কবি চিরশ্রী দেবনাথের কবিতা
*
শ্রীরাধা গো
কবি চিরশ্রী দেবনাথ

ফেলে এসো রাধা যমুনাতীর, তমালতরু ও বালক প্রেমিক, ফেলে এসো  ঘাসে ছাওয়া
তৃণভূমি, জোৎস্নাশাসিত সঙ্গসুধা, ধুয়ে দাও গৌরবর্ণ, ফুলের সাজ আর সুগন্ধ বিলাস, যদি
সাজাই আমার সাজে, কালো রঙে ঢেকে যাক শ্যামের আদর,  তীব্র তিলখানি ধেবরে যাবে
খড়ি ওঠা চামড়ায়, আগুনরঙা চুল,  কোটর চোখে খোলা নদী, ডুব দাও শ্যাম, নবম
পরিচ্ছেদ  শ্রীভাগবত ক্লোজ, ঘুচে গেছে রাস, পরকীয়া রক্তে হোলি, মেঘের পথে হাত
ধরেছে রাধা আমার, নিকষ কালো  রাধা দিলাম এনে বড়ু চন্ডীদাস, কলম উঠিয়ে রইলেন
যে বড়ো, এ যে বিষমকথা, রূপহীন অপুষ্ট নারী দিয়ে কি আর হয় কাব্যকথা, এসো এসো
রাধা ঝুলন দোলায় দুলি,  তোমায় দিলাম শ্যামহীন বৃন্দাবন, তোমার সঙ্গে আছি
এক পৃথিবী আমি.....

.                                      **************************  
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
তবু আয়
কবি চিরশ্রী দেবনাথ
প্রথম প্রকাশ ত্রিপুরার “দৈনিক সংবাদ” পত্রিকার “সংবাদ বিচিত্রা” পাতায়।

জবালার শরীর ছোঁয়া সব কৃত্রিমতা
বুঝি নেমে আসছে মাটিতে
পৃথিবী বুক পেতে নারীর জন্য আজন্ম
ঋষি গৌতমের এজলাস পেরিয়ে
বিক্রমজিতের আদালতে পৌঁছুতে হাজার
হাজার বছর
গর্ভশোনিতে কি নতুন কোন প্রজন্মের হাতছানি
যজ্ঞসমিধ জমিয়ে রেখেছি কোনদিন
করবো ক্যাম্পফায়ার
মেঘমল্লারে আগুন ধরবে সেদিন
সামবেদীয় শুদ্ধতা দেবো না তোকে
কেবলি আমার রক্ত কোষ কলা অনুভব
ঘনীভূত হবে আমার আমি
সে পথে ছড়াবে কি পান্না
না শুধু শ্লেষ ছড়ানো চুনীরঙা আকাশ .. ..

.            **************************  
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
আদুরে মেয়ে
কবি চিরশ্রী দেবনাথ
প্রথম প্রকাশ ত্রিপুরার “দৈনিক সংবাদ” পত্রিকার “সংবাদ বিচিত্রা” পাতায়।

পদ্মাবতী.....শ্রাবণ রেখে গেছে বৃষ্টির দাগ,
ভাদ্রের খরতা সেই দাগটুকু শুকিয়ে নেবার আগে যাবো চম্পকনগরে, সেখানের মাটির রঙ
কি ধূসর না বহুদিন ধরে কত সনকার ব্রতপালনের রঙে গেরুয়া হয়ে আছে, করতোয়া
নদীর তীরে, খুল্লনার ঢিপির পাশে, হাত ধরে বসাবো তোমায় ঠান্ডা পাথরে। লাল সন্ধ্যা  
নেমে আসুক লখিন্দরের মেধে, কালনাগিনীর বিষ থাক আজ ভোমরা কোটরে,  সার সার
ঘটে ভরে দিই ধূপ ধূপ ছোটবেলা,  শাপলারাঙা  বড়বেলা তোমার।  দেখো কেমন করে
শ্রাবণ জুড়ে তোমার গান, হাসি কান্নার জীবনে  দিয়ে গেলে বারোমাস্যার টনিক।
আমপাতায় ঘন তেল সিঁদুর, "  জরৎকারুপ্রিয়া
পুএবতী ভবো ", মাঝখানে তুমি একটি মন্ত্র শুধু,  ভালবেসেছ কখনো?  কেঁদেছিলে?
ভালবাসায় জারিত না হওয়ার কান্না!  শান্ত বিস্ফোরণ চোখে নিয়ে কেন তাকিয়ে, শ্রাবণ
মেঘে  যেন সহস্রাব্দের সুনামী!  নীলকন্ঠের সব বিষ ঐ শরীর জড়িয়ে, আজ কিছু
বিষ তুলে দাও শ্যামল মেয়েদের ফুলের মতো ঠোঁটে, কোমল নখের আঁচরে আঁচরে,
ছোবলে শুষে নিক তারা ধর্ষণ, না ভালবাসার ভেজা পথে ছড়িয়ে দিলাম পদ্মপাপড়ি আর
হাঁসপালকের নৌকো, সপ্তডিঙা ভাসিয়ে অতীত থেকে তুলে আনি আজন্ম অহংকারী চাঁদ
সদাগরকে,তোমার পূজো করেনি! নীচুতলার  "চেঙমুড়ী কানী" মেয়ে এক, এখন দেখুক সে
কেমন করে ছেঁয়ে যাচ্ছো তুমি, মিশে যাচ্ছো ঘরের আদুরে মেয়ে হয়ে....

.                                **************************  
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
অনুভবে স্বাধীনতা
কবি চিরশ্রী দেবনাথ

কাল রাতে স্বাধীনতা এসে দাঁড়ালো আমার কাছে, বড় শুকনো  মনে হলো তারে, ভারত
মহাসাগর থেকে আসা ঠান্ডা হাওয়ায় সে যেন কাঁপছিল তির তির করে, হরিদ্রাভ দুটি
চোখে মরুভূমির শুস্কতা মনে হলো, তাকে স্পর্শ করলাম,  ছলকে উঠলো তার বরফ মুকুট।
তাকে  আমি মাখতে লাগলাম আমার শরীর জুড়ে, দ্রবীভূত রোদের মত সে আমার মধ্যে
মিশে যেতে লাগলো। আমি তাকে অর্জন করিনি, কোন রক্ত ঝরাইনি তার জন্য, অপেক্ষার
মুহূর্ত গুনিনি কোন দ্বীপান্তর বাসীর ফিরে আসার, তার কাছে এসেছি আমি ঘরে ফেরা
পাখীর মত, গাঢ় ভালোলাগার মত আমার দিন রাত্তির ওম্ ওম্ হয়ে আছে তার উষ্ণতায়।
তবু মনে
হল আজ আমি তাকে আদর করব, কিশোরী মেয়ের দুই বেণী  বেঁধে দেওয়ার সময় মার
কোমল হাত থেকে ঝরে পরে যে
মায়াবী জোৎস্না সেরকম আদর,তাকে কোলে তুলে নেবো, ধীরে ধীরে বড় করে তুলব,
আমার স্বপ্নরা নক্ষত্র হয়ে ঝিকমিক করবে তার শরীর ছুঁয়ে, আমার ভালোলাগার
একটুকরো আলো যেন, পায়ে পরিয়ে দেবো নূপূর আর তার সঙ্গে মিশে যাবে আসমুদ্র
ভারতকন্যাদের দৃপ্ত পদচারনা, কিন্তু এখন থাক,বঙ্গোপসাগরের উপর থেকে ধেয়ে আসা
মৌসুমী বায়ু একটু দাঁড়াও, না হয় ঘুমোক আমার কোলে কিছুক্ষণ, বড় ক্লান্ত, বড় ক্লান্ত সে
আজ।

.                                **************************  
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
ঐ মেয়েরা
কবি চিরশ্রী দেবনাথ

কিছু মেয়ে যাচ্ছিল
ঢেউ এর মতো,
ফসফরাস জ্বলে জ্বলে উঠছিল
তাদের চুল ছুঁয়ে শরীর বেয়ে
চারপাশে ধূমায়িত শালবন
পলক ফেলার আগেই তারা মিশে গেলো
আমি পিছু নিয়েছি তাদের
আমার হাতে যন্ত্রফলা
আবার যেন চারপাশ থেকে জমে উঠল
কিছু অবয়ব
ওরা কারা জানতেই হবে আমার
দৌড়ুতে লাগলাম
মেয়েগুলো কিন্তু হাঁটছে, ধীর লয়ে
তবু ধরা যাচ্ছিল না
কেউ পেছন ফিরছে না একবারও
যদি দেখতে পেতাম কোন মুখ
হাঁপাচ্ছি আমি
পথের ধারে ধারে এখন ঝাউয়ের গাছ
কাছে কি কোথাও তবে সমুদ্র!
এই তো কথা শোনা যাচ্ছে তাদের
তীব্র ধাতব গর্জন যেন
আমার যন্ত্রফলা মুহুর্তে ছুটতে লাগলো
আমি আলাদা হতে লাগলাম
এবার ছুঁয়ে ফেলছি ঐ মেয়েদের
পেছনে আরেকটা আমি
সেও কখনো ছোঁবে এই মেয়েদের ..

.           **************************  
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
আমার দেশ
কবি চিরশ্রী  দেবনাথ

এমন কেন মনে হয়
এই যে আজকের কৃষ্ণপক্ষীয়
রাতে সাজানো ঘরের দেয়ালে
পুরুলিয়ার মুখোশখানি
শুধু এক টুকরো অশরীরী মৃত্যুর ছায়া
তুমি এসে দাঁড়ালে, ঝকমকিয়ে
উঠলো তোমার কানের ঐ হীরককুচি
মনে হলো "পান্না"র হীরের খনির
শ্রমবালকের রাসায়নিক দগ্ধ দুটি হাত
তোমার গ্রীবা জুড়ে রঙবেরঙের
জাঙ্ক জুয়েলারির বন্য শোভা
মনে হলো বনহারানো আদিবাসী
গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে আমার চারপাশে
তোমার কাঁকনের ঐ স্বর্ণালী উদ্ভাসে মিশে যায় "কোলারের"
ক্ষীণতনু  খনিবালিকার শ্বাস নিতে না পারা
সারা শরীর বেয়ে  মসৃণ কলমকারী, মনে হলো  সুতোয় সুতোয়
"কালাহস্তীর" তাঁতির  ক্ষয়ে যাওয়া নখ
নিটোল শরীরের বিভাজিকায় শুধু
যেন  ক্রমাগত বেঁধে ফেলা
স্রোতহীন তিস্তার বিষাদী অববাহিকা
বিরক্তিতে ছুঁড়ে ফেলে দিলাম
হাতের "লাস্ট ম্যান ইন্ টাওয়ার"
তাকালাম তোমার দিকে
কখন ঘুমিয়ে গেছো তুমি
আবছায়া খাজুরাহে  লেগে আছে
দেবদাসী অভিমান
তুমিই কি আমার দেশ
আর আমি পাথরের ভগবান ......

.           **************************  
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
একটু উষ্ণতার জন্য
কবি চিরশ্রী দেবনাথ


একটু উষ্ণতার জন্য দ্রিমি দ্রিমি মাদল বাজে, কোথাও কোথাও নিস্পাপ কৈশোর
জ্বলতে থাকে অস্ফুট আগুনে, টুকরো টুকরো নারী ভেসে ভেসে শালবন মহুয়ার
জঙ্গল পেরিয়ে নাগরিক পথে আদিম অন্ধকারে জ্বলতে থাকে হায়েনার চোখের মত, তেতো
মধুতেও মেটে না আশ, ছিঁড়ে খুঁড়ে দেখো তারে প্রতিদিন। বনরাজি বিষাদ ছড়ায় শুধু,
ঘাসফুল বলে আজ আমি ঝড়না ছুঁতে যাই, উৎসে তাকে পাথর চাপা দেবো, শুকনো খাতে
গড়িয়ে পড়ুক ঝাঁঝালো মহুয়া, বিষাক্ত মৌমাছি কন্ঠে নিয়েছি ভরে, ভয় আর করি না, থানে
শুয়ে থাকা বনদেবী তোমার চোখে কোনদিনই দেখিনি জল, তাই দেবী আমি আজ।

.                                   **************************  
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
সেই তরুণটি
কবি চিরশ্রী দেবনাথ
প্রথম প্রকাশ ত্রিপুরার “দৈনিক সংবাদ” পত্রিকার “সংবাদ বিচিত্রা” পাতায়।

ঘুম ঘুম বিসুভিয়াস থেকে কিছু লাভা আর চিরহরিৎ অরণ্যের সবুজ নিয়ে বেড়ে ওঠা সেই
তরুণটিকে হারিয়ে যেতে দিও না, যার গভীর ঘাড়ে রাখা আছে পালকের মত হালকা
একটুকরো বিশুদ্ধতা, নদীর চরের মত জেগে ওঠা কোনও পেলব প্রেম, তার সামনে রাখবো
আমি খাপখোলা তলোয়ার, হাঁটবে সে ধার ছুঁয়ে ছুঁয়ে, ছিটকে পরবে কিছু রক্ত, ছড়িয়ে
পড়বে গ্লোবালাইজড্ বিপ্লবের ডিজিটাল নীলাভ রঙ, বিশ্বায়ন হাত বাড়াক না তার দিকে,
মুচকি হেসে সে হাত ধরবে সময়ের, তার ঘন পল্লবিত দুই চোখের খরতায় মিশে যাবে  
কোনও মৌন নদী, নাই বা হলো তাতে জোঁয়ার ভাঁটা, সব কি আর এক সরলরেখায় হয়
সবসময়? পলকা পা ফেলে অমল তরুণ হেটে যাবে দীর্ঘায়িত দুপুরের পথে, বিকেল থমকে
দাঁড়িয়ে সেখানে রোদমেখে, হোক না একা, জেনে রেখো কিছু জোনাকি আলো জ্বেলে বসে
আছে এই খন্ডিত বসন্তপ্রান্তরে .....

.                                   **************************  
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
একটি বায়োডাটা
কবি চিরশ্রী দেবনাথ

মেয়েটির নাম : আফ্রিকা
বাবা : সমুদ্র
মা : পৃথিবী
গায়ের রঙ : কালবৈশাখীর আকাশ
উচ্চতা : গনগনে অগ্নিশিখা
শিক্ষাগত যোগ্যতা : কিছু কোমল কিছু দুরন্ত অনূভব
স্বপ্ন : ইচ্ছে করে আকাশ ছুঁয়ে দেখতে।

.            **************************  
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
খেলা খেলা
কবি চিরশ্রী দেবনাথ

আজ মেঘ সাম্রাজ্যে শাসন আমার,
যেমন তেমন যা খুশী হোক,
মেঘ পাহাড়, চাঁদ বুড়ি, আদর করা নক্ষত্র সব বসবে আমার ইচ্ছেমত।
মাঝ আকাশে নৌকো ভাসাই, পালছাড়া মাঝিবিহীন।
আজ সে সেচ্ছাচারী, চুম্বক পাহাড় যাচ্ছে ডুবে, লৌহছায়া অর্থহীন।
কোথায় তুমি, কোথায় আমি, আকাশ পেরিয়ে সূর্যপথ, পথের শেষে শীতল ফিউশন।
মেঘস্তম্ভে জলপ্রপাত, ভাসবে বুঝি জনপথ,
কালপুরুষকে সঙ্গে করে আকাশভূমে
শিকার খেলা,
স্বর্ণমৃগ হাসছে তবু , ছুটছে দেখো অশ্বমেধের ঘোড়া।

.            **************************  
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর