কবি জর্জ মীরজাফর গোস্বামী - এর আসল নাম শুভঙ্কর মুখোপাধ্যায়। তাঁর এই ছদ্মনাম নেবার
কারণ সম্পর্কে কবি বলেছেন, যে সে ছিল ১৯৭৩ সালের ঘটনা। সবে নকশাল আন্দোলন শেষ হয়েছে, এই
সময় তখন খুব জাতীয় সংহতির কথা বলা হচ্ছিল। ‘বাংলাদেশ’ রাষ্ট্র হয়েছে। তখন দেশপ্রেম, সংহতি
ইত্যাদির কথা খুব প্রচার করা হচ্ছিল। কবির কাছে এসব ফাঁকা বুলি বলেই মনে হয়েছিল। তাকে ব্যঙ্গ
করার জন্যই এই নাম। “জর্জ মীরজাফর গ্বোস্বামী” নামেই কবি ছড়া, গান, কবিতা, লেখেন। কবি ১৯৭৩ সালে
রাণাঘাট থেকে “পদাতিক” নামে একটা পত্রিকা বের করেছিলেন, তাতে “একচক্ষু কর্মকার” নামে লিখেছিলেন।
প্রবীর দত্ত হত্যার পর “শ্বেত সন্ত্রাস” নামে একটা নাটক লিখেছিলেন ঐ ছদ্মনামেই।

১৯৯৬ সালে, কবি, জলার্ক পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে জানিয়েছিলেন যে, ১৯৭০-৭১ সালে তিনি
কৃষ্ণনগর গভর্ণমেন্ট কলেজে পড়ার সময় নকশাল রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হন। এই সময় তাঁর বয়স ১৬
থেকে ১৮ বছর ধরে নিয়ে তাঁর জন্ম ১৯৫২-৫৪ হতে পারে। কেউ যদি কবির প্রকৃত জন্মদিন জানান তাহলে
আমরা কৃতজ্ঞ থাকবো।

গানের জন্য তিনি কোন প্রথাগত বিদ্যা লাভ করেন নি। খবিরা থাকতেন রানাঘাটে। তাঁদের বাড়ীতে প্রায়
সবাই গান গাইতেন। ১৯৭৩ সালে চন্দন ভট্টাচার্যের সাথে গাইতে বলা হয় | রানাঘাট থেকে দমদমের
কাজীপাড়ায় এসে রিহার্সাল দিতেন। হেদুয়াতে বসন্ত কেবিনের উপরে তাঁর একটা ঘর নিয়েছিলেন। বাড়ী
ফিরতে প্রয়ই রাত সাড়ে বারটা বেজে যেতো। শো থাকলে ফেরাও হোত না।

১৯৭৮ সালে কবি জর্জ মীরজাফর গোস্বামী “সোসিওলজি”-তে  এম. এ. পাশ করেন, কল্যানী
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এম.এ. তে তিনি প্রথম হন। এই সময় কল্যাণীতে কিছু কিছু ছাত্র আন্দোলন সংগঠিত
করবার চেষ্টা করেছিলেন। সম্ভবত ১৯৭৬-৭৭ সালে ভোলানাথ শীল, বাঁকুড়ায় পুলিশের থেকে রাইফেল স্ন্যাচ্
করে। ঐ সময়ে ওদের অ্যারেস্ট করা হয়। এর প্রতিবাদে কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ে বন্ ধ পালন করা হয়।
এতে কবির সক্রিয় ভূমিকা ছিল। তবে তিনি কোন নির্দিষ্ট রাজনীতি করতেন না। নিজেরা যা ভাল বুঝতেন
তাই করতেন। তবে গোপন কাজ করতে হবে এটা সবসময় মাথায় থাকত।

যে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কবি জড়িয়ে পড়েন ( সি.পি.আই.এম.এল. বা নকশালপন্থী ) তাদের থেকে নির্দেশ
দেওয়া হল --- গ্রামে যেতে হবে। কবির সমস্ত রাজনৈতিক কাজকর্মের প্রেরণা ছিলেন কবির বোন (নাম
বলেননি)। কবি তাঁর বোনকে তার রাজনৈতিক ধ্যানধারণা বুঝিয়েছিলেন। কবি চাকরী বাকরীর জন্য
অ্যাপ্লাইও করতেন না। বোন স্কটিশ চার্চ কলেজে একটা লেকচারারের চাকরী পেলেও ওদের কথায় ছেড়ে
দেন। কারণ তাঁদের গ্রামে যাওয়ার ফরমান এসেছিল। তখন তাঁরে বাড়ীতে থাকলে, ওরা অবজ্ঞাই করত।
১৯৭৯ সালে খসরা দলিল ও কবির কিছু লেখা নিয়ে ওদের সাথে মতভেদ হওয়ায় শেষপর্যন্ত দল ছেড়ে দেন
। ১৯৮০ সালে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটা স্কলারশিপ পান, ধর্ম ও রাজনীতি বিষয়ে গবেষণা করে |
বাংলাদেশের উপর একই বিষয়ে কাজ করেছেন |

কবি মনে করেন যে সি.পি.আই.এম. যে নিজেদের সেকুলার পার্টি বলে, আদৌ তা নয় |  তাঁর মতে প্রতুল
মুখার্জ্জীর প্রথম ক্যাসেট “যেতে হবে” অসাধারণ, কিন্তু দ্বিতীয় ক্যাসেটের ( সম্ভবত “ওঠো হে” ) কয়েকটা গান
ওর কাছ থেকে আশা করা যায় না। প্রতুলবাবুর গান তথাকথিক নকশালরা ব্যপকভাবে গাইত, কিন্তু এখন
ওর গান যে কেউ গাইতে পারে (?)! অতবড় লেখক শিল্পী হয়েও মনে হয় উনি কিছুটা বিভ্রান্ত (?)। তবে
বর্তমানে যে তথাকথিত জীবনমুখী গান হচ্ছে তা আসলে গণসংগীতেরই বারোটা বাজাচ্ছে।

কবি গান শুনে শ্রোতা ও দর্শকদের প্রতিক্রিয়া ভালই ছিল। একবার মনুমেন্টের তলায় কবির অভিনয় দেখে
এক বৃদ্ধ কবিকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, “বাবা, তুমি একটু দুধ খেও”। একবার দুর্গাপুরে এক অবাঙালী
কমরেড বলেছিলেন --- “গাজীর” গান আমি বুঝতে পেরেছি। বাংলা তো ভাল বুঝতে পারি না তবে আপনার
জেসচার এবং কিছু কথা থেকে বুঝতে পারি। প্রভাত গান্ধীর ( বন্দীমুক্তি আন্দোলনের নেতা ) খুব ভাল
লেগেছিল গাজীর গান। কবির কথায় একবার মেদিনীপুর থেকে ফেরার পথে পকেটে পয়সা নেই, ট্রেনে গান
ধরলেন। হকাররা তাঁদের বিনা পয়সায় বাদাম সন্দেশ দিয়েছিল। তখন তো তাঁরা সাধারণ লোকের কাছ
থেকে পয়সা, খাবার, বিড়ি অবধি চেয়ে নিয়েছেন। গান শুনে খুশী মনেই দিয়েছে। অন্তত একশ বার কার্জন
পার্কে, মনুমেন্টের তলায় কবি গান করেছেন।

কবার কার্জন পার্কে একটা অনুষ্ঠান শেষে কবি মুড়ি খাচ্ছিলেন। দেখেন যে, তাঁদের তমালদা এক লম্বা-চওড়া
লোকের সঙ্গে কথা বলছেন। ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন আপনারা কি শুধু এই গান করেন? তমালদা উত্তর
দিলেন না আমরা সাধারণের গান করি। ভদ্রলোক বললেন যে আপনারা যখন সব খোলাখুলি বললেন তখন
আমিও বলি আমি পুলিশের লোক। আপনাদের মধ্যে কেউ নকশাল আছে? তমালদা বলেন না না। তখন
কবি প্রচণ্ড আঁতলেমি শুরু করেন। ওর ধারনা হয় তাঁরা আঁতেল।

আর একটা ঘটনা সম্বন্ধে কবি বলেছেন। ২০শে জুলাই। সেদিন লালগোলা লোকাল বেশ লেট করেছিল।
প্রোগ্রাম ছিল কার্জন পার্কে। হাতে পয়সা না থাকায় কবি হেঁটেই কার্জন পার্কে পৌঁছান। পোঁছে দেখেন কার্জন
পার্ক একদম ফাঁকা। তখন তিনি মেডিক্যাল কলেজে বন্ধুদের কাছে ফিরে যান। বন্ধুদের কাছ থেকে পয়সা
নিয়ে রাণাঘাটে ফিরে আসেন। পরের দিন সকালে কাগজ খুলে দেখেন প্রবীর দত্তকে পুলিশ গুলি করে হত্যা
করেছে। পরে কবি শুনেছিলেন তিনিও সেদিনের টার্গেট ছিলেন।

এরপর কবি ১৯৭৩ সালে চন্দন ভট্টাচার্য, শ্যামল গণ, সুব্রত ভট্টাচার্য কে সাথে নিয়ে গঠন করেন ওপেন
থিয়েটার | একটা সময়ে তাঁদের উপর পার্টির নির্দেশ ছিল যে তাঁরা কোনো অনুষ্ঠান করতে পারবেন না
কারন কেউ মুখ চেনাতে পারবেন না। পার্টির গোপনীয়তা রক্ষা করতে গিয়ে কবিদের গান ও “ওপেন
থিয়েটারের” ক্ষতি হয়েছিল বলে কবির মনে হয়েছে। কিছুদিন প্রায় বসেই গিয়েছিলেন।

হেমাঙ্গ বিশ্বাসের মাস সিঙ্গার্স-এর সাথে তেমন সম্পর্ক ছিল না, তবে কবি হেমাঙ্গদার কাছে যেতেন |
হেমাঙ্গদার কাছে গান শিখতে চাইলে শিখিয়ে দিতেন এছাড়া কবির বাজেটের উপর গাজীর গান তিনি তুলে
নিয়েছিলেন। উনি নকশালপন্থী ছিলেন কিনা কবি জানতেন না, তবে কবিদেরই সমর্থন করতেন।

কবি গাজী গানের সুরে বেশ কয়েকটি গান লিখেছেন। বাজেট নিয়ে, বকচ্ছপ নামে একটা গান লিখেছেন।
পালা গান লিখেছেন। এর সুর লোকসঙ্গীত, সিনেমা থেকে নেওয়া। তাঁর অনেক গান হারিয়ে গেছে। সব
মিলিয়ে কুড়ি-পঁচিশটা হবে। কবির গানের সুর নিয়ে বলেছেন যে তাঁদের বাড়ীতে দুজন গাজী আসতেন।
তাঁদের গান কবি মন দিয়ে শুনতেন এবং ওদের সুর থেকে গাজীর গান লিখেছেন, সুর দিয়েছেন। একটা
পালাগান লিখেছিলেন তাঁর মার কাছে শোনা একটা অসমীয়া লোকসঙ্গীতের সুরে।

কবি জর্জ মীরজাফর গোস্বামীর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে “মীরজাফরী : জর্জ মীরজাফর গোস্বামী”
(১৯৮০), “পাঁচফোঁড়ন : জর্জ মীরজাফর গোস্বামী” (১৯৮৪), “গরু নিয়ে রাজনীতি : শুভঙ্কর
মুখোপাধ্যায়” (১৯৯৪) প্রভৃতি। এছাড়া কবি ১৯৭৩ সালে রাণাঘাট থেকে “পদাতিক” নামে একটা পত্রিকা বের
করেছিলেন, তাতে “একচক্ষু কর্মকার” নামে লিখেছিলেন।


আমরা  
মিলনসাগরে  কবি জর্জ মীর্জাফর গোস্বামীর গান ও কবিতা  তুলে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে
দিতে পারলেই এই প্রয়াসের সার্থকতা।

আমরা
কবি রাজেশ দত্তর কাছে ভীষণভাবে কৃতজ্ঞ, কবি জর্জ মীর্জাফর গোস্বামীর এই পাতাটি তৈরী করার
সবরকম তথ্য, আমাদের দেবার জন্য তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে।  আমরা আরও কৃতজ্ঞ শ্রী চিররঞ্জন
পালের  (চলভাষ +৯১৯৪৩৪৫১৬৮৯৮)  কাছে   তাঁর  নানাভাবে  এই পাতাটি তৈরী করতে  সাহায্য করার
জন্য। স্বপন দাসাধিকারী সম্পাদিত  “এবং জলার্ক” থেকে ০২.০৬.১৯৯৭ তারিখে প্রকাশিত “যুদ্ধ জয়ের গান”,
গ্রন্থ থেকে নেওয়া তথ্যাদি নেওয়া হয়েছে। আমরা তাঁদের কাছেও কৃতজ্ঞ।



উত্স - জর্জ মীরজাফর গোস্বামী, “দুলেছে সপ্ত সিন্ধু : সত্তর দশকের গণসঙ্গীত : কিছু কথা, কিছু স্মৃতি”,
.         স্বপন দাসাধিকারী সম্পাদিত “যুদ্ধ জয়ের গান”, ১৯৯৭।



কবি জর্জ মীর্জাফর গোস্বামীর মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন


আমাদের ই-মেল -
srimilansengupta@yahoo.co.in     

এই পাতার প্রথম প্রকাশ - ১৭.১১.২০১৫
...