নূতন ও পুরাতন
কবি বিমল মিত্র
সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ও সত্যেন্দ্রকুমার বসু সম্পাদিত মাসিক বসুমতী পত্রিকার বৈশাখ
১৩৩৮ (মে ১৯৩১) সংখ্যা থেকে।


সেদিন পথের প্রান্তে দাঁড়াইয়া হেরিলাম নির্ব্বাক্ বিস্ময়ে
পুরাতন বর্ষ হায় বেদনায় আর্দ্র-চক্ষু মাগিছে বিদায়!
চরণ মন্থর-গতি, অন্তর স্পন্দন-হীন, দেহ লজ্জা-ভয়ে
একান্তই সঙ্কুচিত ; অপরাধী বক্ষ তার যেন ক্ষমা চায়!

লতায় পল্লবে শত উপেক্ষার দৃষ্টি যেন দহিতেছে তারে ;
নূতন আসিবে কাল তারি লাগি দিকে দিকে নব আয়োজন ;
যে চলিল তারে কেহ নাহি কহে সান্ত্বনার বাণী বারে বারে ;
সে যেন একান্ত পর ; তারে বুঝু কারো আর নাহি প্রয়োজন!

কহিলাম, “হে বন্ধু বিগত-প্রায়! দুঃখ কেন মিথ্যা তব শোক!
অতীত শীতের স্নেহ কে স্মরিবে বসন্তের হবে হেব জয়?”
সে কহিল, ‘আমি যা’ দিয়াছি যত হর্ষ স্নেহ আনন্দ আলোক
সে কি সবার উপক্ষার? এতটুকু প্রীতি তরে সে কি কিছু নয়?”

আসিয়াছে নববর্ষ, হর্ষে লয়ে নব নব শত উপহার ;
ধরণীর বক্ষ-পাত্রে আনন্দের রূপ-সুধা উচ্ছল চঞ্চল।
আশার উত্সুক-স্বপ্নে পৃথিবীর জীব জড় উন্মত্ত দুর্ব্বার ;
আতাম্র আম্রের পত্রে তারি সুর স্বন-স্বনি ধ্বনিছে কেবল।

অতীতের সর্ব্ব-স্মৃতি অবলুপ্ত ধরণীর শ্যাম গাত্র হ’তে ;
বিহগের কলকণ্ঠে নব সুর নব ছন্দে নিত্য আন্দোলিত!
চৈত্রের বিদগ্ধ মাঠ ভ’রে গেছে সবুজের অন্তহীন স্রোতে!
বিশ্বের অন্তরে আজ অতীতের পদ-চিহ্ন বিস্মৃতি-আবৃত!

নূতনেরে কহিলাম, “হে সুন্দর বন্ধু মোর! হে বর্ষ নবীন!
তোমার আসার আগে যে জন বিদায় নিল চেন তুমি তারে?”
কহিল নূতন বর্ষ, “আজিও চিনি না তারে, চিনিব সে দিন
যে দিন ধরণী হ’তে মোর স্মৃতি মিলাইবে ঘন অন্ধকারে!”

.              
         ******************               
.                                                                             
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
কবি বিমল মিত্রর কবিতা
*
আমার কবিতা
কবি বিমল মিত্র
সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ও সত্যেন্দ্রকুমার বসু সম্পাদিত মাসিক বসুমতী পত্রিকার আষাঢ়
১৩৩৮ (জুলাই ১৯৩১) সংখ্যা থেকে।


মনের মাধুর্য দিয়া জীবনের দীর্ঘ-পথে
.                                  রচিয়াছি অপূর্ব্ব কবিতা ;
বিশ্বের অন্তর হ’তে নিঃশেষে আহরি’ সুধা
.                                  ব্যগ্র-বক্ষে করেছি সঞ্চয়।
আমার হৃদয়-তীর্থে অমৃতের চিত্ত-বীণা
.                                  গাহে নব আনন্দের গীতা ;---
তোমরা শুনিতে পাো সে সুরের নৃত্য-রেশ---
.                                  নিত্য তব অতুল অক্ষয়।
আমার ছন্দের স্বপ্নে ফাল্গুনের ফুল্ল-রাত্রি
.                                      কল্পনায় করেছি অমর ;
ঝর্ণার ঝর্ঝর নৃত্য সে ছন্দের অন্তহীন
.                                    আবর্ত্তনে হয়েছে চঞ্চল ;
বসন্তের অন্তরের স্তব-মন্ত্র সে স্বপ্নের
.                                     সুষমায় করেছি সুন্দর।
আমি কবি, আমার কল্পনা দিয়া বিধাতারে
.                                     সৃজিয়াছি পবিত্র নিম্মল।


সন্ধ্যার সন্ধির ক্ষণে আকাশের শেষ প্রান্তে
.                                     সে বিচিত্র বর্ণ-সমারোহ ;
যে সুন্দর রামধনু রঙে রঙে নিত্য নব
.                                     বর্ষার সে সীমাহীন নভে ;
অরণ্যের গম্ভীরতা সে সঙ্গীতে মর্ম্মরিছে
.                                     অসীমের উত্সুক-আগ্রহ ;---
আমার কাব্যের সুরে সবারে করেছি পূর্ণ
.                                  মৃত্যুহীন সৌন্দর্য্য বৈভবে!
আমার স্বপ্নের স্বর্গে আমূর্চ্ছিত গীতরব,
.                                        রূপ রস গন্ধ অহরহ ;
আমার প্রাণের পুষ্পে পুঞ্জীভূত পরাগের
.                                     অন্তহীন ঊর্দ্ধায়িত প্রীতি ;
বিধাতার মত আমি কবিতার ছন্দে-নৃত্যে
.                                    নিত্য রচি সৃষ্টি সমারোহ ;
আমি কবি ; সুন্দরের স্পর্শ তাহি---তাই
.                              মোর কণ্ঠে বাজে অনন্তের গীতি।

.                       ******************               
.                                                                             
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*