কবি মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর - জন্মগ্রহণ করেন কলকাতার জোড়াসাঁকোয়। পিতা প্রিন্স দ্বারকানাথ
ঠাকুর ও মাতা দিগম্বরী দেবীর জ্যেষ্ঠ পুত্র। ব্রাহ্মসমাজের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধর্মনেতা।

তিনি প্রথমে রাজা রামমোহন রায়ের প্রতিষ্ঠিত অ্যাংলো-হিন্দু স্কুলে এবং পরে ১৮৩১ সাল থেকে কয়েক
বছর হিন্দু কলেজে পড়েন। এর পর তাঁর পিতার "কার টেগোর কোম্পানি" নামের সওদাগরি অফিসে ও
ইউনিয়ন ব্যাঙ্কে কাজে শিখে, পিতার বিষয়কর্মে ও ব্যবসায়ে কর্তৃত্ব পেয়ে, বিলাসী হয়ে ওঠেন।

১৮৩৫ সালে পিতামহীর মৃত্যুর পর তাঁর মনে ধর্মজিজ্ঞাসা প্রবল হয়ে ওঠে। ক্রমে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য ধর্ম
এবং দর্শনের বিভিন্ন গ্রন্থ অধ্যয়ন করে ঈশ্বরলাভের জন্য ব্যকুল হয়ে ওঠেন। ধর্মতত্ত্ব আলোচনার জন্য
৬.১০.১৮৩৯ সালে "তত্ত্বরঞ্জিনী সভা" স্থাপন করেন। সভার দ্বিতীয় অধিবেশনে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়
“তত্ত্ববোধিনী সভা”। ১৮৪০ সালে, অক্ষয়কুমার দত্তর সাহায্যে প্রতিষ্ঠা করেন "তত্ত্ববোধিনী পাঠশালা"। বিনা
বেতনে বাংলা ভাষার মাধ্যমে বিজ্ঞান ও ধর্মশাস্ত্র বিষয়ক উপদেশ দেওয়া এই পাঠশালার উদ্দেশ্য ছিল।
১৮৪২ সাল থেকে তত্ত্ববোধিনী সভা ব্রাহ্মসমাজের ভার তুলে নেয়। ১৮৪৩ সালে নিজের অর্থে ও অক্ষয়কুমার
দত্তর সম্পাদনায় প্রকাশিত করা শুরু করেন তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা। তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা, ব্রাহ্ম সমাজের এই
নতুন ধর্মবিশ্বাস প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক সংস্কারের পক্ষেও জনমত গড়ে তোলে।

২১.১২.১৮৪৩ তারিখে ২০ জন বন্ধুর সঙ্গে মিলে তিনি ব্রাহ্ম ধর্মে দীক্ষাগ্রহণ করে ব্রাহ্মধর্ম প্রচারের কাজে
উদ্যোগী হন। ১৮৪৬ সালে যখন তাঁর পিতা দ্বারকানাথের মৃত্যু হয় ইংল্যাণ্ডে, তখন তিনি অপৌত্তলিক মতে
পিতৃশ্রাদ্ধ সম্পন্ন করেন। পিতার "কার টেগোর কোম্পানি" ও ইউনিয়ন ব্যাঙ্ক উঠে গেলে তিনি সততার সঙ্গে
পিতৃঋণ পরিশোধ করেন।

১৮৫৩ সালে তিনি তত্ত্ববোধিনী সভার সম্পাদক হন। ১৮৫৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ব্রহ্মবিদ্যালয়। ১৮৬০ সালে
বসেন ব্রাহ্মসমাজের বেদিতে। ২৬.৭.১৮৬০ তারিখে দ্বিতীয়া কন্যার বিবাহে শালগ্রামশিলা বর্জন করেন। এর
ফলে হিন্দু সমাজে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। হিন্দু পূজাপার্বনের বদলে প্রচলন করেন মাঘোত্সব ( ১১ই মাঘ ) ও
দীক্ষাদিন ( ৭ই পৌষ )।  

১.৮.১৮৬১ তারিখে, ইণ্ডিয়ান মিরর নামে একটি ইংরেজী পত্রিকাও প্রকাশ করেন তিনি।

মতবিরোধ হওয়ায় ১৮৬৬ সালে কেশবচন্দ্র সেন “সর্বভারতীয় ব্রাহ্ম সমাজ”-এর প্রতিষ্ঠা করেন।
দেবেন্দ্রনাথের অনুগামী ব্রাহ্মসমাজ “আদি ব্রাহ্ম সমাজ” নামে পরিচিতি লাভ করে। খৃষ্ট ধর্মের প্রভাব থেকে
যুবকদের রক্ষা করার জন্য মহারাজ রাধাকান্ত দেব  তাঁকে  "জাতীয় ধর্মের পরিরক্ষক" উপাধীতে ভূষিত
করেন। ১৯৬৯ সালে ব্রাহ্মগণ তাঁকে “মহর্ষি” উপাধীতে ভূষিত করেন।

১৮৭৬ সালে বীরভূম জেলায় এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল কিনে সেখানে আশ্রম স্থাপন করেন, যা আজকের
শান্তিনিকেতনে রূপান্তরিত করে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দেন, তাঁরই পুত্র
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

তিনি জ্ঞানান্বেষণ সভার সভ্য এবং হিন্দু চ্যারিটেবল ইনস্টিটিউশনের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। কিছুদিন তিনি
রাজনীতিতেও অংশ নেন। রাজনৈতিক বক্তব্য রাখার জন্য, কয়েক জন বন্ধুর সঙ্গে মিলে ১৮৫১ সালে
ন্যাশনাল অযাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠা করেন। পরে এটি ব্রিটিশ ইণ্ডিয়ান সোসাইটির সঙ্গে মিশে যায়। তিনি
ব্রিটিশ পার্লিয়ামেন্টে স্বায়ত্তশাসনের দাবী-সংবলিত একটি দরখাস্তও পাঠিয়েছিলেন। তিনি বেথুন সোসাইটির
অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। তিনি বাংলায় সংস্কৃত ব্যাকরণ প্রকাশিত করেছিলেন।

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ব্রাহ্মধর্ম (১৮৫০), ব্রাহ্মধর্মের ব্যাখ্যান (১৮৬০), পরলোক ও মুক্তি (১৮৯৫),
আত্মজীবনী (১৮৯৮)।  আত্মজীবনীর  ইংরেজী অনুবাদ করেন সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও ইন্দিরা দেবীচৌধুরাণী,
১৯১৭ সালে। তিনি অনেক ব্রহ্মসঙ্গীতও রচনা করে গিয়েছেন।

আমরা
মিলনসাগরে  কবি মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা তুলে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে
পারলে এই প্রচেষ্টার সার্থকতা।



উত্স:  ডঃ শিশির কুমার দাশ, "সংসদ সাহিত্য সঙ্গী", ২০০৩    
.            
কবি দুর্গাদাস লাহিড়ী সম্পাদিত "বাঙ্গালীর গান" সংকলন, ১৯০৫,
.            সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু সম্পাদিত "সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান", ১৯৭৬,
.            
উইকিপেডিয়া       



কবি মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন



আমাদের ই-মেল -
srimilansengupta@yahoo.co.in     


এই পাতা প্রথম প্রকাশ - ২৭.১.২০১৬

...