কবি গিরিজা কুমার বসুর কবিতা
|
আহ্বান
কবি গিরিজাকুমার বসু
রাধারাণী দেবী ও নরেন্দ্র দেব সম্পাদিত “কাব্য-দীপালি” থেকে নেওয়া
মুখের হাসিতে আর
. বুকের বেদনা সই
. ঢেকে কত রাখ্ বো,
জোর ক’রে মন বেঁধে
. আড়ালে লুকিয়ে কেঁদে
. কত কাল থাক্ বো !
. যেদিন বিদায় নিলে
. মনে পড়ে, ব’লেছিলে
. ‘দু-দিনেই আস্ বো’,
. তুমি কি ভুলিলে সই,
. নেই মোর এক বই
. ভাল’ যারে বাস্ বো |
হৃদয়ে রাখিয়া যায়
. পলকে হারাতে, হায় !
. কি দিন্ই সে যাপ্ ছে
কে বুঝিবে সেই কথা
. তোমার বিরহ-ব্যথা
. কি প্রাণে সে চাপ্ ছে |
দিবানিশি দেখে তবু
. দু’জনার কারো কভু
. যেতো না যে তিয়াষা,
ভুবনে কি ছিল মধু,
. নয়নে কি প্রেম, बधमবঁধূ
. মরমে সে কি আশা !
. দরশ পরশ মাগি’
. আজ আমি নিশি জাগি
. অধর কি তিক্ত !
. হে মোর অমিয়, তুমি
. এস’, তারে চূমি চূমি
. কর সুধা-সিক্ত |
আজি দিকে দিকে প্রীতি
. ভরি’ উঠে বনবীথি
. চম্পক-গন্ধে,
এস তুমি অনুরাগে
. নিখিল ভুবন জাগে
. নব গীতি-ছন্দে |
বিচিত্রা
কবি গিরিজাকুমার বসু
রাধারাণী দেবী ও নরেন্দ্র দেব সম্পাদিত “কাব্য-দীপালি” থেকে নেওয়া
চঞ্চল হিয়া, বল বল প্রিয়া,
. বল বল প্রিয়তমা,
মনো-মধুপের মোহন রূপের
. সুধা-শতদল সমা !
কোন্ অলকারহ কামনা-দুয়ার খুলি’
মৃণাল-গরবী সলিল-শয়ন ভুলি’
ফুটিলে আমার বক্ষ-সরসে দুলি’
. প্রেমারুণ অনুরাগে !
ওগো মনোরমা, ঊষা-প্রিয়তমা
. এত মোরে ভালো লাগে !
সেদিন গোধূলি, আঁখি-পাতা তুলি
. হাসিমুখে সুবিমলে,
চেয়েছিলে দুটি ডাগর নয়নে
. মুগ্ধ-মরম-তলে |
যেদিন প্রথম-পরিচয়-ক্ষণে
সুধু পলকের মৃদু দরশনে
জীবনের রথ টানিলে চরণে
. অলখ হৃদয়-হারে,
নিমেষে চমকি’, সঁপিলাম সখি,
. নিঃশেষে আপনারে |
তোমার বুকের চীনাংশুকের
. রজতাঞ্চল-রুচি
কৌমুদী –ছলে নিল কি ধরার
. সকল ম্লানিমা মুছি ?
দ্রাক্ষা-অধর চুমায় তোমার
বকুল-বালিকা বিভল হিয়ার
খুলিল কি ধীরে মৃদু দল তার
. কিশোরী-বয়স লভি’ ?
তোমার বুকের আলিঙ্গনের
. বহিয়া বিনোদ ছবি |
প্রেয়সীর বেশে, নিলে ভালোবেসে
. আমারে বরণ করি’ ;
নয়নের ডোরে বাঁধিলে যে মোরে
. হে হৃদয়-ঈশ্বরী !
চরণ-সেবার নিয়েছি যে ভার,
জানি, নহি আমি যোগ্য তাহার
সোনা করি’ দিলে মোর সংসার,
. হে পরশমণি তুমি |
স্নেহের আমার গোমুখী-প্রপাত,
. প্রেমের তীর্থভূমি !
কে তোমারে প্রিয়া, রাখিল সৃজিয়া
. সোহাগে আমারি তরে !
কোন্ মনোরথে আসিলে লক্ষ্মী
. লক্ষ্মীছাড়ার ঘরে !
কোন্ সে অতীত পুণ্যের ফলে
রচিলে আলয় পরাণ-কমলে
তব উত্সব-দীপ আজি জ্বলে
. আনন্দে দিবাযামী,
কোন্’ শিব’জটা বহি বল্লভী
. মানসে আসিলে নামি |
দুলিয়া ফুলিয়া প্লাবন-জাগর
. মিলন-সাগর, সখি,
লুটায়ে পড়িছে বক্ষ-বেলায়
. তোমারি কিরণে ওকি ?
.তোমারি পেলব-পীযূষ-তৃষায়
চিত্ত-চকোর ফিরে কি নিশায়
চাহি ছায়াপথে তোমারি দিশায়
. অধর-কুমুদ জাগে ?
তোমারি জীবনে জীবন তাহার,
. দাবী তার সব আগে |
যাচিয়া চরণ, হৃদয়-আসন
. পেতেছিনু তব প্রিয়া
ধন্য করিলে অঙ্ক তাহার
. শ্রীপদ’ –প্রসাদ দিয়া
থাক’ থাক’ সেথা হইয়া অচল
নিখিল-নারীর হে রাকা অমল
তোমারি ধ্যানের মন্ত্রে কেবল
. ফুটুক্ আমার বাণী ;
তুমি থাক মোর সকলের বাড়া,
. তুমি থাক’ মোর রাণী |
ফাল্গুনে
কবি গিরিজাকুমার বসু
সুকুমার সেন সম্পাদিত “বাংলা কবিতা সমুচ্চয়” ১ম খন্ড থেকে নেওয়া
এত কলি, এত মধু, এত গুঞ্জরণ
. এত কেন বিচিত্র বরণ
আমার দুয়ারে আজি আনিলে বল্লভ !
. নিশিদিন নবীন পল্লব
দক্ষিণের মৃদু বায়ে শিহরি সঞ্চরি
. এই মোর মুগ্ধ হিয়া ভরি
এত কথা কেন কহে ? হে প্রিয় আমার
. আনন্দের এত উপহার
সহিতে যে পারে না পরাণ, গেছ ভুলি
. কি ব্যথায় গেছে দিনগুলি ?
সেই তীব্র বেদনার অন্ধকার টুটি
. উঠে আজি চারিদিকে ফুটি
একি আভা, একি জ্যোতিঃ | উচ্ছ্বাসিয়া বুক
. ঝলসিছে কি মহা ময়ূখ |
অন্তহীন রিক্ততার হিম শীর্ণ হাতে
. বসন্তের কিরণ সম্পাতে
প্রাচুর্যের একি শুভ্র লীলা-শতদল
. দিলে আনি সুধার কোমল
একেবারে এত সুখ হানি হৃদিতলে
. ভাসাইলে কেন আঁখিজলে ?
রাগ করিয়ো না, প্রিয় ! এতদিন পরে
. হে বাঞ্ছিত, এলে তুমি ঘরে
মোর তরে নিয়ে এলে করি আহরণ
. কত বেশ, কত আভরণ
মরমের বীণাখানি যতনে সাধিয়া
. কত সুরে আনিলে বাঁধিয়া
নাই মনে অপ্রশংসা তার ; সমারোহ
. চিত্তে মোর জাগায়ো না দ্রোহ
শুধু ভয়, পাছে গুরু নৈবেদ্যের ভারে
. হারাইয়া ফেলি দেবতারে ||
ঠাণ্ডার গল্প
কবি গিরিজাকুমার বসু
শক্তি চট্টোপাধ্যায় ও এখ্ লাসউদ্দিন আহ্ মদ সম্পাদিত “দুই বাংলার ছড়া” থেকে নেওয়া
বিধু বলে--- আজকাল পাটনায় সে কি শীত
শুনে তুই একেবারে হয়ে যাবি স্তম্ভিত |
ভোরবেলা উঠে দেখি বুক কাঁধ ঘাড়-পিঠ,
বরফেতে জমে গিয়ে হয়ে গেছে ইঁট !
নিধু বলে ---- ও তো ভারি, আমাদের গ্রামটায়
ঠাণ্ডা যে কি রকম শুনে হবি চুপ ঠায় |
ঘুম ভেঙে ঘটি নিয়ে গিয়ে কাছে গাইটার
দুধ দুই, যত দেখি ---- এ আবার কি ব্যাপার ?
বিস্ময়ে সোজা হয়ে ওঠে গোঁফ জুলফি
বাঁট থেকে ক্রমাগত বার হয় কুলফি |
তমাল
কবি গিরিজাকুমার বসু
প্রবাসী পত্রিকার মাঘ ১৩০৮ ( ফেব্রয়ারী ১৯০২ ) সংখ্যা থেকে নেওয়া।
কার সে বাঁশরী-রবে প্রেম-বৃন্দাবনে
উষার কণকভূষা ধরি চারু শিরে
জাগিলে প্রথম তুমি বিপুল ভূবনে
দাবী
কবি গিরিজাকুমার বসু
দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ও জলধর সেন সম্পাদিত ভারতবর্ষ পত্রিকার আষাঢ় ১৩২৯ ( জুলাই
১৯২২ ) সংখ্যা থেকে নেওয়া।
তুমি কেন পাও লাজ
. ‘বউ’ বলে ডাক্ লে ?
তুমি কেন যাও স’রে
. আর কেউ থাকলে ?
তৃপ্তি
কবি গিরিজাকুমার বসু
দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ও জলধর সেন সম্পাদিত ভারতবর্ষ পত্রিকার অগ্রহায়ণ ১৩২৯ ( ডিসেম্বর
১৯২২ ) সংখ্যা থেকে নেওয়া।
নিল সরমের বাঁধ টুটি
. মরমের চাঁদ, ঠাঁই---
. আকাশে
ছিল প্রেমে মোর কোন্ ত্রুটি
. বুকে ঢাকা নিধি তাই
. রাকা সে।
তার হৃদয়ের সব আশা
. মিটে যদি তারকার
. শয়নে
আর কাজ নাই ভালবাসা
. থাক্ দূরে, দেখি শুধু
. নয়নে।
দুর্লভ
কবি গিরিজাকুমার বসু
দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ও জলধর সেন সম্পাদিত ভারতবর্ষ পত্রিকার আশ্বিন ১৩২৯ ( অক্টোবর
১৯২২ ) সংখ্যা থেকে নেওয়া।
ডাগর আঁখিতে আলোর সাগর কুঙ্কুম গালে লালের মায়া,
আধ’ শশী তার শোভন ললাট কুসুম-ধনুর ভ্রূ-দুটি ছায়া
বাদলের ব্যাথা
কবি গিরিজাকুমার বসু
দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ও জলধর সেন সম্পাদিত ভারতবর্ষ পত্রিকার শ্রাবণ ১৩২৯ ( অগাষ্ট
১৯২২ ) সংখ্যা থেকে নেওয়া।
বুকের জমাট ব্যথা বিষাদের তপ্ত-শ্বাসে
. আঁখি-কোণে হইয়া তরল,
পড়িল ঝরিয়া যার তোমারি স্বাগত-পথ
. করি বঁধু কোমল সরল ;
. সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত
কবি গিরিজাকুমার বসু
দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ও জলধর সেন সম্পাদিত ভারতবর্ষ পত্রিকার শ্রাবণ ১৩২৯ ( অগাষ্ট
১৯২২ ) সংখ্যা থেকে নেওয়া।
[ পরলোকগমন - শনিবার, ১০ই আষাঢ়, ১৯২৯ --- রাত্রি দুই ঘটিকা ]
সে যে এসেছিল চাঁদের কিরণ
. পৌণ-মাসীর রাতে ;
সে যে ভেসেছিল কোকিল-কূজন
. স্নিগ্ধ মলয় রাতে ;
সে যে ফুটেছিল কুন্দ-কুসুম
. পৌষে তপন করে ;