাতা কাঁদিছে হাম্বা রবেতে বহে অবিরল ধারা
অশ্রু গোমুখী সে ধারা মিশিল গঙ্গা গোমুখী সনে
পতিত-পাবনী ফেনিল রঙ্গে গরজি উঠিল সঘনে |
লহরীর পর লহরী তুলিয়া ছুটে চলে অবিরল
স্বরগের হাসি রূপে মেশাটমশি ভেসে যায শতদল
কমল আসলে কমল লোচন কোমল শয্যাপরে
ভুবন ভুলান মদনমোহন চির শিশুর রূপ ধরে |
দীননাথ তারে বুকেতে তুলিয়া স্নেহের পীযুষদানে
কল্যাণ করে দানিল বামারে চির বঞ্চিত ধনে |
বামা দীননাথ সুখেতে ভাসিল ভাসে আনন্দ নীরে
সহসা জাগিল স্বপন টুটিল চমকিত বারে বারে |

.                ****************                                
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
প্রকাশ
কবি অতীন্দ্র লাল দাশ
রচনা --০৩ / ১১ /  ১৯৫৭
শ্রীমতী মাধুরীকণা দাশ প্রকাশিত “পঙ্কজ” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া


বঙ্গাধিপের উত্সব পুরী সাজিয়াছে মনোরমা,
বৈশাখী শুক্লা নবমী নিশীথে স্বপন দেখিবে বামা ;
.                  বসিয়া যুক্ত করে
.                  ভরা গঙ্গার তীরে,
বামা দীননাথ দেখিল কখন নোহন ভঙ্গিমা,
অমল কমলে কমল নয়ন অপরূপ মহিমা
দীননাথ লভে দীনের নাথেরে অযাচিত কৃর্পারাশি,
স্নেহের বক্ষে ধরিয়া হেরিল সে মুখ পূর্ণ শশী
.                    দানে কল্যাণ করে
.                    বামার অঙ্ক পরে,
গোলকের ধনে অরূপ রতনে সযতনে ভালবাসি ;
টুটিল  স্বপন, ভাবে মনে মন দিব্য পুলকে ভাসি !

*     *     *      *   

বামা দীননাথ ধীরে চলে যায় বিহ্বল তনুখানি,
মনে মনে স্মরি ভাব-বুকে ধরি আদরের গুণমণি |
.                     মুগ্ধ আপন মনে,
.                     চলিয়াছে গৃহপানে,
বিধুরা বামার স্নেহ-অভিসার উড়ে অঞ্চলখানি ;
দিব্য শিশুর ধরিয়া অঙ্কে জননী সে অভিমানী |

*     *     *      *

নিজ অঙ্গনে পশিল দুজনে প্রবেশ কুটীর মাঝে,
হেরে বিস্ময়ে হৃদয়ের নিধি অপরূপ শিশু সাজে ;
.                     ত্রস্ত ব্যাকুল পদে
.                     স্নেহের বাঁধনে বাঁধে
অকুলা জজনী শুনে কিঙ্কিনী কোন সুরে বাঁশী বাজে ;
অন্তরযামী প্রকাশানন্দ হৃদয়ে বাহিরে রাজে |

.                   ****************                                
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
শিশু সুন্দর
কবি অতীন্দ্র লাল দাশ
রচনা --০৪ / ১১ / ১৯৫৭
শ্রীমতী মাধুরীকণা দাশ প্রকাশিত “পঙ্কজ” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া


পুণ্যশীলা ধর্মময়ী                               মহারাণী স্বর্ণময়ী
সদা সাধু সমাবেশ আলয়ে তাঁহার |
নিত্য সেবা পূজা চলে                      নিষ্ঠাভরে কুতূহলে
দীন অভাজন তরে সদা মুক্ত দ্বার ||
একদা নেপালবাসী                           আসে এক সন্ন্যাসী
পরম দৈবজ্ঞ বলি রটি গেল নাম |
বিজ্ঞজন দীননাথ                         পেয়ে গেল এ সংবাদ
বন্ধুবর কবিরাজ গঙ্গাধর ধাম ||
দীননাথ সুপণ্ডিত                           তাতে বহু শাস্ত্রবিৎ
জন্ম-পত্র রচনায় আছে অধিকার |
পুঁথি পড়ি রাশি রাশি                     রেখা টানি অঙ্ক কষি
করেছে ঠিকুজিখানি অতি চমত্কার ||
জন্ম লগ্ম রাশিচক্র                         কত রেখা অষ্ট বক্র
কেমনে বাঁধিবে সেই ত্রিভঙ্গ বাঁকায় |
স্নেহে অন্ধ বৃদ্ধ পিতা                    নাহি ভাবে সেই কথা
নিয়তির নিয়ন্তারে নিয়ন্ত্রিতে চায় ||
দীননাথ ন্যায়রত্ন                            করিয়া পরম যত্ন
পুত্রের ঠিকুজিখানি করেছে নির্ভুল |
একমাত্র পুত্র তায়                    বাঁচে কি না বাঁচে হায়
বুক করে দুরু দুরু সংশয় আকুল ||
জন্মপত্র লয়ে সাথে                        দীননাথ ত্রস্ত পদে
গেল যথা আছে সাধু বসি যোগাসনে |
ঠিকুজি করিয়া পাঠ                        সাধু হয় হতবাক
বিস্ময় পুলক চিত্তে ভাবে মনে মনে ||
পরদিন বিপ্রপুছে                  জাতক কি বেঁচে আছে ?
ঠিকুজি বিচার করে দোখিতে হইবে |
বিদ্যাস্থান বন্ধুস্থান                      কোন গ্রহ অবস্থান
ইষ্ট রিষ্ট বিচারিব সর্ব শুভাশুভে ||
দীননাথ মনে মনে                        অশুভ প্রমাদ গণে
ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসিল কাতরে সম্ভাষি |
“পুত্র শোকাতুর বুকে                   দিলা বিধি এ জাতকে
হারা নিধি হয়ে নিবে মোরে সর্বনাশি ?”
সন্ন্যাসী  কৌতুকে হাসে                 কহেন মধুর ভাষে
‘জানিতে চাহিনু শুধু খোকা কিবা করে ?”
বিপ্র কহে “খেলা করে”              সাধুজী বলিল তারে
“বারেক দেখিতে চাহি আনিও কুমারে ||”
দ্বিতীয় দিবস গতে                    তৃতীয় দিবস প্রাতে
ন্যায়রত্ন গেলা তব সন্ন্যাসী সদন |
দুই স্নেহ বাহু ডোরে                    পরম যতন করে
বুকে ধরি হারা নিধি পরম রতন ||
নিমেষে দর্শনমাত্র                     পুলকে শিহরে গাত্র
সন্ন্যাসী কুমারে নিল নিজ অঙ্ক পরে |
শ্রীপদ ধরিয়া বক্ষে                   অশ্রু বিগলিত চক্ষে
অপলক রহে চাহি সে চির সুন্দরে ||
ছোট ছোট পা দুখানি                নিজ শিরোপরে আনি
আনন্দ সাগরে ডুবে সন্ন্যাসী ঠাকুর |
ন্যায় রত্ন কহে তার                  একি দেখি হায়, হায়,
দাও পুত্রে পদধূলি বিঘ্ন কর দূর ||
সন্ন্যাসী রহিল চাহি                      নয়নে নিমেষ নাহি
বাহ্যজ্ঞান লুপ্ত তার কথা নাহি সরে |
তবে কিছুক্ষণ পরে                   সাধু কহে ধীরে ধীরে
‘এ শিশু সামান্য নহে কভু চরাচরে  ||
জনম মাহেন্দ্রক্ষণ                           পঞ্চতত্ত্ব গ্রহগণ
সমাবেশ একসাথে অবতার যোগ
সরল শিশুর বেশে                       মহাউদ্ধারণ হাঁসে
আনন্দ মূরতিখানি হরি তাপ শোক ||
যুগে যুগে আসে সে যে                ভূ-ভার হরণ কাজে
গণনায় গর্গ করে আপস নির্ণয়
জন্ম সার্থক মানি                       ভগবানে গনি আমি
সর্ব্বেন্দ্রিয় গুণাভাসে বর্ব পরিচয় ||
দীননাথ মনে মনে                      অবাক বিস্ময় মানে
পিতৃ-স্নেহে অপত্যেরে নিল বক্ষে তুলি |
মঙ্গল কামনা করে                         চুম্বিল অধর পরে
ইষ্ট নাম স্মরি যায় গৃহে চলি ||

.                             ****************                                
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
যোগের রাজা
কবি অতীন্দ্র লাল দাশ
রচনা --০৪ / ১১ / ১৯৫৭
শ্রীমতী মাধুরীকণা দাশ প্রকাশিত “পঙ্কজ” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া

কিরীটেশ্বরী মন্দির হতে সন্ন্যাসী একজন
পথে পথে ফিরে হাসে আর গাহে মনা ভাবে নিমগন ||

কেহ বলে ক্ষ্যাপা কেহ দেয় সেবা কেহ বা বচন শুনে
মান-অপমান সম্মান তাহার কোন কিছু নাহি মানে ||

সন্ধানী চোখ কারে যেন খুঁজে নাহি পায় তার দিশা
খুঁজে খুঁজে ফিরে পথে পথে ঘুরে খোংজাই হয়েছে নেশা ||

উদাসীন সাধু গান গেয়ে যায় সুরেতে মাতায় প্রাণ,
“কোথা তুমি মোর বন্ধু শ্রীহরি, দিবা হয় অবসান |”

সন্ন্যসী বেশে চলেছে জহুরী পরশ-পাথর খোজে,
কোথায় লুকান রয়েছে মাণিক কোন্ সাগরের মাঝে |
ধনীর প্রাসাদে দীনের কুটীরে কোথায় শ্রী-অঙ্গনে,
ধূলি ধূসরিত সোমার অঙ্গ লুকায়ে রয়েছে বনে |
বুঝি বনমালা পরিয়াছে গলে চরণে নুপূর বাজে,
কোন গোঠে বুঝি চরাইছ ধেণু মোহন রাখাল সাজে |
অঙ্গনে বুঝি হামাগুড়ি দেয়, রাঙ্গা ছোট পা-দুখানি,
নয়নে বিলোল পরেছে কাজল, মুখে হাঁসি রেখা টানি ||

*     *      *      *    

বামা দীননাথ আপনার কাজ করিছে আপন মনে,
শিশু ভোলানাত হামাগুড়ি দেয় কুটীরের অঙ্গনে |
হেন কালে ক্ষ্যাপা সাধু প্রবেশিল দীন অঙ্গনতলে,
অপলক হেরে রক্ত-কমল শিশুর চরণতলে |
ধ্বজ বজ্রাঙ্কুশ চিহ্ন হেরিয়া হৃদয় নাচে,
এতদিনে বুঝি মহাদরশন মিলিয়াছে মিলিয়াছে |
“এ শিশু কাহার, এ যে রাজা হবে”, সাধু ফুকারিয়া কহে,
মহা বিস্ময়ে কাতর বচনে দীননাথ বলে তাহে,
“গরীব বামুন, এ ছেলে আমার, রাজা নাহি সম্ভবে ||”
সন্ন্যাসী বলে “আমার বচন মিথ্যা না কভু হবে,
ভোগ-রাজা নহে, যোগ রাজা সেজে জীবে প্রেম বিতরিবে |
ত্রিতাপ-দমন পরশ-রতন পাপী-তাপী উদ্ধারিবে |”
বামা দীননাথ ভাবিয়া আকুল এ কি বলে গেল ক্ষ্যাপা,
জনক-জননী স্নেহরস-খনি, লীলাময়ে বুঝে কেবা ?

.                             ****************                                
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
জগৎ-বন্ধু
কবি অতীন্দ্র লাল দাশ
রচনা --২১ / ১১ / ১৯৫৭
শ্রীমতী মাধুরীকণা দাশ প্রকাশিত “পঙ্কজ” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া


দুর্বাঘাসে লতায়-পাতায়
হাসে শরৎ রাণী,
দোয়েল শ্যামা গাইছে ডালে
বইছে মধুর বাণী |
লতায়-পাতায় ফুলের শোভা
সবুজ বনানী ,
বিশ্বমাতা পেতেছে তাঁর
সোনার আঁচল খানি |
সকাল হতে চল্ ছে বড়
--- আয়োজনের ঘটা,
নেমতন্ন নামকরণ
অনেক কেনা-কাটা |
ইষ্ট পূজি যথা সাধ্য
কার্য করি শেষ,
দীন সুতের নাম-করণ
হ’ল অবশেষ |
ধন-রত্ন ফেলি দিয়া
শিশু চিন্তামণি
দুই হাতে চেপে ধরে
ভাগবতখানি |
ভাগবত প্রেমের খনি
প্রেম-ভক্তি-সিন্ধু,
নামটি হয় বামা-সুতের
শ্রীজগৎ-বন্ধু |

.                                ****************                                
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
অনামী
কবি অতীন্দ্র লাল দাশ
রচনা --০৫ / ১১ / ১৯৫৭
শ্রীমতী মাধুরীকণা দাশ প্রকাশিত “পঙ্কজ” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া

ওরে অভিমান ভরা সাহসিকা,
কোথা খুঁজে খুঁজে ফির সে যে অনামিকা,
বহু রূপে বহুরূপী সম্মুখে তোমার
খেলে হাসে, ভালবাসে আসে বার বার
তোমারে ঘিরিয়া আছে
তব গৃহে আসে-পাশে
উদ্বেলিত রস-সিন্ধু প্রেম-পারাবার
পুত্র-রূপে, বন্ধু-রূপে, সখা-রূপে সে যে
তোমারে লইয়া খেলে লীলাময় সাজে |

*     *     *

পুরুষ উত্তম তুমি নামাতীত নামী
সর্বঘটে বিরাজিছ নামী অন্তর্যামী
স্নেহাতুরা জননীর কাছে বন্ধুসোনা,
কৈলাস-কামিনী তরে জগতের সোনা,
দীননাথ পিতৃ-ভাবে জগতে ভাবিছে
প্রাণবন্ধু বলি কভু সখারা ডাকিছে
প্রিয়ে প্রিয়তর ক’রে বন্ধু গোপাল
কচি-মুখে মধুর-হাসি ব্রজের রাখাল |

.                  ****************                                
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
প্রাণের জগৎ
রচনা --  কবি অতীন্দ্র লাল দাশ
রচনা –১২  / ১১ / ১৯৫৭
শ্রীমতী মাধুরীকণা দাশ প্রকাশিত “পঙ্কজ” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া

রবি যায় অস্তাচলে, আঁধারে ঘিরিছে,
গৃহে গৃহে গৃহলক্ষ্মী ধীরে জ্বালিয়েছে
সন্ধ্যাদীপ সযতনে তুলসী তলায়,
শঙ্খ-ঘন্টা আরতির দূরে শুনা যায় |
কন্ঠদেশে জড়াইয়া বস্ত্রাঞ্চলখানি
ভক্তিভরে প্রণমিছে দেবী রাসমণি,
হৃদে স্মরি লক্ষ্মীকান্তে কমললোচন
মধুর কীর্তন গাহে মঙ্গল বচন |
হেনকালে অকস্মাৎ একি হ’ল হায়
জগৎ মূর্চ্ছিত হয়ে ভূতলে লুটায়
দ্বিতলের প্রকোষ্ঠের পাটাতন হতে
স্খলিত চরণ হ’য়ে কঠিন ভূমিতে
সশব্দে পড়েছে হায় শুভ্র শতদল
বজ্রাহত শোভে যেন অমল-কমল,
শিব-নেত্র, হ’ল শিশু, বাঁচে কি না বাঁচে
নাড়ী বুঝি নাই নাই, আছে কিনা আছে,
প্রাণ-পাখী বুঝি হায় উড়িয়া পালায়
সোনার পিঞ্জর ছাড়ি কোন সে কুলায় |
জীবনের অন্তে বুঝি অন্তর-দেবতা
বাক্য হীন বিম্বাধরে নাহি কোন কথা |
চতুর্দিকে উঠে হায় ক্রন্দনের ধ্বনি
অশ্রুজলে ভাসিছেন দেবী রাসমণি
মৃত্যুর মলিন ছায়া আসিছে ঘেরিয়া
ম্লান মুখ কম্প বক্ষ রহিয়া রহিয়া
নয়নে ঘনায় হায় হতাশার ছবি
অস্তাচলে ডুবে বুঝি প্রভাতের রবি |

*    *    *    *

হেন কালে কবিরাজ আশ্বাসিল আসি |
স্নেহে-যত্নে মমতায় বিপদেরে নাশি
আনন্দে নাচিল শিশু | প্রাণের জগতে
রাসমণি টেনে নিল আপন বক্ষেতে ||

.                  ****************                                
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর