কবি গিরিজা কুমার বসুর কবিতা
*
আহ্বান
কবি গিরিজাকুমার বসু
রাধারাণী দেবী ও নরেন্দ্র দেব সম্পাদিত “কাব্য-দীপালি” থেকে নেওয়া

মুখের হাসিতে আর
.        বুকের বেদনা সই
.                ঢেকে কত রাখ্ বো,
জোর ক’রে মন বেঁধে
.        আড়ালে লুকিয়ে কেঁদে
.                কত কাল থাক্ বো !

.                                     যেদিন বিদায় নিলে
.                                            মনে পড়ে, ব’লেছিলে
.                                                    ‘দু-দিনেই আস্ বো’,
.                                    তুমি কি ভুলিলে সই,
.                                            নেই মোর এক বই
.                                                     ভাল’ যারে বাস্ বো |

হৃদয়ে রাখিয়া যায়
.        পলকে হারাতে, হায় !
.                কি দিন্ই সে যাপ্ ছে
কে বুঝিবে সেই কথা
.        তোমার বিরহ-ব্যথা
.                কি প্রাণে সে চাপ্ ছে |

দিবানিশি দেখে তবু
.        দু’জনার কারো কভু
.                যেতো না যে তিয়াষা,
ভুবনে কি ছিল মধু,
.        নয়নে কি প্রেম, बधमবঁধূ
.                মরমে সে কি আশা !

.                                        দরশ পরশ মাগি’
.                                                আজ আমি নিশি জাগি
.                                                        অধর কি তিক্ত !
.                                        হে মোর অমিয়, তুমি
.                                                এস’, তারে চূমি চূমি
.                                                        কর সুধা-সিক্ত |

আজি দিকে দিকে প্রীতি
.        ভরি’ উঠে বনবীথি
.                চম্পক-গন্ধে,
এস তুমি অনুরাগে
.        নিখিল ভুবন জাগে
.                নব গীতি-ছন্দে |




.                         ***************  
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
বিচিত্রা
কবি গিরিজাকুমার বসু
রাধারাণী দেবী ও নরেন্দ্র দেব সম্পাদিত “কাব্য-দীপালি” থেকে নেওয়া

চঞ্চল হিয়া, বল বল প্রিয়া,
.                বল বল প্রিয়তমা,
মনো-মধুপের মোহন রূপের
.                সুধা-শতদল সমা !
কোন্ অলকারহ কামনা-দুয়ার খুলি’
মৃণাল-গরবী সলিল-শয়ন ভুলি’
ফুটিলে আমার বক্ষ-সরসে দুলি’
.                প্রেমারুণ অনুরাগে !
ওগো মনোরমা, ঊষা-প্রিয়তমা
.                এত মোরে ভালো লাগে !

সেদিন গোধূলি, আঁখি-পাতা তুলি
.                হাসিমুখে সুবিমলে,
চেয়েছিলে দুটি ডাগর নয়নে
.                মুগ্ধ-মরম-তলে |
যেদিন প্রথম-পরিচয়-ক্ষণে
সুধু পলকের মৃদু দরশনে
জীবনের রথ টানিলে চরণে
.                অলখ হৃদয়-হারে,
নিমেষে চমকি’, সঁপিলাম সখি,
.                নিঃশেষে আপনারে |

তোমার বুকের চীনাংশুকের
.                রজতাঞ্চল-রুচি
কৌমুদী –ছলে নিল কি ধরার
.                সকল ম্লানিমা মুছি ?
দ্রাক্ষা-অধর চুমায় তোমার
বকুল-বালিকা বিভল হিয়ার
খুলিল কি ধীরে মৃদু দল তার
.                কিশোরী-বয়স লভি’ ?
তোমার বুকের আলিঙ্গনের
.                বহিয়া বিনোদ ছবি |

প্রেয়সীর বেশে, নিলে ভালোবেসে
.                আমারে বরণ করি’ ;
নয়নের ডোরে বাঁধিলে যে মোরে
.                হে হৃদয়-ঈশ্বরী !
চরণ-সেবার নিয়েছি যে ভার,
জানি, নহি আমি যোগ্য তাহার
সোনা করি’ দিলে মোর সংসার,
.                হে পরশমণি তুমি |
স্নেহের আমার গোমুখী-প্রপাত,
.                প্রেমের তীর্থভূমি !

কে তোমারে প্রিয়া, রাখিল সৃজিয়া
.                সোহাগে আমারি তরে !
কোন্ মনোরথে আসিলে লক্ষ্মী
.                লক্ষ্মীছাড়ার ঘরে !
কোন্ সে অতীত পুণ্যের ফলে
রচিলে আলয় পরাণ-কমলে
তব উত্সব-দীপ আজি জ্বলে
.                আনন্দে দিবাযামী,
কোন্’ শিব’জটা বহি বল্লভী
.                মানসে আসিলে নামি |

দুলিয়া ফুলিয়া প্লাবন-জাগর
.                মিলন-সাগর, সখি,
লুটায়ে পড়িছে বক্ষ-বেলায়
.                তোমারি কিরণে ওকি ?
.তোমারি পেলব-পীযূষ-তৃষায়
চিত্ত-চকোর ফিরে কি নিশায়
চাহি ছায়াপথে তোমারি দিশায়
.                অধর-কুমুদ জাগে ?
তোমারি জীবনে জীবন তাহার,
.                দাবী তার সব আগে |

যাচিয়া চরণ, হৃদয়-আসন
.                পেতেছিনু তব প্রিয়া
ধন্য করিলে অঙ্ক তাহার
.                শ্রীপদ’ –প্রসাদ দিয়া
থাক’ থাক’ সেথা হইয়া অচল
নিখিল-নারীর হে রাকা অমল
তোমারি ধ্যানের মন্ত্রে কেবল
.                ফুটুক্ আমার বাণী ;
তুমি থাক মোর সকলের বাড়া,
.                তুমি থাক’ মোর রাণী |







.                         ***************  
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
ফাল্গুনে
কবি গিরিজাকুমার বসু
সুকুমার সেন সম্পাদিত “বাংলা কবিতা সমুচ্চয়” ১ম খন্ড থেকে নেওয়া

এত কলি, এত মধু, এত গুঞ্জরণ
.                এত কেন বিচিত্র বরণ
আমার দুয়ারে আজি আনিলে বল্লভ !
.                নিশিদিন নবীন পল্লব
দক্ষিণের মৃদু বায়ে শিহরি সঞ্চরি
.                এই মোর মুগ্ধ হিয়া ভরি
এত কথা কেন কহে ? হে প্রিয় আমার
.                আনন্দের এত উপহার
সহিতে যে পারে না পরাণ,  গেছ ভুলি
.                কি ব্যথায় গেছে দিনগুলি ?

সেই তীব্র বেদনার অন্ধকার টুটি
.                উঠে আজি চারিদিকে ফুটি
একি আভা, একি জ্যোতিঃ |  উচ্ছ্বাসিয়া বুক
.                ঝলসিছে কি মহা ময়ূখ |
অন্তহীন রিক্ততার হিম শীর্ণ হাতে
.                বসন্তের কিরণ সম্পাতে
প্রাচুর্যের একি শুভ্র লীলা-শতদল
.                দিলে আনি সুধার কোমল
একেবারে এত সুখ হানি হৃদিতলে
.                ভাসাইলে কেন আঁখিজলে ?

রাগ করিয়ো না, প্রিয় ! এতদিন পরে
.                হে বাঞ্ছিত, এলে তুমি ঘরে
মোর তরে নিয়ে এলে করি আহরণ
.                কত বেশ, কত আভরণ
মরমের বীণাখানি যতনে সাধিয়া
.                কত সুরে আনিলে বাঁধিয়া
নাই মনে অপ্রশংসা তার ; সমারোহ
.                চিত্তে মোর জাগায়ো না দ্রোহ
শুধু ভয়, পাছে গুরু নৈবেদ্যের ভারে
.                হারাইয়া ফেলি দেবতারে ||




.                         ***************  
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
ঠাণ্ডার গল্প
কবি গিরিজাকুমার বসু
শক্তি চট্টোপাধ্যায় ও এখ্ লাসউদ্দিন আহ্ মদ  সম্পাদিত “দুই বাংলার ছড়া” থেকে নেওয়া

বিধু বলে--- আজকাল পাটনায় সে কি শীত
শুনে তুই একেবারে হয়ে যাবি স্তম্ভিত |
ভোরবেলা উঠে দেখি বুক কাঁধ ঘাড়-পিঠ,
বরফেতে জমে গিয়ে হয়ে গেছে ইঁট !

নিধু বলে ---- ও তো ভারি, আমাদের গ্রামটায়
ঠাণ্ডা যে কি রকম শুনে হবি চুপ ঠায় |
ঘুম ভেঙে ঘটি নিয়ে গিয়ে কাছে গাইটার
দুধ দুই, যত দেখি ---- এ আবার কি ব্যাপার ?
বিস্ময়ে সোজা হয়ে ওঠে গোঁফ জুলফি
বাঁট থেকে ক্রমাগত বার হয় কুলফি |



.                         ***************  
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
তমাল
কবি গিরিজাকুমার বসু
প্রবাসী পত্রিকার মাঘ ১৩০৮ ( ফেব্রয়ারী ১৯০২ ) সংখ্যা থেকে নেওয়া।

কার সে বাঁশরী-রবে প্রেম-বৃন্দাবনে
উষার কণকভূষা ধরি চারু শিরে
জাগিলে প্রথম তুমি বিপুল ভূবনে


.                         ***************  
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
দাবী
কবি গিরিজাকুমার বসু
দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ও জলধর সেন সম্পাদিত ভারতবর্ষ পত্রিকার আষাঢ় ১৩২৯ ( জুলাই
১৯২২ ) সংখ্যা থেকে নেওয়া।

তুমি কেন পাও লাজ
.                              ‘বউ’ বলে ডাক্ লে ?
তুমি কেন যাও স’রে
.                               আর কেউ থাকলে ?
.                                 জয়ে বশ বাড়্ বে।
 
.                         ***************  
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
তৃপ্তি
কবি গিরিজাকুমার বসু
দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ও জলধর সেন সম্পাদিত ভারতবর্ষ পত্রিকার অগ্রহায়ণ ১৩২৯ ( ডিসেম্বর
১৯২২ ) সংখ্যা থেকে নেওয়া।

নিল সরমের বাঁধ টুটি
.        মরমের চাঁদ, ঠাঁই---
.                        আকাশে

ছিল প্রেমে মোর কোন্ ত্রুটি
.        বুকে ঢাকা নিধি তাই
.                        রাকা সে।

তার হৃদয়ের সব আশা
.        মিটে যদি তারকার
.                        শয়নে

আর কাজ নাই ভালবাসা
.        থাক্ দূরে, দেখি শুধু
.                        নয়নে।


.                         ***************  
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
দুর্লভ
কবি গিরিজাকুমার বসু
দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ও জলধর সেন সম্পাদিত ভারতবর্ষ পত্রিকার আশ্বিন ১৩২৯ ( অক্টোবর
১৯২২ ) সংখ্যা থেকে নেওয়া।

ডাগর আঁখিতে আলোর সাগর কুঙ্কুম গালে লালের মায়া,
আধ’ শশী তার শোভন ললাট কুসুম-ধনুর ভ্রূ-দুটি ছায়া


.                         ***************  
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
বাদলের ব্যাথা
কবি গিরিজাকুমার বসু
দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ও জলধর সেন সম্পাদিত ভারতবর্ষ পত্রিকার শ্রাবণ ১৩২৯ ( অগাষ্ট
১৯২২ ) সংখ্যা থেকে নেওয়া।

বুকের জমাট ব্যথা বিষাদের তপ্ত-শ্বাসে
.                               আঁখি-কোণে হইয়া তরল,
পড়িল ঝরিয়া যার তোমারি স্বাগত-পথ
.                               করি বঁধু কোমল সরল ;


.                              ***************  
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
.   সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত
কবি গিরিজাকুমার বসু
দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ও জলধর সেন সম্পাদিত ভারতবর্ষ পত্রিকার শ্রাবণ ১৩২৯ ( অগাষ্ট
১৯২২ ) সংখ্যা থেকে নেওয়া।

[ পরলোকগমন - শনিবার, ১০ই আষাঢ়, ১৯২৯ --- রাত্রি দুই ঘটিকা ]

সে যে এসেছিল চাঁদের কিরণ
.                                পৌণ-মাসীর রাতে ;
সে যে ভেসেছিল কোকিল-কূজন
.                                স্নিগ্ধ মলয় রাতে ;
সে যে ফুটেছিল কুন্দ-কুসুম
.                                পৌষে তপন করে ;


.                              ***************  
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর