কবি অতীন্দ্রলাল দাশের কবিতা
*
ঘোড়ার ডিম
কবি অতীন্দ্র লাল দাশ
রচনা --২০/ ১১ / ১৯৫৭
শ্রীমতী মাধুরীকণা দাশ প্রকাশিত “পঙ্কজ” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া

চৌধুরীদের বড় বাড়ী, মস্ত জমিদার,
ফুলের বাগান, ফলের বাগান শোভে চারিধার |
চৌধুরীদের তেজী ঘোড়া কেশর নাড়ে যত
শিশু জগৎ ভাবে তারে, পক্ষ্মীরাজের মত,
তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে কোথায় যাবে উড়ে,
বন, জঙ্গল, নদ, নদী, সাত সাগরের পারে ||
হাঁসগুলি সব খেলে বেড়ায় দীঘির কাল জলে
অবাক জগৎ চেয়ে থাকে পরম কুতূহলে |
কত কি যে আকাশ পাতাল ভাবে জগৎ সোনা,
“হাঁসের যেমন ডিম হয়, ঘোড়ার কি তা হয় না?”
চৌধূরীদের মেয়েরা তায় ডিম দেখিয়ে বলে,
“দেখ্ রে জগৎ, ঘোড়ার এ ডিম, দেখিস্ ছানা হলে |”
“ঘোড়ার ডিম” দেখে জগৎ হয়ে মহা খুসি
দিদির কাছে সকল কথা বলে বাড়ী আসি |
“শুনছ দিদি, ঘোড়ার ডিম দেখে এলুম আমি”
সবাই হাঁসে, দিদি তারে কোলেতে নেয় চুমি |
সবাই কেন হেঁসে ওঠে জগৎ বোঝে না
ডাগর চোখে তাকিয়ে থাকে সরল বন্ধু সোনা |
রঙ্গরাজ শিশু গোপাল কতই রঙ্গের কান্ড,
এমনি ধারা চল্ ছে বুঝি জগৎ ব্রহ্মান্ড ||

.                         ****************                                
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
লজ্জা
কবি অতীন্দ্র লাল দাশ
রচনা --২৪ / ১১ / ১৯৫৭
শ্রীমতী মাধুরীকণা দাশ প্রকাশিত “পঙ্কজ” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া

গোপাল তারিণীর হবে বিয়ে
.                        এই সম্পর্ক নিয়ে
স্নেহের দিদি দিগম্বরী
.                        বলেন আদর করি
“জগৎ তুইও যা মেয়ে দেখে আয়
ভাল মন্দ সব কিছু অপায় উপায় |”
.                         এই না শুনে
.                         সলজ্জ মনে
জগৎ গিয়ে দেখে এল সবার সনে
তার ভাবী বৌদিদিকে |
এলে পরে দিদি তাকে
“জিজ্ঞেস করে কেমন দেখে এলে ?”
“খুব ভাল” জগৎ বলে |
দিদি বলে, “সুশ্রী তো মুখখানি ?”
জগৎ বলে, তাতো দেখিনি,
যাবার সময় দাওনি আমায় বলে ---
.                         সুশ্রী কিম্বা বিশ্রী তা হলে
.                         কেমন করে বলি”
এই কথাটি শুনে, সবাই হাসে খালি
আর বলে, পাঠিয়েছ উপযুক্ত লোক,
পা দেখেছে দেখেনি মুখ চোখ,
যা কোন দিন শোনেনি কেউ কোনো দেশে
তামার ভাই--এ র বেলা শুনলাম অবশেষে “  |
জগৎ শুনে মনে মনে ভাবে
           “হয়তো বা হবে
.                         আমার ভুল |”
কিন্তু কোথায় অপ্রতুল,
           কিছুই বুঝতে নারে,
.                         তাই বারে বারে
নীচু হয়ে পায়ে মাটী খুঁটে ;
লজ্জা পেয়ে কপোল দুটী রাঙ্গা হয়ে উঠে ||

.                         ****************                                
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
অভিনব
কবি অতীন্দ্র লাল দাশ
রচনা --২৪ / ১১ / ১৯৫৭
শ্রীমতী মাধুরীকণা দাশ প্রকাশিত “পঙ্কজ” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া

গোপাল তারিণীর হয়ে গেল বিয়ে
দিগম্বরী দিদিমণি তাই নিয়ে
.                       অবশেষে
জগৎকে ডেকে বলেন ভালবেসে
“বৌদিদিদের বৌদি” বলে ডেকো,
শ্রদ্ধা ভক্তি প্রণাম তাদের করতে ভুলনাকো,
বড় বৌকে ডাকবে বড় বৌদি
মেজ বৌকে ডাক্ বে মেজ বৌদি,”
.                        জগৎ শুধু মনে মনে ভাবে,
.                        তাই বা বুঝি হবে |
ভাইদেরে বিয়ে করে ভদ্র মহিলারা
দিদি হতে যাবেন কেন, এটী কেমনধারা ?
ভাইদের সাথে যখন সাথী হয়ে এলেন,
ভাইদের সাথে তারা ‘ভায়া’ হয়ে গেলেন
.               এই তো সোজা হিসাব পরিপাটী
.                        এই তো অতি খাঁটী,
শ্বশুর কুলে এলো বলে নিজের পিতৃকুলে
ভুলে যাবেন এমন কথা কোন শাস্ত্রে বলে |”
তাই পিতৃকুল শ্বশুরকুল এই দুইটী কুলে
.                        মিশিয়ে এক কুলে
.               ভেবে চিন্তে জগৎ ডাকে
.                         একে একে
অধিকারী সুতা বড় বৌকে “অধিকারী ভায়া”  বলে
আর বাগ্ চি কন্যা মেজ বৌকে “বাগচি ভায়া” বলে ||

*    *    *    *

“ভায়া” দেরে প্রণাম করতে হবে,
কিন্তু কেমন করে ছোঁবে,
তাই অনেক ভেবে চিন্তে
.               গেল আন্ তে
বাঁশের একটা লম্বা চটা ---
.               দিয়ে সেটা
দূর থেকে “ভায়া” দের প্রতিজনে
     পায়ে ঠেকিয়ে সাবধানে,
সেই চটার অগ্রভাগ হস্তে নিয়ে---
.               মাথায় দিয়ে
.               করল প্রণাম অভিনব
সবাই হেঁসে বলে “কি আর কব
এ সব হল সৃষ্টি ছাড়ার কান্ড নব নব |
কালে কালে আরও কত শুনব ||”

.                         ****************                                
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
রূপের দেবর
কবি অতীন্দ্র লাল দাশ
রচনা --২৪ / ১১ / ১৯৫৭
শ্রীমতী মাধুরীকণা দাশ প্রকাশিত “পঙ্কজ” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া

বৌদিদিরা আসে ঘরে,
জগৎ প্রণাম করে
দূর হতে চটা এক ঠেকাইয়া পায়,
“অধিকারী”   “বাগ্ চী ভায়া”
হাঁসিয়া আকুল কায়া
অদ্ভুত দেবর বন্ধু অভিনবতায় ||
রঙ্গনাথে পেয়ে সঙ্গে
বৌদিদিরা মাতে রঙ্গে
অনাসক্ত রসরাজ আনন্দ বিলায়
পদ্ম পত্রে বিন্দু সম
অনাবিল মনোরম
শুচি শুদ্ধ বন্ধু সোনা অতুল বিভায় ||
কঠোর নিয়ম নিষ্ঠা
সংযমের পরাকাষ্ঠা
জগতের সুসংযত কায়মনো বাক্
বালক দেবরে দেখি
ভক্তি প্লুত হয় আঁখি
বিস্ময়েতে দুই “জায়া” হয় হত বাক্ ||
ঘাটেতে প্রভাত কালে,
বধূরা ঘোমটা খুলে
আচম্বিতে হেরে কিবা ভাসিছে সলিলে,
জ্যোতির্ময় পদ্মাসনে
বসি আছে যোগাসনে
অপূর্ব রূপের বিভা ফুটে জপের স্থলে ||
বেলা বুঝি বয়ে যায়
নড়িতে শকতি নাই
দুই “জায়া” দেখে দেখে আঁখি না ফিরায়,
দিগম্বরী দেখে আসি
জগতের আলোরাশি
জগতের তনু ঘিরে অপূর্ব ছটায় ||
সমাপণ করি স্নান,
স্বর্ণকান্তি দেহ খান
ঢালিয়া সুবর্ণ ছটা ধীরে চলি যায়,
দুই “জায়া” স্তব্ধ কায়
মুখে কোন কথা নাই ;
রূপের দেবর যেন  নব গোরা রায় ||

.                               ****************                                
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
রাধা মদন মোহন
কবি অতীন্দ্র লাল দাশ
রচনা --২৬ / ১১ / ১৯৫৭
শ্রীমতী মাধুরীকণা দাশ প্রকাশিত “পঙ্কজ” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া

পাবনা থেকে ব্রাহ্মণকান্দায় প্রসন্ন গোলক-মণি,
বেড়াতে এসেছে, সাথে রহিয়াছে বন্ধু সে সোনামনি |
সধু সজ্জন গ্রামের মাঝারে ছিল এক ব্রাহ্মণ
মিলি দুজনায় গিয়াছে তথায় জগৎ রয়েছে সাথে,
সারিয়া আহার, করিয়া বিহার বাহির হয়েছে পথে
জগৎ তাদেরে লইয়া ফিরিছে, পথে বনভূমি মাঝে,
রাখালিয়া বাঁশী উঠিছে বাজিয়া, তারকা ফুটিছে সাঁঝে |

*    *    *    *

শ্যামল বনানী ঘন বিন্যাসে নব কিশলয় শাখা,
সাঁঝের বিহগ ফিরিছে কূলায় ছড়ায়ে ক্লান্ত পাখা,
তরুরে ঘিরেছে লতার তনিমা সোহাগের বাহুডোরে
কুসুম শয়নে বিবশ ভ্রমর বসিয়া অলস ভরে
মলয় সমীরে ফুটে থরে থরে পারুল রজনীগন্ধা
কেতকী কুসুম ভাঙ্গিয়াছে ঘুম ধীরে নেমে আসে সন্ধ্যা
গন্ধে আকুল পাগল মধুপ পথ তার গেছে ভুলে,
কাহারে যে খোঁজে কোন পথে যেতে কোন পথে গেছে চলে,

*    *    *    *

জগৎ ক্ষিপ্র চলিতেছে আগে দোঁহে চলে পিছে পিছে
সহসা দেখিতে না পায় জগতে কোথায় হারয়ে গেছে
সাঁঝের আঁধারে খুঁজে বারে বারে কোথায় মিলিবে দেখা
হেন কালে দেখে তমালের তলে দাঁড়ায়ে প্রাণের সখা
রাধারাণীসাথে মদন মোহন উজলি কাননভূমি
নূপুরের ধ্বনি বাজে কিঙ্কিনি রয়িছে চরণ চুমি |
শিরে শিখি পাখা ঈষৎ হেলা ভালে চন্দন আঁকা
গলে বনমালা দোদুল দুলিছে নয়ন কাজল রেখা,
কিশোর গোপাল বামেতে কিশোরী অধরে মধুর হাঁসি
লক্ষ চাঁদের অমিয় মলিয়া চমকে ও রূপ রাশি |
স্তব্ধ অবাক দুজনে হেরিছে মুখে নাহি কোন কথা
নিমেষের ছবি নিমেষে মিলাল বনমালী ভানুসুতা,
সহসা হাসিয়া জগৎ সেখানে হইল আবির্ভূত,
কেহ নাহি বুঝে জগতের লীলা হয়ে থাকে অভিভূত ||

.                         ****************                                
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
পূজারী
কবি অতীন্দ্র লাল দাশ
রচনা --২৬ / ১১ / ১৯৫৭
শ্রীমতী মাধুরীকণা দাশ প্রকাশিত “পঙ্কজ” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া

চঞ্চল কানু দেশে দেশে ফিরে খেলে ভাঙ্গাগড়া খেলা
কোমর পুরেতে গোবিন্দ পুরেতে ব্রাহ্মণ কান্দাতে লীলা ||
মন্দির মাঝে চির সুন্দর রাধা গোবিন্দ জাগে
বালক জগৎ পূজে হেঁসে খেলে নেচে নেচে পুরোভাগে ||
প্রাণের ঠাকুর মনের মুকুরে ধরিয়া হৃদয় মাঝে
কিশোর কিশোরী নাগর নাগরী সাজায় রসের সাজে ||
কিশোর পূজারী পূজিছে কিশোর আপন বিভোর ভাবে,
কিশোরের প্রাণ উতলা আকুল কিশোরের বাঁশী রবে,
প্রাণের আকুতি জানায় জগৎ, হৃদয়ে হৃদয়ে কথা,
মরমের বাণী নয়নে খেলিছে মুখর সে নীরবতা ||
“তুমি আমার খেলার সাথীটি তুমি কি প্রাণের সখা,
তুমি কি আমার প্রেমের গোপাল আজি এসে দিলে দেখা,
তুমি ভাই মোর, তুমিই বন্ধু তুমিই সকল মম
তুমি ময় আমি, আমি ময় তুমি বহ্নিতে তাপ সম |
তোমারে ভাবিয়া হৃদয়ে লভিয়া জেনেছি জেনেছি আমি
তুমি আমার আমি যে তোমার, ওগো অন্তরযামী,
মম হৃদয়ের অনুতে অনুতে তনুতে তনুতে তাই
প্রেমের জগতে তোমাতে আমাতে কোনই প্রভেদ নাই |
তুমিই সেজেছ ভক্ত তোমার তুমিইত ভগবান,
ভকতি প্রেমের বাঁশীর রন্ধ্রে তাইত তুলেছ তান ||
প্রেমের জগৎ প্রেমেতে পাগল বাধা নাই বিধি নাই,
প্রীতি মঞ্জরী অঞ্জলি করি প্রেমনাথে পূজে তাই |
মধুর নাগরে কখনও সাজায় মধুরা নাগরী বেশে,
নগরীর বেশে শোভে গোবিন্দ রাধিকার বাম পাশে |
শ্রীমতীরে করে রূপের নাগর শিরে দেয় শিখি চূড়া
গলে বনমালা করেতে বাঁশরী কটী বাসে পীত ধরা |
অপরূপ সাজে রাধা গোবিন্দে হেরি সবে চমকিত,
ভাবিছে জগৎ চপল বালক নাহি বুঝে হিতাহিত |
হাঁসিয়া জগৎ রাধা গোবিন্দে পালটিয়া দেয় সাজ
শ্রীমতীরে স্থাপে বামেতে তাহার দক্ষিণে রসরাজ ||

.                         ****************                                
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
বিদ্যালয়ের পথে বিদ্যার্থী
কবি অতীন্দ্র লাল দাশ
রচনা --২৮ / ১১ / ১৯৫৭
শ্রীমতী মাধুরীকণা দাশ প্রকাশিত “পঙ্কজ” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া

বিদ্যালয়ের পথে চলে বিদ্যার্থী বালক
নয়নে নিমেষ নাহি রহি অপলক
যেবা দেখে সেই রহে চাহি,
আনন্দ কণিকা এক | গ্রন্থ বহি
চলিয়াছে এক মনে এক ধ্যানে
চির-যাত্রী কিসের সন্ধানে |
অপরূপ রূপ-রাশি বিচ্ছুরিত সর্বাঙ্গে তাহার
অঙ্গে-অঙ্গে উছলায় তরঙ্গিত রূপের পাথার
কিবা ছন্দে কিবা তালে, কিবা লয়ে, মনোহর,
পুলকিয়া দশদিক বিশ্বচরাচর |
অপূর্ব ব্রহ্মণ্যজ্যোতি তরুণ কিশোর
যশোহর রোড ধরে চলে মনোচোর |
যে দেখিল সে নজিল না ফিরে নয়ন |
ও-রূপের সাগরেতে ডুবে যায় মন |
বস্ত্র-খন্ড ঢেকেছে শরীর
অঙ্গে অঙ্গে দ্যুতি তবু ভেদি সে প্রাচীর
খেলে যায় দিকে দিকে সুস্নিগ্ধ সুধীর,
সর্ব বিদ্যা বিকশিত সর্ব অঙ্গে তার,
শ্বেত-শতদল যেন কুসুম-সম্ভার,
অবিদ্যার অন্ধকার ঘুচায়ে জাগিছে
বিদ্যার অরুণ রূপ পুলকে ভাতিছে |

.                 ****************                                
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
উপনয়ন
কবি অতীন্দ্র লাল দাশ
রচনা --২৮ / ১১ / ১৯৫৭
শ্রীমতী মাধুরীকণা দাশ প্রকাশিত “পঙ্কজ” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া

পূরব অচলে অরুণ-তরুণ জাগিয়া উঠিছে ধীরে
সোণালী আভায় হাঁসি উছলায় তমসার তীরে তীরে
নিদ্রালুতার সোনার স্বপন ভেঙ্গে হল খান খান
ভোরের শানাই ভৈরবী সুরে গাহে জাগরণী গান,
চপল জগৎ আজি অচপল কোথা তার চপলতা,
ভাব-গম্ভীর সুবোধ-সুধীর শান্ত সে নীরবতা |
মন্দিরতলে ধিকি ধিকি জ্বলে পূতঃ হোমানল শিখা
যজ্ঞ-অনলে আহুতি দানিছে শুচি-শুভ অরণিকা |
বালক-জগৎ অপরূপ রূপে শোভে সন্ন্যাসী সাজে
নবীন ব্রহ্মচারীর বেশেতে করেতে দন্ড রাজে
মুন্ডিত শির সবিতার মত ভাতি বরেণ্য ভর্গ,
নবীন প্রভাতে নামিয়াছে বুঝি ঘরেতে তপের স্বর্গ |
নব দ্বিজ রায় অতুল প্রভায় ব্রহ্মপুরুষ সম
মহা গায়ত্রী ধ্বনিবে কর্ণে ছন্দিত মনোরম |
যজ্ঞসূত্রে পড়িল কি বাঁধা আকাশের নীলমণি
জলধির মহা কল-কল্লোল মহা ওঁকার ধ্বনি |
বালক-জগৎ নবীন-জগতে মহাভাবে নিমগণ
আপনার ভাবে আপনি ভাসিছে নিমিলিত দু’নয়ন,
আপনার মাঝে কিবা নবভাবে আপনারে পায় খুঁজিয়া
প্রবীন-জগতে নবীন-কিশোর আপনি উঠিল জাগিয়া ||

.                 ****************                                
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
তুলসীর ছায়া
কবি অতীন্দ্র লাল দাশ
রচনা --৩০ / ১১ / ১৯৫৭
শ্রীমতী মাধুরীকণা দাশ প্রকাশিত “পঙ্কজ” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া

বিদ্যালয়ে যাইবার হয়েছে সময়
স্নান করি পূজা সারি
যেতে হবে তাড়াতাড়ি
পদব্রজে যেতে হবে পথ কম নয় ||
স্নাত পূত বন্ধু সোনা মন্দিরেতে যায়
গোবিন্দ মন্দির পথে
দ্রুত পদে যেতে যেতে
তুলসী মঞ্চেতে হেরে তুলসী ছায়ায়,
তুলসীর ছায়া পড়ে জগতের পায়,
পরম ভকতি ভরে
জগৎ সরিয়া পরে
কেমনে দলিবে হায় তুলসী ছায়ায় |
তুলসী মঞ্জরী ছায়া পড়েচে ভূমিতে
তাহারে এড়াতে যত
দূরে হয় অপসৃত
জগতের সাথে ছায়া লাগিল ঘুরিতে
দিগম্বরী দিদিমণি করি দরশন
তুলসীর ছায়া ঘুরে
জগতেরে ঘিরে ঘিরে
দেখে না প্রত্যয় হয় ভাবে মনে মন |
কভু ভাবে জগতের চপল বালক
তুলসীরে হেলা ভরে
চরণে দলিত করে
চলে বুঝি, নাহি জ্ঞান স্বরগ নরক |
জগতের কাছে ভক্তি করে উপদেশ
“তুলসীর ছায়া ভাই
চরণে দলিতে নাই
তাতে হয় মহাপাপ দুঃখ অবশেষ |”
জগৎ কাতরে অতি করে নিবেদন
“আমি এড়াইতে চাই
ছায়া মোর সাথে যায়,”
আপনারে অপরাধী ভাবে মন ||

*     *     *

আলো সাথে ছায়া রাণী পিছু পিছু যায়
আলো ছায়া পাশাপাশি
তাতে ফুটে রূপ রাশি
প্রেমরঙ্গ এই লীলা কেবা বুঝে তায় |

.                                ****************                                
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
দুঃখীরাম
কবি অতীন্দ্র লাল দাশ
রচনা --২৪ / ১১ / ১৯৫৭
শ্রীমতী মাধুরীকণা দাশ প্রকাশিত “পঙ্কজ” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া

দধি দুগ্ধ স্কন্ধে করি চলিয়াছে দুঃখীরাম ঘোষ
হঠাৎ কি যেন দেখি মন্ত্র মুগ্ধ হয়েছে বেহোঁস্

*     *     *     *     

তরুণ বালক এক বিদ্যালয় হতে বাড়ী যায়,
বগলে লইয়া পুঁথি শ্বেতাম্বরে ঢাকি সর্বকায়,
রাঙ্গা ছোট পাদুখানি উঠে নামে যেন ছন্দে তালে
পদক্ষেপে ফুটাইয়া মুকুলিত প্রেম শতদলে,
আয়ত নয়ন দুটী ঢল ঢল বিমুগ্ধ চাহনি,
কোটী চন্দ্র সুধাময় রূপায়িত কচি মুখখানি ||
অপূর্ব রূপের ছটা অঙ্গে অঙ্গে তনুর তনিমা |
সুধা সিন্ধু উছলায় তরঙ্গিত রূপের মহিমা ||

*     *     *     *     

আনমনে চলিয়েছে ধীরে ধীরে বালক সরল,
তারে দেখি দুঃখীরাম আত্মহারা ভুলেছে সকল |
দধি দুগ্ধ বেচিবারে বিয়ে বাড়ী চলিয়াছে, সেযে
কিবা মন্ত্রে কোনজালে মায়ামুগ্ধ হল পথ মাঝে ||
বালক চলিছে পথে দুঃখীরাম পিছু পিছু চলে,
বিয়ে-বাড়ী-পথে যেতে সহসা সে পথ গেছে ভুলে |
কোথা গেল বেচা কেনা আয় ব্যয় হিসাব নিকাশ,
জীবন নিকুঞ্জে বুঝি কুঞ্জচারী হয়েছে প্রকাশ,
মধুর রিনিকি ঝিনি মধুছন্দে নেচে নেচে যায়
কি সুরে বাজিছে বাঁশী ডাকে যেন “আয়, ‘ওরে আয় |”

*     *     *     *    

বালক প্রবেশে শেষে আপনার গৃহের প্রাঙ্গণে,
দুঃখীরাম দ্বার প্রান্তে সচকিত হল মনে মনে |
মনে ভাবে, “কোথা যেতে, একি হল, আসিনু কোথায়”,
তাড়াতাড়ি চলে গিয়ে আনমনে বিপণি সাজায় |
মন তার গেছে চুরি, দেখে সেই রূপের কিশোর,
সবি হল ভুল, শুধু চোখে ভাসে সেই মন চোর
ভাবের লহরী উঠে উদ্বেলিত মানস সায়রে,
কেবা তুমি, কিবা নাম, কেমনে যে বাঁধিছে আমারে,
জীবন সায়াহ্নে বুঝি আসিয়াছ জীবন-দেবতা,
দুঃখীর দুঃখের মাঝে আসিবে কি আমৃত বারতা |

*     *     *     *      

চিন্তান্বিত বাড়ী যায় নাহি মিলে হিসাব তাহার
বালকেরে স্মরি স্মরি মুগ্ধ-চিত্ত হয় বার বার ||
বন্ধু-পুত্র জলধর দিল তারে সকল সন্ধান,
এক সাথে পড়ে দোহে জগৎ সে হয় তার নাম |
বন্ধু ধনে নিয়া আসে জলধর দুঃখীর দোকানে,
প্রিয়তমে পেয়ে কাছে দুঃখী হয় সুখী মনে প্রাণে |
পুলক আনন্দে তার সর্বদেহ শিহরিয়া উঠে
শ্রী মুখে তুলিয়া দেয় ক্ষীরসর স্নেহ-কর-পুটে |
বন্ধু সোনা খায় তাহা ফুটে উঠে হাসির আলোক |
সেই হাসি খেলে যায় মিশে যায় গোলক ভূলোক ||

.                       ****************                                
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর